মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ০৭ জুলাই ২০২৬, ০৯:৩০

স্বপ্নযাত্রায় একধাপ এগিয়ে ফরিদগঞ্জ ফুটবল একাডেমির তিন উদীয়মান ফুটবলার

রাজন চন্দ্র দে
স্বপ্নযাত্রায় একধাপ এগিয়ে ফরিদগঞ্জ ফুটবল একাডেমির তিন উদীয়মান ফুটবলার

বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল) বা জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়া যে কোনো তরুণের জন্যে আজীবনের লালিত স্বপ্নের বাস্তবায়ন। নিজের দেশের শীর্ষ মঞ্চে লাল-সবুজ জার্সিতে খেলার সুযোগ পাওয়া মানে লক্ষ লক্ষ ফুটবলপ্রেমীর ভালোবাসা ও প্রত্যাশার বিশাল দায়িত্ব কাঁধে নেওয়া। সেই আশায় ছোটবেলা থেকেই একটা স্বপ্ন নিয়ে ফুটবলের যাত্রা শুরু হয় ফরিদগঞ্জ উপজেলার ৮নং পাইকপাড়া দক্ষিণ ইউনিয়নের কড়ৈতলী গ্রামের সন্তান আনন্দ চন্দ্র দে দীপ, পুষ্প আহমেদ ও উদয় চন্দ্র দে’র।

১. ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাবে সুযোগ পাওয়া দীপের সাথে কথা হলে তিনি জানান, ছোটবেলা থেকেই ফুটবলকে ভালোবাসতাম। মাঠে যখন খেলা হতো বসে বসে খেলা দেখতাম। আমার স্বপ্ন ছিলো একদিন ভালো একজন ফুটবলার হবো। কড়ৈতলী উদয়ন যুব সংঘের মাঠ থেকেই আমার ফুটবলের যাত্রা শুরু। একদিন শুনলাম আমাদের কড়ৈতলী এলাকার একজন কৃতী সন্তান আছেন, যে কিনা বাংলাদেশ জাতীয় দলে খেলেন। তাঁর নাম রেজাউল করিম রেজা। তিনি ফরিদগঞ্জের ফুটবলকে আরও এগিয়ে নিতে একটা ফুটবল একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি প্রতিটি ইউনিয়নে নিজে এবং তাঁর সহকর্মীদের নিয়ে খেলোয়াড় বাছাইয়ের কাজ শুরু করলেন। এই সুযোগে আমিও আমার ইউনিয়নের পক্ষ থেকে ফরম পূরণ করলাম। কারণ এই সুযোগ আমি হাতছাড়া করতে চাইনি। পরিচয় হলো রেজা ভাইয়ের সাথে। খুবই আন্তরিক একজন মানুষ তিনি। খুবই ভালোবাসতেন আমাকে। তিনি আমার খেলা দেখে বললেন, একদিন বড়ো মাপের একজন খেলোয়াড় হবে। চালিয়ে যাও। প্রশিক্ষণ গ্যাপ দিবে না। তারপর ফরিদগঞ্জ ফুটবল একাডেমিতে ভর্তি হলাম, আর শুরু হলো আমার আসল যুদ্ধ। শুধু কঠোর পরিশ্রম করতে লাগলাম।

অবশেষে আমাদের একাডেমির সর্বশেষ কোচ স্বপন স্যার বললেন, কিছুদিন পর ঢাকা সেকেন্ড ডিভিশন বাংলাদেশ ফুটবলের লিগ শুরু হবে। স্যার বললেন “ট্রায়াল দে।” আমি বললাম, ঠিক আছে স্যার। তখন আমি ও আমার দু বন্ধু উদয় ও পুষ্প ঢাকা সেকেন্ড ডিভিশন ফুটবল লিগের জন্যে ট্রায়াল দিলাম। আমরা তিনজনই উত্তীর্ণ হলাম। এরপর মেডিকেল টেস্টেও তিনজনে টিকলাম এবং ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাবে প্রশিক্ষণ নেয়া শুরু করলাম।

আমার বাবা ও মায়ের স্বপ্ন ছিলো একদিন আমি ভালো একজন ফুটবলার হবো। সেই স্বপ্ন যেনো পূরণ হয় সেজন্যে মহান সৃষ্টিকর্তার নিকট প্রার্থনা করি। সত্যি কথা বলতে, নিজের দেশের শীর্ষ ক্লাবগুলোতে সুযোগ পাওয়ার অনুভূতিটি অবর্ণনীয়। গ্রামের পাড়া মহল্লা থেকে শুরু করে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় এবং শহরের বিভিন্ন অলিগলি বা জেলা পর্যায়ের মাঠ থেকে উঠে এসে একদম পেশাদার মঞ্চে পা রাখাটা বিশাল অর্জনের।

দীপ আরও জানান, সমর্থকরা যে আবেগ নিয়ে স্টেডিয়ামে আসেন বা খেলা দেখেন, সেই চাপ সামলে সেরাটা দিয়ে দলকে জেতানো অনেক বড়ো মানসিক শক্তির কাজ। আমি আমার সাধ্যমতো চেষ্টা করবো কড়ৈতলীর মাঠ থেকে ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাবে এসে আমার সেরাটা দেওয়ার। আপনারা আমার জন্যে একটু আশীর্বাদ করবেন। আমি যেনো একদিন বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের হয়ে খেলতে পারি। কৃতজ্ঞতা জানাই আমাকে এই জায়গায় আনতে যিনি বিশেষ ভূমিকা পালন করেছেন, আমার কোচ স্বপন স্যারের প্রতি।

২. ফুটবল আমার নেশা, মাঠ আমার পরিচয়Ñএটাই ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাবে সুযোগ পাওয়া ফরিদগঞ্জ ফুটবল একাডেমির আরেক উদীয়মান ফুটবলার পুষ্প আহমেদের কথা। ছোটবেলা থেকেই তিনি ফুটবলের প্রতি খুবই মনোযোগী ছিলেন। বাড়ির পাশে মাঠ হওয়াতে দিনের প্রায় অধিকাংশ সময়ই কাটতো মাঠে ফুটবলকে নিয়ে।

ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাবে সুযোগ পাওয়া পুষ্প আহমেদ কড়ৈতলী উদয়ন যুব সংঘের মাঠ থেকেই ফুটবলের যাত্রা শুরু করেন। বাংলাদেশ জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক রেজাউল করিম রেজার প্রতিষ্ঠিত ফরিদগঞ্জ ফুটবল একাডেমিতে প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে পুষ্পের খেলোয়াড়ি জীবন শুরু হয়। একজন ভালো ও দক্ষ ফুটবলার হিসেবে একাডেমিতে পুষ্প বেশ সুনাম কুড়িয়েছেন।

পুষ্প আহমেদ একাডেমিতে নিয়মিত অনুশীলনের পাশাপাশি বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার ফুটবল টুর্নামেন্টে অংশ নেন। তিনি ফরিদগঞ্জ উপজেলা দল, চাঁদপুরের বিভিন্ন ক্লাবের হয়ে এবং জেলার বিভিন্ন ছোট-বড় টুর্নামেন্টে ধারাবাহিকভাবে খেলে থাকেন। পুষ্প আহমেদ খেলাধুলার পাশাপাশি পড়ালেখা চালিয়ে যাচ্ছেন।

২০২৫ সালের আগস্টে আবারও ফরিদগঞ্জ ফুটবল একাডেমিতে কোচ স্বপন চৌধুরীর তত্ত্বাবধানে অনুশীলন শুরু করেন পুষ্প। পরবর্তীতে পুষ্প কোচের সুপারিশে ঢাকার ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাবের দ্বিতীয় বিভাগ লিগের ট্রায়ালে অংশ নেন। সফলভাবে ট্রায়াল ও প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে অবশেষে ঢাকা দ্বিতীয় বিভাগ ফুটবল লিগে খেলার সুযোগ অর্জন করেন তিনি।

তিনি সকলের কাছে দোয়া কামনা করেছেন, ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জাতীয় ফুটবল দলে যাতে খেলার সুযোগ পান এবং কঠোর পরিশ্রম ও নিষ্ঠার মাধ্যমে দেশের ফুটবলে নিজের অবস্থান তৈরি করতে পারেন। বাবা-মা, ফরিদগঞ্জ ফুটবল একাডেমীর প্রতিষ্ঠাতা রেজাউল করিম রেজা, কোচ স্বপন চৌধুরী, সতীর্থ এবং যারা সবসময় সাহস ও সমর্থন দিয়েছেন, তাদের সবার প্রতি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞতা জানান পুষ্প।

৩. ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাবে সুযোগ পাওয়া আরেক ফুটবলার উদয়ের সাথে কথা হয়। তিনি জানান, একসময় ফুডপান্ডায় চাকরি করতাম। কিন্তু আমার স্বপ্ন ছিলো একজন ভালো ফুটবলার হওয়া। সেই থেকেই ফুডপান্ডার রাইডার থেকে ঢাকা লিগে আমার স্বপ্নযাত্রা।

একসময় ক্রিকেটই ছিলো আমার প্রথম ভালোবাসা। কিন্তু ২০১৯ সালে ফরিদগঞ্জ উপজেলার কড়ৈতলী উদয়ন যুব সংঘ মাঠে স্থানীয় ফুটবলার তমালের খেলা দেখে ফুটবলের প্রতি গভীর আগ্রহ জন্মায় আমার। সেদিন থেকেই খালি পায়ে ফুটবল খেলতে শুরু করি আমি। ২০২১ সালে আমাদের এলাকার কৃতী সন্তান, ফরিদগঞ্জ ফুটবল একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা, বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক রেজাউল করিম রেজার স্বপ্নের একাডেমি ফরিদগঞ্জ ফুটবল একাডেমিতে ট্রায়ালের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ নেওয়ায় সুযোগ পাই। এরপর থেকেই স্বপ্ন দেখতে শুরু করি একদিন ঢাকার মাঠে খেলার। তবে সেই স্বপ্নপথ ছিলো সংগ্রাম, ত্যাগ আর কঠোর পরিশ্রমে ভরা।

পারিবারিক আর্থিক সংকটের কারণে নিজের ফুটবল অনুশীলনের খরচ নিজেকেই বহন করতে হয়েছে। এজন্যে চাঁদপুরে ফুডপান্ডা রাইডার হিসেবে কাজ করতাম। সকালে বাসে করে ফরিদগঞ্জ থেকে একাডেমিতে অনুশীলন, বিকেলে চাঁদপুর আউটার স্টেডিয়ামে ব্যক্তিগত অনুশীলন এবং সন্ধ্যা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত ফুডপান্ডায় ডেলিভারিÑএভাবেই চলেছে আমার প্রতিদিনের জীবন।

২০২২ সাল পর্যন্ত চাঁদপুরে থেকে অনুশীলন চালিয়ে যাওয়ার পর বাড়িতে ফিরে নিয়মিত অনুশীলনের পাশাপাশি বিভিন্ন ফুটবল টুর্নামেন্টে অংশ নেই। ২০২৩ ও ২০২৪ সালে ফরিদগঞ্জ উপজেলা দল, চাঁদপুর জেলা দল এবং জেলার বিভিন্ন ছোট-বড় টুর্নামেন্টে ধারাবাহিকভাবে খেলেছি।

২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত পারিবারিক দায়িত্ব পালনের জন্যে ঢাকার একটি মেডিকেল ক্যান্টিনে চাকরি করি। পরে সেই চাকরি ছেড়ে আবার ফুডপান্ডা রাইডার হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি আরামবাগ ফুটবল একাডেমিতে ভর্তি হয়ে অনুশীলন করার পরিকল্পনা করি। কিন্তু নানা প্রতিকূলতায় সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয়নি। এরই মধ্যে কানে সংক্রমণ ও জ্বরে আক্রান্ত হয়ে বাড়ি ফিরে যেতে বাধ্য হই। দীর্ঘ প্রায় ছয় থেকে সাত মাস ফুটবল থেকে দূরে থাকতে হয় আমাকে।

২০২৫ সালের আগস্টে আবারও ফরিদগঞ্জ ফুটবল একাডেমিতে কোচ স্বপন চৌধুরীর তত্ত্বাবধানে অনুশীলন শুরু করি। সেপ্টেম্বরে চাঁদপুর ডিসি কাপে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের মাধ্যমে আবারও নিজেকে প্রমাণ করি। সেই পারফরম্যান্সে কোচদের নজরে আসি আমি। পরবর্তীতে কোচের সুপারিশে ঢাকার ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাবের দ্বিতীয় বিভাগ লিগের ট্রায়ালে অংশ নেই। সফলভাবে ট্রায়াল ও প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে অবশেষে ঢাকা দ্বিতীয় বিভাগ ফুটবল লিগে খেলার সুযোগ অর্জন করেছি আমি।

উদয় বলেন, “এই অর্জন আমার একার নয়। আমার বাবা-মা, ফরিদগঞ্জ ফুটবল একাডেমি, আমার কোচ স্বপন চৌধুরী, আমার সতীর্থ এবং যারা সবসময় আমাকে সাহস ও সমর্থন দিয়েছেন, তাদের সবার প্রতি আমি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ। তাদের দোয়া ও সহযোগিতা ছাড়া আজকের এই অবস্থানে পৌঁছানো সম্ভব হতো না।”

ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জাতীয় ফুটবল দলে খেলে লাল-সবুজের জার্সিতে দেশকে প্রতিনিধিত্ব করাই উদয়ের সবচেয়ে বড়ো স্বপ্ন। তিনি সকলের কাছে দোয়া ও আশীর্বাদ কামনা করেছেন, যেন কঠোর পরিশ্রম ও নিষ্ঠার মাধ্যমে দেশের ফুটবলে নিজের অবস্থান তৈরি করতে পারেন।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়