প্রকাশ : ২৮ আগস্ট ২০২৪, ০০:০০
আউটার স্টেডিয়ামের উন্নয়ন কাজে কেন এতো গোপনীয়তা?

যে কোনো উন্নয়ন কাজে যে প্রাক্কলন বা এস্টিমেট করা হয়, তাতে ঠিকাদারের লাভ ধরেই সেটা করা হয়। কিন্তু কাজ পেতে ঠিকাদাররা আজকাল কে কতো লেসে দরপত্র দাখিল করবে তার প্রতিযোগিতায় নামে। তারপর কার্যাদেশ বাগিয়ে নিতে পারলে অধিকাংশ ঠিকাদার সেটাকে সাব কন্ট্রাক্টরের নিকট কিংবা দক্ষ বা দক্ষ ব্যক্তির কাছে বিক্রি করে আগাম লাভ তুলে নিয়ে সটকে পড়ে। অবস্থা এমন দাঁড়ায়, দুধরূপী কাজটির ক্রিম তুলে খেয়ে ফেলে ঠিকাদার ক্রিমবিহীন দুধটি সাব কন্ট্রাক্টরের জন্যে রেখে দেয়। তখন সাব কন্ট্রাক্টর কাজের মান ধরে রাখার মানসিকতায় আর থাকে না। মূল ঠিকাদার ও সাব কন্ট্রাক্টর স্থানীয় রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি, মাস্তান-সন্ত্রাসী, টাউট-বাটপার- দালালদের ম্যানেজ করে, বিশেষ করে কার্যাদেশ প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ ও যাদের কাজ তাদের কর্তাব্যক্তিদের যে কোনোভাবে বাগিয়ে কোনোমতে কাজ শেষ করার ফন্দি আঁটে। খোঁজ পেয়ে গণমাধ্যম কর্মী কিংবা সচেতন কেউ সিডিউল অনুযায়ী কাজ হচ্ছে কিনা জানতে চাইলে ঠিকাদার/সাব কন্ট্রাক্টরের মাথা গরম হয়ে যায়। তারা সিডিউল নিয়ে লুকোচুরি খেলে, তথ্য গোপন করে কিংবা গণমাধ্যম কর্মীকেও ম্যানেজ করে, আর ম্যানেজ করতে না পারলে গণমাধ্যম কর্মীকে বা সচেতন ব্যক্তিকে চাঁদাবাজের তকমা পরিয়ে দেয়, হুমকি-ধমকি দেয়, আর সংবাদ প্রকাশিত হলে প্রতিবাদ দেয় ইত্যাদি। চাঁদপুর আউটার স্টেডিয়ামের কোটি কোটি টাকার উন্নয়নমূলক কাজ নিয়ে যা হচ্ছে, তা উপরোল্লিখিত বিবরণের সাথে সাযুজ্যপূর্ণ বলে মনে হচ্ছে।
গতকাল চাঁদপুর কণ্ঠের ক্রীড়াকণ্ঠে 'আউটার স্টেডিয়ামের কোটি কোটি টাকার উন্নয়ন কাজের সুষ্ঠু তদারকি ও হিসেব নেই' শিরোনামের প্রতিবেদনে চৌধুরী ইয়াসিন ইকরাম তুলে ধরেছেন যে, চাঁদপুর আউটার স্টেডিয়ামে চলছে কোটি কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের আওতায় এ কাজ হচ্ছে বলে জানা গেছে। আউটার স্টেডিয়াম মাঠের চারপাশে দেয়াল বর্ধিতকরণ, সুইমিংপুল সংস্কার, ইনডোরে খেলার ব্যবস্থাসহ মাঠের উন্নয়ন হচ্ছে এই প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু কে এই প্রকল্পের কাজ করছেন বা কারা করছেন এ সম্বন্ধে জানতে গেলে প্রায় শোনা যেতো, এক প্রভাবশালী ঠিকাদার এই কাজ করছেন। তার ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে কথা বলতে গেলে বলা হতো, আগে কথা বলুন চাঁদপুর পৌরসভার সাবেক মেয়র (বর্তমানে পলাতক) জিল্লুর রহমান জুয়েল এবং জেলা ক্রীড়া সংস্থার সহ-সভাপতি ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের জনৈক পরিচালকের সাথে। এ ছাড়া কোন্ কোন্ কাজে কী পরিমাণ খরচ হবে সেটা জানতে জেলা ক্রীড়া সংস্থার দায়িত্বপ্রাপ্ত সেক্রেটারি গোলাম মোস্তফা বাবুকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি জেলা ক্রীড়া সংস্থার সহ-সভাপতিদের সাথে আলাপ করতে পরামর্শ দিতেন। একটা লুকোচুরি ভাব পুরো কাজটিকে ঘিরে। সেই কাজ এখনও চলছে। তবে গত ক'দিন ধরে কাজের তত্ত্বাবধানকারী কাউকে গিয়ে পাওয়া যাচ্ছে না। কেবল শ্রমিকরা কাজ করে যাচ্ছেন। তাদের কাছে কিছু জানতে চাইলে তারা বলেন, আমরা তো এ জেলার মানুষ নই, কাজ করতে এখানে এসেছি, কাজ করে চলছি। আর কিছু বলতে পারবো না।
আউটার স্টেডিয়াম এলাকা ঘুরে জানা যায়, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই বছরাধিককাল সময় পূর্বে কাজটি শুরু করেন ঢাকার এক ঠিকাদার, যার হাত নাকি অনেক লম্বা (!)। যিনি জেলা আওয়ামী লীগের নেতৃস্থানীয় ক'জন (যারা জেলা ক্রীড়া সংস্থারও কর্মকর্তা)কে ম্যানেজ করেই নাকি এ কাজ শুরু করেছেন এবং এখনও করছেন। বাস্তবতা হলো, আউটার স্টেডিয়ামের চারপাশে পুরানো ইট ও নিম্নমানের ইট দিয়ে তৈরি করা হয়েছে বাউন্ডারি দেয়াল। এই অনিয়মের বিষয়ে আগ্রহী কোনো গণমাধ্যম কর্মী জানতে চেয়েছেন তো তৎকালীন ক্ষমতাধর মেয়র খেপে উঠতেন। তার ভাবটা ছিলো এমন-ঠিকাদার এতোটা ক্ষমতাধর যে, তার কাজের বিষয়ে ন্যূনতম নাক গলালে নাক ভেঙ্গে যাবে এবং কেউ হাত বাড়ালে হাত পুড়ে যাবে। এই প্রকল্পের আওতায় মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক সাঁতারু অরুণ নন্দী সুইমিংপুলটির গ্যালারীর কাজ বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু সুইমিংপুলের ভেতরের কাজ পরিপূর্ণ হয়ে উঠেনি।
স্থানীয় এলাকাবাসী ও ক্রীড়া-দর্শকদের সাথে আলাপকালে তারা জানান, আউটার স্টেডিয়ামে বিভিন্ন ইভেন্টের খেলার মাঠের অনেকাংশ জুড়ে কয়েক ধাপের সিঁড়ি বানানো হচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে খেলোয়াড়দের অনুশীলনের জন্যে মাঠ পেতে সমস্যায় পড়তে হবে। জেলা ক্রীড়া সংস্থার নতুন এডহক কমিটি কিংবা পরবর্তীতে জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাথে জড়িত বিভিন্ন ক্লাবের প্রতিনিধিদের ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত কার্যকরী কমিটি যদি আউটার স্টেডিয়ামের কোটি কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের কাজের নকশা ও সিডিউল অনুযায়ী সকল হিসাব ও কাজের স্বচ্ছতা আদায় করে নিতে পারে, তাহলে প্রকল্পটি এগিয়ে নেয়া হবে সঙ্গত। এ ধরনের কাজের জন্যে অভিজ্ঞ ও সাবেক খেলোয়াড়দের নিয়ে কমিটি গঠন করা হলে এর কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হবে বলে অভিজ্ঞজনদের অভিমত। প্রকল্পটির কাজের অগ্রগতির বিষয়ে জেলা ক্রীড়া সংস্থার সদ্য সাবেক সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা বাবুর সাথে মুঠোফোনে কয়েকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তার মুঠোফোনটি বন্ধ থাকায় বক্তব্য নেয়া যায় নি।
চাঁদপুর জেলা ক্রীড়া সংস্থার সদ্য বিদায়ী সাধারণ সম্পাদক শিক্ষা জীবনে ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে লেখাপড়া করেছেন কিনা সেটা জানা সম্ভব না হলেও তার ম্যানেজরিয়াল ক্যাপাসিটি বা ব্যবস্থাপনাগত দক্ষতা ছিলো উল্লেখযোগ্য। তিনি চাঁদপুরে আওয়ামী লীগের দু গ্রুপকে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ম্যানেজ করে তার পদটা দীর্ঘদিন ঠিক রাখতে সক্ষম হয়েছেন। এতে ক্রীড়া ঠিকভাবে চললো কি চললো না এবং উন্নয়নমূলক কাজ ঠিকমত হলো কি হলো না সেটা নিয়ে গণমাধ্যম ছাড়া অন্য কারো মাথা ঘামানোর ফুরসত দেখা যায় নি। কোনো ক্রীড়া ইভেন্ট হলে স্টেডিয়াম বা আউটার স্টেডিয়ামে গণমাধ্যম কর্মীদের ভিড় জমাতে দিলেও জেলা প্রশাসক পদাধিকার বলে জেলা ক্রীড়া সংস্থার সভাপতি হিসেবে উন্নয়ন কাজ পরিদর্শন বা তদারকিতে আসলে কোনো গণমাধ্যম কর্মীকে ভিড় জমাবার সুযোগ দিতেন না এই সাধারণ সম্পাদক । ‘গোপনীয়তা পাপ’ হলেও এটি তার জন্যে পাপ ছিলো না। সেজন্যে উন্নয়নমূলক কাজ সহ ক্রীড়া সংস্থার অনেক কিছুতেই তিনি গোপনীয়তা রক্ষার কাজে অসাধারণ পারঙ্গমতার পরিচয় দিয়েছেন এবং প্রভাবশালীদের খুশি করতে সক্ষম হয়েছেন। এখন দেখার অপেক্ষা, অ্যাডহক কমিটি বা নূতন কমিটির দায়িত্বে যারা আসবেন, তারাও ক্রীড়া সংস্থার সকল কিছুতে গোপনীয়তা রক্ষার প্রতিযেগিতা করেন, না স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠায় আন্তরিক হন।