প্রকাশ : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৪৯
স্ত্রীর জন্যে স্বামীর এতো বড় ত্যাগ চিকিৎসকের মোবাইল-আসক্তিতেই যেন শেষ!

স্ত্রীর প্রতি একজন স্বামীর ভালোবাসার গভীরতা কতটা হতে পারে, আক্তার হোসেনের ২৫ বছরের প্রবাসজীবনের গল্প তারই এক মর্মস্পর্শী উদাহরণ। জীবিকার সন্ধানে সংযুক্ত আরব আমিরাতে পাড়ি জমিয়ে সেখানে ব্যবসা গড়ে তুলেছিলেন তিনি। কিন্তু অসুস্থ স্ত্রীর খবর পেয়ে সেই সাজানো প্রবাসজীবনের ইতি টেনে ২০১৫ সালে দেশে ফিরে আসেন। স্ত্রীর চিকিৎসায় ব্যয় করেছেন জীবনের সঞ্চিত অর্থের বড় একটি অংশ—পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, যার পরিমাণ প্রায় দেড় কোটি টাকা। লিভার প্রতিস্থাপনের পর স্ত্রীকে সুস্থ রাখার আশায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে বছরের পর বছর পাশে থেকেছেন। অথচ সেই দীর্ঘ লড়াইয়ের শেষ প্রান্তে এসে যদি একজন চিকিৎসকের অবহেলার কারণে একটি প্রাণ ঝরে যায়—তাহলে তা কেবল একটি পরিবারের শোক নয়, পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্যেই গভীর প্রশ্ন।
শাহরাস্তি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে হাজেরা বেগমের মৃত্যুকে ঘিরে যে অভিযোগ উঠেছে, তা অত্যন্ত গুরুতর। স্বজনদের অভিযোগ, রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটার পর চিকিৎসকের সহায়তা চেয়েও তারা তাৎক্ষণিক সাড়া পাননি এবং চিকিৎসক তখন মোবাইল ফোনে ব্যস্ত ছিলেন। বিদ্যুৎ না থাকার কারণে ওপরের তলায় যেতে না পারার অভিযোগও এসেছে। শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ অপেক্ষার পর রোগীর মৃত্যু হয়। এসব অভিযোগ সত্য হলে এটি নিছক দায়িত্বে গাফিলতি নয়; এটি চিকিৎসাসেবার মৌলিক নৈতিকতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক এক ভয়াবহ ব্যর্থতা।
তবে আবেগ যতই প্রবল হোক, মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণের ক্ষেত্রে অভিযোগের পাশাপাশি তথ্য-প্রমাণ ও নিরপেক্ষ তদন্ত অপরিহার্য। রোগীর মৃত্যুর পেছনে চিকিৎসাগত জটিলতা কতটা দায়ী ছিল, চিকিৎসকের তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপ প্রয়োজন ছিল কি না, সেই সময় কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে খুঁজে বের করতে হবে। অভিযোগ সত্য হলে দায়ী ব্যক্তির বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে; আর অভিযোগের কোনো অংশ সত্য না হলে সেটিও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট করা জরুরি।
চিকিৎসকের হাতে রোগীর জীবন ও পরিবারের শেষ আশাটুকু ন্যস্ত থাকে। তাই হাসপাতালের দায়িত্ব পালনকালে মোবাইল ফোনের ব্যক্তিগত ব্যবহার যদি জরুরি চিকিৎসাসেবার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, সেটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। প্রযুক্তি চিকিৎসকের সহায়ক হতে পারে, কিন্তু রোগীর জীবন রক্ষার মুহূর্তে তা কখনোই রোগীর বিকল্প নয়। একজন চিকিৎসকের কয়েক মিনিটের মনোযোগ কখনো কখনো একটি জীবন আর মৃত্যুর মধ্যে পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।
এই ঘটনা আমাদের সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর জরুরি চিকিৎসাসেবার বাস্তব চিত্র নিয়েও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। রাতে পর্যাপ্ত চিকিৎসক-নার্স উপস্থিতি, জরুরি রোগীর দ্রুত মূল্যায়ন, দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসকের জবাবদিহি এবং রোগীর স্বজনের অভিযোগ শোনার কার্যকর ব্যবস্থা—এসব নিশ্চিত না হলে কেবল অবকাঠামো নির্মাণ করে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
আক্তার হোসেনের কষ্টের জায়গাটি আরও গভীর। তিনি অর্থ দিয়ে, সময় দিয়ে, নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে স্ত্রীকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন। শেষ পর্যন্ত মৃত্যু অনিবার্য হয়ে থাকলেও একজন স্বজন যেন এই আক্ষেপ নিয়ে না ফেরেন যে, ‘আরেকটু আগে চিকিৎসা পেলে হয়তো মানুষটিকে বাঁচানো যেত।’ চিকিৎসাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সাফল্য শুধু রোগীকে সুস্থ করে বাড়ি পাঠানো নয়; শেষ মুহূর্তেও রোগীকে যথাযথ মর্যাদা, মনোযোগ ও চিকিৎসাসেবা দেওয়া।
হাজেরা বেগম আর ফিরে আসবেন না। কিন্তু তার মৃত্যু যদি সত্যিই অবহেলার ফল হয়ে থাকে, তবে এই মৃত্যু থেকে শিক্ষা নেওয়ার দায় সংশ্লিষ্ট সবার। দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদ্ঘাটন করতে হবে। একই সঙ্গে হাসপাতালগুলোতে দায়িত্ব পালনকালে চিকিৎসকদের পেশাগত আচরণ ও মোবাইল ব্যবহারের বিষয়ে কঠোর নীতিমালা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা দরকার।
একজন স্বামী ২৫ বছরের প্রবাসজীবন ছেড়ে স্ত্রীর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। সেই ভালোবাসার শেষ মুহূর্তটি যেন চিকিৎসকের অনাগ্রহ বা মোবাইলের পর্দায় হারিয়ে না যায়—এটাই হওয়া উচিত এই বেদনাদায়ক ঘটনার সবচেয়ে বড় শিক্ষা। মানুষের জীবন কোনো ফোনকল, কোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা কোনো ব্যক্তিগত ব্যস্ততার চেয়ে বড়। হাসপাতালের দরজায় দাঁড়িয়ে অসহায় স্বজনের আকুতি তাই উপেক্ষা করার মতো কোনো সাধারণ শব্দ নয়; সেটি অনেক সময় একটি জীবনের শেষ আর্তনাদ।







