শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ২১ আগস্ট ২০২৬, ০৪:৪৫

অহংকার, নদী ও একটি নিঃসঙ্গ গোধূলি

অধ্যাপক মো. রাকিব হোসেন
অহংকার, নদী ও একটি নিঃসঙ্গ গোধূলি
ছবি : প্রতীকী

অহংকার, নদী ও একটি নিঃসঙ্গ গোধূলি

ক্ষমতার সুবর্ণ সময়ে নিজের প্রাসাদোপম চারতলা বাংলোর রাজকীয় ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে সুরমা বেগম প্রায়ই ভাবতেন—এই শহর, এই জনপদ তাঁর ইশারাতেই চলে।

বয়স ষাটের কোঠায় পৌঁছালেও তাঁর চিবুকের সুদৃঢ় রেখায় লেগে ছিল এক অপ্রতিরোধ্য প্রতাপের ছাপ। প্রায় তিন দশক ধরে এই এলাকার ভাগ্য নিয়ন্ত্রণের মূল চালিকাশক্তি ছিলেন তিনি। তাঁর এক একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ছিল অনুগতদের জন্য অলঙ্ঘনীয় নির্দেশ, আর বিরোধীদের জন্য অলিখিত শাস্তি। ক্ষমতার সুউচ্চ শিখরে বসে তিনি অন্ধভাবে বিশ্বাস করতেন—টাকা, প্রভাব আর পজিশন দিয়ে পৃথিবীর সবকিছুই কেনা সম্ভব; এমনকী মানুষের নিয়তিও।

সেই দম্ভের আড়ালে সংসার নামের নরম অনুভূতিটি ধীরে ধীরে শুষ্ক হয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিল। সন্তানদের তথাকথিত নিরাপত্তার বাহানায় সুদূরে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন, আর তাঁর আজীবনের নিঃশব্দ পথসঙ্গী—প্রচারবিমুখ মৃদুভাষী স্বামীটিকে বন্দি করে রেখেছিলেন এক রাজকীয় খাঁচায়। মাঝরাতে অসুস্থ স্বামী যখন একটু সহমর্মিতা আর ভালোবাসার আশ্রয় খুঁজতেন, সুরমা বেগম তখন ক্ষমতার পরবর্তী দাবার চাল সাজাতে ব্যস্ত। স্বামী একদিন নিঃশ্বাস ফেলে বলেছিলেন, "ক্ষমতার মসনদে বহু মানুষ নতজানু হয় সুরমা, কিন্তু জীবনের শেষ বাঁকে একটা মানুষের হাত ধরে শান্তিতে নিঃশ্বাস ফেলার আশ্রয়টুকু কেনা যায় না।" সুরমা বেগম সেদিন তাঁর সেই গভীর আত্মোপলব্ধিকে রাজনৈতিক দুর্বলতা ভেবে উড়িয়ে দিয়েছিলেন।

কিন্তু মহাকালের নিজস্ব বিচারব্যবস্থা রয়েছে। প্রকৃতির হিসাব কখনো ভুল ঠিকানায় পৌঁছায় না; অমোঘ কর্মফলের নিয়ম ঠিকই তার গন্তব্য খুঁজে নেয়।

এক ঝড়ো রাতে রাজনৈতিক পরিবর্তনের বিধ্বংসী হাওয়ায় তাঁর সেই সুরক্ষিত দুর্গ আর প্রহরীবেষ্টিত থাকেনি। যে সাইরেনের তীব্র শব্দে এতদিন রাজপথ থমকে দাঁড়াত, সেই করুণ সাইরেন বাজিয়েই একদল পুলিশ এসে তাঁর পুরো বাড়ি ঘিরে ফেলল। জাঁকজমপূর্ণ গাড়ির দরজা খুলে যারা প্রতিদিন পিঠ বাঁকিয়ে সালাম জানাত, তাদেরই এক কর্মকর্তা নির্দয় কণ্ঠে আদেশ দিল, "ম্যাডাম, সময় শেষ। গাড়িতে উঠুন।"

হাতে যখন লোহার শক্ত ও শীতল হাতকড়াটা চেপে বসল, সুরমা বেগম শেষবারের মতো পেছনে ফিরে তাকালেন। না, কোথাও সেই স্তুতিকারীদের ভিড় নেই, নেই ফুলের মালা হাতে অনুগতদের সারি। প্রিজন ভানের অন্ধকূপতুল্য লোহার খাঁচায় ওঠার সময় তাঁর চেতনা প্রথমবার অনুধাবন করল—ক্ষমতার চেয়ারটি আসলে কাঠেরই থাকে, তা কখনো মানুষের আপন হয় না।

কারাগারের স্যাঁতসেঁতে চার দেয়ালের নির্জনতায় পার হচ্ছিল তাঁর বন্দিজীবন। ঠিক কয়েক মাসের মাথায় একদিন লোহার গরাদের ওপারে এসে দাঁড়ালেন জেলের এক কর্মকর্তা। মুখাবয়বে কোনো মানবিক প্রলেপ নেই, শুধুই নির্জীব দাপ্তরিক স্বর, "আপনার স্বামী আজ ভোরে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন।"

মুহূর্তের মধ্যে সুরমা বেগমের বুকের ভেতরটা যেন এক শূন্য মরুভূমিতে রূপ নিল। কোনো আর্তনাদ গলা দিয়ে বের হলো না, চোখ দুটো পাথরের মতো জমে গেল। যে মানুষটি আড়ালে থেকে নিঃশব্দে তাঁর সমস্ত ঝড়ের অভিঘাত সহ্য করেছিলেন, জীবনের শেষ মুহূর্তে এসে তাঁর ঠোঁটে এক ফোঁটা পানি তুলে দেওয়ার ক্ষমতাও এই শক্তিশালী সাবেক নেত্রীর নেই।

মেয়ের অক্লান্ত আইনি লড়াইয়ের পর আদালতের নির্দেশে মিলল মাত্র ১২ ঘণ্টার প্যারোল—একটি কফিনের পাশে গিয়ে দাঁড়ানোর সীমিত অধিকার।

পুলিশি কর্ডনের কড়া নজরদারিতে, হাতে হাতকড়া পরা অবস্থায় যখন তিনি কফিনের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন, কাচের এপারে তিনি আর ওপারে তাঁর চিরঘুমে ঢলে পড়া জীবনসঙ্গী। থরথর করে কাঁপতে থাকা হাতটি তিনি কাচের বাক্সের গায়ে রাখলেন। আজ তাঁর শত কোটি টাকার ব্যাংক ব্যালেন্স, ক্ষমতার অগণিত গার্ড আর বিগত দিনের প্রতাপ—কিছুই কাচের ওপারের মানুষটির মাথায় শেষবারের মতো হাত বুলিয়ে দেওয়ার সুযোগটুকুও ফিরিয়ে দিতে পারল না। ক্ষমা চাওয়ার জন্য যে শব্দগুলো বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠছিল, তা নিছক বোবা কান্না হয়ে কাচের দেয়ালেই ধাক্কা খেয়ে ফিরে এলো।

হঠাৎ প্রহরীদের যান্ত্রিক তাগাদা, "ম্যাডাম, ১২ ঘণ্টা পূর্ণ হয়েছে। চলুন।"

এক অপূরণীয় অপরাধবোধ আর শূন্য হৃদয় নিয়ে সুরমা বেগম আবার প্রিজন ভানের দিকে পা বাড়ালেন। গাড়ির ক্ষুদ্র গরাদ দিয়ে হঠাৎ তাঁর চোখ পড়ল পথের ধারে। এক সাধারণ দিনমজুর পরম মমতায় তাঁর অসুস্থ স্ত্রীর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন, আর দুজনে মিলে এক কাপ চা ভাগ করে খাচ্ছেন—দুজনের চোখে এক পরম নির্ভরতা

গাড়ির লোহার দেওয়ালে মাথা ঠেকিয়ে সুরমা বেগমের চোখের জল নিঃশব্দে ঝরে পড়তে লাগল। তিনি আজ হাড়ে হাড়ে অনুধাবন করতে পারছেন—

ক্ষমতার অহংকার মানুষকে এক অদ্ভুত বিভ্রান্তিতে রাখে। কিন্তু রাজদণ্ড কিংবা বিপুল বিত্তপ্রভাব—সবকিছুই সাময়িক প্রবঞ্চনা। জীবন আসলে অত্যন্ত সাধারণ, আর সেই সাধারণ জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ ঐশ্বর্য হলো—জীবনের শেষ মুহূর্তে ভালোবাসার মানুষের পাশে বসে তাঁর হাতটি ধরে শান্তিতে নিঃশ্বাস ফেলতে পারা। কারণ ক্ষমতা চিরদিন থাকে না, কিন্তু মানুষের প্রতি মানুষের আচরণ আর অমোঘ কর্মফল ঠিক ঠিক পথ চিনে দরজায় এসে কড়া নাড়ে।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়