শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ১০ জুলাই ২০২৬, ১২:০৪

কথার বন্যায় হারিয়ে যাচ্ছে শোনার সংস্কৃতি

হাসান আলী
কথার বন্যায় হারিয়ে যাচ্ছে শোনার সংস্কৃতি

কোনো সামাজিক অনুষ্ঠান, পারিবারিক মিলনমেলা কিংবা সভা-সমাবেশে গেলে একটি দৃশ্য প্রায়ই চোখে পড়ে। কেউ কেউ সুযোগ পেলেই কথা বলতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। হাতে মাইক এলে যেন কথার প্রবাহ থামতেই চায় না। নিজের অভিজ্ঞতা, মূল্যবোধ, নৈতিকতা, বিশ্বাস, রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি কিংবা জীবনের দর্শন নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা শুরু হয়। অনেক সময় শ্রোতারা আগ্রহী কি না, মনোযোগ ধরে রাখতে পারছেন কি না, কিংবা অন্য কারও কিছু বলার সুযোগ আছে কি নাÑসেসব বিষয় তেমন বিবেচনায় আসে না।

বিশেষ করে কিছু প্রবীণের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি দেখা যায়। অবশ্য এর পেছনে কারণও রয়েছে। দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতা, অর্জন এবং সংগ্রামের গল্প তঁাদের কাছে মূল্যবান। তঁারা মনে করেন, এই অভিজ্ঞতা অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া প্রয়োজন। অনেক ক্ষেত্রেই এই ভাবনা আন্তরিক। কিন্তু সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন অভিজ্ঞতা বিনিময় একতরফা বক্তৃতায় পরিণত হয় এবং সংলাপের জায়গা সংকুচিত হয়ে যায়।

আসলে মানুষ কেন কথা বলতে এতো ভালোবাসে? কারণ কথা বলা শুধু তথ্য আদান-প্রদান নয়, এটি নিজের অস্তিত্ব জানান দেওয়ারও একটি উপায়। আমরা কথা বলে বোঝাতে চাইÑ“আমি আছি”, “আমার অভিজ্ঞতা আছে”, “আমার মতামত গুরুত্বপূর্ণ।” অনেক সময় কথা বলার মধ্যে স্বীকৃতি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাও কাজ করে। ফলে কোনো অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে কিছু না বললে যেন নিজের উপস্থিতিই অদৃশ্য হয়ে যাবেÑএমন একটি অচেতন অনুভূতি কাজ করতে পারে।

কিন্তু একটি প্রশ্ন থেকে যায়। মানুষ কি সত্যিই কথার মাধ্যমে বদলায়?

বাস্তব অভিজ্ঞতা বলে, কথার চেয়ে কাজের প্রভাব অনেক বেশি। একটি অনুপ্রেরণামূলক বক্তৃতা মানুষকে সাময়িকভাবে উৎসাহিত করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন সাধারণত আসে বাস্তব কর্মকাণ্ড থেকে। একজন মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা সততার কথা বলতে পারেন, কিন্তু একটি সৎ কাজ তার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী বার্তা দেয়। কেউ মানবতার গল্প বলতে পারেন, কিন্তু বিপদে এগিয়ে গিয়ে সাহায্য করা মানুষের মনে অনেক গভীর ছাপ ফেলে।

মজার বিষয় হলো, আমরা অনেক সময় কথা বলার ক্ষেত্রে উদার হলেও কাজের ক্ষেত্রে তুলনামূলক সংযত। সমাজ পরিবর্তনের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করতে আমরা আগ্রহী, কিন্তু বাস্তবে সেই পরিবর্তনের জন্যে সময়, শ্রম বা সম্পদ ব্যয় করতে ততোটা আগ্রহী নই। কোনো সামাজিক সমস্যার সমাধান নিয়ে দীর্ঘ বক্তৃতা দেওয়া সহজ, কিন্তু সমাধানের পথে ছোট একটি পদক্ষেপ নেওয়া তুলনামূলক কঠিন।

আজকাল বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আরেকটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। প্রায় সবাই কিছু না কিছু বলতে চান। কেউ শুভেচ্ছা জানাতে চান, কেউ অভিজ্ঞতা ভাগ করতে চান, কেউ পরামর্শ দিতে চান। এর মধ্যে অনেক ইতিবাচক দিকও আছে। মানুষ অংশগ্রহণ করতে চায়, নিজেকে যুক্ত রাখতে চায়। কিন্তু কখনও কখনও এটি নিজের অবস্থান এবং উপস্থিতি স্মরণ করিয়ে দেওয়ার এক ধরনের প্রচেষ্টায় পরিণত হয়।

অথচ প্রকৃত দক্ষতা সবসময় বেশি কথা বলার মধ্যে নয়। বরং অল্প সময়ে, সহজ ভাষায় এবং পরিষ্কারভাবে মূল বক্তব্য তুলে ধরতে পারা একটি বড়ো গুণ। ইতিহাসে এমন অনেক মানুষ আছেন, যঁারা দীর্ঘ বক্তৃতার জন্যে নয়, বরং সংক্ষিপ্ত অথচ অর্থবহ কথার জন্যে স্মরণীয় হয়ে আছেন। কারণ মানুষের মনোযোগ একটি সীমিত সম্পদ। দীর্ঘ বক্তব্যে গুরুত্বপূর্ণ বার্তাও হারিয়ে যেতে পারে।

আরও একটি বিষয় আমাদের ভাবা দরকার। আমরা কি সত্যিই শুনতে জানি?

বর্তমান সময়ে মনে হয়, অধিকাংশ মানুষ বক্তা হতে চায়, শ্রোতা নয়। সবাই নিজের কথা বলতে চায়, কিন্তু অন্যের কথা মন দিয়ে শোনার আগ্রহ তুলনামূলক কম। অথচ শোনা একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক দক্ষতা। একজন মনোযোগী শ্রোতা শুধু তথ্য গ্রহণ করেন না, তিনি অন্য মানুষকে সম্মানও দেন। অনেক সম্পর্ক ভেঙে যায় কথা কম বলার কারণে নয়, বরং কেউ কারও কথা মন দিয়ে না শোনার কারণে।

প্রবীণ বয়সে এই বিষয়টির গুরুত্ব আরও বেশি। দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতা অবশ্যই মূল্যবান, কিন্তু সেই অভিজ্ঞতা তখনই কার্যকর হয়, যখন তা বিনয়ের সঙ্গে ভাগ করা হয় এবং নতুন প্রজন্মের কথা শোনার জন্যও সমান আগ্রহ থাকে। জ্ঞান শুধু বলার মধ্যে নয়, শোনার মধ্যেও বৃদ্ধি পায়।

সবশেষে বলা যায়, মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করার জন্যে সবসময় দীর্ঘ বক্তব্য প্রয়োজন হয় না। কখনও কখনও একটি সংক্ষিপ্ত বাক্য, একটি সৎ কাজ, একটি সহানুভূতিশীল আচরণ কিংবা একটি মনোযোগী শ্রবণই সবচেয়ে শক্তিশালী বার্তা হয়ে উঠতে পারে।

হয়তো আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড়ো প্রয়োজন আরও কিছু বক্তা নয়, বরং আরও কিছু ভালো শ্রোতা। কারণ যে সমাজে সবাই কথা বলে কিন্তু কেউ শোনে না, সেখানে শব্দ বাড়ে; কিন্তু বোঝাপড়া বাড়ে না।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়