শুক্রবার, ২৬ জুন, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ২৬ জুন ২০২৬, ১৭:৪৭

পবিত্র আশুরার আমল ও মুসলিমদের করণীয়

অনলাইন ডেস্ক
পবিত্র আশুরার আমল ও মুসলিমদের করণীয়

শুক্রবার (২৬ জুন) পবিত্র আশুরা পালিত হবে। পবিত্র আশুরা বা মহররম মাসের ১০ তারিখ ইসলামের ইতিহাসে এ দিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পবিত্র আশুরার এ দিনে ইসলামের ইতিহাসে অনেক তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে। নিচে কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনা তুলে ধরা হলো : আশুরার দিন আল্লাহতাআলা মুসা (আ.) ও বনি ইসরাইলকে ফেরাউনের অত্যাচার থেকে মুক্ত করেছিলেন। মুসা (আ.)-এর দোয়ায় আল্লাহতাআলা রেড সি বা লোহিত সাগরকে বিভক্ত করে দিয়েছিলেন এবং মুসা (আ.) ও তার অনুসারীরা নিরাপদে পার হতে পেরেছিলেন কিন্তু ফেরাউন ও তার বাহিনী ডুবে যায়।

নবী নূহ (আ.)-এর কিস্তি ৪০ দিন ও ৪০ রাতের বন্যার পর জুদি পর্বতে অবতরণ করেছিল আশুরার এই দিনে। এ ঘটনাটি আল্লাহর রহমত এবং নবী নূহ (আ.)-এর ধৈর্যের উদাহরণ হিসেবে উল্লিখিত।

পবিত্র আশুরার দিন আল্লাহতাআলা হজরত ইব্রাহিম (আ.)-কে নমরুদের অগ্নিকুণ্ড থেকে রক্ষা করেছিলেন। আল্লাহর আদেশে আগুন ঠান্ডা হয়ে ইব্রাহিম (আ.)-এর জন্য শান্তি হয়ে যায়।

হজরত ইউনুস (আ.)-কে একটি বড় মাছ গিলে ফেলেছিল। ৪০ দিন সেই মাছের পেটে থাকার পর আল্লাহর আদেশে তাকে মুক্তি দিয়েছিলেন পবিত্র আশুরার এ দিনে।

হজরত ঈসা (আ.)-কে পবিত্র আশুরার দিন আসমানে তুলে নেওয়া হয়েছিল বলে অনেক বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে। আশুরার দিনেই ৬১ হিজরিতে ইমাম হুসাইন (রা.) ও তার অনুসারীরা কারবালার ময়দানে ইয়াজিদের বাহিনীর হাতে শাহাদাত বরণ করেন। এ ঘটনা ইসলামের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও হৃদয়বিদারক ঘটনা হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছে।

ইসলাম ধর্মের বর্ণনামতে, কেয়ামতের দিন আশুরার দিন ঘটবে বলে হাদিসে উল্লেখ রয়েছে। আশুরার দিনে আল্লাহতাআলা অনেক নবী ও তাদের অনুসারীদের বিভিন্ন বিপদ-আপদ থেকে মুক্তি দিয়েছেন। পবিত্র আশুরার দিনে আল্লাহতাআলা আদম (আ.)-এর তওবা কবুল করেছিলেন।

এ ঘটনাগুলো পবিত্র আশুরার দিনকে মুসলমানদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্ববহ এবং তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। পবিত্র আশুরা সম্পর্কে কিছু হাদিস ও বর্ণনা ১. রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার আগে আশুরার রোজা ওয়াজিব ছিল। রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার পর এ দিন রোজা রাখা মুস্তাহাব। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, জাহেলি সমাজের লোকেরা রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার আগে আশুরার দিন রোজা রাখত। এ দিন কাবায় গিলাফ জড়ানো হতো। এরপর যখন রমজানের রোজা ফরজ হলো তখন নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যিনি এ দিন রোজা রাখতে চায় সে রাখুক। যিনি না চায় না রাখুক। (বুখারি : ১৫৯২)

৩. তওবা গুরুত্বপূর্ণ আমল। নবীজির এক সাহাবি জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রসুল! রমজানের পর আপনি কোন মাসে রোজা রাখতে বলেন? নবীজি বলেন, তুমি যদি রমজানের পর রোজা রাখতে চাও তাহলে মহররমে রোজা রাখো। কেননা মহররম হচ্ছে আল্লাহর মাস। এ মাসে এমন এক দিন আছে, যেদিন মহান আল্লাহ অতীতে অনেকের তওবা কবুল করেছেন। ভবিষ্যতেও অনেকের তওবা কবুল করবেন। (তিরমিজি : ৭৪১)

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র আশুরার দিনে আমল ও ইবাদত

রাসুলুল্লাহ (সা.) পবিত্র আশুরার দিনে বিশেষ কিছু আমল এবং ইবাদত করেছেন, যা মুসলিম উম্মাহর জন্য অনুসরণীয়। নিচে কিছু উল্লেখযোগ্য কার্যকলাপ তুলে ধরা হলো।

রাসুলুল্লাহ (সা.) মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করার পরে দেখলেন, মদিনার ইহুদিরা আশুরার দিন রোজা রাখছে। তাদের কাছে জানতে চাইলে তারা বললো, এই দিনে আল্লাহতাআলা মুসা (আ.) ও বনি ইসরাইলকে ফেরাউনের অত্যাচার থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। তাই আমরা এ দিন রোজা রাখি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, আমরা মুসার (আ.) সঙ্গে আরও বেশি সম্পৃক্ত। তাই তিনি নিজেও রোজা রাখলেন এবং সাহাবিদেরও রোজা রাখার নির্দেশ দিলেন। (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)

রাসুলুল্লাহ (সা.) আশুরার দিনে বেশি বেশি তওবা ও ইস্তিগফার করতেন। এই দিনে আল্লাহর কাছে নিজের গুনাহ মাফের জন্য দোয়া করতেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) আশুরার দিনে গরিব-দুঃখীদের সাহায্য করতেন এবং তাদের প্রতি দান-খয়রাত করতেন। এই দিনে দান করলে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা সম্ভব। আশুরার দিন রাসুলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর কাছে বিভিন্ন দোয়া করতেন এবং তার উম্মাহর জন্য কল্যাণ কামনা করতেন। পবিত্র আশুরার দিনে রাসুলুল্লাহ (সা.) আশুরার দিনে বেশি বেশি ইবাদত করতেন, কোরআন তেলাওয়াত করতেন, এবং নফল নামাজ আদায় করতেন।

পবিত্র আশুরার দিনে মুসলিমদের জন্য বিশেষ কিছু করণীয় রয়েছে, আশুরার দিনে কেবলমাত্র রোজা রাখা নয়, সঙ্গে সঙ্গে নিয়মিত নামাজ আদায় করা, বেশি বেশি তওবা-ইস্তিগফার করা এবং সৎ কাজ করার মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা উচিত। যা পালন করলে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা সম্ভব। নিচে এই দিনের করণীয় বিষয়গুলো তুলে ধরা হলো:

১. রোজা রাখা : আশুরার রোজা কবে রাখতে হয় এবং কয়টি রাখতে হয়?

বিভিন্ন হাদিসে আশুরার রোজার ফজিলত রয়েছে। হজরত আবু কাতাদা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে আছে, নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, মহান আল্লাহর কাছে আমি আশা পোষণ করি যে, তিনি আশুরার রোজার মাধ্যমে আগের এক বছরের পাপ ক্ষমা করে দেবেন। (তিরমিজি : ৭৫২)

বাংলাদেশে সোমবার (৮ জুলাই) থেকে মহররম মাস গণনা শুরু হয়। সে হিসেবে বুধবার (১৭ জুলাই) পালিত হবে পবিত্র আশুরা। পবিত্র আশুরার দুটি রোজা রাখতে হবে। এ হিসেবে মহররমের ১০ তারিখ বুধবার (১৭ জুলাই) একটি, আর এর আগে মহররমের ৯ তারিখ মঙ্গলবার (১৬ জুলাই) অথবা পরের দিন মহররমের ১১ তারিখ বৃহস্পতিবার (১৮ জুলাই) আরও একটি।

নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমরা আশুরার দিনে রোজা রাখো, তবে এ ক্ষেত্রে ইহুদিদের সঙ্গে মিল না হওয়ার জন্য মহররমের ১০ তারিখের আগের দিন অথবা পরের দিন আরও একটি রোজা রাখো। (মুসনাদে আহমদ: ২১৫৪)

২. ইবাদত ও দোয়া করা - নামাজ আদায় : পঁাচ ওয়াক্ত নামাজের পাশাপাশি নফল নামাজ আদায় করা। - কোরআন তেলাওয়াত : বেশি বেশি কোরআন তেলাওয়াত করা। - দোয়া : নিজের এবং অন্য মুসলমানদের জন্য কল্যাণ কামনা করে দোয়া করা।

৩. তওবা ও ইস্তিগফার নিজের গুনাহের জন্য তওবা করা এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা। সবার কর্তব্য এটির কদর করা। আশুরার দিন তওবা কবুলের মোক্ষম সময়। এদিনে তওবা কবুল হওয়া, নিরাপত্তা এবং অদৃশ্য সাহায্য লাভ করার কথাও রয়েছে। এ জন্য এ সময়ে এমন সব আমলের প্রতি মনোনিবেশ করা উচিত, যাতে মহান আল্লাহর রহমত বান্দার দিকে আরও বেশি ধাবিত হয়।

৪. সৎ কাজ করা ও সহায়তা করা এবং সদয় আচরণ করা। - সৎ কাজ : যে কোনো সৎ কাজ করা, যেমন মানুষের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করা, মিথ্যা ও অন্যায় থেকে বিরত থাকা। - গরিব-দুঃখীদের সাহায্য করা : আশুরার দিনে দান-খয়রাত করা এবং গরিব-দুঃখীদের সাহায্য করা। - আত্মীয়স্বজনের সাথে সম্পর্ক রক্ষা : আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের প্রতি সদয় আচরণ করা।

৫. শিক্ষামূলক কার্যক্রম - শিক্ষাগ্রহণ : আশুরার দিনের তাৎপর্য এবং ইসলামের ইতিহাস সম্পর্কে জানার চেষ্টা করা। - পরিবারের সঙ্গে আলোচনা : পরিবারের সদস্যদের সাথে আশুরার দিনের তাৎপর্য সম্পর্কে আলোচনা করা এবং তাদের এ দিনটি গুরুত্বের সঙ্গে পালনের জন্য উৎসাহিত করা।

৬. শোক পালন - কারবালার শহীদদের স্মরণ : হজরত ইমাম হুসাইন (রা.) এবং তার সঙ্গীদের কারবালার ময়দানে শাহাদাত বরণের ঘটনা স্মরণ করা। তাদের ত্যাগের গুরুত্ব বোঝা এবং অনুভব করতে পারা।

আশুরার দিনটি পালনের মাধ্যমে আমরা আল্লাহর কাছে আরও কাছাকাছি আসতে পারি এবং তার রহমত ও মাগফিরাত অর্জন করতে পারি। আশুরার দিনটি ইসলামের ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন ও আমল থেকে আমরা অনেক কিছু শিখার রয়েছে। তা অনুসরণে আমরা এই দিনটি গুরুত্ব সহকারে পালন করতে পারি। সূত্র : কালবেলা।

জীবনী: ইমাম হুসাইন (রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু)

নুরুল ইসলাম হাসেমী (রহ.)

সাইয়্যিদুশ শোহাদা, শহীদে দশতে কারবালা ইমামে আলী মক্কাম হযরত সাইয়্যিদুনা ইমাম হোসানই রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু শমস্-এ খান্দানে মোস্তফভী (মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বংশের সূর্য), ওয়ারিসে শুজা’আত ও সাখাওয়াতে মুরতাযাভী (হযরত আলী মুরতাযা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর বীরত্ব ও দানশীলতার উত্তরাধিকারী), হাম শবীহে রাসূল (যঁার চেহারা ও স্বভাব রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনুরূপ), জিগারগোশায়ে বতুল (ফাতেমা যাহরা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহার কলিজার টুকরা), রাযদারে নবুয়ত (নবুয়তের গোপনভাণ্ডারের ধারক), তাজদারে ইমামত (ইমামতের মুকুটধারী), শাহেনশাহে শাহাদাত (শহীদদের বাদশাহ), সাইয়্যিদুশ শোহাদা (শহীদদের ইমাম), ইমামে আরশ মক্বাম (সর্বোচ্চ আসনে আসীন ইমাম), গারিকে ইশক ও বালা (ইশকের গভীরতায় ডুবে যাওয়া ও উচ্চতাকে অতিক্রমকারী), শহীদে দশতে কারবালা (কারবালার প্রান্তরে শাহাদতপ্রাপ্ত), হযরত সাইয়্যিদুনা ইমাম হোসাইন চতুর্থ হিজরীর ৪ঠা শা’বানুল মু’আযযাম মোতাবেক ৮ জানুয়ারী ৬২৬ খৃষ্টাব্দ রোজ মঙ্গলবার পবিত্র মদীনা মুনাওয়ারায় শুভজন্মগ্রহণ করেন। তঁার পবিত্র নাম হোসাইন। ইতিপূর্বে হোসাইন নামটি অন্য কারো ছিলনা।

কুনিয়ত আবু আব্দুল্লাহ।

উপাধি-মুরতাযা (আল্লাহর মনোনীত), সাইয়্যিদুৎ তোক্বা ওয়ান নোক্বা (পরহেযগার ও উত্তমগণের ইমাম), সাইয়্যিদে শাবাবে আহলে জান্নাত (জান্নাতি যুবকদের ইমাম), সাইয়্যিদুল আসখিয়া (উদারদের ইমাম), শাবিহে রাসূল (প্রিয়নবীর সদৃশ), বায়হানাতুর রাসূল (প্রিয়নবীর দীপ্ত প্রকাশ) ইত্যাদি।

পিতা-শাহে বেলায়ত, মাওলা আলী মুশকিল কোশা।

মাতা-সাইয়্যিদাতুন্নেসা, খাতুনে জান্নাত ফাতেমাতুয্-জাহ্রা।

দাদা-হযরত খাজা আবু তালিব

দাদী-হযরত ফাতেমা বিনতে আসাদ

নানাজান-ইমামুল আম্বিয়া, হযরত মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ

নানী-উম্মুল মোমিনীন, হযরত সাইয়্যিদা খদিজাতুল কোবরা।

তঁার পবিত্র বংশধারা:

হযরত ইমাম হোসাইন ইবনে হযরত আলী ইবনে আবি তালিব ইবনে আব্দুল মোত্তালিব ইবনে হাশিম ইবনে আব্দে মানাফ হযরত ইমাম হোসাইন মায়ের পবিত্র গর্ভে মাত্র ৬ মাস ছিলেন। এটি ছিল তঁার বিশেষ বৈশিষ্ট্য। হযরত ইয়াহইয়া ইবনে যাকারিয়া ও মাতৃগর্ভে মাত্র ৬ মাস ছিলেন।

তঁার শুভাগমনে খান্দানে নবুয়তে আনন্দের জোয়ার বয়ে যায়। কিন্তু তঁার অনাগত বালা-মুসিবতের ইলম (জ্ঞান) ছিল কেবল রাসূল পাক এর কাছে। এজন্যই তঁার চক্ষু মোবারক সিক্ত হয়ে ওঠে। সেই থেকেই খান্দানে নবুয়তে ইমাম হোসাইন -এর মুসিবতের আলোচনা প্রসিদ্ধ হয়ে যায়।

রাসূল-এর আগমনের উদ্দেশ্য ছিল আখলাকে ইনসানীর (মানবিক গুণাবলি) পূর্ণতা। মাওলা আলী এমন একজন যিনি স্বীয় আমলের মাধ্যমে আল্লাহর রেজামন্দি (সন্তুষ্টি) অর্জন করেছিলেন।

খাতুনে জান্নাত, যিনি ছিলেন মাকসুদে কায়েনাত (সৃষ্টির উদ্দেশ্য) প্রিয়নবী সা.-এর প্রতিচ্ছবি।

এমন নূরানী পরিবেশেই ইমাম হোসাইন-এর পবিত্র লালন-পালন ও নূরানী তরবিয়ত (আধ্যাত্মিক শিক্ষা) সম্পন্ন হয়।

রাসূল সা.-এর ভালবাসা: হযরত ইমাম হাসান ও হোসাইন দু’জনকেই রাসূল সা. অতিশয় মুহাব্বত করতেন।

তথাপি হোসাইন-এর প্রতি মুহাব্বতের ছিল এক ভিন্নতর মাত্রা। নবীজী সা. তঁাকে সিনা মোবারকে বসাতেন, কঁাধে চড়াতেন এবং উম্মতকে মুহাব্বতের তাগীদ (অনুরোধ) করতেন।

একবার নামাযরত অবস্থায় হোসাইন সা. নবীজীর পিঠে উঠে গেলে, নিজে থেকে না নামা পর্যন্ত নবীজী সা. সিজদা দীর্ঘায়িত করেন। এক জুমার খুতবা চলাকালে, হোসাইন দরজায় আসলে, নবীজী সা. খুতবা বন্ধ করে তঁাকে মিম্বরে তুলেন এবং কোল মোবারকে বসিয়ে বলেন:

“এই হলো হোসাইন। একে ভালভাবে চিনে রাখো এবং এর ফযীলত স্মরণ রাখো।”

তারপর নবীজী সা. বললেন:

বাংলা অর্থ: হোসাইন আমার থেকে আর আমি হোসাইন থেকে। যে হোসাইনকে ভালবাসে, আল্লাহ তাকে ভালবাসেন।

এই হাদীস দ্বারা বোঝানো হয়, কিয়ামত পর্যন্ত আমার নাম, কর্ম ও দীন হোসাইনের মাধ্যমে টিকে থাকবে।

সাহাবীদের বর্ণনা: হযরত আনাস ইবনে মালেক বলেন: আমি জিজ্ঞেস করলাম, “আহলে বায়তের মধ্যে আপনার সবচেয়ে প্রিয় কে?”

নবীজী সা. বললেন, “হাসান ও হোসাইন”।

নবীজী সা. মা আয়েশা-কে বলতেন: “আমার সন্তানদের কাছে আনো।”তিনি তঁাদেরকে কোল মোবারকে চেপে ধরতেন, তঁাদের শরীর মোবারকের ঘ্রাণ নিতেন।

নবীজী সা. বলেন: “হোসাইন আমারই সন্তান।” হযরত বারা ইবনে আযিব বলেন: একদিন নবীজী ﷺ হাসান ও হোসাইনকে দেখে বললেন: বাংলা অর্থ: হে আল্লাহ! আমি তঁাদেরকে ভালবাসি, আপনিও তঁাদেরকে ভালবাসুন এবং যারা তঁাদের ভালবাসে, তাদেরকেও ভালবাসুন। ঘোড়ায় চড়ানোর ঘটনা: হযরত ইবনে আব্বাস বলেন: একবার নবীজী সা. হোসাইন কে ঘোড়ার মত পিঠে তুলে খেলাচ্ছিলেন।

হযরত উমর দেখে বললেন, “কত উত্তম সওয়ারী।” নবীজী জবাবে বললেন, “আরোহীও কতইনা উত্তম।”

শাহাদাতের ভবিষ্যদ্বাণী: ইমাম হোসাইনের জন্মের পরই তঁার শাহাদাতের সংবাদ ঘোষিত হয়ে যায়।

হযরত উম্মে সালামা বলেন: রাসূল সা. বললেন, “জিবরাঈল আমাকে জাগ্রত অবস্থায় বলেছেন, এই সন্তান হোসাইনকে ইরাকের যমীনে শহীদ করা হবে।” নবীজী সা. জিবরাঈলকে বললেন, “তুমি ঐ যমীনের মাটি এনে দেখাও।”

জিবরাঈল ঐ মাটি এনে দিলেন। নবীজী সা. সেটি উম্মে সালামাকে দিয়ে বললেন: “এই মাটি একদিন রক্তে পরিণত হবে। তখন বুঝবে, আমার হোসাইন শহীদ হয়েছেন।”

হযরত উম্মে সালামা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) আরও বর্ণনা করেন, রাসূলে পাক ﷺ ইরশাদ করেন: হোসাইন ইবনে আলী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হিজরী বছরের শেষভাগে শাহাদাত বরণ করবেন।

এই সংবাদে হযরত আবু হুরায়রা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) দোয়া করতেন: হে আল্লাহ! আমি আশ্রয় চাই হিজরী বছরের সূচনা ও শিশুদের রাজত্ব থেকে। এই দোয়া তিনি করেন যাতে হযরত হোসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর মর্মন্তুদ শাহাদাতের দৃশ্য দেখতে না হয়। ফলে তিনি ৫৯ হিজরীতেই ইন্তেকাল করেন। তথ্যসূত্র: আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া

কারবালার পূর্বাভাস: হযরত আসবাগ বিন বানানা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, এক যুদ্ধে ফেরার পথে আমরা কারবালার স্থানে পেঁৗছালে হযরত আলী (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) বলেন: “এখানেই তাদের উট বসবে, এখানেই তাদের মালপত্র নামবে, এবং এখানেই তাদের রক্ত প্রবাহিত হবে।” তিনি বলেন, “নবীজির পরিবার থেকে একটি দল এখানে শহীদ হবে-আসমান-যমীন কঁাদবে তঁাদের শোকে।” তথ্যসূত্র: সিররুশ্ শাহাদাতাইন। রাসূলে পাক ﷺ -এর বেসাল শরীফের পরবর্তী অবস্থা ৬ বছর বয়সে হোসাইন (রা.) তঁার প্রিয় নানাজান রাসূলুল্লাহ কে হারান। ৬ মাস পর মায়ের স্নেহের ছায়াও চলে যায়। এরপর তিনি ২৫ বছর বয়স পর্যন্ত পিতার স্নেহ ও তালীমে বেড়ে ওঠেন।

খেলাফতের যুগে: ৩১ বছর বয়সে (৩৫ হিজরী) হযরত আলী (রা.) খেলাফতের আসনে বসেন। এ সময় হোসাইন (রা.) সিফফীন ও নেহরাওয়ান যুদ্ধে বীরত্বের পরিচয় দেন। ৪০ হিজরীতে, আমিরুল মু’মিনীন আলী (রা.) শাহাদাত বরণ করেন। এরপর খেলাফতের দায়িত্ব অর্পিত হয় বড় ভাই ইমাম হাসান (রা.)-এর ওপর। হোসাইন (রা.) তঁাকে সর্বোতভাবে সহযোগিতা করেন।

সমঝোতা ও ইন্তেকাল: ৬ মাস খেলাফত চালিয়ে রক্তপাত বন্ধের উদ্দেশ্যে ইমাম হাসান (রা.) আমীর মু’আবিয়া (রা.)-এর হাতে খেলাফত সোপর্দ করেন এবং মদীনায় ফিরে এবাদতে সময় কাটান।

৫০ হিজরীতে, ষড়যন্ত্রমূলকভাবে তঁাকে বিষপানে শহীদ করা হয়। মৃত্যুর আগে ইমামতের আমানত তুলে দেন হোসাইন (রা.)-এর হাতে। তথ্যসূত্র: তারীখে তাবারী।

আখলাক ও আওসাফ (চরিত্র ও গুণাবলি) : হযরত ইমাম হোসাইন (রা.) জন্মের পর প্রথম দেখেন: নবীজির সা. নামায,

আলীর সেজদা, ফাতেমা (রা.)-এর কুরআন তেলাওয়াত—এমন পবিত্র পরিবেশে তিনি বড় হন। শুজা’আত (বীরত্ব) ও সাখাওয়াত (দানশীলতা)-দুইয়েরই নিদর্শন ছিলেন তিনি।

রাসূল সা. বলেন: “আমি হোসাইনকে আমার বীরত্ব ও দানশীলতা দিয়ে দান করেছি।”তঁার দরজায় অভাবীদের ভিড় লেগেই থাকত। কেউ নিরাশ হয়ে ফিরত না। এজন্য তঁার উপাধি ছিল: আবুল মাসাকীন-(অর্থ: দরিদ্রদের অভিভাবক) রাতে নিজ হাতে খাবার বহন করে গরিব, বিধবা, এতিমদের ঘরে পেঁৗছে দিতেন।

মানুষের সম্মান রক্ষায় তঁার কথা: “কোনও মিসকিন যখন হাত বাড়ায়, সে কেবল প্রয়োজন জানায় না—বরং নিজের সম্মান আমার হাতে তুলে দেয়। তাই আমার দায়িত্ব হয়, তাকে খালি ফেরত না পাঠানো।”

দাসদের সঙ্গে আচরণ: এক দাস মেহমানদের সামনে পাত্র ভেঙে ফেললে তিনি রেগে যান। দাস কুরআনের আয়াত পড়তে শুরু করে: যারা রাগ দমন করে : হোসাইন (রা.) বললেন: “আমি রাগ দমন করলাম” যারা মানুষকে ক্ষমা করে-তিনি বললেন: “আমি তোমাকে ক্ষমা করলাম। আল্লাহ দয়ালুদের ভালোবাসেন : তিনি বললেন: “তোমাকে মুক্ত করে দিলাম”

ইলম: সারা দুনিয়া হোসাইন (রা.)-এর জ্ঞান ও ইলমের সামনে অবনত মস্তক ছিল। মাযহাবি মাসায়েল, দোয়ার সংকলন, এবং আত্মশুদ্ধির বিষয়ে তঁার বহু রচনা ও বাণী আছে। তঁার দোয়াসমূহ সংকলিত: মজমু’আয়ে সহিফায়ে হোসাইনীয়া

আত্মিক শিক্ষা: তরীকতের উসূলের ব্যাপারে হযরত ইমাম হোসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু এর অনেক অমীয় ইরশাদাত বর্ণিত আছে। তিনি এরশাদ করেন যে, অর্থ: “তোমার সবচেয়ে দয়ালু ভাই হলো তোমার দ্বীন।”

অর্থাৎ তোমার সবচেয়ে মেহেরবান ভাই হলো তোমার দ্বীন। এর ব্যাাখ্যায় “কাশফুল মাহজুব” গ্রন্থে হযরত দাতা গঞ্জেবখশ লাহোরী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন যে, দ্বীনের অনুসরনের মধ্যেই মানুষের মুক্তি। দ্বীনের বিরোধিতায় মানুষের ধ্বংস। জ্ঞানবান ওই ব্যক্তি যে আপন মেহেরবান ভাইয়ের হুকুমের অনুসরণ করে এবং সে ব্যাপারে মেহনত করে। কখনো তার বিপরীত করেনা। কারণ, মেহেরবান ভাই সেই যে মানুষের কল্যাণ করে। দয়া ও মেহেরবানীর দরজা কখনো বন্ধ করেনা। তাফসির: কাশফুল মাহজুব-দাতা গঞ্জবখশ (রহ.)

হোসাইন সত্য ও বিশ্বস্ততার নাম, হোসাইন ধৈর্যের নাম, হোসাইন ইবাদতের আত্মা, হোসাইন পূর্ণ দ্বীনের প্রতীক। মজ্ঞান ও চিন্তার সাধ্য কী, যে আপনাকে বুঝতে পারে? কারণ, আপনি তো বুদ্ধি ও চোখের সীমা ছাড়িয়ে আছেন!

♦ কারবালার প্রেক্ষাপট “রওযাতুস সফা” কিতাবে বর্ণিত আছে—হযরত ইমাম হাসান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু-এর শাহাদাতের পর হযরত আমীরে মু‘আবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু দশ বছর হুকুমতের দায়িত্ব পালন করে ১৫ রজব, ৬০ হিজরিতে প্লেগ রোগে আক্রান্ত হয়ে ইন্তেকাল করেন। তঁাকে দামেশকে দাফন করা হয়।

তিনি নবুয়তের পঁাচ বছর পূর্বে জন্মগ্রহণ করেন এবং হিজরতের আট বছর পর ইসলাম কবুল করেন। হযরত উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু-এর খেলাফতকালে তিনি মিশরের হাকিম (শাসক) নিযুক্ত হন এবং হযরত উমর ও হযরত উসমান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমার খেলাফতের সময় মিশরে বিশ বছর রাজত্ব করেন। এরপর দশ বছর হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর কুফা প্রত্যাবর্তনের পর কুফায় শাসন করেন।

হযরত আমীরে মু‘আবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু প্রায় ৮৫ বা ৮৮ বছর বেঁচে ছিলেন। তঁার উজির ছিল স্বীয় পুত্র ইয়াযিদ লা‘য়িন ও আবু মনসুর রূমী। তঁার তিন পুত্র ছিল। ইন্তেকালের পূর্বে তিনি ইয়াযিদের হাতে হুকুমতের দায়িত্ব অর্পণ করেন। ফলে ৬০ হিজরির রজব মাসে ইয়াযিদ ক্ষমতা গ্রহণ করে।

♦ আমীরে মু‘আবিয়া প্রসঙ্গে আহলে সুন্নাতের দৃষ্টিভঙ্গি: হযরত আমীরে মু‘আবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু সম্পর্কে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের অভিমত হলো—তিনি ইসলাম ও মুসলমানদের প্রতি সদয়, রাজনৈতিকভাবে বিচক্ষণ ও দূরদর্শী ছিলেন। তৎকালীন পরিস্থিতিতে তিনি মনে করেছিলেন, নেতৃত্ব হস্তান্তর করলে মুসলমানরা একতাবদ্ধ থাকতে পারবে না। ফলে অনাকাঙ্ক্ষিত রক্তপাত ঘটবে। এই আশঙ্কা থেকেই তিনি তঁার পুত্র ইয়াযিদের হাতে খেলাফত তুলে দেন।

তিনি সে সময় এই দো‘আ করেছিলেন: “হে আল্লাহ! যদি আপনার ইলমে থাকে যে, আমি ইয়াযিদকে তার যোগ্যতার ভিত্তিতে খেলাফতের দায়িত্ব দিচ্ছি, তবে তাকে হুকুমত দান কর। আর যদি আমি শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ভালোবাসার কারণে তাকে দায়িত্ব দিয়ে থাকি, তবে তাকে নেতৃত্বের তাওফিক দিও না।” (সূত্র: ইবনে আসীর)

এছাড়া দায়িত্ব প্রদানের সময় তিনি ইয়াযিদকে বিশেষভাবে নসীহত করে বলেছিলেন: “তুমি যদি হোসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর ওপর ক্ষমতাসীন হও, তাহলেও তঁার প্রতি কোনো ষড়যন্ত্র কোরো না, বরং তঁাকে তঁার মতামতসহ স্বাধীনভাবে চলতে দিও। কেননা, তঁার সঙ্গে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রক্তের সম্পর্ক রয়েছে। তিনি এ-ও আশা করেছিলেন যে, অভিজ্ঞতাহীন, তরুণ ইয়াযিদ হয়তো দায়িত্ব পেয়ে পরিণত ও পরিবর্তিত হবে। এই সিদ্ধান্তকে আহলে সুন্নাতের ওলামাগণ “ইজতিহাদী ভুল” হিসেবে গণ্য করেছেন। সেজন্যই আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের ওলামাগণ বলেছেন, “হযরত আমীরে মু‘আবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু-এর ব্যাপারে সমালোচনা, গাল-মন্দ করা হারাম। কারণ তিনি ওহীর লেখক ছিলেন এবং তঁার জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দো‘আ করেছিলেন।” (সূত্র: তারীখে তাবারী)।

মদীনার গভর্নরের কাছে ইয়াযিদের চিঠি: সিংহাসনে বসার পর ইয়াযিদের প্রধান লক্ষ্য ছিল তিনজন মহান সাহাবীর বায়‘আত (শপথ) গ্রহণ : হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু

হযরত ইমাম হোসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু কারণ তঁারা মুসলিম উম্মাহর নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন। ইয়াযিদের আশঙ্কা ছিল, তঁারা যদি খেলাফতের দাবিদার হয়ে ওঠেন, তবে তঁার জন্য বিপদ দেখা দিতে পারে। এজন্য সে মদীনার গভর্ণর ওয়ালিদ ইবনে উক্বা-এর নিকট চিঠি পাঠিয়ে হুকুম দিলো: “আমীরে মু‘আবিয়ার ইন্তেকালের সংবাদ দাও এবং আমার নামে বায়‘আত নাও। যতক্ষণ তারা বায়‘আত না করে, তাদেরকে ছাড়া যাবে না।”

ওয়ালিদ ও মারওয়ানের আলোচনা : ওয়ালিদ ইবনে উক্বা ছিলেন এক সৎ, নম্রচরিত্র ও আহলে বায়তের প্রতি সম্মানশীল ব্যক্তি। তিনি বিষয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে মারওয়ান-কে ডেকে পরামর্শ করলেন।

মারওয়ান, যিনি কঠোর মেজাজ ও রাজনীতিবিদ ছিলেন, বললেন : “তঁাদেরকে ডেকে” (আলোচনার পরবর্তী অংশ থাকবে ইনশাআল্লাহ পরবর্তী পর্বে।)

ছবি :

পবিত্র আশুরার আমল ও মুসলিমদের করণীয়

শুক্রবার (২৬ জুন) পবিত্র আশুরা পালিত হবে। পবিত্র আশুরা বা মহররম মাসের ১০ তারিখ ইসলামের ইতিহাসে এ দিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পবিত্র আশুরার এ দিনে ইসলামের ইতিহাসে অনেক তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে। নিচে কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনা তুলে ধরা হলো : আশুরার দিন আল্লাহতাআলা মুসা (আ.) ও বনি ইসরাইলকে ফেরাউনের অত্যাচার থেকে মুক্ত করেছিলেন। মুসা (আ.)-এর দোয়ায় আল্লাহতাআলা রেড সি বা লোহিত সাগরকে বিভক্ত করে দিয়েছিলেন এবং মুসা (আ.) ও তার অনুসারীরা নিরাপদে পার হতে পেরেছিলেন কিন্তু ফেরাউন ও তার বাহিনী ডুবে যায়।

নবী নূহ (আ.)-এর কিস্তি ৪০ দিন ও ৪০ রাতের বন্যার পর জুদি পর্বতে অবতরণ করেছিল আশুরার এই দিনে। এ ঘটনাটি আল্লাহর রহমত এবং নবী নূহ (আ.)-এর ধৈর্যের উদাহরণ হিসেবে উল্লিখিত।

পবিত্র আশুরার দিন আল্লাহতাআলা হজরত ইব্রাহিম (আ.)-কে নমরুদের অগ্নিকুণ্ড থেকে রক্ষা করেছিলেন। আল্লাহর আদেশে আগুন ঠান্ডা হয়ে ইব্রাহিম (আ.)-এর জন্য শান্তি হয়ে যায়।

হজরত ইউনুস (আ.)-কে একটি বড় মাছ গিলে ফেলেছিল। ৪০ দিন সেই মাছের পেটে থাকার পর আল্লাহর আদেশে তাকে মুক্তি দিয়েছিলেন পবিত্র আশুরার এ দিনে।

হজরত ঈসা (আ.)-কে পবিত্র আশুরার দিন আসমানে তুলে নেওয়া হয়েছিল বলে অনেক বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে। আশুরার দিনেই ৬১ হিজরিতে ইমাম হুসাইন (রা.) ও তার অনুসারীরা কারবালার ময়দানে ইয়াজিদের বাহিনীর হাতে শাহাদাত বরণ করেন। এ ঘটনা ইসলামের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও হৃদয়বিদারক ঘটনা হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছে।

ইসলাম ধর্মের বর্ণনামতে, কেয়ামতের দিন আশুরার দিন ঘটবে বলে হাদিসে উল্লেখ রয়েছে। আশুরার দিনে আল্লাহতাআলা অনেক নবী ও তাদের অনুসারীদের বিভিন্ন বিপদ-আপদ থেকে মুক্তি দিয়েছেন। পবিত্র আশুরার দিনে আল্লাহতাআলা আদম (আ.)-এর তওবা কবুল করেছিলেন।

এ ঘটনাগুলো পবিত্র আশুরার দিনকে মুসলমানদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্ববহ এবং তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। পবিত্র আশুরা সম্পর্কে কিছু হাদিস ও বর্ণনা ১. রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার আগে আশুরার রোজা ওয়াজিব ছিল। রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার পর এ দিন রোজা রাখা মুস্তাহাব। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, জাহেলি সমাজের লোকেরা রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার আগে আশুরার দিন রোজা রাখত। এ দিন কাবায় গিলাফ জড়ানো হতো। এরপর যখন রমজানের রোজা ফরজ হলো তখন নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যিনি এ দিন রোজা রাখতে চায় সে রাখুক। যিনি না চায় না রাখুক। (বুখারি : ১৫৯২)

৩. তওবা গুরুত্বপূর্ণ আমল: নবীজির এক সাহাবি জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রসুল! রমজানের পর আপনি কোন মাসে রোজা রাখতে বলেন? নবীজি বলেন, তুমি যদি রমজানের পর রোজা রাখতে চাও তাহলে মহররমে রোজা রাখো। কেননা মহররম হচ্ছে আল্লাহর মাস। এ মাসে এমন এক দিন আছে, যেদিন মহান আল্লাহ অতীতে অনেকের তওবা কবুল করেছেন। ভবিষ্যতেও অনেকের তওবা কবুল করবেন। (তিরমিজি : ৭৪১)

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র আশুরার দিনে আমল ও ইবাদত

রাসুলুল্লাহ (সা.) পবিত্র আশুরার দিনে বিশেষ কিছু আমল এবং ইবাদত করেছেন, যা মুসলিম উম্মাহর জন্য অনুসরণীয়। নিচে কিছু উল্লেখযোগ্য কার্যকলাপ তুলে ধরা হলো।

রাসুলুল্লাহ (সা.) মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করার পরে দেখলেন, মদিনার ইহুদিরা আশুরার দিন রোজা রাখছে। তাদের কাছে জানতে চাইলে তারা বললো, এই দিনে আল্লাহতাআলা মুসা (আ.) ও বনি ইসরাইলকে ফেরাউনের অত্যাচার থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। তাই আমরা এ দিন রোজা রাখি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, আমরা মুসার (আ.) সঙ্গে আরও বেশি সম্পৃক্ত। তাই তিনি নিজেও রোজা রাখলেন এবং সাহাবিদেরও রোজা রাখার নির্দেশ দিলেন। (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)

রাসুলুল্লাহ (সা.) আশুরার দিনে বেশি বেশি তওবা ও ইস্তিগফার করতেন। এই দিনে আল্লাহর কাছে নিজের গুনাহ মাফের জন্য দোয়া করতেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) আশুরার দিনে গরিব-দুঃখীদের সাহায্য করতেন এবং তাদের প্রতি দান-খয়রাত করতেন। এই দিনে দান করলে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা সম্ভব। আশুরার দিন রাসুলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর কাছে বিভিন্ন দোয়া করতেন এবং তার উম্মাহর জন্য কল্যাণ কামনা করতেন। পবিত্র আশুরার দিনে রাসুলুল্লাহ (সা.) আশুরার দিনে বেশি বেশি ইবাদত করতেন, কোরআন তেলাওয়াত করতেন, এবং নফল নামাজ আদায় করতেন।

পবিত্র আশুরার দিনে মুসলিমদের জন্য বিশেষ কিছু করণীয় রয়েছে, আশুরার দিনে কেবলমাত্র রোজা রাখা নয়, সঙ্গে সঙ্গে নিয়মিত নামাজ আদায় করা, বেশি বেশি তওবা-ইস্তিগফার করা এবং সৎ কাজ করার মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা উচিত। যা পালন করলে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা সম্ভব। নিচে এই দিনের করণীয় বিষয়গুলো তুলে ধরা হলো:

১. রোজা রাখা : আশুরার রোজা কবে রাখতে হয় এবং কয়টি রাখতে হয়?

বিভিন্ন হাদিসে আশুরার রোজার ফজিলত রয়েছে। হজরত আবু কাতাদা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে আছে, নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, মহান আল্লাহর কাছে আমি আশা পোষণ করি যে, তিনি আশুরার রোজার মাধ্যমে আগের এক বছরের পাপ ক্ষমা করে দেবেন। (তিরমিজি : ৭৫২)

বাংলাদেশে সোমবার (৮ জুলাই) থেকে মহররম মাস গণনা শুরু হয়। সে হিসেবে বুধবার (১৭ জুলাই) পালিত হবে পবিত্র আশুরা। পবিত্র আশুরার দুটি রোজা রাখতে হবে। এ হিসেবে মহররমের ১০ তারিখ বুধবার (১৭ জুলাই) একটি, আর এর আগে মহররমের ৯ তারিখ মঙ্গলবার (১৬ জুলাই) অথবা পরের দিন মহররমের ১১ তারিখ বৃহস্পতিবার (১৮ জুলাই) আরও একটি।

নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমরা আশুরার দিনে রোজা রাখো, তবে এ ক্ষেত্রে ইহুদিদের সঙ্গে মিল না হওয়ার জন্য মহররমের ১০ তারিখের আগের দিন অথবা পরের দিন আরও একটি রোজা রাখো। (মুসনাদে আহমদ: ২১৫৪)

২. ইবাদত ও দোয়া করা - নামাজ আদায় : পঁাচ ওয়াক্ত নামাজের পাশাপাশি নফল নামাজ আদায় করা। - কোরআন তেলাওয়াত : বেশি বেশি কোরআন তেলাওয়াত করা। - দোয়া : নিজের এবং অন্য মুসলমানদের জন্য কল্যাণ কামনা করে দোয়া করা।

৩. তওবা ও ইস্তিগফার : নিজের গুনাহের জন্য তওবা করা এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা। সবার কর্তব্য এটির কদর করা। আশুরার দিন তওবা কবুলের মোক্ষম সময়। এদিনে তওবা কবুল হওয়া, নিরাপত্তা এবং অদৃশ্য সাহায্য লাভ করার কথাও রয়েছে। এ জন্য এ সময়ে এমন সব আমলের প্রতি মনোনিবেশ করা উচিত, যাতে মহান আল্লাহর রহমত বান্দার দিকে আরও বেশি ধাবিত হয়।

৪. সৎ কাজ করা ও সহায়তা করা এবং সদয় আচরণ করা : যে কোনো সৎ কাজ করা, যেমন মানুষের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করা, মিথ্যা ও অন্যায় থেকে বিরত থাকা। - গরিব-দুঃখীদের সাহায্য করা : আশুরার দিনে দান-খয়রাত করা এবং গরিব-দুঃখীদের সাহায্য করা। - আত্মীয়স্বজনের সাথে সম্পর্ক রক্ষা : আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের প্রতি সদয় আচরণ করা।

৫. শিক্ষামূলক কার্যক্রম শিক্ষাগ্রহণ : আশুরার দিনের তাৎপর্য এবং ইসলামের ইতিহাস সম্পর্কে জানার চেষ্টা করা। - পরিবারের সঙ্গে আলোচনা : পরিবারের সদস্যদের সাথে আশুরার দিনের তাৎপর্য সম্পর্কে আলোচনা করা এবং তাদের এ দিনটি গুরুত্বের সঙ্গে পালনের জন্য উৎসাহিত করা।

৬. শোক পালন : কারবালার শহীদদের স্মরণ : হজরত ইমাম হুসাইন (রা.) এবং তার সঙ্গীদের কারবালার ময়দানে শাহাদাত বরণের ঘটনা স্মরণ করা। তাদের ত্যাগের গুরুত্ব বোঝা এবং অনুভব করতে পারা।

আশুরার দিনটি পালনের মাধ্যমে আমরা আল্লাহর কাছে আরও কাছাকাছি আসতে পারি এবং তার রহমত ও মাগফিরাত অর্জন করতে পারি। আশুরার দিনটি ইসলামের ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন ও আমল থেকে আমরা অনেক কিছু শিখার রয়েছে। তা অনুসরণে আমরা এই দিনটি গুরুত্ব সহকারে পালন করতে পারি।

সূত্র : কালবেলা।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়