সোমবার, ২৫ মে, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ২৪ মে ২০২৬, ১০:৩৮

আওয়ামী লীগের ফিরে আসা : ইনসাফ নাকি নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ?

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ন্যায়বিচার, পুনরুত্থান ও আদর্শিক দ্বন্দ্বের নতুন অধ্যায়

দেলোয়ার জাহিদ
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ন্যায়বিচার, পুনরুত্থান ও আদর্শিক দ্বন্দ্বের নতুন অধ্যায়

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক আলোচনায় দুটি বক্তব্য বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানের মন্তব্য “শেখ হাসিনার প্রতিও ইনসাফ থাকবে”; অন্যদিকে সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের পর্যবেক্ষণÑ“লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে।” আপাতদৃষ্টিতে ভিন্ন এই দুই বক্তব্য গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংকট, রাষ্ট্রীয় দুর্বলতা এবং আদর্শিক বিভ্রান্তির এক জটিল বাস্তবতা সামনে আসে।

জাহেদ উর রহমানের বক্তব্যে একটি নৈতিক ও আইনি অবস্থান স্পষ্ট করার চেষ্টা রয়েছে। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, নতুন বাংলাদেশের ভিত্তি প্রতিহিংসা নয়, বরং ন্যায়বিচার। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও তাঁকে বিচারবহির্ভূত আচরণের মুখোমুখি করা হবে না; বরং সাংবিধানিক ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন বিচারিক প্রক্রিয়ায় আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হবে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ক্ষমতার পালাবদল প্রায়ই প্রতিশোধ, দমননীতি ও রাজনৈতিক নিপীড়নের সঙ্গে যুক্ত ছিলো। সেই প্রেক্ষাপটে ‘ইনসাফ’ শব্দটির ব্যবহার নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক রাজনৈতিক বার্তা বহন করে।

কিন্তু এখানেই মূল প্রশ্নটি উঠে আসেÑবাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও বিচারিক কাঠামো কি সত্যিই এতোটাই নিরপেক্ষ ও স্বাধীন যে, সেখানে ‘ইনসাফ’ নিশ্চিত করা সম্ভব? যে রাষ্ট্রে বছরের পর বছর বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন ও আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ রয়েছে, সেখানে হঠাৎ করে ‘ন্যায়বিচার’-এর প্রতিশ্রুতি কতোটা বিশ্বাসযোগ্য? কেবল ভাষাগতভাবে ‘ইনসাফ’ উচ্চারণ করলেই কি একটি রাষ্ট্র ন্যায়ভিত্তিক হয়ে ওঠে?

মানবসভ্যতার ইতিহাসে ন্যায়বিচার ও সাম্যের ধারণা সবচেয়ে প্রাচীন এবং আলোচিত প্রশ্নগুলোর একটি। আধুনিক বিশ্বে এটি শুধু দার্শনিক বিতর্ক নয়, বরং আইন, রাষ্ট্র, সমাজ ও নৈতিকতার কেন্দ্রীয় প্রশ্ন। প্লেটো তাঁর ঞযব জবঢ়ঁনষরপ-এ ন্যায়বিচারকে সামাজিক সামঞ্জস্য ও নৈতিক ভারসাম্যের ধারণা হিসেবে দেখেছিলেন। এরিস্টটল ‘ঊয়ঁরঃু’ বা সাম্যের ধারণা তুলে ধরে বলেন, আইনের কঠোর ও যান্ত্রিক প্রয়োগ কখনও কখনও অন্যায় তৈরি করতে পারে, তাই বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় ন্যায্যতার প্রয়োগ প্রয়োজন। অন্যদিকে জন রলস তাঁর ‘ঔঁংঃরপব ধং ঋধরৎহবংং’ তত্ত্বে বলেন, একটি সমাজ তখনই স্থিতিশীল হয়, যখন মানুষ বিশ্বাস করে যে রাষ্ট্র তাদের প্রতি ন্যায্য আচরণ করছে।

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই দার্শনিক আলোচনাগুলো কেবল তাত্ত্বিক নয়, বরং গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক।

এখানে মাহফুজ আলমের বিশ্লেষণ বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তিনি মূলত দেখাতে চেয়েছেন, আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেও তার রাজনৈতিক ও আদর্শিক প্রভাব নির্মূল করা যায়নি। বরং রাজনৈতিক শূন্যতা, উগ্রবাদী প্রবণতা, মব সংস্কৃতি, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, আইনের শাসনের দুর্বলতা এবং অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থ সংস্কার প্রক্রিয়া আওয়ামী লীগের পুনরুত্থানের পথ সহজ করেছে। অর্থাৎ তিনি পরোক্ষভাবে স্বীকার করছেন যে, আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তনের প্রধান কারণ দলটির শক্তি নয়, বরং বিকল্প রাজনৈতিক শক্তিগুলোর নৈতিক ও কৌশলগত ব্যর্থতা।

এই বিশ্লেষণ বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংকটের গভীরতাকে উন্মোচন করে। কোনো রাজনৈতিক দলের পুনরুত্থান কেবল সাংগঠনিক শক্তির কারণে ঘটে না, বরং জনগণ তখনই পুরোনো শক্তির দিকে ফিরে তাকায়, যখন নতুন বিকল্পগুলো আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়। মাহফুজ আলমের বক্তব্যে সেই হতাশা ও আত্মসমালোচনার প্রতিফলন স্পষ্ট। পরিবর্তনের রাজনীতি যারা সামনে এনেছিলো, তারাই শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকে একটি সুসংহত নৈতিক ও রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা দিতে পারেনিÑএমন ইঙ্গিত তাঁর বক্তব্যে সুস্পষ্ট।

কিন্তু এখানেই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। যদি আওয়ামী লীগের পুনরুত্থানের পেছনে উগ্রবাদ, অসহিষ্ণুতা ও আইনের শাসনের সংকট দায়ী হয়, তাহলে ‘ইনসাফ’-এর যে নৈতিক ভাষা ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটিও কি একই রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে দুর্বল হয়ে পড়বে না? কারণ ন্যায়বিচার কেবল আদালতের রায় নয়, এটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, নাগরিক স্বাধীনতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক নিরপেক্ষতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি আরও একটি গভীর বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করেÑএখানে রাজনৈতিক দলগুলো প্রায়ই রাষ্ট্রকে নিজেদের অস্তিত্বের সম্প্রসারণ হিসেবে ব্যবহার করেছে। ফলে ক্ষমতার পরিবর্তন মানেই হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রতিপক্ষকে নির্মূল করার প্রচেষ্টা। এই সংস্কৃতি গণতন্ত্রকে দুর্বল করেছে এবং রাষ্ট্রকে দলীয় প্রতিযোগিতার একটি যন্ত্রে পরিণত করেছে।

গান্ধী, মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র কিংবা নেলসন ম্যান্ডেলার মতো নেতারা পুনর্মিলনভিত্তিক রাজনীতির যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, বাংলাদেশের রাজনীতি এখনো সেই পরিপক্বতায় পৌঁছাতে পারেনি। এখানে ‘ইনসাফ’ শব্দটি প্রায়ই রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হয়, কিন্তু বাস্তবে প্রতিপক্ষের প্রতি সহনশীলতা, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা বা নৈতিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি খুব কমই দেখা যায়। ফলে জনগণের একাংশের কাছে ‘ইনসাফ’ ধারণাটি আদর্শিকভাবে আকর্ষণীয় হলেও বাস্তবিকভাবে সন্দেহের জন্ম দেয়।

সবচেয়ে বড়ো বিপদ হলো, যদি ন্যায়বিচারের ভাষা কেবল রাজনৈতিক বৈধতা তৈরির হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তাহলে তা আরও গভীর হতাশা ও সংঘাত সৃষ্টি করবে। কারণ মানুষ শুধু শাসক পরিবর্তন চায় না, তারা রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনও চায়। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রায়ই দেখা যায়, নতুন শক্তি পুরোনো শক্তির সমালোচনা করলেও শেষ পর্যন্ত একই ধরনের কেন্দ্রিকতা, অসহিষ্ণুতা ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক আচরণ পুনরুৎপাদন করে।

আজ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড়ো প্রয়োজন কোনো একক রাজনৈতিক শক্তির বিজয় নয়, বরং একটি ন্যায়ভিত্তিক, সহনশীল ও প্রাতিষ্ঠানিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা। যেখানে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শত্রু নয়, গণতান্ত্রিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা হবে। যেখানে ‘ইনসাফ’ মানে বিচারের নামে প্রতিশোধ নয়, আবার দায়মুক্তির সংস্কৃতিও নয়। বরং এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি, যেখানে নাগরিক মর্যাদা, মানবিক সহাবস্থান এবং আইনের শাসন ক্ষমতার ঊর্ধ্বে স্থান পায়।

বাংলাদেশের বর্তমান সংকট তাই কেবল আওয়ামী লীগ বনাম বিরোধী শক্তির সংঘাত নয়, এটি রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি পুনর্গঠনের সংগ্রাম। আর সেই সংগ্রামে সবচেয়ে বড়ো প্রশ্ন একটাইÑবাংলাদেশ কি সত্যিই প্রতিশোধের রাজনীতি থেকে বের হয়ে ন্যায়ভিত্তিক গণতন্ত্রের পথে হাঁটতে পারবে, নাকি ‘ইনসাফ’ শব্দটিও শেষ পর্যন্ত আরেকটি রাজনৈতিক স্লোগান ও প্রহসনে পরিণত হবে?

Delwar Jahid

418 600 KIRKNESS RD NW,

Edmonton, Alberta T5Y2H5

[email protected]

Phone: (780) 200-3592

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়