প্রকাশ : ২৪ মে ২০২৬, ১০:৩৭
প্রবাসে মারা গেলে লাশ নয়, টাকা খোঁজে অনেক পরিবার!

একটি কাল্পনিক বর্ণনা দিয়ে শুরু করা যাক প্রবাসীদের নির্মম বাস্তবতার গল্প। হয়তো এই ভয়াল কল্পনাই বাস্তবতার সাথে হুবহু মিলে যাবে এবং শেষমেষে মিলেই যাবে “কফিনে শুয়ে থাকা প্রবাসী ভেবেছিল, দেশে ফেরার পর হয়তো সবাই তার কফিন ঘিরে কাঁদবে।” আত্মীয়-স্বজনরা ব্যস্ত হয়ে পড়বে তকে দাফন কাফনের জন্যে, কিন্তু বাস্তবে পরিবারের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়ায় কফিনের সাথে কতো টাকা এসেছে, কী পাওয়া যাবে। এই প্রতীকী বর্ণনাগুলো প্রবাসীদের অন্তর্গত ভয়, একাকীত্ব ও অবমূল্যায়নের গভীর চিত্র তুলে ধরে। তারা বুঝতে পারেন, জীবনের চেয়েও তাদের উপার্জনের মূল্য অনেক বেশি।
সৌদি আরবের এক হাসপাতালে স্ট্রোক করে মারা গেছেন প্রবাসী মোহাম্মদ হোসেন। জীবনের প্রায় পুরো সময়টাই তিনি কাটিয়েছেন প্রবাসে শ্রমিকের জীবনযাপন করে। ছেলে-মেয়েদের উচ্চশিক্ষা, বাড়ি নির্মাণ, সংসারের প্রতিটি প্রয়োজন সবকিছুর পেছনেই ছিলো তার ঘামঝরা উপার্জন। অথচ মৃত্যুর পর তার লাশ দেশে নেওয়া হবে কি না, সেই প্রশ্নে পরিবারের সিদ্ধান্ত ছিলো নির্মম। স্ত্রী জানতে চেয়েছিলো লাশ দেশে আনতে কতো খরচ হবে আর সৌদি আরবে দাফন করলে কতো টাকা পাওয়া যাবে। যখন জানা গেলো দেশে আনতে খরচ বেশি, তখন পরিবার সাফ জানিয়ে দিলো, লাশ দেশে আনার প্রয়োজন নেই। শেষ পর্যন্ত সহকর্মীরাই সৌদি আরবের মাটিতে তাকে দাফন করেন।
যে মানুষটি জীবনের সবটুকু দিয়ে পরিবারকে বাঁচিয়েছিলেন, মৃত্যুর পর তিনি নিজের পরিবারের কাছেই হয়ে গেলেন বোঝা। এই ঘটনা একক কোনো বিচ্ছিন্ন কাহিনি নয়। বরং মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা লাখো বাংলাদেশি শ্রমিকের জীবনের এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। প্রতিদিন পরিবারকে টিকিয়ে রাখতে যে মানুষগুলো বিদেশের মাটিতে শ্রম বিক্রি করছেন, তাদের অনেকের মৃত্যুর পর পরিবার লাশের চেয়ে অর্থ সহায়তার হিসাবকে বড়ো করে দেখছে। একসময় যাদের জন্যে জীবন উৎসর্গ করা হয়, মৃত্যুর পর তাদের মরদেহও অনেক ক্ষেত্রে হয়ে উঠছে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয়। ফলে প্রশ্ন উঠছে প্রবাসীদের কাছে কি পরিবার এখন ভালোবাসার জায়গা, নাকি কেবল টাকার উৎস?
দীর্ঘদিন সৌদি আরবে কাটানো আরেক বাংলাদেশি মো. গিয়াস উদ্দিনের ঘটনাও একই রকম হৃদয়বিদারক। পরিবারের সুখের জন্যে তিনি নিজের যৌবন, স্বপ্ন এমনকি বিবাহিত জীবন পর্যন্ত বিসর্জন দিয়েছিলেন। বহু বছর পর দেশে গিয়ে বিয়ে করে আবার প্রবাসে ফিরে যান। কিন্তু ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপজনিত জটিলতায় একদিন হঠাৎ তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুর খবর শোনার পর পরিবারের মধ্যে শোকের চেয়ে বেশি আলোচনায় আসে লাশ দেশে আনলে কতো খরচ হবে আর বিদেশে দাফন করলে কতো টাকা পাওয়া যাবে। পরিবারের কেউ মরদেহের খোঁজ নিলো না, জানতে চাইলো না কোথায় কীভাবে দাফন হবে। বরং সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়লো ক্ষতিপূরণের টাকার হিসাব নিয়ে।
এমন বাস্তবতা শুধু একজন প্রবাসীর নয়, বরং হাজারো প্রবাসী শ্রমিকের অন্তর্গত ভয়ংকর আতঙ্ক। মালয়েশিয়ায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়া বাংলাদেশি রেমিট্যান্সযোদ্ধা মো. আবদুল সোবহানের ঘটনাও দেশবাসীকে নাড়া দিয়েছিলো। কুমিল্লার লাকসামের এই প্রবাসী মৃত্যুর পর মালয়েশিয়ায় পড়ে থাকেন হাসপাতালের মর্গে। বাংলাদেশ হাইকমিশন তার পরিবারের সঙ্গে বারবার যোগাযোগ করলেও পরিবার লাশ নিতে আগ্রহ দেখায়নি। এতে হাইকমিশনের কর্মকর্তারা পর্যন্ত বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন।
একজন বাবার মরদেহ দেশে আনতে পরিবারের অনীহা শুধু প্রশাসনকেই নয়, বিবেকবান মানুষকেও হতবাক করেছে। যে মানুষটি বছরের পর বছর রেমিট্যান্স পাঠিয়ে সংসার চালিয়েছেন, মৃত্যুর পর তার জন্যে পরিবারের এতোটুকু আবেগও দেখা গেলো না। অনেক সময় অবশ্য পরিবার লাশ দেশে আনতে চাইলেও বাস্তবতার দেয়ালে আটকে যায়।
অন্যদিকে, ইরাকে স্ট্রোক করে মারা যাওয়া প্রবাসী মো. সাগরের মরদেহ নয় মাস ধরে মর্গে পড়ে থাকার ঘটনা উপরোক্ত বিষয়ের বিপরীতে দাঁড়ায় । পরিবারের ইচ্ছা ছিলো লাশ দেশে এনে শেষবারের মতো মুখ দেখা ও নিজ হাতে দাফন করা। কিন্তু আইনি জটিলতা ও ব্যয়ের কারণে সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড থেকে জানানো হয়, নিয়োগকর্তা খরচ বহন করছে না। ফলে বিদেশেই দাফনের পরামর্শ দেওয়া হয়। অথচ ভাই মো. খবিরের আকুতি ছিলোÑ“ভাইয়ের মুখটা একবার দেখতে চাই।” এই ঘটনাগুলো দেখায়, সব পরিবার এক নয়। কেউ কেউ টাকার জন্যে লাশ ফেলে রাখে, আবার কেউ অর্থের অভাবে শেষ বিদায়টুকুও দিতে পারে না।
২০২১ সালে মালয়েশিয়ায় মারা যাওয়া গাইবান্ধার জহিরুল ইসলাম জবুর ঘটনাও ছিলো বেদনাদায়ক। জন্ডিস ও লিভারের রোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি হাসপাতালে মারা যান। মৃত্যুর পর ১৭ দিন তার মরদেহ পড়ে ছিলো হাসপাতালের মর্গে। পরিবার দরিদ্র হওয়ায় লাশ দেশে আনানোর খরচ বহন করতে পারেনি। অবশেষে বাধ্য হয়ে তারা মালয়েশিয়াতেই দাফনের অনুমতি দেয়। অর্থনৈতিক সংকট কীভাবে একজন বাবাকে নিজের মাটিতে কবর পাওয়ার অধিকার থেকেও বঞ্চিত করে, এই ঘটনা তার জ্বলন্ত উদাহরণ।
প্রবাসীদের জীবনের সবচেয়ে বড়ো ট্র্যাজেডি হলোÑতারা বেঁচে থাকতেও একা, মরার পরেতো একাই। বিদেশের মাটিতে দিনরাত শ্রম দিয়ে তারা পরিবারের জন্যে স্বপ্ন বুনে যায়। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই সম্পর্কের জায়গায় তৈরি হয় কেবল অর্থনৈতিক নির্ভরতা। মাস শেষে টাকা পাঠানোই হয়ে ওঠে সম্পর্কের একমাত্র ভাষা। অনেক পরিবার কেবল টাকা পাঠানোর সময় যোগাযোগ রাখে। অসুস্থতা, একাকীত্ব বা মানসিক কষ্টের খবর নেওয়ার সময় থাকে না। ফলে প্রবাসীরা ধীরে ধীরে মানুষ থেকে পরিণত হন ‘চলমান এটিএম মেশিনে’।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়া একটি পোস্ট দেশজুড়ে আলোড়ন তোলে। সেখানে লেখা ছিলো “পরিবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাদের লাশ লাগবে না, টাকা লাগবে।” পোস্টটিতে এক সৌদি প্রবাসীর মৃত্যুর বর্ণনা ছিলো। মালিক পক্ষ পরিবারকে জানিয়েছিলো, সৌদি আরবে দাফন করতে দিলে কিছু আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। আর দেশে নিতে চাইলে খরচ বহন করা হবে। পরিবার শেষ পর্যন্ত টাকাই বেছে নেয়। এই পোস্টে হাজার হাজার মানুষ ক্ষোভ ও বেদনা প্রকাশ করেন। কারণ এটি কেবল একটি পরিবারের সিদ্ধান্ত নয়, বরং সমাজের মানবিক অবক্ষয়ের প্রতিচ্ছবি।
গেলো কয়েক মাসে শুধু সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদেই সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন চাঁদপুরের একাধিক প্রবাসী। সূত্র বলছে, গত পাঁচ মাসে অন্তত ৫০ জন চাঁদপুরের শ্রমিক বিভিন্ন দেশে মারা গেছেন। তাদের অধিকাংশই পরিবারের সুখের আশায় বিদেশে গিয়েছিলেন। প্রবাসীদের মৃত্যু এখন আর শুধুই পারিবারিক ট্র্যাজেডি নয়, এটি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে।
১৯৯৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত মোট ৫৬ হাজার ৭৬৯ জন প্রবাসীকর্মীর মরদেহ দেশে ফিরেছে। এই সংখ্যা শুধু মৃত্যুর হিসাব নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজারো ভাঙ্গা পরিবার, নিঃসঙ্গ শ্রমিক ও অপ্রকাশিত কান্নার ইতিহাস। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে সৌদি আরবে কমপক্ষে ১৩ হাজার ৬৮৫ বাংলাদেশি মারা গেছেন। অধিকাংশ মৃত্যুই ছিলো রহস্যজনক বা ব্যাখ্যাতীত। অনেকের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ পর্যন্ত জানা যায়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, মানসিক চাপ, পর্যাপ্ত চিকিৎসার অভাব এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এসব মৃত্যুর উল্লেখযোগ্য কারণ।
প্রবাসীদের মৃত্যু ঘিরে অর্থনৈতিক হিসাবের বিষয়টি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে সরকারি ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থার কারণে। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড মৃত প্রবাসীর পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দিয়ে থাকে। বিমানবন্দরে লাশ পরিবহন ও দাফনের খরচ ছাড়াও পরিবার পায় আর্থিক অনুদান। ফলে অনেক ক্ষেত্রে মানবিক সম্পর্কের জায়গা দখল করে নেয় অর্থনৈতিক হিসাব।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিন পরিবার থেকে দূরে থাকার কারণে অনেক প্রবাসীর সঙ্গে আবেগিক দূরত্ব তৈরি হয়। সম্পর্ক তখন দায়িত্বে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। প্রবাসী ব্যক্তি পরিবারে একজন মানুষ হিসেবে নয়, বরং উপার্জনক্ষম সদস্য হিসেবে বিবেচিত হতে থাকেন। ফলে মৃত্যুর পর আবেগের চেয়ে অর্থের প্রশ্ন সামনে চলে আসে।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, প্রবাসী পরিবারগুলোতে ‘অর্থনির্ভর সম্পর্ক’ তৈরি হওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। পরিবারের সদস্যরা যখন বছরের পর বছর শুধু টাকা পাওয়ার মধ্য দিয়ে সম্পর্ক অনুভব করে, তখন আবেগিক বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে মৃত্যুর মতো ঘটনাও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তে রূপ নেয়।
সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই প্রবণতা বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামোর জন্যে অশনিসংকেত। একসময় পরিবার ছিলো আবেগ, মায়া ও আত্মত্যাগের জায়গা। এখন অনেক ক্ষেত্রে সেই সম্পর্ক ভোগবাদ ও অর্থকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে। ফলে প্রবাসীরা ধীরে ধীরে নিজেদের পরিবারেই পরবাসী হয়ে উঠছেন।
প্রবাসী শ্রমিকদের অনেকেই অভিযোগ করেন, অসুস্থ হলে পরিবারের কাছ থেকে মানসিক সমর্থন পান না। ফোন দিলেও পরিবারের প্রথম প্রশ্ন থাকে “টাকা পাঠিয়েছ?” এই মানসিক চাপ তাদের মধ্যে হতাশা, বিষণ্ণতা ও একাকীত্ব বাড়িয়ে দেয়। অনেক প্রবাসী আত্মহত্যার পথও বেছে নেন।
মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর মতে, মৃত্যুর পর লাশ দেশে আনতে প্রশাসনিক জটিলতা, ব্যয় এবং সময়ক্ষেপণ বড়ো সমস্যা। অনেক পরিবার এসব ঝামেলা এড়াতে বিদেশেই দাফনে সম্মতি দেয়। তবে কিছু ক্ষেত্রে সরাসরি অর্থের হিসাবও বড়ো কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্যমতে, ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ৩ হাজার ১৫৪ জন প্রবাসীর মরদেহ দেশে এসেছে। এ সময় প্রায় ৩ হাজার পরিবারের মধ্যে দাফন সহায়তা দেওয়া হয় এবং কয়েক হাজার পরিবার আর্থিক অনুদান পায়। এই অনুদান অনেক পরিবারের জন্যে সহায়ক হলেও কিছু ক্ষেত্রে সেটি মানবিকতার চেয়ে বড় হয়ে উঠছে।
প্রবাসীরা বলছেন, রাষ্ট্রকে শুধু ক্ষতিপূরণ নয়, প্রবাসীদের মানসিক ও সামাজিক নিরাপত্তার দিকেও নজর দিতে হবে। পরিবারগুলোর মধ্যেও সচেতনতা তৈরি প্রয়োজনÑএকজন প্রবাসী কেবল টাকার উৎস নয়, তিনি পরিবারেরই একজন মানুষ। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও মৃত ব্যক্তির প্রতি সম্মান ও শেষ বিদায়ের গুরুত্ব অপরিসীম। ইসলাম ধর্মে মরদেহের সম্মান রক্ষা ও যথাযথ দাফনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। অথচ আজ অনেক পরিবার অর্থের হিসাবের কাছে সেই মানবিক দায়িত্ব ভুলে যাচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই দেখা যায় বিদেশে মারা যাওয়া প্রবাসীদের সহকর্মীরাই শেষ পর্যন্ত দাফনের দায়িত্ব পালন করছেন। তারা নিজেরা চাঁদা তুলে কাফন-দাফনের ব্যবস্থা করেন। এই দৃশ্যগুলো একদিকে যেমন সহমর্মিতার উদাহরণ, অন্যদিকে পরিবার ও সমাজের মানবিক ব্যর্থতারও প্রতীক।
প্রবাসীদের নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো বলছে, বিদেশে থাকা শ্রমিকদের জন্যে কাউন্সেলিং, পারিবারিক যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং সামাজিক সচেতনতা জরুরি। না হলে ভবিষ্যতে এই সংকট আরও গভীর হবে। পরিবার ও প্রবাসীর মধ্যে আবেগিক সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে উদ্যোগ প্রয়োজন।
একজন প্রবাসী যখন বিদেশে যান, তখন তিনি শুধু নিজের জন্যে নয়, পুরো পরিবারের ভবিষ্যতের জন্যে সংগ্রাম করেন। নিজের অসুস্থতা, কষ্ট, একাকীত্ব সবকিছু চেপে রেখে টাকা পাঠান। কিন্তু মৃত্যুর পর যদি সেই মানুষটির লাশও পরিবারের কাছে গুরুত্ব না পায়, তবে সেটি কেবল ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়Ñসমগ্র সমাজের নৈতিক পরাজয়।
আজ প্রশ্ন উঠছে আমরা কি প্রবাসীদের মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করছি, নাকি শুধু রেমিট্যান্স পাঠানোর যন্ত্র হিসেবে দেখছি? দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখা এই মানুষগুলোর প্রতি পরিবারের এমন আচরণ কেবল হৃদয়বিদারক নয়, লজ্জাজনকও বটে।
একজন প্রবাসীর সবচেয়ে বড়ো স্বপ্ন থাকে মৃত্যুর পর অন্তত নিজের মাটিতে ঘুমানোর। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, অনেকের কবর হচ্ছে বিদেশের নির্জন মাটিতে, পাশে থাকছে না পরিবার, থাকছে না প্রিয়জনের শেষ ছোঁয়া। শুধু কয়েকজন সহকর্মী আর নীরব বালুকাময় কবরস্থান সাক্ষী হয়ে থাকে এক জীবনের অবসানের।
প্রবাসীদের কফিনে আজ শুধু লাশ ফিরে আসে না, ফিরে আসে হাজারো না বলা কষ্ট, অবহেলা আর একাকীত্বের গল্প। যে মানুষগুলো জীবনের সবটুকু দিয়ে পরিবারকে বাঁচিয়ে রাখে, মৃত্যুর পর তাদের জন্যে যদি পরিবার কেবল টাকার অঙ্ক খোঁজে, তবে সেটিই হয়তো আমাদের সময়ের সবচেয়ে নির্মম সামাজিক বাস্তবতা।
মোহাম্মদ সানাউল হক : সৌদি প্রবাসী, ফিচার সাংবাদিক।








