প্রকাশ : ১১ এপ্রিল ২০২৬, ১১:২১
শিক্ষকতা পেশা থেকে অবসরে গেলেন বিশিষ্ট শিক্ষক নেতা বিলাল হোসেন

মতলব দক্ষিণ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বরদিয়া কাজী সুলতান আহমেদ উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক মো. বিলাল হোসেন ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ মহান শিক্ষকতা পেশা থেকে অবসর গ্রহণ করেন। তিনি একদিকে ছিলেন দক্ষ ও শিক্ষার্থীদের জনপ্রিয় শিক্ষক, অপরদিকে ছিলেন একজন শিক্ষক নেতা। তিনি পরে হয়ে ওঠেন একজন মাধ্যমিক স্তরের জাতীয় শিক্ষক নেতা।
মতলবের কৃতী সন্তান বিলাল হোসেন ১৯৬৬ সালের ১৫ জানুয়ারি মতলব দক্ষিণের গাবুয়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম সালামত মিঞা এবং মাতার নাম মালেকা বেগম। তিনি ১৯৮২ সালে এসএসসি, ১৯৮৪ সালে এইচএসসি, ১৯৮৭ সালে বিএসসি ডিগ্রি নেন। স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের সাথে সাথেই ১৯৮৮ সালের ৬ অক্টোবর মতলব দক্ষিণ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বরদিয়া কাজী সুলতান আহমেদ উচ্চ বিদ্যালয়ে গণিতের সহকারী শিক্ষক হিসেবে শিক্ষকতা শুরু করেন। ১৯৯৪ সালে শিক্ষকতার লাইসেন্স খ্যাত বিএড ডিগ্রি নেন। শিক্ষকতা পেশা সংশ্লিষ্ট অনেক স্বল্প মেয়াদী প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে একজন দক্ষ শিক্ষক হিসেবে তিনি খ্যাতি অর্জন করেন। তিনি শিক্ষকতা পেশার মধ্য থেকেই জনপ্রিয় শিক্ষক, মতলবের শিক্ষক নেতা, পরবর্তীতে জেলার মাধ্যমিক শিক্ষক নেতা ও বাংলাদেশ মাধ্যমিক সহকারী শিক্ষক সমিতির রূপকার ও প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং জাতীয় শিক্ষক নেতা হন। তিনি শিক্ষকতার পাশাপাশি মহান এ পেশার মর্যাদা রক্ষা, শিক্ষক সমাজের কল্যাণে ও শিক্ষার মান-উন্নয়নে নিজেকে এ সব শিক্ষক সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত করেন। সেই হিসেবে তিনি ১৯৯২ সালে তৎকালীন বৃহত্তর মতলব উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক, ১৯৯৬ সালে সাধারণ সম্পাদক, পরবর্তী ধারাবাহিকতায় চাঁদপুর জেলার মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির বিভিন্ন পদ অলংকৃত করেন। তখন আজকের দ্বারকনাথ বা ডিএন হাই স্কুল ছিলো জেলার সকল শিক্ষক-কর্মচারীদের দাবি আদায়ের বা আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু। মাধ্যমিক, কারিগরি, মাদ্রাসা ও কলেজগুলো সব সময়েই যুগপৎ আন্দোলনের প্রেক্ষাপট তৈরি করে জেলার সকল নেতৃবৃন্দ এক ও অভিন্ন শিক্ষক সংগঠনের নেতৃত্ব দেয়া হয় এককভাবে ও একই ভ্যেনু থেকে। সে সুবাদেই তিনি কেন্দ্রীয় কমিটিতে বিভিন্ন পদে ও আন্দোলন-সংগ্রামের নীতি-নির্ধারণী সভার অন্যতম শিক্ষক নেতা হওয়ার সুবর্ণ সুয়োগ পান।
ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, অধ্যক্ষ ড. আলমগীর কবির পাটওয়ারী ও অধ্যক্ষ সাফায়েত আহমেদ ভূঁইয়ার চাঁদপুরে নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ কলেজ শিক্ষক সমিতি- বাকশিস সংগঠনটি ঠিক থাকলেও ১৯৯৭ সালে চাঁদপুরের মাধ্যমিক শিক্ষক সংগঠনটি দুটি ভাগে ভাগ হয়ে যায়। এর একটি হয়ে যায় রাজনৈতিক সহযোগী শিক্ষক সংগঠন। অপরটি নীতি ও আদর্শ বিসর্জন না দিয়ে নিরপেক্ষ ও অরাজনৈতিক মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতি হিসেবে নেতৃত্ব দেন তৎকালীন ডিএন হাইস্কুলের সাবেক প্রধান শিক্ষক সাখাওয়াত হোসেন। আর ওটির নেতৃত্বে ছিলেন অরুণ কুমার মজুমদারসহ আরো অনেকে। ফলে বিলাল হোসেন চলে এলেন মাধ্যমিক শিক্ষক সংগঠনের ফ্রন্ট লাইনে এবং তাঁর নেতৃত্বের বিকাশ লাভ করে। তিনি ১৯৯৪, ১৯৯৫, ১৯৯৬, ১৯৯৭, ২০০০, ২০০১, ২০০২, ২০০৫, ২০০৭, ২০০৮, ২০১০, ২০১১, ২০১২, ২০১৫, ২০১৬ ,২০১৮ ও ২০১৯ সাল পর্যন্ত অগ্নি-কঠিন, চড়াই-উৎরাইসম্পন্ন বাকশিস ও জাতীয় শিক্ষক-কর্মচারী ফ্রন্ট কর্তৃক জাতীয়ভাবে ১৭টি শিক্ষক সংগঠনের ডাকা শিক্ষকদের প্রতিটি দাবি আদায়ের আন্দোলনে চাঁদপুরের শিক্ষক-কর্মচারীদের সংগঠিত করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন এবং প্রতিটি সভা-মিছিল-পথসভা-প্রতিবাদ মুখর দাবি নিয়ে রাজপথে নেমে আসেন।
শিক্ষকগণ ধর্মঘট, হরতাল, কর্মবিরতি, সমাবেশ, মহাসমাবেশ, বিক্ষোভ মিছিল, মানববন্ধন কর্মসূচি, স্মারকলিপি পেশ, আলোচনা, পর্যালোচনা, মিটিং, মিছিল, কালো ব্যাজ ধারণ, কালো পতাকা উড্ডয়ন, এমপি-মন্ত্রীদের সাথে সাক্ষাৎ ও ১শ’ টাকায় ঘর বানিয়ে রাত্রি যাপন ইত্যাদি কর্মসূচিগুলো দাবি আদায়ের লক্ষ্যে আন্দোলন করতে বাকশিসসহ চাঁদপুর জেলার স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরিদেরকে সাথে করে এক প্লাটফর্ম থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে চাঁদপুরের শিক্ষকগণ। তিনিও ছিলেন এর একজন।
তৎকালীন ডিএন হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক সাখাওয়াত হোসেনকে স্কুলকেন্দ্রিক নানা ঝামেলায় জড়ানো হয়। অতঃপর তাঁর মৃত্যুর পর জেলার এ শিক্ষক সংগঠনটি নেতৃত্বহীন হয়ে যায়। যার ফলে ২০১৪ সালের ৪ নভেম্বর শিক্ষক নেতা বিলাল হোসেন বাকশিসের পরামর্শে তাঁর ক’জন সহকর্মী নিয়ে চাঁদপুরে ‘মাধ্যমিক সহকারী শিক্ষক সমিতি’ নামে নতুন একটি সংগঠন গড়ে শিক্ষকদের দাবি আদায়ে ভূমিকা রেখেছেন।
২০১৯ সালেও জেলা বাকশিসের সাথে তিনি ঢাকার রাজপথে ছিলেন। ওই মাধ্যমিক সহকারী শিক্ষক সমিতিটি বর্তমানে কেন্দ্রীয়ভাবে বাংলাদেশ মাধ্যমিক সহকারী শিক্ষক সমিতি নামে দেশের রাজধানীসহ প্রায় ২০ উপজেলা জেলায় সাংগঠনিকভাবে কর্মকাণ্ড পারিচালনা করছে। এ সংগঠনটি পরিচালনা করতে জেলা ও উপজেলায় অনেক প্রধান শিক্ষকের বিরাগভাজন হতে হয়েছে।
২০২৬ সালের ১৪ জানুয়ারি বিলাল হোসেন তাঁর স্কুল থেকে অবসরগ্রহণ করেন। ব্যক্তিজীবনে তিনি দু’ কন্যা ও এক পুত্র সন্তানের পিতা। বড়ো ছেলে যুক্তরাষ্ট্রের বলস্ট্রাট বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চতর ডিগ্রিতে অধ্যয়ন করছেন। বড়ো মেয়ে ঢাকায় বাংলাদেশ মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স কোর্স সম্পন্ন করেছেন এবং কনিষ্ঠ মেয়ে আল আমিন একাডেমি স্কুল এন্ড কলেজে অধ্যয়নরত। তাঁর সহধর্মিণী একজন আদর্শ গৃহিণী।




