প্রকাশ : ০৪ মার্চ ২০২৬, ০৯:৫৬
অধিকার আদায়ে, প্রতিবাদে, প্রতিরোধে স্লোগান রণধ্বনিতুল্য

স্লোগান সাহিত্যের অংশ হলেও বেশি ব্যবহার হয় রাজনীতিতে। বলা চলে স্লোগান রাজনীতির একটি অন্যতম প্রধান উপকরণ। যারা রাজনীতি করেন তাদের মিছিল এবং সমাবেশ করা লাগে। আর স্লোগান ছাড়া মিছিল কল্পনাও করা যায় না। সমাবেশেও বক্তব্যের ফাঁকে ফাঁকে স্লোগান উচ্চারিত হয়। আমার কাছে মনে হয়, পৃথিবীতে যখন রাজনীতি শুরু হয় তখন থেকেই স্লোগান শুরু হয়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বেশ ক’টি স্লোগান বিখ্যাত হয়ে আছে। বিশেষ করে ব্রিটিশ আমল থেকে এখন পর্যন্ত রাজনৈতিক ময়দানে যেসব শ্লোগান ইতিহাস হয়ে আছে ও আজো মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে এবং এখনো ব্যবহার হচ্ছে সেসব স্লোগানই প্রবন্ধের মূল বিষয়।
বাংলায় গান মানে হলো সংগীত। ইংরেজিতে গান মানে হলো বন্দুক। স্লো শব্দটি ইংরেজি। যার মানে ধীরগতি। গানকে ইংরেজি শব্দ ধরে নিয়ে স্লোগানের মানে করলে হয় ধীর গতির বন্দুক। মানে যে বন্দুক ধীর গতিতে কাজ করে। আবার গানকে বাংলা শব্দ ধরে নিয়ে শ্লোগানের মানে করা যায় ধীর গতির সংগীত। রস বাদ দিয়ে স্লোগান নিয়ে অভিধান কী বলে সেটা দেখে নেই।
স্লোগান একটি ধারণা বা উদ্দেশ্য পুনরাবৃত্তিমূলক অভিব্যক্তি হিসেবে রাজনৈতিক, বাণিজ্যিক, ধর্মীয় এবং অন্যান্য প্রেক্ষাপটে ব্যবহৃত একটি স্মরণীয় নীতিবাক্য বা শব্দগুচ্ছ। স্লোগান শব্দটি ইংরেজি, এটি এসেছে স্লোগ্রন থেকে, যা একটি স্কটিশ গ্যালিক শব্দ। গ্যালিক মানে হলো সেনাবাহিনীর চিৎকার বা ‘যুদ্ধের ডাক’। তার মানে সেনাবাহিনীর যুদ্ধের ডাক দেওয়ার সাথে স্লোগানের সম্পর্ক গভীর। কারণ সেখান থেকেই তার উৎপত্তি। যদিও আজ তা রাজনীতিরই সম্পদ। ১৫১৩ সাল থেকে এই শব্দটির ব্যবহার শুরু হয়। শুরুতে এটি একটি নীতিবাক্য হিসাবে হেরাল্ড্রিতে ব্যবহৃত হতো। স্লোগান একটি স্মরণীয় নীতিবাক্য বা বাক্যাংশ, যা কোনো গোষ্ঠী, রাজনৈতিক দল, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বা ধর্মীয় উদ্দেশ্যকে বোঝাতে বা কোনো ধারণার পুনরাবৃত্তিমূলক অভিব্যক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
স্লোগানকে ট্যাগলাইন বলা হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে। ইউরোপীয়রা এটিকে ব্যবহার করে শর্ত ভিত্তিরেখা, স্বাক্ষর, দাবি হিসেবে। বাংলাদেশে স্লোগান ব্যবহার হয় দাবি আদায়ে, জনগণকে উজ্জীবিত করতে। এ পর্যন্তই সুন্দর। একটি স্লোগানের শক্তি অনেক, ভূমিকা বিরাট। একটি স্লোগান একটি ঘুমন্ত জাতিকে জাগাতে পারে। একটি স্লোগান কথা বলে, না বলা অনেক কথা। একটি স্লোগান তছনছ করে দিতে পারে জালিমের তখত। একটি স্লোগান কাঁপন ধরিয়ে দিতে পারে জালিমের ভিত। যেখানে স্লোগান স্পর্শ করতে পারতো শিল্পকে। সেখানে স্লোগান আজ মুখ থুবড়ে পড়েছে পচা নর্দমায়। কিছু কিছু স্লোগান এতোটাই নোংরা যে তা বর্বরতার সামিল। যে স্লোগান দুর্গন্ধ ছড়ায় সে স্লোগান, স্লোগান নয়। যে স্লোগান অরাজকতা সৃষ্টি করে সে স্লোগান, স্লোগান নয়। বাংলাদেশে বিগত দু দশক ধরে কিছু কিছু স্লোগান উচ্চারিত হয়ে আসছে যা খুবই আপত্তিকর। বর্তমানে নতুন কিছু স্লোগান দিচ্ছে নতুন প্রজন্ম যা লিখতেও লজ্জা লাগে। আবার কিছু কিছু নতুন স্লোগান এতোই মনোমুগ্ধকর যে সময় সেসবকে স্যালুট করছে।
পৃথিবীর যে কোনো আন্দোলনে, সংগ্রামে, বিপ্লবে, যুদ্ধে স্লোগান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। স্লোগানকে রণধ্বনিতুল্য বললেও ভুল হবে না। অধিকার আদায়ে, প্রতিবাদে, প্রতিরোধে স্লোগানের অনিবার্যতা অস্বীকার করা যায় না। রাজনৈতিক মতভেদে পাল্টাপাল্টি স্লোগানের সংস্কৃতিও রয়েছে। ব্রিটিশ ভারতে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে জাতীয় কংগ্রেস এবং গোপন সশস্ত্র যুগান্তর, অনুশীলন সমিতি ইত্যাদি জাতীয়তাবাদী ধারার শ্লোগান ছিলো বঙ্কিমচন্দ্রের কবিতার ‘বন্দে মাতরম’। রবীন্দ্রনাথ ‘বন্দে মাতরম’ কবিতাটির সুরারোপ করলেও জাতীয় কংগ্রেসকে অনুরোধ করেছিলেন ওই গানটি যেন জাতীয় সংগীত হিসেবে ব্যবহার করা না হয়। কবি জসীমউদ্দীনকে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘বন্দে মাতরম’ গানটি যেভাবে আছে, তোমরা মুসলমানরা এজন্য আপত্তি করতেই পার। কারণ এখানে তোমাদের ধর্মমত ক্ষুণ্ন হবার যথেষ্ট কারণ আছে।’ রবীন্দ্রনাথ বুদ্ধদেব বসুকে পর্যন্ত জানিয়েছিলেন, ‘ভারতবর্ষে ন্যাশনাল গান এমন হওয়া উচিত, যাতে এটা হিন্দু, মুসলমান, খ্রিস্টানরা শ্রদ্ধার সঙ্গে ভক্তির সঙ্গে যোগ দিতে পারে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, মুসলিম সম্প্রদায় ‘বন্দে মাতরম’ কেবল প্রত্যাখ্যানই করেনি, বিপরীতে অনুরূপ সাম্প্রদায়িক স্লোগান নিয়ে হাজির হয়েছিলো। ‘নারায়ে তাকবির-আল্লাহু আকবার’। হিন্দু ও মুসলিম দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভক্তির ওই স্লোগানই অবশেষে ভারত বিভক্তি অনিবার্য করে তুলেছিলো।
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে ওই দুই সাম্প্রদায়িক স্লোগানের বিপরীতে যে স্লোগানটি সর্বভারতীয় স্লোগান হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ার উপযুক্ত ছিলো, সেটি সম্প্রদায়গত স্লোগানের তীব্রতায় গ্রহণ করেনি না হিন্দু, না মুসলমানরা। সেটি হচ্ছে ‘জয় হিন্দ’। স্লোগানটির স্রষ্টা নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। সিঙ্গাপুরে বিপ্লবী রাসবিহারী বসু তার গঠিত আজাদ হিন্দ ফৌজের দায়িত্বভার সুভাষ বসুর কাছে অর্পণের সময় উপস্থিত আজাদ হিন্দ ফৌজের সদস্যদের উদ্দেশে ভাষণ শেষে সুভাষ বসু ‘জয় হিন্দ’ স্লোগানটি সর্বপ্রথম দিয়েছিলেন। পাকিস্তান আন্দোলনে মুসলিম লীগ বা আওয়ামী মুসলিম লীগ নেতাদের প্রধান স্লোগান ছিলো ‘নারায়ে তাকবির- আল্লাহু আকবার’। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিদের মাতৃভাষা ছিলো বাংলা, অথচ বাংলা ভাষা উপেক্ষা করে উর্দু ভাষা রাষ্ট্রভাষার ঘোষণা দেওয়া হয়। বিপরীতে ভাষার দাবিতে তীব্র প্রতিবাদ-সংগ্রাম শুরু হয়। ভাষা আন্দোলনে কার্যকর স্লোগানটি ছিলো, ‘রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই’। ওই সময় ‘শহীদের রক্ত বৃথা যেতে দেব না’ স্লোগানটি সর্বস্তরে সাড়া ফেলতে পেরেছিলো। অবশেষে পাকিস্তানি শাসকরা বাংলাকে রাষ্ট্রের অন্যতম রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে শহীদ আসাদ, মতিউরের আত্মদানে পতন ঘটে আইয়ুব খানের। রাষ্ট্রীয় বাহিনীর গুলিতে শহীদ আসাদের আত্মদানের পরক্ষণে ‘আসাদের মন্ত্র-জনগণতন্ত্র’ শ্লোগানটি ব্যাপকভাবে সাড়া ফেলে। জাতীয়তাবাদীরা তখন নতুন শ্লোগান দেয়, ‘তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা-মেঘনা যমুনা’। বিপরীতে বামপন্থিরা দেয়, ‘তোমার আমার ঠিকানা খেত-খামার-কারখানা’। ১৯৭০-এর নির্বাচনে মওলানা ভাসানী আওয়ামী লীগকে ওয়াক ওভার দিয়েছিলেন এজন্যে যে, নির্বাচনের মধ্য দিয়ে একটি সিদ্ধান্ত বেরিয়ে আসুক। পাশাপাশি নিজেরা নির্বাচনী দ্বন্দ্বে লিপ্ত হলে সেটা পশ্চিম পাকিস্তানিদেরই স্বার্থ রক্ষা করবে। তাই তিনি কৌশল অবলম্বন করে স্লোগান দেন ‘ভোটের আগে-ভাত চাই’, ‘ভোটের বাক্সে লাথি মারো-পূর্ব বাংলা স্বাধীন করো’। মুক্তিযুদ্ধে প্রতিটি রণাঙ্গনে মুক্তিযোদ্ধারা ‘জয় বাংলা’ স্লোগানটি সমবেতভাবে দিতো। স্বাধীন দেশে হরেক রকম স্লোগান বের হলেও এরশাদের শাসনামলের শেষ দিকে ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক-গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ স্লোগানটি আলোড়ন তুলেছিলো। সে আন্দোলনে মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক ডা. মিলনকে গুলি করে হত্যার পর এরশাদের পতন অনিবার্য হয়ে পড়ে। তখন স্লোগান উঠে, ‘এক দফা-এক দাবি-এরশাদ তুই এখন যাবি’।
‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগানটি নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে দিতে দেখা যায়। দলের শীর্ষ নেতারাও বক্তব্যের সময় অনেকে ইনকিলাব জিন্দাবাদ স্লোগানটি ব্যবহার করেন। তবে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগানটি এখনকার নয়, বহু পুরনো। ইনকিলাব জিন্দাবাদ স্লোগানটি কোথা থেকে এলো?
ইনকিলাব মূলত আরবী শব্দ, যার অর্থ বিপ্লব। শব্দটি উর্দুতেও ব্যবহার হয়। জিন্দাবাদ হিন্দি শব্দ। যার অর্থ দীর্ঘজীবী। ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’-এর অনুবাদ ‘বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক’। এটি প্রথম সাহিত্যে ব্যবহার করেন মহাকবি মুহাম্মদ ইকবাল। এটি শ্লোগান হিসেবে প্রথম ব্যবহার করে বামপন্থী কম্যুনিস্টরা। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে ইনকিলাব জিন্দাবাদ স্লোগানটি প্রথম ব্যবহার হয়। আজ বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে বিক্ষোভের সময় নাগরিক সমাজের কর্মীরা স্লোগানটি ব্যবহার করছে।
ভারতীয় পত্রিকা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে এক লেখায় উল্লেখ রয়েছে, ১৯২১ সালে মাওলানা হাসরাত মোহানি প্রথম স্লোগানটি ব্যবহার করেন। এরপরে এ স্লোগান ঠাঁই করে নেয় উপনিবেশবিরোধী সশস্ত্র সংগ্রামের নেতা ভগত সিংয়ের কণ্ঠেও। নানা পরিচয়ে পরিচিত ছিলেন হাসরাত মোহানি। উর্দু ভাষার এ কবি ছিলেন শ্রমিকনেতা, ছিলেন ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সদস্যও। তিনি ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির এক নেতার সঙ্গে প্রথম ভারতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে পূর্ণ স্বরাজ বা পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি উত্থাপন করেছিলেন। ইনকিলাব জিন্দাবাদ শ্লোগানটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অংশ হিসেবে দিয়েছিলেন হাসরাত মোহানি। ইরফান হাবিবের লেখায় দেখা যাচ্ছে, ১৯২৯ সালে আদালতে দেওয়া এক জবানবন্দিতে ভগত সিং বলেন, ইনকিলাব বা বিপ্লব বোমা বা পিস্তলের সংস্কৃতি নয়। আমাদের বিপ্লবের অর্থ হলো প্রকাশ্য অন্যায়ের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে থাকা বর্তমান পরিস্থিতিকে সম্পূর্ণ বদলে দেওয়া। দেশে স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে গত জুলাইয়ে যখন ছাত্র-জনতার আন্দোলন তীব্র হয়ে উঠে, তখন তরুণদের অনেকেই ইনকিলাব জিন্দাবাদ স্লোগানটি ব্যবহার করেন।
ছয় দফা কর্মসূচি বাঙালি জাতিকে মুহূর্তের মধ্যে জাগিয়ে তোলে। এক আশ্চর্য টনিকের মতো কাজ করে ‘জাগো জাগো -বাঙালী জাগো’ স্লোগানটি। পাশাপাশি অন্য পক্ষ থেকে আসে- ‘জাগো জাগো-সর্বহারা জাগো’/’জাগো জাগো -মুসলিম জাগো’। ১৯৬৯ সালে ভাসানী অনুসারী পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের একাংশ ‘স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলা’ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্লোগান প্রকাশ্যে উত্থাপন করে এবং সে সময় যে স্লোগান দেয়, ঐ সময় তা বেশ সাড়া জাগায়। স্লোগানগুলো হলো--‘শ্রমিক কৃষক অস্ত্র ধর-পূর্ব বাংলা স্বাধীন কর’, ‘মাগো তোমায় মুক্ত করব-শপথ নিলাম শপথ নিলাম’।
১৯৬৯ সালে ছাত্রলীগের সম্মেলনের সময় ‘জয় বাংলা’ স্লোগানটি সুচিন্তিতভাবে উঠানো হয়। এই স্লোগানের পাশাপাশি ছাত্রলীগের মধ্য থেকেই তখন ‘তোমার দেশ আমার দেশ-বাংলাদেশ বাংলাদেশ’ ও ‘পদ্মা- মেঘনা-যমুনা তোমার আমার ঠিকানা’ সহ আরো অনেক জাতীয়তাবাদী স্লোগান উঠতে থাকে। শেখ মুজিবুর রহমান তখন ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান সমর্থন করেন এবং বক্তৃতার সময় ও অন্যান্য ক্ষেত্রে এই শ্লোগান দিতে আরম্ভ করেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের সময় সারা বাংলাদেশে এই স্লোগান বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনায় জনগণকে উদ্বুদ্ধ করে তোলে।
ইতিহাসের ভাঁজেও চাপা পড়েছে অনেক স্লোগান। আবার অনেক সার্বজনীন স্লোগানকে দলীয়করণ বা বিকৃতও করা হয়েছে। ইদানীং রাজনীতির মাঠে-ময়দানে যেসব শ্লোগান উচ্চারিত হচ্ছে তাতে কেবল রুচিহীনতাই নয়, অসভ্যতারও প্রকাশ ঘটছে। দাবি, অধিকার বা প্রতিপাদ্য বিষয় তুলে ধরার চাইতে স্লোগান হয়ে উঠছে প্রতিহিংসার, বিদ্বেষের। নষ্ট রাজনীতির এসব স্লোগান প্রতিনিয়ত বিষ ছড়াচ্ছে। বিভাজিত করছে আমাদের জাতীয়তাবোধকে। অথচ সার্বভৌমত্ব এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ সংগ্রামে আমরা সোচ্চার ছিলাম শ্লোগানে শ্লোগানে। দাবি, অধিকার, দ্রোহ-- স্লোগানে ছড়িয়ে পড়েছিলো জনপদ থেকে জনপদে। বৃটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে বায়ান্নের ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনসহ ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায়ে আমাদের স্লোগানের ভাষা, অভিব্যক্তি, প্রকাশ ছিলো প্রায় এক ও অভিন্ন। দেশ স্বাধীনের পর আমরা যখন পরস্পর পরস্পরের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যেতে শুরু করলাম, তখন থেকে আমাদের স্লোগানও প্রতিনিয়ত প্রতিহিংসার ও বিদ্বেষময় হয়ে উঠতে লাগলো। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বর্তমানে তা কুরুচিপূর্ণ, অসভ্যতার পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। রাজনীতির পাশাপাশি স্লোগান থেকেও আমাদের শিষ্টাচারবোধ উঠে গেছে। তেমনি কিছু স্লোগান হলো--‘জ্বালো জ্বালো, আগুন জ্বালো’। ‘জ্বালিয়ে দেও পুড়িয়ে দেও, শিবিরের আস্তানা’। ‘ছাত্রদলের গদিতে আগুন জ্বালো একসাথে’। জ্বালাও পোড়ানোর মধ্যে শান্তি নেই। আর জ্বালাও পোড়ার মধ্যে যে ধ্বংস হয় তা দেশ এবং দেশের মানুষেরই ক্ষতি। আরেকটা ভয়ংকর শ্লোগান হলো--‘একটা একটা শিবির ধর, ধইরা ধইরা জবাই কর’ অথবা ‘একটা একটা জামায়াত ধর, ধইরা ধইরা জবাই কর’, ‘একটা একটা শিবির ধর, সকাল বিকাল নাস্তা কর’। আমার কাছে মনে হয় পৃথিবীর সবচেয়ে বিশ্রী শ্লোগান হলো এটি। প্রকাশ্যে প্রতিপক্ষকে জবাই করার আহ্বান কোনো সভ্যজাতি করতে পারে না। এটার মতো অশ্লীল শ্লোগান আর হতে পারে না। প্রতিপক্ষ কতোটুকু হিংস্র আর দুর্বল হলে মানুষকে নাস্তার ম্যানু বানাতে পারে! ‘ক তে কাদের মোল্লা তুই রাজাকার তুই রাজাকার।’ এটাকেও ভালো স্লোগান বলতে পারি না। কারণ ক তে অনেক সুন্দর এবং পুণ্যবানদের নাম রয়েছে। ‘টিনের চালে কাউয়া, ফজলু আমার শাউয়া।’ ‘এক, দুই, তিন, চার- তারেক জিয়ার পুটকি মার।’ এগুলো কখনো স্লোগানের পর্যায়ে পড়ে না। ছন্দ মিললেই স্লোগান হয়। স্লোগান তা যা মানুষের হৃদয়কে আন্দোলিত করে। স্লোগান তা যা মানুষের হৃদয়ে ঝড় তোলে।
২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে নতুন কিছু স্লোগান সাধারণ মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এই স্লোগানগুলো এতোই যুগোপযোগী ছিলো এবং মানুষ এতোটাই উদ্বুদ্ধ হয়েছে যে, ৫ আগস্ট সব মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। বাংলায় একটা কথা আছে ‘লেবু বেশি চিপলে তিতা হয়ে যায়।’ বিগত বছরগুলোতে রাজাকার শব্দটি এতো বেশি ব্যবহার হয়েছে যে মানুষ এর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। প্রতিপক্ষকে একেবারে শেষ করে দেওয়ার জন্যে এটি ব্যবহার হতো। শেষ পর্যন্ত তা উল্টে গেছে। তাইতো আন্দোলনকারীরা শ্লোগান তোলে ‘আমি কে-তুমি কে? রাজাকার রাজাকার, কে বলেছে কে বলেছে? স্বৈরাচার স্বৈরাচার।’ ২০২৪-এর প্রায় ৪০ দিনের
ছাত্র-জনতার আন্দোলনের জনপ্রিয় শ্লোগানগুলো হলো- ‘চাইলাম অধিকার হয়ে গেলাম রাজাকার।’ ‘আপস না সংগ্রাম, সংগ্রাম সংগ্রাম।’ ‘লেগেছে-রে লেগেছে, রক্তে আগুন লেগেছে।’ ‘রক্তের বন্যায় ভেসে যাবে অন্যায়।’ ‘আপস না সংগ্রাম? সংগ্রাম সংগ্রাম।’ ‘দালালি না রাজপথ? রাজপথ রাজপথ।’ ‘আমার খায়, আমার পরে, আমার বুকেই গুলি করে।’ ‘লাশের ভেতর জীবন দে, নইলে গদি ছাইড়া দে।’ ‘আমার সোনার বাংলায়, বৈষম্যের ঠাঁই নাই।’ ‘আমার ভাই কবরে, খুনি কেন বাহিরে।’ ‘গুলি করে আন্দোলন, বন্ধ করা যাবে না।’ ‘জাস্টিস জাস্টিস উই ওয়ান্ট জাস্টিস।’ ‘বুকের ভেতর অনেক ঝড়, বুক পেতেছি গুলি কর।’ ‘যদি তুমি ভয় পাও তবে তুমি শেষ, যদি তুমি রুখে দাঁড়াও তবে তুমি বাংলাদেশ।’ ‘এক দুই তিন চার, শেখ হাসিনা গদি ছাড়।’
লেখক পরিচিতি : প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক সভাপতি, ফরিদগঞ্জ লেখক ফোরাম; নির্বাহী সদস্য, সাহিত্য একাডেমি, চাঁদপুর; সাধারণ সম্পাদক, ফরিদগঞ্জ প্রেসক্লাব।




