বৃহস্পতিবার, ০৩ এপ্রিল, ২০২৫  |   ৩৫ °সে
আজকের পত্রিকা জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয়
ব্রেকিং নিউজ
  •   হাইমচরে মাটি বোঝাই বাল্কহেডসহ আটক ৯
  •   কচুয়ায় কৃষিজমির মাটি বিক্রি করার দায়ে ড্রেজার, ভেকু ও ট্রাক্টর বিকল
  •   কচুয়ায় খেলতে গিয়ে আগুনে ঝলসে গেছে শিশু সামিয়া
  •   কচুয়ায় ধর্ষণের অভিযোগে যুবক শ্রীঘরে
  •   ১ হাজার ২৯৫ কেজি নিষিদ্ধ পলিথিন জব্দ করেছে কোস্ট গার্ড

প্রকাশ : ১৩ ডিসেম্বর ২০২৪, ০১:০২

সন্তানকে নৈতিক শিক্ষা দানে পিতা-মাতার ভূমিকা

মাও. মো. মোশাররফ হোসাইন
সন্তানকে নৈতিক শিক্ষা দানে পিতা-মাতার ভূমিকা

আজ যারা কচি-কঁাচা আগামীতে তারাই হবে জাতির কর্ণধার। সন্তান মা-বাবার কাছে আল্লাহ তাআলার এক মহা আমানত। এই আমানতের যথাযথ হক আদায় করা মা-বাবা ও অভিভাবকের কর্তব্য। কিন্তু অনেক মা-বাবাই সন্তানের তালীম-তরবিয়ত ও নৈতিক শিক্ষার ব্যাপারে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। এর মূলে রয়েছে : এক. দ্বীন সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং সন্তান যে একটি মহা আমানত-এ বিষয়ে সচেতনতার অভাব। দুই. বিজাতীয় রীতি-নীতি ও ফ্যাশন প্রীতি। তিন. বৈষয়িক উপার্জনকেই জীবনের সাফল্য হিসেবে মনে করা। এ কারণে সন্তানকে একজন ঈমানদার ও সাচ্চা মুসলমান হিসেবে গড়ে তোলার তাগিদ তারা বোধ করেন না। এ সকল মৌলিক চিন্তাগত ভ্রান্তিই সন্তানের তালীম-তারবিয়াত ও নৈতিক শিক্ষার ব্যাপারে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের পথে প্রতিবন্ধক হয়ে দঁাড়ায়।

প্রতিটি সচেতন মুসলিম অভিভাবক তার সন্তানের বিবেক-বুদ্ধি বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে দ্বীনি শিক্ষা সম্পর্কে ধারণা দিয়ে থাকেন। সন্তান যখন আধো আধো কথা বলা শুরু করে বা তারও আগে বাবা মা সন্তানকে আল্লাহ-আল্লাহ, আব্বু, আম্মু ইত্যাদি শব্দ সম্বোধনের সঙ্গে সঙ্গে আদর-সোহাগ করতে থাকে। তখন থেকেই প্রথমে তাওহিদের কালেমা- ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ শিক্ষা দেওয়া জরুরী। তখন থেকেই সন্তান এগুলো শিখতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। এটা হলো সন্তানের জন্য বাবা-মার প্রাথমিক বুনিয়াদি শিক্ষা।

সন্তানের শৈশব সুন্দর হলে সে ইহকাল ও পরকালে গর্বের ধন হবে। মহানবী (সা.) বলেছেন, তোমরা এমন নারীদের বিয়ে করো, যারা অধিক সন্তানপ্রিয়। আমি তোমাদের সুসন্তানের জন্য রোজ কিয়ামতে গর্বিত হব। (নাসায়ি: ৩২২৭, আবুদাউদ: ২০৫০) আল্লাহ তাআলা অনাগত সন্তানের জন্য দোয়া ও শুভকামনা শিখিয়েছেন। হে আমার প্রভু! আমাকে সুসন্তান দান করুন। (সুরা-৩৭ ছফফাত, আয়াত: ১০০)। হে আমার প্রভু! আমাদের সাথিদের ও আমাদের সন্তানদের আমাদের জন্য চোখের শীতলতায় পরিণত করুন, আর আমাদের মুত্তাকিনদের প্রধান করুন। (সুরা-আল ফুরকান, আয়াত: ৭৪) হে আমাদের প্রভু! আমাদের উভয়কে আপনার অনুগত করুন, আর আমাদের বংশধরদেরও আপনার অনুগত করুন; আপনার বিধান আমাদের প্রত্যক্ষ করান এবং আমাদের প্রতি মনোনিবেশ করুন! নিশ্চয় আপনি তওবা কবুলকারী ও দয়ালু। (সুরা-২ বাকারা, আয়াত: ১২৮) সন্তান যেন বার্ধক্যে পিতা–মাতাকে নিঃসঙ্গ ফেলে না রাখে, সে জন্য প্রার্থনা, হে আমার প্রভু! আমাকে একা ছেড়ে দেবেন না, আপনিই তো সর্বোত্তম উত্তরাধিকারী দাতা। (সুরা-২১ আম্বিয়া, আয়াত: ৮৯)

সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজন উত্তম পারিবারিক পরিবেশ। কোরআন করিমের ভাষায়, হে আমার প্রভু! আমাকে উত্তম পরিবার দান করুন, নিশ্চয় আপনি প্রার্থনা শ্রবণকারী। (সুরা-৩ আলে ইমরান, আয়াত: ৩৮)। ‘হে আমাদের প্রভু! আমাদের ইহকালে ও পরকালে কল্যাণ দান করুন, আর দোজখের আজাব থেকে আমাদের রক্ষা করুন।’ (সুরা-২ বাকারা, আয়াত: ২০১) কোনো শিশু যদি অভিভাবকের অবহেলার কারণে পথচ্যুত হয়ে যায়, তাহলে সে হাশরের দিনে আল্লাহর কাছে অভিভাবকের বিরুদ্ধে অভিযোগ করবে, হে আমাদের রব! আমরা আমাদের অভিভাবক ও বড়দের অনুসরণ করেছি, তারা আমাদের বিপথগামী করেছে। হে আমাদের প্রভু! আপনি তাদের দ্বিগুণ শাস্তি দিন এবং মহা–অভিসম্পাত করুন। (সুরা-৩৩ আহজাব, আয়াত: ৬৭-৬৮)

শিশুদের নামাজ, রোজাসহ ইবাদত ও ধর্মীয় আচার–অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণে অভ্যস্ত করাতে হবে, যাতে মানসিক ও নৈতিক শক্তিতে বলীয়ান হতে পারে। কোরআন, হাদিস ও ধর্মগ্রন্থ এবং ধর্মীয় সাহিত্যপাঠে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বোঝাতে হবে। আত্মীয়স্বজন, পাড়া–প্রতিবেশী ও সমাজের সবার সঙ্গে মেশার সুযোগ তৈরি করতে হবে। হাদিস শরিফে রয়েছে, নিজেদের সন্তানদের স্নেহ করো এবং তাদের ভালো ব্যবহার শেখাও। (বুখারি)। সন্তানকে সদাচার শিক্ষা দেওয়া দানখয়রাতের চেয়েও উত্তম। (ইবনে মাজাহ)। তোমরা সন্তানদের জ্ঞান দান করো; কেননা তারা তোমাদের পরবর্তী যুগের জন্য সৃষ্ট। (বায়হাকি)। শিশুদের ইবাদত ও আমলের বিষয়ে পিতা–মাতা, অভিভাবকসহ শিক্ষক–শিক্ষিকা এবং সব স্তরের সচেতন নাগরিকেরই দায়িত্ব পালন করতে হবে। হাদিস শরিফে এসেছে, তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল, আর এ ব্যাপারে প্রত্যেককেই জবাবদিহি করতে হবে। (মুত্তাফাকুন আলাইহি; বুখারি: ৮৫৩, মুসলিম: ১৮২৯)। রাসুল (সা.) বলেন, যখন মানুষ মৃত্যুবরণ করে, তখন তার সব আমল বন্ধ হয়ে যায়; তবে তিনটি কাজের প্রতিদান পেতে থাকে। এমন দান, যার কল্যাণ চলমান থাকে; এমন জ্ঞান, যা দ্বারা মানুষ উপকৃত হতে থাকে; এমন সৎকর্মশীল সন্তান, যে তার (পিতা–মাতার) জন্য দোয়া করে। (ইবন কাসির)

অপ্রাপ্তবয়স্ক বা নাবালেগ শিশুদের নামাজ, রোজা ও আমলের সওয়াব পিতা–মাতা ও অভিভাবকেরা পাবেন। নাবালেগ শিশু রোজা রেখে ভেঙে ফেললে তার কাজা বা কাফফারা কিছুই লাগবে না। এতদঞ্চলে সাধারণত মেয়েরা ১১ থেকে ১৩ বছরে এবং ছেলেরা ১৩ থেকে ১৫ বছরে বালেগ বা সাবালক হয়; তখন থেকেই এদের নামাজ, রোজা ইত্যাদি ফরজ হয়। যদিও সাত বছর থেকে শিখন ও দশ বছর থেকে বাস্তব প্রশিক্ষণমূলক আমল শুরু করাতে হয়।

সন্তানাদি মহান স্রষ্টা আল্লাহপাকের পক্ষ থেকে আমানত। এ আমানতকে রক্ষা করতে হবে। সন্তানদের সঙ্গে এমন আচরণই করতে হবে, যা তার শারীরিক প্রবৃদ্ধির জন্য সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং সহায়ক। তাদের এমন শিক্ষাই দিতে হবে, যা তাদের মনন ও মানস গঠনে ফলপ্রসূ ভূমিকা রাখে। মানবজন্মের উদ্দেশ্যই হলো মহান স্রষ্টা আল্লাহকে পরিচয় করা। আজকে যারা শিশু, তারা একদিন বড় হবে, তাদের ওপর আল্লাহর বিধান মানার দায়িত্ব অর্পিত হবে। কোনো নিয়ম বা বিধান না জানলে মানা যায় না। তাই সন্তানদের এমন শিক্ষা দিয়ে গড়ে তুলতে হবে, যাতে সে আল্লাহর বিধান মেনে সিরাতে মুস্তাকিমের ওপর সহজে চলতে পারে। জেনে-বুঝে চলতে পারে, সহি-শুদ্ধভাবে আমল করতে পারে। তার না জানার দায় যেন তার পিতামাতা বা অন্য কারো ওপর চাপিয়ে দিতে না পারে। পিতামাতাকে দায়িত্বসচেতন থাকতে হবে। কারণ, সন্তানদের উপযুক্ত শিক্ষা দিয়ে গড়ে তোলার দায়িত্ব পিতামাতার বা অভিভাবকের। এজন্যে সন্তানকে ইসলামী-শিক্ষা অবশ্যই দিতে হবে। সেই সঙ্গে সন্তানাদির উন্নত চরিত্রগঠন, ভদ্রতা, শিষ্টাচার এবং ব্যবহারিক জীবনে আমলের অভ্যাস তৈরি করতে দীক্ষাও দিতে হবে। মহানবী সা. ইরশাদ করেন- কারো তার সন্তানকে আদব তথা শিষ্টাচার শিক্ষা দান করা একসা (একটি পরিমাপ) শস্য আল্লাহর রাস্তায় সদকা করা থেকেও উত্তম। (তিরমিযি শরীফ)। নবীজি সা. আরো ইরশাদ করেন- কোনো পিতা তার সন্তানকে ভালো আদব তথা শিষ্টাচার শিক্ষা দেয়া থেকে উত্তম কোনো পুরস্কার দিতে পারে না (তিরমিযি শরীফ)। নবীজি সা. আরো ইরশাদ করেন- তোমরা নিজ সন্তানদের বয়স সাত বছর হলে নামাযের নির্দেশ দান করো, দশ বছর বয়সে নামায না পড়লে শাস্তি দান করো এবং ঘুমানোর সময় তাদের বিছানা পৃথক করে দাও (আবু দাউদ শরীফ)।

মানবতার মহান শিক্ষক নবী কারীম সা. সন্তান জন্মের বহু আগ থেকেই ভালো ও নেক সন্তান কিভাবে জন্ম নেবে, কিভাবে তাদের প্রতিপালন করতে হবে, কিভাবে শিক্ষার পাশাপাশি দীক্ষাও দিতে হবে- এ ব্যাপারে মূল্যবান নির্দেশনা দান করেছেন।

প্রথম নির্দেশনা : সন্তান লাভ করার নিমিত্তে মানুষ যে বিয়ে করে, সে যেন দ্বীনদার ভালো মেয়েকে বিয়ে করে, কোনো বদদ্বীন, দুশ্চরিত্র মেয়েকে যেন বিয়ে না করে। ভদ্র, চরিত্রবান ও দ্বীনদার মেয়েকে যেন পাত্রী হিসেবে নির্বাচন করে। হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে- হযরত আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, নবী কারীম সা. ইরশাদ করেন- চারটি বৈশিষ্ট্যের মধ্য থেকে কোনো একটি বৈশিষ্ট্য দেখে মহিলাকে বিয়ে করা হয়। মহিলার ধন-সম্পদ দেখে, তার বংশমর্যাদা দেখে, তার রূপ দেখে কিংবা তার দ্বীনদারি দেখে। তুমি মহিলাকে তার দ্বীনদারি দেখে বিয়ে করো, জীবনে সুখী হতে পারবে (মিশকাত শরীফ) । এভাবে মেয়ের পিতামাতা তথা অভিভাবককে বলা হয়েছে, কোনো ফাসিক ফাজির ও দুশ্চরিত্র লোকের কাছে তোমার মেয়েকে বিবাহ দেবে না। বরং দ্বীনদার ও মোত্তাকি পরহেজগার লোকের নিকট বিয়ে দেবে। এমন লোকের কাছ থেকে প্রস্তাব এলে কোনো দ্বিধা না করে সাদরে সে প্রস্তাব গ্রহণ করবে। নবী কারীম সা. ইরশাদ করেন- এমন লোকের পক্ষ থেকে যদি তোমার মেয়ে বিয়ের প্রস্তাব আসে, যার দ্বীনদারি ও চরিত্রকে তুমি পছন্দ করো, তাহলে তার কাছে বিয়ে দিয়ে দাও। এটা যদি না করো, তাহলে জমিনে ফেতনা ও নানা বিপর্যয় দেখা দেবে (মিশকাত শরীফ)। নবীজির এসব নির্দেশনা ওপর আমল করে পিতামাতা দ্বীনদারি অবলম্বন করলে তাদের ঔরসে নেককার সন্তানাদি জন্ম নেবে।

দ্বিতীয় নির্দেশনা : সন্তান জন্মলাভ করার পর শরীর পরিচ্ছন্ন করে তার ডান কানে আযান ও বাম কানে ইকামাত দিতে হবে। আযানে প্রথমে চারবার "আল্লাহু আকবার" বলে বাচ্চার মন-মস্তিষ্কে এ কথা বসিয়ে দিতে হবে, দুনিয়াতে কারো শক্তি আল্লাহর শক্তি থেকে বেশি নয়। আল্লাহই সবচে' বড় শক্তিশালী, মহাপরাক্রান্ত এবং মাপ্রতাপান্বিত। তিনি বিদ্যমান। সদা সর্বদা ছিলেন, আছেন ও থাকবেন। তারপর দু'বার "আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" বলে আল্লাহর একত্ববাদের বাণী কানে পেঁৗছিয়ে তার অবচেতন মনের কাছে এ দাবি রাখা হবে, আল্লাহর একত্ববাদের প্রচার-প্রসারে কারো ভয়ে ভীত হওয়া যাবে না। অতঃপর দু'বার "আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ" বলার মাধ্যমে এমন পবিত্র ব্যক্তিত্বের রিসালাতের ঘোষণা দান করতে হবে, যার মাধ্যমে আমরা কুফুর ও শিরকের অন্ধকার থেকে বের হয়ে তাওহীদ ও ঈমানের আলোর ময়দানে পদার্পণ করেছি। আল্লাহর অস্তিত্ব, তার একত্ববাদ এবং নবীজির রিসালাত ঘোষণার পর দু'বার হাইয়্যা আলাস সালাহ বলে ইসলামের সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত নামাযের দাওয়াত দেয়া হবে। দু'বার হাইয়্যা আলাল ফালাহ বলে চিরস্থায়ী সফলতা যে নামাযের মধ্যেই নিহিত আছে, সেই নামাযের প্রতি পুনর্বার আহ্বান ব্যক্ত করা হবে। সবশেষে দু'বার"আল্লাহু আকবার এবং একবার ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ এর মাধ্যমে এ কথা বলা হবে, মুসলমানের জীবনে সফলতা আর কামিয়াবি তখনই আসবে, যদি জীবনের সূচনায় তাওহীদ অন্তরে বদ্ধমূল হয় এবং তাওহীদি বিশ্বাস নিয়ে নেক আমলের ওপর জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে।

তৃতীয় নির্দেশনা : কোনো বুযুর্গ আলেমকে দিয়ে তাহনিক করাবে। তাহনিক হলো- বাচ্চাকে কোনো বুযুর্গ আলেমের নিকট নিয়ে যাবে। তিনি বরকতের জন্য দোয়া করবেন এবং খেজুর চিবিয়ে নরম করে বাচ্চার মুখের তালুতে লাগিয়ে দেবেন, যাতে বাচ্চা চেটে চেটে নিঃশেষে খেয়ে নেয়। এভাবে সাহাবায়ে কেরামও নবীজিকে দিয়ে তাদের নবজাতকদের তাহনিক করাতেন এবং বরকতের জন্য দোয়া করাতেন। হযরত আয়েশা রাযি. বলেন- নবীজির কাছে বাচ্চাদের নিয়ে আসা হতো। তিনি তাদের বরকতের জন্য দোয়া করতেন এবং তাদেরকে তাহনীক করতেন। অর্থাৎ- খেজুর চিবিয়ে তাদের মুখের তালুতে লাগিয়ে দিতেন। (মিশকাত শরীফ)

চতুর্থ নির্দেশনা : নবীজি সা. ইরশাদ করেন- যার ঘরে বাচ্চা জন্মলাভ করবে, সে যেন বাচ্চার সুন্দর নাম রাখে এবং তাকে আদব তথা শিষ্টাচার শিক্ষা দেয়। (মিশকাত শরীফ) বাচ্চার জন্য অর্থপূর্ণ ভালো নাম রাখতে হবে। যাতে এ নামে বাচ্চার বরকত হয় এবং তার কামিয়াবির কারণ হয়। হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে- আল্লাহ নিকট সবচে' পছন্দনীয় নাম হলো আব্দুল্লাহ ও আব্দুর রহমান। অন্য হাদীসে বর্ণিত হয়েছে- তোমরা আম্বিয়ায়ে কেরামের নামে তোমাদের বাচ্চাদের নাম রাখো।

পঞ্চম নির্দেশনা : বাচ্চার যখন মুখ ফুটবে, কথা বলতে শিখবে, তখন তাকে কালেমার তালিম দিবে। ইসলামী জ্ঞানে সমৃদ্ধ ভালো সচ্চরিত্রবান শিক্ষকের মাধ্যমে ধর্মীয় শিক্ষা দান করবে। সময় মত ধর্মীয় বিদ্যালয়ে ভর্তি করাবে। যত্নসহকারে প্রয়োজনীয় ইসলামিশিক্ষা দান করবে। সে মোতাবেক আমল করে কি-না, খেয়াল রাখবে। আমল সুন্দর করার জন্য নানা কৌশল অবলম্বন করবে, প্রয়োজনে চাপ সৃষ্টি করবে।

প্রয়োজনীয় ইসলামী শিক্ষা দান করার পাশাপাশি জাগতিক শিক্ষাও দান করবে। দুনিয়ার লাইনে যত বড় শিক্ষিতই হোক, কোনো অসুবিধে নেই। বরং এটাও কাম্য। তবে ধর্মীয় শিক্ষা আরো বেশি কাঙ্ক্ষিত, এটাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি জাগতিক শিক্ষা- এটা কল্যাণকর। আর ধর্মীয়শিক্ষা বিবর্জিত জাগতিক শিক্ষা- সকল অকল্যাণ ও পাপাচারের প্রতিভূ। সন্তানকে জাগতিক শিক্ষা দেবার জন্য অর্থ-বিত্ত খরচ করলেন, ইসলামি শিক্ষা থেকে বঞ্চিত রাখলেন- এটা সন্তানের জন্য কল্যাণকামিতা নয়। এটা বাচ্চার সঙ্গে দুশমনি, নিজের সঙ্গেও দুশমনি। এর জন্য আল্লাহর দরবারে জবাবদেহি করতে হবে। দোষী সাব্যস্ত হতে হবে। মহনবী সা. ইরশাদ করেন- যে ব্যক্তি দুনিয়াকে ভালোবেসে অগ্রাধিকার দেয়, সে আখেরাতের ক্ষতি করে। আর যে ব্যক্তি আখেরাতকে ভালোবেসে অগ্রাধিকার দেয়, সে তার দুনিয়ার ক্ষতি করে। সুতরাং ক্ষণস্থায়ী জিনিসের ওপর চিরস্থায়ী জিনিসকে অগ্রাধিকার দাও। (রাওয়াহু আহমদ) কোনো তত্ত্বজ্ঞানী বলেছেন- "মানুষের বন্ধু এবং কল্যাণকামী হলো সেই ব্যক্তি, যে তার আখেরাতকে সুন্দর ও শান্তিময় করার চেষ্টা করে; যদিও এতে তার দুনিয়ার কিছু ক্ষতি হয়ে যায়। আর মানুষের শত্রু হলো সেই ব্যক্তি, যে তার আখেরাতের ক্ষতি করার চেষ্টা করে; যদিও এতে তার দুনিয়ার কিছু ফায়েদা হয়ে যায়। (মাজালিসুল আবরার)

পিতামাতা যদি সত্যিই সন্তানের কল্যাণকামী হয়ে থাকেন, অবশ্যই সন্তানের ইসলামি শিক্ষাদানকে অগ্রাধিকার দান করবেন। কারণ, এতে আখেরাতে নিজেরাও বঁাচবেন, সন্তানাদিও বঁাচবে। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন- দোজখের আগুন থেকে তোমরা নিজেরাও বঁাচো এবং তোমাদের পরিবারবর্গকেও বঁাচাও। (সূরা তাহরীম, আয়াত-৭)

স্মরণ রাখতে হবে, সন্তান বিগড়ে গিয়ে বদদ্বীন হওয়ার সমস্ত জিম্মাদারি পিতামাতা এবং অভিভাবকের ওপর বর্তাবে। সন্তানকে যে রকম শিক্ষা-দীক্ষা দেয়া হবে, সে সেভাবেই গড়ে ওঠবে। নবী কারীম সা. ইরশাদ করেন- প্রতিটি সন্তানই ফিতরাত তথা ইসলাম গ্রহণ করার পূর্ণ যোগ্যতা নিয়ে জন্মলাভ করে। কিন্তু তার পিতামাতা শিক্ষা-দীক্ষার মাধ্যমে তাকে ইহুদি, খ্রিস্টান বা অগ্নিপূজক বানায়। (মিশকাত শরীফ) বর্ণিত হাদীস দ্বারা বুঝা যায়- সন্তানের মন-মানস, চরিত্র-অভ্যাস, লাইফস্টাইল ও ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি পিতামাতা প্রদত্ত শিক্ষা-দীক্ষা দ্বারা প্রভাবিত হয়। পিতামাতা যেভাবে প্রতিপালন করবেন- যে ধরনের শিক্ষা-দীক্ষা দান করবেন, সন্তান সেভাবেই বেড়ে ওঠবে। কিয়ামত দিবসে পিতাকে তার সন্তানাদি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে- তুমি সন্তানকে কী শিক্ষা দিয়েছিলে এবং কী ধরনের ভদ্রতা ও শিষ্টাচার শিখিয়েছিলে?

সন্তানের শারীরিক প্রতিপালনের পর সবচেয়ে বড় কর্তব্য হলো, সন্তানকে এমন যোগ্য করে গড়ে তোলা- যাতে সে আল্লাহর কাছে সম্মানিত হয় এবং জাহান্নাম থেকে বঁাচতে পারে। তাকে এমন শিক্ষা-দীক্ষা দান করা- যাতে সে নবীজির আদর্শ অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করতে অভ্যস্ত হয়ে যায়। নামায-রোযা ইত্যাদির পাবন্দি করে। যাতে তার মনে আখেরাতের ফিকির পয়দা হয়। কোনো অবস্থায়ই ইসলামিশিক্ষাকে অবজ্ঞা করা চলবে না। যথাযত গুরুত্বসহকারে ইসলামিশিক্ষা দিতে হবে। সহি-শুদ্ধভাবে কোরআন তেলাওয়াত শেখাতে হবে। কারণ, হাদীসে বর্ণিত হয়েছে-প্রয়োজন পরিমাণ দ্বীনী ইলিম শিক্ষা করা প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর ওপর ফরয। (ইবনে মাজাহ) কোনোরকমে নাজেরা কোরআন পড়িয়ে দিলেই কিংবা ‘তালিমুল ইসলাম’ জাতীয় ছোট কোনো কিতাব পড়িয়ে দিলেই দ্বীনীশিক্ষা অর্জন করার ফারযিয়্যাত আদায় হবে না। বরং বালেগ হওয়া থেকে নিয়ে মৃত্যু পর্যন্ত তাকে যা যা আমল করতে হবে, যে যে বিশ্বাস পোষণ করতে হবে এবং যা যা পরিহার করে চলতে হবে- এসব সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন করতে যে পরিমাণ ইলমের প্রয়োজন, তা অর্জন করা ফরয।

পিতামাতা, অভিভাবক বা রাষ্ট্র যদি নব প্রজন্মকে ইসলামিশিক্ষা থেকে মূর্খ রাখেন, নামায-রোযা ইত্যাদি আমল-বন্দেগিতে অভ্যস্ত করে গড়ে না তোলেন, ইসলামী আদর্শ মোতাবেক জীবন পরিচালনা করার অভ্যাসি না বানান এবং জাহান্নাম থেকে বেঁচে জান্নাতে যাওয়ার রাস্তা দেখিয়ে না দেন- তাহলে কিয়ামত দিবসে এ নব প্রজন্মই তাদের বিরুদ্ধে আল্লাহর আদালতে বিচার দায়ের করবে। তখন কী হবে? জীবন ও জগতের স্বার্থে, আমাদের স্বার্থে এ ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা করা উচিৎ। আল্লাহ সকলকে বুঝবার তাওফিক দান করুন।

লেখক : মুহাদ্দিস, ফরিদগঞ্জ মজিদিয়া কামিল মাদ্রাসা, খতীব, কালেক্টরেট জামে মসজিদ, চঁাদপুর, পি.এইচ.ডি গবেষক (আরবী) রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

তাহাজ্জুদ নামাজের গুরুত্ব

মধ্যরাতে যখন লোকেরা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, পূণ্যার্থী তখন ঘুম থেকে জেগে ইবাদত-বন্দেগি করেন। সুবহে সাদিকের আগ পর্যন্ত তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করেন। সুবহে সাদিক হয়ে গেলে এ নামাজ আর পড়া যায় না। যদি রাত দ্বিপ্রহরের পর ঘুম থেকে জেগে ওঠার সম্ভাবনা না থাকে, তাহলে এশার নামাজের পর এবং বিতরের আগে তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করতে হয়। তবে রাতের শেষাংশে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়লে তাতে সওয়াব বেশি।

তাহাজ্জুদের মাধ্যমে বান্দার সঙ্গে আল্লাহর সরাসরি সম্পর্ক স্থাপিত হয়। রাতের শেষ প্রহরে আল্লাহ বান্দাদের প্রতি তাদের কাজের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনার আহ্বান জানান।

আবু হুরাইরা (রা.) বর্ণনা করেছেন যে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘প্রতি রাতের শেষ এক-তৃতীয়াংশে আল্লাহ জমিনের কাছাকাছি আসমানে নেমে এসে তঁার বান্দাদের আহ্বান জানিয়ে বলেন, কে আছ যে আমার কাছে প্রার্থনা করবে, যাতে আমি তার প্রার্থনার জবাব দিতে পারি? কে আছ যে আমার কাছে কিছু চাইবে, যাতে আমি তাকে তার প্রার্থিত বস্তু দিতে পারি? কে আছ যে আমার কাছে ক্ষমা চাইবে, যাতে আমি তাকে ক্ষমা করতে পারি?’ (বুখারি ও মুসলিম)।

ছবি : ১২

কোরআন-সুন্নাহর আলোকে ইয়া রাসূলাল্লাহ (দঃ) বলা কি জায়েজ?

আলহাজ্ব মাও. মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন আলকাদেরী

প্রিয় নবীজি (সাঃ) কে দূর বা কাছ থেকে আহ্বান করা বৈধ তঁার পবিত্র ইহ-লৌকিক জীবনে ও তঁার ওফাতের পরেও। তাই একজনে ইয়া রাসুলাল্লাহ (দঃ)বলে আহ্বান করুক, কিংবা সমষ্টিগত মিলে সমবেত কণ্ঠে ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ (দঃ) বলে স্লোগান দিক উভয় ক্ষেত্রে এ আহ্বান বৈধ। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লামকে আহ্বান করার স্বপক্ষে প্রমাণাদি কুরআনুল করীম, হাদিস শরীফ, ফেরেশতা ও সাহাবিদের কর্মকাণ্ড ও উম্মতের বিবিধ কার্যাবলিতে সুস্পষ্টরূপে বিদ্যমান রয়েছে। কুরআন করীমে অনেক জায়গা আছে।

হে নবী, হে রাসূল, ওহে কম্বলাবৃত বন্ধু, ওহে চাদরাবৃত বন্ধু ইত্যাদি বলে। দেখা যায়, উল্লেখিত আয়াত সমূহে তাকে আহ্বান করা হয়েছে। অন্যান্য নবীদেরকে অবশ্য তাদের নাম ধরেই সম্বোধন করেছে কুরআনুল করীম। যেমন : হে মুছা, হে ঈসা, হে ইয়াহয়া, হে ইব্রাহীম, হে আদম ইত্যাদি (আলাইহিমুস সালাম)। কিন্তু মাহবুব (আলাইহিস সালাম)কে আহ্বান করেছে প্রিয় উপাধিসমূহে ভূষিত করে। কবির ভাষায় : নবীগণের জনক হযরত আদম (আঃ) কে ডাকা হয়েছে ইয়া আদামু বলে, আর মুহম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাহে ওয়াসাল্লাম)কে ডাকা হয়েছে ওহে নবী উপাধিতে।

কুরআন করীম বরঞ্চ সাধারণ মুসলমানদেরকেও এভাবে আহ্বান করেছে-হে ঈমানদারগণ। আর তঁাদেরকে নির্দেশ দিয়েছে-মাহবুব আলাইহিস সালামকে আহ্বান করো সম্মানসূচক উপাধিসমূহের মাধ্যমে। কুরআন ইরশাদ করছে-তোমরা রাসুলকে এমনভাবে ডেকো না, যেভাবে তোমরা একে অপরকে ডাক। এখানে তঁাকে ডাকতে নিষেধ করা হয়নি। বরং অন্যান্যদেরকে ডাকার মত না ডাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কুরআন অন্যত্র ইরশাদ করেছে-তাদেরকে তাদের পিতার সাথে সম্পর্ক যুক্ত করে ডাকা)। এ আয়াতে এ কথাটির অনুমতি দেয়া হয়েছে যে, যায়েদ ইবনে হরিছা (রাঃ)কে ইবনে হারিছা অর্থাৎ হারিছা এর পুত্র বলে ডাক, কিন্তু তঁাকে ইবনে রাসুলাল্লাহ বা রাসুলুল্লাহর পুত্র বলে ডেকো না। এরূপ কাফিরদেরকেও অনুমতি দেয়া হয়েছে তাদের সাহায্যার্থে তাদের সাহায্যকারীদেরকে ডাকার-অর্থাৎ তোমরা যদি নিজের দাবীর ব্যাপারে সত্যবাদী হও, তা’হলে আল্লাহর সাথে সম্পর্কহীন তোমাদের অন্যান্য সাহায্যকারীদেরকে ডেকো।

‘মিশকাত’ শরীফের প্রথম হাদিছে আছে, হযরত জিব্রাইল (আঃ) আরয করছিলেন : ‘হে মুহাম্মদ, আমাকে ইসলাম সম্পর্কে অবহিত করুন। এখানে আহ্বান করার বিধান পাওয়া গেল। সে একই মিশকাত শরীফের ‘ওফাতুন্নবী’ শীর্ষক অধ্যায়ে আছে, হুযুর(আলাইহিস সালাম) এর ওফাতের সময় মলকুল মউত আরয করছিলেন : হে মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম), আল্লাহ তা’আলা আমাকে আপনার নিকট পাঠিয়েছ্নে। দেখুন, এখানেও ইয়া মুহাম্মদ বলে আহ্বান করা হয়েছে। ইবনে মাজা শরীফের সালাতুল ‘হাজত’ শীর্ষক অধ্যায়ে হযরত উছমান ইবনে হানীফ (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, এক অন্ধ ব্যক্তি হুযুর (আলাইহিস সালাম) এর মহান দরবারে উপস্থিত হয়ে অন্ধত্ব দূরীকরণার্থে দোয়া প্রার্থী হয়েছিলেন, হুযুর (আলাইহিস সালাম) তাকে শিখিয়ে দিলেন এ দু’আটি : (হে আল্লাহ, আমি তোমার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করছি রহমতের নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) মারফত তোমার দিকে মনোনিবেশ করছি। হে মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়ামাল্লাম) আমি আপনার মাধ্যমে আপন প্রতিপালকের দিকে আমার এ উদ্দেশ্য (অন্ধত্ব মোচন) পূরণ করার নিমিত্তে মনোনিবেশ করলাম যাতে আপনি আমার এ উদ্দেশ্য পূরণ করে দিন। হে আল্লাহ, আমার অনুকূলে হুযুর (আলাইহিস সালাম) এর সুপারিশ কবুল করুন।) এ হাদিছটির বিশুদ্ধতা প্রসঙ্গে হযরত আবু ইসহাক (রহঃ) বলেছেন এ হাদিছটি বিশুদ্ধ (সহীহ)।

লক্ষ করুন দু’আটি কিয়ামত পর্যন্ত ধরাপৃষ্ঠে আগমনকারী মুসলমানদের জন্য শিক্ষার বিষয় বস্তুতে পরিণত হল। এখানে হুযুর (আলাইহিস সালাম)কে আহ্বান করা হয়েছে এবং তার সাহায্য ও প্রার্থনা করা হয়েছে।

ফতওয়ায়ে আলমগীর ১ম খণ্ডের কিতাবুল হজ্জ্ব এর আদাবু যিয়ারতে কবরিন্নবী আলাইহিস সালাম শীর্ষক বর্ণনায় উল্লেখিত আছে : অতঃপর নবীর রওযা যিয়ারতকারী ব্যক্তি বলবে-হে নবী, আপনার প্রতি আমার সালাম, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি আল্লাহর রাসুল।

এর পর লিখা হয়েছে : যিয়ারতকারী এর পর বলবে ওহে রাসুলাল্লাহর সত্যিকার প্রতিনিধি, আপনার প্রতি সালাম ওহে রাসুলের গুহার সাথী (ছউর নামক পাহাড়ের গুহায় সহাবস্থানকারী) আপনার প্রতি আমার সালাম এর পর আরও লিখা হয়েছে : যিয়ারতকারী তারপর বলবে ওহে মুসলমানদের আমীর আপনার প্রতি সালাম ওহে মূর্তি নিধনকারী আপনার প্রতি সালাম, (রাদিয়াল্লাহু আনহুম।)। এখানে দেখুন হুযুর (আলাইহিস সালাম)কে ডাকা হয়েছে এবং তারই পার্শ্বদেশে শায়িত হযরত সিদ্দীকি ও ফারুক (রাঃ)কেও ডাকার বিধান রাখা হয়েছে। এ উম্মতেরক্রেষ্ঠত্বের মর্যাদায় আসীন ব্যক্তিবর্গ আওলিয়ায়ে মিল্লাত মশায়েখ ও বুযুর্গানে দ্বীন ও তাদের দুআ ও নির্ধারিত পাঠ্য ওয়াযীফাসমূহেও ইয়া রাসুলাল্লাহ বলে আহ্বান করে থাকেন। যেমন কসীদায়ে বোর্দা শরীফে আছে : হে সৃষ্ট জীবের সর্বশ্রেষ্ঠ ও সম্মানিত সত্ত্বা আপনি ছাড়া আমার এমন কেউ নেই যার কাছে ব্যাপক বিপদাপদের সময় আশ্রয় নিতে পারি।

হযরত ইমাম যয়নুল আবেদীন (রহঃ) স্বীয় কসীদায় নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)কে আহ্বান করেছেন এভাবেঃ-হে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের রহমতের নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) সেই যয়নুল আবেদীনের সাহায্যে এগিয়ে আসুন যে, জালিমদের ভিড়ের মধ্যে তাদের হাতে বন্দী হয়ে কাল যাপন করছে।

স্বনামধন্য আল্লামা জামী (রহঃ) বলেছেন-আপনার বিরহ বেদনায় সৃষ্টি জগতের প্রাণে ওষ্ঠাগত। হে আল্লাহর নবী আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করুন দয়ার ভান্ডার খুলে দিন। কেন, আপনি সারা বিশ্বের জন্য রহমতস্বরূপ নন কি? আমাদের কত বঞ্চিত ও পাপীদের প্রতি এত বিমুখ হয়ে রয়েছেন কেন?

হযরত ইমাম আবু হানীফা (রহঃ) স্বীয় কসীদায়ে নু’মানে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)কে আহ্বান করেছেন এভাবে-ওহে সর্দারদের সর্দার অন্তরে দৃঢ় আশা নিয়ে আপনার কাছে এসেছি আপনার সন্তুষ্টির প্রত্যাশী হয়েছি এবং নিজে আপনার আশ্রয়ে সমর্পণ করছি।

এসব কবিতার স্তবকসমূহ হুযুর (আলাইহিস সালাম)কে আহ্বান করা হয়েছে তার সাহায্য কামনা করা হয়েছে। এ আহ্বান করা হয়েছে দূর থেকে তঁার ওফতের পর। সকল মুসলমান নামাযে বলেনঃ اَلسَّلَامُ عَلَيْكَ اَيُّهَا النَّبِىُّ وَرَحْمَةُ اللهِ وَبَرْكَاتُهُ ওহে নবী! আপনার প্রতি সালাম আল্লাহর রহমত ও বরকতসমূহ আপনার উপর বর্ষিত হোক! নামাযে তঁাকে এভাবে আহ্বান করা ওয়াজিব বা আবশ্যিক কর্তব্য। এ আততাহিয়াতু প্রসঙ্গে হাযির-নাযির এ আলোচনায় সুবিখ্যাত ফতওয়ায়ে শামী ও আশআতুল লমআত গ্রন্থদ্বয়ের উদ্ধৃতি সমূহ আগেই পেশ করেছি।

এতক্ষণ পর্যন্ত পর্যালোচনা করা হল এককভাবে ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ’ বলা প্রসঙ্গে। যদি অনেক লোক একত্রে সমবেত হয়ে সমবেত কণ্ঠে ‘নারায়ে-রিসালাত’ ধ্বনি তোলে, তা’হলে তা’ও জায়েয। কারণ, যখন এককভাবে ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ’ বলা জায়েয, তখন এক সাথে সবাই মিলে বলাও জায়েয হবে বৈকি। কয়কটি ‘মুবাহ’ (যে সব কাজ করলে কোন ছওয়াব নেই, না করলেও কোন পাপ নেই, সে সব কাজ মুবাহ।) কাজকে একত্রিত করলে সমষ্টিও মুবাহ বলে গণ্য হবে। যেমন-বিরানী হালাল। কেননা তা হচ্ছে কয়কটি হালাল দ্রব্যাদির সমষ্টি মাত্র।

অধিকন্তু, সবাই মিলে সমকেত কন্ঠে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম ) কে আহ্বান করার স্বপক্ষে সুস্পষ্ট প্রমাণও রয়েছে।

মুসলিম শরীফ দ্বিতীয় খণ্ডের শেষে ‘হাদিছুল হিজরত’ শিরোনামের অধ্যায়ে হযরত বরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, হুযুর (আলাইহিস সালাম) যখন মক্কা ত্যাগ করে মদীনা শরীফের প্রান্ত সীমায় প্রবেশ করলেন, তখন তঁাকে কিরুপে স্বাগত জানানো হয়েছিল তার বিবরণ হাদিছের ভাষায় শুনুন : তখন মদীনার নারী পুরুষ ঘরের ছাদসমূহের উপর আরোহণ করেন, ছোট ছোট ছেলে ও ক্রীতদাসগণ মদীনার অলিতে গলিতে ছড়িয়ে পড়েন, সবাই ‘ইয়া মুহাম্মদ’ ইয়া রাসুলাল্লাহ ’ ধ্বনিতে আকাশ-বাতাস মুখরিত করে তোলেন। মুসলিম শরীফের এ হাদিছে নারায়ে রিসালাত ধ্বনি তোলার সুস্পষ্ট প্রমাণ বিধৃত। জানা গেল যে, সমস্ত সাহাবায়ে কিরাম নারায়ে রিসালতের ধ্বনি তুলতেন। এ হাদিছে হিজরতে একথাও আছে যে, সাহাবায়ে কেরাম জুলুসও বের করেছেন। হুযুর (আলাইহিস সালাম) যখনই কোন সফর থেকে মদীনা শরীফে ফিরে আসতেন তখন মদীনা বাসীগণ তাকে প্রাণঢালা সম্বর্ধনা জানাতেন এবং তঁার সম্মানার্থে ‘জুলুস’ বের করতেন। (মিশকাত ও বুখারী প্রভৃতি হাদিছগ্রন্থ দ্রষ্টব্য)।

আলহাজ্ব মাওলানা মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন আলকাদেরী : অধ্যক্ষ, জামেয়ো অদুদিয়া সুন্নিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদরাসা, হাটহাজারী পৌরসভা, চট্টগ্রাম।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়