প্রকাশ : ১১ মে ২০২৬, ০৯:৩৮
সনাক-চাঁদপুরের অ্যাকটিভ সিটিজেন গ্রুপের ব্যতিক্রমী উদ্যোগে বদলে গেছে স্বাস্থ্যসেবার মান
মৈশাদী এবং রামপুর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর উদ্যোগ ও সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) চাঁদপুরের অনুপ্রেরণায় গঠিত অ্যাকটিভ সিটিজেন গ্রুপ (এসিজি)-এর ব্যতিক্রমী উদ্যোগে বদলে গেছে দুটো ইউনিয়নের স্বাস্থ্যসেবার মান। সম্প্রতি চাঁদপুর সদর উপজেলার মৈশাদী ইউনিয়ন এবং রামপুর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র-কেন্দ্রিক এসিজি ওই দুটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সেবার মানোন্নয়নে ব্যাপক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছে। ফলে উপকৃত হচ্ছেন সেবাগ্রহীতারা। এসিজির এমন কার্যক্রম ইতোমধ্যে প্রশংসিত হয়েছে।
সনাক-চাঁদপুর সূত্রে জানা গেছে, মৈশাদী ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ-কেন্দ্রিক এসিজির উদ্যোগে উক্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে একটি নাগরিক সনদ প্রদানসহ একটি দৈনিক ঔষধের তালিকা স্থাপন করা হয়েছে। ফলে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে আসা রোগীরা সহজেই তাদের প্রাপ্র্য ওষুধ সম্পর্কে জানতে পারছেন। এছাড়া রোগীদের জন্য একটি প্রেশার মাপার মেশিন, সদর উপজেলা পরিষদের সহযোগিতায় একটি নেবুলাইজার মেশিন, ২০টি চেয়ার, অফিস রুমে টিবিল ও অন্যান্য উপকরণও দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি এসিজির পরামর্শে স্থাপন করা হয়েছে ব্রেস্ট ফিডিং কর্ণার। টানানো হয়েছে ‘এখানে টাকার বিনিময়ে সেবা প্রদান করা হয় না’ লেখা সম্বলিত বোর্ড। একইভাবে রামপুর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রিক এসিজি ক্লিনিকে ব্রেস্ট ফিডিং কর্ণার, র্যাম্পসহ বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কাজ করেছে। ক্লিনিকের সেবার মানোন্নয়নে বেশ কিছু উদ্যোগও গ্রহণ করেছে এসিজিটি। এসিজির এমন উদ্যোগের ফলে ক্লিনিকের সেবার মানোন্নয়ন হয়েছে, বেড়েছে স্বচ্ছতা, বৃদ্ধি পেয়েছে জনসচেতনতা এবং মানুষকে আরও আত্মবিশ্বাসের সাথে স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে সহায়তা করেছে।
জানা গেছে, এসিজি গ্রুপের সদস্যরা স্থানীয় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সাথে বিভিন্ন এলাকায় কমিউনিটি অ্যাকশন মিটিং আয়োজন করে। সাধারণ জনগণ ক্লিনিকের সেবা বিষয়ে বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরেন এবং স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে বিভিন্ন পরামর্শ দেন।
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে মৈশাদী স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। প্রতিদিন বহু মানুষ চিকিৎসা ও ঔষধের জন্য এই কেন্দ্রে আসেন। তবে, এসিজি-র কার্যক্রম শুরুর দিকে দেখা যায় কেন্দ্রে কোনো হালনাগাদ নাগরিক সনদ প্রদর্শিত ছিল না, সেবাগ্রহীতাদের জন্য কোনো দৈনিক ঔষধের তালিকা ছিলো না, বসার জন্য কোন চেয়ার-টেবিল ছিলো না, কোন ব্রেস্ট ফিডিং কর্ণার ছিলো না, প্রেশার মাপার মেশিন ও নেবুলাইজার মেশিন ছিলো না। এই ঘাটতির কারণে, স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণকারীরা জানতেন না যে তারা কোন কোন সেবা পাওয়ার অধিকারী বা কোন ঔষধগুলো পাওয়া যায়। তথ্যের এই অভাব কখনও কখনও মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি, অসন্তোষ এবং অবিশ্বাসের সৃষ্টি হতো।
যে কোনো পরিষেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য নাগরিক সনদ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। এটি জনগণকে প্রদত্ত পরিষেবার ধরন, সেই পরিষেবাগুলো পাওয়ার প্রক্রিয়া এবং পরিষেবা প্রদানকারী ও গ্রহীতা উভয়ের দায়িত্ব সম্পর্কে স্পষ্টভাবে অবহিত করে। অন্যদিকে, একটি দৈনিক ওষুধের তালিকা জনগণকে বুঝতে সাহায্য করে যে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কোন ওষুধগুলো নিয়মিতভাবে পাওয়া যায়। ওষুধের সরবরাহ সীমিত থাকলে এটি পরিষেবা প্রদানকারীদের উপর অপ্রয়োজনীয় চাপ কমাতেও সাহায্য করে এবং একটি স্বচ্ছ ও ন্যায্য পরিষেবা পরিবেশ তৈরিতে সহায়তা করে। সম্মিলিতভাবে, এই উপকরণগুলো পরিষেবা প্রদানকারী এবং সম্প্রদায়ের মধ্যে আস্থা তৈরিতে অবদান রাখে।
এই উপকরণগুলোর গুরুত্ব অনুধাবন করে, এসিজি গ্রুপ সমস্যাগুলো সমাধানে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ ও চাঁদপুর পরিবার পরিকল্পনা কর্তৃপক্ষের সাথে বিভিন্ন সময়ে অ্যাডভোকেসি সভার আয়োজন করে। সভায় এসিজির সদ্যস্যরা বিষয়গুলো উত্থাপন করে এবং সমাধানের উদ্যোগ গ্রহণ করে। কর্তৃপক্ষ তাঁদের সীমাবদ্ধতার কারণ পর্যায়ক্রমে সমস্যগুলো সমাধানের উদ্যোগ গ্রহণ করবেন বলে জানান। তবে, তারা এ সকল সমস্যাগুলো সমাধান করার জন্য এসিজির সহযোগিতা কামনা করেন।
স্বাস্থ্যকেন্দ্রে একটি নাগরিক সনদ, দৈনিক ওষুধের তালিকাও প্রস্তুত ও অন্যান্য উপকরণগুলো কেন্দ্রের ভেতরে প্রদর্শন করা হয়। এই উদ্যোগের ফলে, স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সেবা ও পরিবেশ আরও স্বচ্ছ এবং জনবান্ধব হয়ে উঠেছে। সেবাগ্রহীতারা এখন স্পষ্টভাবে বুঝতে পারেন কী কী সেবা ক্লিনিকে পাওয়া যাচ্ছে এবং তারা কোন কোন ওষুধ গ্রহণ করতে পারবেন। এর ফলে বিভ্রান্তি কমেছে এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা বেড়েছে। একই সাথে, সেবা প্রদানকারীরা অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন বা চাপের সম্মুখীন না হয়ে আরও সাবলীলভাবে সেবা প্রদান করতে পারছেন।
স্বাস্থ্যকেন্দ্রের এসএসিএমও এবং এফডব্লিউ-ভি জানিয়েছেন যে, এই তথ্যের সহজলভ্যতা রোগীদের সাথে যোগাযোগকে সহজ করেছে এবং সার্বিকভাবে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের মান উন্নত করেছে।
জেলা পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের সাথে সনাকের অ্যাডভোকেসি সভা জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. মোস্তফা কামাল বলেন, সনাকের এসিজি খুবই দক্ষতার সাথে তাদের কার্যক্রগুলো বাস্তবায়ন করছে। এসিজির কার্যক্রমের ফলে আমরা অনেক সমৃদ্ধ হয়েছি। এজন্যে তাঁদেরকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
তিনি পরিবার পরিকল্পনা সেবাখাতকে আরও বেশি কার্যকর করার জন্যে সনাকের সাথে সহযোগিতার ভিত্তিতে কাজ করার আশাবাদ ব্যক্ত করেন। আমরা আশা করছি পর্যায়ক্রমে সনাক এসিজি গ্রুপের চিহ্নিত সমস্যাগুলো পর্যায়ক্রমে সমাধান করা হবে।
তিনি বলেন, মৈশাদী ও রামপুর ইউনিয়নের যে সমস্যা ও পরামর্শগুলো উত্থাপিত হয়েছে, তা উপজেলার মাসিক মিটিংগুলোতে সবাইকে অবহিত করা হবে। কোন ইউনিয়নে যাতে এ ধরনের কোন সমস্যা না থাকে সে ব্যাপারে সবাইকে সচেতন করা হবে এবং চিঠির মাধ্যমে নির্দেশনা দেওয়া হবে।
ক্লিনিকের সেবাগুলো বিষয়ে সেবাগ্রহীতাদের সাথে আলোচনা করলে তাঁরা জানান, আগে আমরা জানতাম না যে আমাদের কোন কোন সেবা বা ওষুধ পাওয়ার কথা। এখন আমরা স্পষ্টভাবে তথ্য দেখতে পাই এবং আরও বেশি আত্মবিশ্বাসের সাথে স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করতে পারি।
এই সাফল্যের জন্য এসিজি সত্যই প্রশংসার দাবিদার। এসিজির সহযোগিতার ফলে নাগরিক এবং কর্তৃপক্ষের মধ্যে সহযোগিতার মাধ্যমে পরিচালিত একটি সহজ ও স্বল্প খরচের উদ্যোগ জনসেবা প্রদানে অর্থপূর্ণ ও টেকসই উন্নতি আনতে পারে।






