প্রকাশ : ০১ জুন ২০২৪, ০০:০০
আকিব শিকদারের কবিতা

প্রথম পরিচয়
সেলিম ভাই, আপনার জন্য আমার ধাঁধাঁ, আচ্ছা বলুন তো...
আমাদের প্রথম দেখাটা কখন কোথায় হয়েছিল?
মুখ কাচুমাচু করার কিছু নেই, জবাব আমিই বলি-
এগারোতম ছড়া উৎসবে আপনার হাতে মাউথপিস, আমার হাতে
একটা চিক্কন কাগজ, হিজিবিজি কাটাকাটি সমেত কী সব লিখা।
আপনার মাথার গেরুয়া হ্যাটটা
বাঁ হাতে ঠিক করে নিয়ে বললেন,-‘এবার স্বরচিত
কবিতা পাঠ করতে আসছে...’
হ্যাঁ, প্রথম একবার আটকে গিয়েছিলেন, তারপর ভুলের মতোই
শুনালেন সবাইকে আমার নাম। আমি তখনও অর্বাচীন এক আঁতেল-
কবিতাপত্র হাতে ঠকঠক কাঁপছি এবং ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কাঁশিতে
সাফ করছি গলা।
সামনে অজস্র শ্রোতা, আমি কবিতা পাঠ
শুরু করলাম। কেউ কান চুলকায়, কেউ হাত চুলকায়, কেউ মাথার চুলে
আঙুল বোলাতে বোলাতে পায়ের জুতা ঠিক করে। আবার কেউ কেউ
ভ্র¤œয়ের পাশে রাজ্যের যন্ত্রণা নিয়ে কুচকানো কপালে তাকিয়ে থাকে
আমার দিকে, তাকিয়ে থাকতে হবে-
তাই হয়তো তাকিয়ে থাকা।
মনে মনে ভাবি, কবিতা নির্বাচনে
ভুল করলাম না তো...! প্রেমের কবিতা হলে
ভালো হতো, কিংবা হাসির ছড়া। চোখ বন্ধ করে
কাঠের পুতুলের মতো অনড় বসে শুনতো সবাই এক্কেবারে প্রত্নযুগের
কালো পাথরের মূর্তি যেমন; তারপর হাসতে হাসতে
পড়তো গড়িয়ে এদিক ওদিক।
আমার যে প্রেমিকা, আমি যার বাড়ির পথে যাবার বেলায়
খোলা জানালায় কমসে কম তিনবার চোখ রাখি, তাকে উদ্দেশ্য করে
দাঁত কটমটিয়ে বললামণ্ড‘অন্তত তুমি তোমার
ওড়না ধরে টানাটানি বন্ধ করো, অনুরোধ করি, আমার প্রতিভাকে
মাঠে মরতে দিও না। আমার অপমান তো তোমারও অপমান।’
একজোড়া জালালী কবুতর হাততালি দেওয়ার মতো শব্দে
উড়ে গেল হলরুমের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে, কারও দৃষ্টি
গেলো না সে দিকে।
একটা শিশু দেয়ালের লেজকাটা টিকটিকিটাকে
তাড়া করতে গিয়ে ছুঁড়ে মারলো হাতের বাঁশি, সেদিকে দিলো না
মনোযোগ কেউ।
ছোট বেলায় চোখে কাঁচপোকা পরে যেমন জল ঝরছিল
তেমনি টলমল করে উঠলো আমার চোখ। সবার দৃষ্টি
এবার আমার দিকে, শুধুই আমার দিকে...
আমি সেলাই কলের নিরবিচ্ছিন্ন ঘূর্ণয়মান চাকার মতো
মাইক ফাটিয়ে অনর্গল বলে গেলামণ্ড
‘হে মাটি... হে স্বদেশ... হে মায়ের অশ্র¤œসিক্ত
পিতার কবর, ওগো পূর্বপুরুষের গলিত লাশে উর্বর পুণ্যভূমি।
যতক্ষণ হৃৎপিণ্ডে রক্ত আছে, যতক্ষণ ঘাড়ের উপর মাথাটি দণ্ডায়মান
কসম তোমার- যে লুটেরা লুটে নেয় তোমার সুখ, যে কুলাঙ্গার
চেটে খায় তোমর সম্ভ্রম, তোমার দুর্দিনে
যে দুবৃর্ত্ত বগল বাজিয়ে হাসে তোষামোদি হাসি
বিরুদ্ধে তার রুখে দাঁড়াতে গিয়ে
মরণ যদিও আসে- লড়ে যাবো, লড়ে যাবো, লড়ে যাবো।’
সেলিম ভাই, সেদিনই আপনার সাথে
আমার প্রথম পরিচয়।
***
মানুষ কি নেই নিরুপায় ক্ষণে
এখানে মানুষ এমন ছিলো না কখনো
এখানে পরিবেশ ছিলো না এমন বৈরী, আমার
চিরচেনা মাতৃভূমিতে। এখানে ছিলো না প্রতিযোগিতা
অন্যকে টপকে যাওয়ার, অপরের মনে-
প্রতিহিংসার বীজ বুনে দেওয়া চাতুরী এখানে ছিলো না, ছিলো না
অধপতনের গতি বেগতিক।
এখানে এখন মানবন্তরে বিস্তৃত
কালকূট, মানুষের মুখ আকাশচুম্বী দানবীয়
রূপ ধরে করেছে আড়াল আমাদের সোনালি আকাশ।
অবিশ্বাসের ঘুণ আর স্বপ্নভঙ্গের অভিশাপ
এসেছে নেমে আমাদের সবার উপর
দুরারোগ্য ব্যাধির মতো সঙ্গোপনে, গড়েছে
আশ্রম নিচ্ছিদ্র নিরাপদ।
এমন একটি মানুষ কি নেই, বুক ফুলিয়ে
যে পারে বলতে- ‘আমি সত্যের সন্ধানী-
মিথ্যার মুখে মারি লাত্থি, অধপতনের
টেনে ধরি লাগাম আর সভ্যতার নামে অসভ্যের আচরণ
দেখেও না দেখার ভান ধরে থাকি না পড়ে।’
এমন একটি মানুষ কি নেই, নিরুপায় ক্ষণে যাকে ডেকে
বলা যায়- ‘জ্বলে ওঠো আপন শক্তিতে-
আমরা তোমার বিপ্লবী অগ্নিস্ফুলিঙ্গ
নেবো ধার, ফিরিয়ে দেবো হাজার দীপের দীপালী।’