শুক্রবার, ০৪ এপ্রিল, ২০২৫  |   ২৮ °সে
আজকের পত্রিকা জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয়
ব্রেকিং নিউজ
  •   হাইমচরে মাটি বোঝাই বাল্কহেডসহ আটক ৯
  •   কচুয়ায় কৃষিজমির মাটি বিক্রি করার দায়ে ড্রেজার, ভেকু ও ট্রাক্টর বিকল
  •   কচুয়ায় খেলতে গিয়ে আগুনে ঝলসে গেছে শিশু সামিয়া
  •   কচুয়ায় ধর্ষণের অভিযোগে যুবক শ্রীঘরে
  •   ১ হাজার ২৯৫ কেজি নিষিদ্ধ পলিথিন জব্দ করেছে কোস্ট গার্ড

প্রকাশ : ২১ মে ২০২৪, ০০:০০

স্মৃতিতে অম্লান প্রিয় বিদ্যাপীঠ

রাজন চন্দ্র দে
স্মৃতিতে অম্লান প্রিয় বিদ্যাপীঠ

কলেজ জীবনের সেই স্মৃতিমাখা আবেগী দিনগুলোর কথা খুবই মনে পড়ে। সেই দিনগুলোর কথা স্মৃতির পাতায় লিখে রাখার ইচ্ছে থাকলেও তা আর হয়ে উঠেনি। কিন্তু আজ এমন একটি প্লাটফর্ম পেলাম যেখানে সেই দিনগুলোর কথা না লিখলে মনে হয় জীবনের কোনো অপূর্ণতা থেকে যাবে। এজন্যে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই চাঁদপুর সরকারি কলেজের ৭৫ বছর পূর্তি ও পুনর্মিলনী আয়োজক কমিটিকে।

দেশের নামকরা বড় বড় বিদ্যাপীঠে বা বিশালায়তন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ হয়নি। কিন্তু যে কলেজটিতে আমার পড়ার সুযোগ হয়েছে সে কলেজটি আমার শিক্ষা জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যাপীঠ চাঁদপুর সরকারি কলেজ। কত না স্মৃতি রয়েছে এ কলেজটি ঘিরে।

কলেজের প্রথম দিনটির কথা খুবই মনে পড়ে। অনার্সে ভর্তি হওয়ার সুযোগ হলো ব্যবস্থাপনা বিভাগে। যদিও হিসাববিজ্ঞান প্রথম পছন্দ দিলে তাতে ভর্তি হতে পারতাম। কিন্তু ইচ্ছে করেই প্রথম পছন্দ হিসেবে ব্যবস্থাপনা বিভাগ দিয়েছি। তখন ভর্তি পরীক্ষা ছিল। তাতে ৭৬তম হয়েছি। যেদিন ভর্তি হতে আসলাম, তাতে কিছুই চিনতাম না। পরিচয়ও নেই কারো সাথে। অনেককেই জিজ্ঞেস করলেও সঠিক তথ্য পেতাম না। গেলাম অফিস রুমে। একটা ফরম নিলাম। ফরমটা পূরণ করতে গেলে কিছু কাটাছেঁড়া হয়। ফরমটি জমা দিতে গেলে অফিসের একজন কর্মী ধমকের স্বরে বললেন, কী পড়াশোনা করেছেন, এতো কাটা গেলো কেনো? আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম। অনেক শিক্ষার্থী আশেপাশে ছিলো, আমি খুবই লজ্জা পেলাম। যাক অতঃপর ভর্তি হলাম।

প্রথম প্রথম বলা চলে প্রতিদিনই কলেজে যেতাম। অনেক সময় ক্লাস থাকতো আবার অনেক সময় ক্লাস থাকতো না। তারপরও কলেজে নিয়মিত আসতাম। নিয়মিত কলেজে আসার কারণে শিক্ষকরা অনেক ভালোবাসতেন আমাকে। তাদের মধ্যে অন্যতম প্রিয় কিউএম হাসান শাহরিয়ার স্যার। স্যার এতোটাই সুন্দর বুঝাতেন এবং পড়াতেন যে, সকল শিক্ষার্থীর কাছে স্যার খুবই প্রিয় ছিলেন। দীর্ঘদিন স্যারের কাছে প্রাইভেটও পড়লাম। অত্যন্ত দক্ষ শিক্ষক তিনি। খেলাধুলার প্রতি তাঁর প্রবল আকর্ষণ। এই কলেজে আমার বর্ণিল শিক্ষা জীবনে আমি তাঁর মতো শিক্ষকদের কাছে পেয়েছি অতুলনীয় ভালোবাসা, উৎসাহ ও সহযোগিতা।

আমার সবসময় মনে পড়ে কলেজের সেই ফুটবল টুর্নামেন্টের কথা। যা প্রতিনিয়ত আমাকে নস্টালজিক করে। সেটি ছিলো ২০০৬ সালে চাঁদপুর সরকারি কলেজের আন্তঃবিভাগ ফুটবল টুর্নামেন্ট। এ টুর্নামেন্টকে ঘিরে হাসি-আনন্দ-কান্না সকল কিছুই লুকিয়ে রয়েছে। টুর্নামেন্টে ১৬টি বিভাগ ৪টি গ্রুপে বিভক্ত ছিলো। আমি ছিলাম ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধিনায়ক। তখন প্রতিটি খেলাতে ছোটখাট মারামারির ঘটনা ঘটতো। গ্রুপ পর্যায়ের প্রতিটি ম্যাচেই জয়লাভ করে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে সেমিফাইনালে উত্তীর্ণ হই। সেমিফাইনাল খেলা হয় ইংরেজি বিভাগের সাথে। আর ২য় সেমিফাইনালে হিসাববিজ্ঞান বিভাগ খেলে রসায়নবিজ্ঞান বিভাগের সাথে। সেমিফাইনালে মাঝ মাঠ থেকে আমার লংশর্ট একেবারে গোলবারের কোণাকুণি গিয়ে গোলবারের ভেতরে প্রবেশ করে। গোলটা হওয়ার পর সকল দর্শক মাঠে প্রবেশ করে আমাকে কোলে তুলে নেয়। আমাকে কোলে তুলে নাচতে গিয়ে আমার বুড়ো আঙ্গুলটিতে প্রচণ্ড চোট লাগে। আজও মাঝে মধ্যে আমি সেই চোটের ব্যথায় ভুগি। আমার দল এক শূন্য গোলে এগিয়ে। খেলা শেষ হওয়ার ১০ মিনিট পূর্বে প্রতিপক্ষের একটা কর্নার কিক নিয়ে রেফারির সাথে বাকবিতণ্ডা লেগে যায়। আমার দলের খেলোয়াড়রা এগিয়ে গেলে প্রতিপক্ষ দলের মারধরের শিকার হয়। এক বহিরাগত ছাত্র পরনের বেল্ট খুলে মারামারি করতে লাগলো। ফলে রেফারি খেলার সমাপ্তি ঘোষণা করতে বাধ্য হন। রেফারি ব্যবস্থাপনা বিভাগকে জয়ী ঘোষণা করেন। ২য় সেমিফাইনালে হিসাববিজ্ঞান বিভাগ রসায়ন বিজ্ঞান বিভাগের সাথে দুই শূন্য গোলে জয়লাভ করে। মনে পড়ে, সেমিফাইনালে জয়লাভের পর আমার প্রিয় শাহরিয়ার স্যার আমার হাতে দশ হাজার টাকা দিয়ে বললেন, যাও তুমি তোমার খেলোয়াড়দের নিয়ে কিছু খেয়ে আসো এবং ফাইনাল খেলার জন্য খেলোয়াড়দের যা যা প্রয়োজন কিনে নিয়ে আসো। আমি ও আমার দলের কয়েকজন খেলোয়াড়সহ গণি স্কুলের সামনের দোকান থেকে গ্লাভস, সেভগার্ড, মোজা ইত্যাদি কিনে নিয়ে আসলাম। অতঃপর স্বপ্নের ফাইনালে ব্যবস্থাপনা বিভাগ হিসাব বিজ্ঞান বিভাগের সাথে মুখোমুখি হয়। ফাইনালেও আমার সেই স্বপ্নের গোল। গোল হওয়ার সাথে সাথেই শুরু হয় রেফারির সাথে বাকবিতণ্ডা ও মারামারি। তবে খেলোয়াড়দের মধ্যে ছিলো সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক। মারামারিতে লিপ্ত হলো বহিরাগত শিক্ষার্থীরা। খেলা শেষ হওয়ার আর মাত্র ১৫ মিনিট বাকি। তারপর খেলার নির্দিষ্ট সময় শেষ হলে রেফারি খেলার সমাপ্তি ঘোষণা করেন। তখন খেলা ১-১ গোলে ড্র ছিলো। কিন্তু চ্যাম্পিয়ন ও রানার্সআপ ট্রফি আর বিতরণ হলো না।

কলেজ জীবনের শুরু থেকে শেষ অবধি আমার সঙ্গী ছিলো একমাত্র আশীর্বাদ। মহান সৃষ্টিকর্তার কৃপা, মা-বাবার আশীর্বাদ, শিক্ষকদের অতুলনীয় ভালোবাসা, উৎসাহ ও সহযোগিতার ফলে আমি অনার্স ও মাস্টার্সে খুবই ভালো ফলাফল অর্জন করি। সময়ের পরিক্রমায় ও স্মৃতির ধারায় হয়তো জীবনের অধ্যায়গুলো বদলায়, কিন্তু হৃদয়ের গহীনে রয়ে যায় কিছু স্মৃতি। কলেজের স্বর্ণালি দিনগুলো হারিয়ে গেলেও জীবনের অ্যালবামে রয়ে গেছে উজ্জ্বলভাবে।

রাজন চন্দ্র দে : প্রাক্তন শিক্ষার্থী, স্নাতক (ব্যবস্থাপনা বিভাগ), শিক্ষাবর্ষ : ২০০৩-০৪।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়