প্রকাশ : ২৩ এপ্রিল ২০২৪, ০০:০০
আমাদের ভাষার লড়াই : সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা

(গত সংখ্যার পর)
আমাদের সেই ভাষা আন্দোলনের আজ সত্তর বছর অতিক্রম হতে চলেছে। আজও আমরা জানি না ঠিক কতজন সেদিন পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছিলেন। রাষ্ট্র একুশে পদক দিয়েছে ভাষা শহিদদের, যেখানে পাঁচজন ভাষা শহিদকে স্বীকার করা হয়েছে। কিন্তু একুশের প্রথম কবিতার কবির কলমে সেদিন চল্লিশজন শহিদ হয়েছিলেন বলে পংক্তিবদ্ধ হয়েছে। পরের দিনের সংবাদপত্রগুলোর কোনটা ছাব্বিশজন আর কোনটা ষোলজনের কথা উল্লেখ করেছিল। কোন কোন পত্রিকায় বারোজন শহিদের কথাও বলা হয়েছে। কিন্তু বাঙালির তাজ, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনের ডায়রি মোতাবেক সেদিন নয়জন ভাষার জন্যে শহিদ হয়েছিল বলে লিপিবদ্ধ আছে। ভাষা শহিদের সংখ্যার এ দ্বন্দ্ব যদি আজও মীমাংসা করা না যায় তবে ভবিষ্যতের ইতিহাস বিতর্কিত হয়েই আবর্তিত হবে।
পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলনের পরিণামে অসমীয়রাও ভাষার জন্যে আন্দোলনে এগিয়ে আসে। উনিশশো একষট্টি সালের মে মাসে আসামের বরাক উপত্যকার ইতিহাসে ভাষা আন্দোলনের প্রথম শহিদ হওয়ার ঘটনা ঘটে। বাংলাকে এড়িয়ে সকল সরকারি ও বেসরকারি দপ্তরে অসমীয়া ভাষাকে চালু করার প্রজ্ঞাপন জারি হলে আসামের বাংলাভাষীদের মধ্যে দ্রোহের সঞ্চার হয় যা তাদের শহিদ হওয়ার শক্তি জাগায়।
পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলনের পরবর্তী ফলশ্রুতি হিসেবে উনিশশো বাহান্ন সালের একুশে ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় রাজশাহীতে শহিদ মিনার গড়ে ওঠে যা মাত্র তিনঘন্টা স্থায়ী ছিল। পুলিশের হামলায় তা ভাঙা হয়। বাহান্ন সালের তেইশে ফেব্রুয়ারি ঢাকায় রাতারাতি গড়ে ওঠে শহিদ মিনার যার নকশা করেন সাঈদ হায়দার। কিন্তু এটার আয়ুও তিন দিনের বেশি স্থায়ী হলো না। এর পরে উনিশশো তিপ্পান্ন সালে 'একুশে ফেব্রুয়ারী' শিরোনামে একটি সংকলন প্রকাশিত হয় যার সম্পাদক হাসান হাফিজুর রহমান। এতে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী রচিত একুশের সেই কালজয়ী গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’- প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। এর পাশাপাশি তোফাজ্জল হোসেনের একুশের গানটিও স্থান পেয়েছিল যার প্রথম দুই কলি ছিল, ‘রক্ত শপথে আরা অজিকে তোমারে স্মরণ করি/একুশে ফেব্রুয়ারি’। মহান একুশের ঐতিহাসিক প্রথম সংকলনে কবি শামসুর রাহমান, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, সৈয়দ শামসুল হক, আবদুল গনি হাজারী, ফজলে লোহানী, আলাউদ্দিন আল আজাদ, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, হাসান হাফিজুর রহমান, আনিস চৌধুরী, আতাউর রহমান, জামালুদ্দিনের কবিতা স্থান পেয়েছিল। উল্লেখ্য, প্রথম সংকলনে ছাপা হওয়া কবিতাগুলোর কোন শিরোনাম ছিল না।
এছাড়াও কথাসাহিত্যিক শওকত ওসমান, সাইয়িদ আতীকুল্লাহ, আনিসুজ্জামান, সিরাজুল ইসলাম এবং আতোয়ার রহমানের লেখা পাঁচটি গল্পে সংকলনটি পূর্ণতা পেয়েছিল। ‘একুশের নকশা’ নামে দুটি বিশেষ রচনা এ সংকলনে ছাপা হয়েছিল যার একটিতে মুর্তজা বশীর লিখেছিলেন, ‘ফুঁসে ওঠা অজগরের মত বিরাট মিছিলটা কেঁপে কেঁপে আসছে। কালো কালো মাথাগুলো রোদে চকচক করছে ওর শরীরের আঁশের মত। সামনে গতকালের শহীদদের রক্তাক্ত কাপড় নিশানের মত ওড়ানো। আরেকজনের কাঁধে একটা টুকরি। অনেকগুলো খালি টিয়ার গ্যাসের খোল দিয়ে তা ভর্তি..।’ একুশের নকশার দ্বিতীয় লেখাটি লিখেছিলেন, সালেহ আহ্মদ- ‘বন্ধুগণ, একশ চুয়াল্লিশকে ভেঙে আমরা এগোতে চাই না। কিন্তু তাই বলে মনে করো না আমাদের সংগ্রাম-আমাদের জীবন এখানটাতেই থেমে গেছে।’ শিল্পী মূর্তজা বশীরের ছাপচিত্র দিয়েই শুরু হওয়া একুশের প্রথম সংকলনের প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন শিল্পী আমিনুল ইসলাম। কবিরউদ্দিন আহমদের লেখা একুশের ইতিহাস দিয়েই সংকলনটি সমাপ্ত হয়।
ভাষা আন্দোলনের ফসলকে পূর্ণমাত্রায় ঘরে তুলতে যে বা যারা আগে-পরে ভূমিকা রেখেছেন, তাদের মধ্যে শেখ মুজিবের ভূমিকা উজ্জ্বলতম। ভাষা আন্দোলনের প্রথম ভাগে ঊনিশশো সাতচল্লিশে যুবনেতা হিসেবে বাংলা ভাষাকে অফিস-আদালতে দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে ব্যবহারের দাবিনামা পাঠ, ঊনিশশো আটচল্লিশে রাজপথে সক্রিয় আন্দোলন ও এগার মার্চের রাষ্ট্রভাষা দাবি দিবস সফল করার জন্যে জেলায় জেলায় গমন ও জনমত গঠন এবং গ্রেপ্তার ও নির্যাতিত হওয়া, ভাষা আন্দোলনের দ্বিতীয় ভাগে ঊনিশশো বাহান্ন সালে জেলবন্দি থেকে টানা বারদিন কড়া অনশনের মাধ্যমে প্রতিবাদ ও হাসপাতালের বেডে শুয়ে তিনি ভাষা আন্দোলনের অন্যান্য নেতৃবৃন্দের সাথে আন্দোলনের কর্মপন্থা নির্ধারণ করেন। ভাষা আন্দোলনের পরবর্তীকালে ঊনিশশো বায়ান্ন সালের পহেলা অক্টোবর, নয়াচীনের অক্টোবর বিপ্লবের আন্তর্জাতিক শান্তি সম্মেলনে শেখ মুজিবের পূর্ব পরিকল্পনা মোতাবেক বাংলায় ভাষণ প্রদান বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দিয়েছে বাংলা ভাষার প্রতি বাঙালির অঙ্গীকারকে। ঊনিশশো একষট্টি সালে রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে রেডিও পাকিস্তান কোন অনুষ্ঠান প্রচার করেনি,অথচ সারাবিশ্ব রবীন্দ্র বন্দনায় ছিল মুখর। রেডিও পাকিস্তান ঢাকা কেন্দ্র কেবলমাত্র পঁয়তাল্লিশ মিনিটের একটা অনুষ্ঠান দিয়েই দায় সারে। মূলতঃ উনিশশো একষট্টি থেকে উনিশশো একাত্তর অব্দি রবীন্দ্রনাথকে নিষিদ্ধ করা হয়,কারণ রবীন্দ্রনাথ বাংলা ভাষার কবি। ১৯৬৭ সালে জুন মাসে তথ্য ও বেতার মন্ত্রী খাজা শাহবুদ্দিন জাতীয় পরিষদে ঘোষণা করেন যে , ভবিষ্যতে রেডিও পাকিস্তান থেকে পাকিস্তানের সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের পরিপন্থী রবীন্দ্র সঙ্গীতের প্রচার নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং এই ধরনের অন্যান্য গানের প্রচার কমিয়ে দেওয়া হবে । ঢাকার ‘ দৈনিক পকিস্তান ‘ পত্রিকায় এই খবর প্রকাশিত হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজে এর বিরোধিতা করে বলেন, আমরা রবীন্দ্র সঙ্গীত গাইব, আমরা রবীন্দ্র সঙ্গীত শুনব। বাংলা ভাষার কবি রবীন্দ্রনাথকে বাঙালির কাছ থেকে কেড়ে নিতে চাইলেও বঙ্গবন্ধু তা হতে দেননি। বাহান্ন পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান গণপরিষদে নয় নভেম্বর, উনিশশো পঞ্চান্ন সালে বাংলায় ভাষণ দিতে গিয়ে বলেন : ‘মাননীয় ডেপুটি স্পিকার মহোদয়, আমাকে বাংলায় কথা বলতে হবে। আমি অত্যন্ত দুঃখিত যে এ ভাষা আপনার বোধগম্য হবে না, তবুও আমাকে বাংলাতেই বলতে হবে।’ তাঁর এ বক্তব্য তাঁকে বাংলা ভাষার রক্ষা কবচ হিসেবেই ফুটিয়ে তোলে। স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু সংবিধান প্রণয়নকালে প্রজাতন্ত্রের ভাষা বাংলা হবে এই মর্মে অনুচ্ছেদ অন্তর্ভুক্ত করেন। উনিশশো চুয়াত্তর সালে তিনি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বাংলায় ভাষণ দিয়ে বিশ্ববাসীর কাছে বাংলাকে মর্যাদাশীল করে তোলেন।
ভাষা আন্দোলনের নবযাত্রায় উনিশশো আটানব্বই সালে কানাডার ভ্যাঙ্কুবারে বসবাসরত অভিবাসী বাঙালি রফিকুল ইসলাম ও আব্দুস সালাম জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব মিঃ কোফি আনান এর কাছে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার আবেদন করেন। সেই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কোফি আনানের তথ্য কর্মকর্তা হাসান ফেরদৌসের পরামর্শে জাতিসংঘের অন্য একটি সদস্য দেশের আবেদন এর সাথে যুক্ত করার পরামর্শ দেন। ফলশ্রুতিতে রফিকুল ইসলাম ও আব্দুস সালাম ‘মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ লাভার্স ক্লাব অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন এবং এর মাধ্যমে কোফি আনানকে আরও একটি চিঠি প্রেরণ করেন। সেই চিঠির অনুলিপি জাতিসংঘের কানাডিয়ান রাষ্ট্রদূত মিঃ ফাওলারকে ও ইউনেস্কোর আনা মারিয়াকে দেয়া হয়। মারিয়ার পরামর্শে এই প্রস্তাবের পক্ষে বাংলাদেশ, কানাডা, ভারত, হাঙ্গেরি ও ফিনল্যান্ডকে যুক্ত করার কথা বলা হয়। কিন্তু অগ্রসর হওয়ার পর দেখা যায়, এই দাবির পক্ষে ঊনত্রিশটি দেশ একমত হয়ে কাজ করে। ঊনিশশো নিরানব্বই সালের সতের নভেম্বর ইউনেস্কোর প্যারিস অধিবেশনে প্রস্তাবটি গৃহীত হয় এবং দুহাজার সাল হতে জাতিসংঘের একশ আটাশিটি সদস্য রাষ্ট্রে একযোগে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করা হয়। দুহাজার দশ সালের অক্টোবরে জাতিসংঘের পঁয়ষট্টিতম সাধারণ অধিবেশনে সিদ্ধান্ত হয় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপনের। সেই মোতাবেক জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রসমূহে এবং জাতিসংঘ সদর দপ্তরে একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পায় এবং শহিদ মিনার স্থাপিত হয়।
আধুনিক ডিজিটাল বাংলাদেশে আজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিশেষত তরুণ সমাজের মধ্যে রোমান হরফে সংক্ষিপ্ত রূপে বিকৃত বাংলা উপস্থাপনের যুগ চলছে। তরুণদের এ চর্চা আমাদের ব্যাহত করে। বিভিন্ন বিদ্যুৎ-নির্ভর গণমাধ্যমে যারা সঞ্চালকের ভূমিকায় থাকেন, তাদের বাংলায় খিচুড়ি ভাষার মিশ্রণ শহিদের চেতনাকে ধূলায় ভূলুণ্ঠিত করে। রেডিও জকিদের ডিজ্যুসমার্কা বাংলা যেমন আমাদের সংস্কৃতির জন্যে হানিকারক তেমনি টেলিভিশন চ্যানেলের নাটকগুলোতেও প্রমিত বাংলা ভাষার দফারফা হয়ে যাচ্ছে। পথেঘাটে ভুল বানানে বাংলাকে উপস্থাপন যেন ভাষাকে ধর্ষণের শামিল। এর সাথে যোগ হয়েছে বানান বিষয়ে বাংলা একাডেমির অদূরদর্শী ক্রিয়াকলাপ। বিভিন্ন পত্রিকাগোষ্ঠী নিজেদের স্বতন্ত্র বানানরীতি অনুসরণ করে ভাষাকে সাধারণ মানুষের জন্যে জটিল করে তুলেছে। একদিকে দেশে আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ভাষাকে যেমন সার্বজনীনতা প্রদানের চেষ্টা করা হচ্ছে, তেমনি অন্যদিকে আদালত ও উচ্চস্তরের শিক্ষায় এখনও বাংলা ভাষাকে প্রধান মাধ্যম হিসেবে পূর্ণাঙ্গ প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। এখনও মোবাইলে অধিকাংশ বাঙালি বাংলা লিখতে শেখেনি। আমরা ভাষা আন্দোলনের শহিদদের একুশে পদক দিলেও কম্পিউটার কী-বোর্ডে অভ্র ফন্টের মাধ্যমে বাংলা প্রবর্তনকারীকে কোন স্বীকৃতি দেইনি। অথচ সবাই সকল ক্ষেত্রে বিনা বাক্য ব্যয়ে অভ্র ব্যবহার করে যাচ্ছি। আমরা কথায় কথায় রবীন্দ্রনাথের সেজদাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথের ‘আগে চাই বাংলা ভাষার গাঁথুনি, পরে চাই ইংরেজি শেখার পত্তন’-এই প্রাজ্ঞ বচনকে আউড়ে যাই কিন্তু নিজেদের সন্তানকে ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলে পাঠিয়ে উন্নত দেশের অভিবাসী নাগরিক বানানোর স্বপ্নে বিভোর থাকি।
এইসব অসঙ্গতি দূর করে আগামী প্রজন্মকে প্রমিত বাংলার চর্চায় অধ্যবসায়ী করা না গেলে ভবিষ্যতে বিকৃত যান্ত্রিক বাংলার উদ্ভব হবে যা আমাদের ভাষা আন্দোলনের মৌল চেতনার পরিপন্থী হয়ে দাঁড়াবে।
তথ্যসূত্র
১. Primitive Man, Vol. 1, No. 3/4 (Jul. - Oct., 1928), pp. 17-23 (7 pages)
Published By: The George Washington University Institute for Ethnographic Research
২. অসমাপ্ত আত্মজীবনী, শেখ মুজিবুর রহমান,জুন ২০১২, দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড