বৃহস্পতিবার, ০৩ এপ্রিল, ২০২৫  |   ২৭ °সে
আজকের পত্রিকা জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয়
ব্রেকিং নিউজ
  •   হাইমচরে মাটি বোঝাই বাল্কহেডসহ আটক ৯
  •   কচুয়ায় কৃষিজমির মাটি বিক্রি করার দায়ে ড্রেজার, ভেকু ও ট্রাক্টর বিকল
  •   কচুয়ায় খেলতে গিয়ে আগুনে ঝলসে গেছে শিশু সামিয়া
  •   কচুয়ায় ধর্ষণের অভিযোগে যুবক শ্রীঘরে
  •   ১ হাজার ২৯৫ কেজি নিষিদ্ধ পলিথিন জব্দ করেছে কোস্ট গার্ড

প্রকাশ : ০৫ মার্চ ২০২৪, ০০:০০

আমার মৌলিক উপলব্ধিতে চাঁসক

সুমন কুমার দত্ত
আমার মৌলিক উপলব্ধিতে চাঁসক

বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তরের আশায় ষোল দশমিক তেতাল্লিশ একর মাটি আঁকড়ে বিস্তীর্ণ চাঁসক মায়ের কোলে ঠাঁই পেতে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিই। পাঁচটি বিষয়ের ওপর পছন্দের সুযোগ থাকায় যথাক্রমে বাংলাটাই প্রথম বেছে নিই, দ্বিতীয় সমাজকর্ম, তৃতীয়টা ইতিহাস, আর শেষের দুটি ইংরেজি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান। বিষয় প্রাপ্তির তারিখে নোটিস বোর্ডে দেখি, ইতিহাসের ঘরে আশ্রয় মিললো আমার। ভীষণ মন খারাপ হলো সেই মুহূর্তে, পছন্দের প্রথমটি পেলাম না। অপ্রাপ্তি নিয়ে বাড়ি ফিরলাম। ভাবনার আকাশজুড়ে তখনও না পাওয়ার বিষয়টা পীড়া দিচ্ছিলো খুব। দিন শেষে রাত গড়ালো। পরেরদিন সকালে কাছের বন্ধুদের বিষয় প্রাপ্তির খোঁজ নিতে গিয়ে আমি বিস্মিত হই, পছন্দ/অপছন্দ তো দূরের কথা, মেধাবীদের অনেকের কপালে কোনো বিষয়ই জোটেনি। ঐ মুহূর্তে একটা মৌলিক উপলব্ধি জাগ্রত হলো নিজের মধ্যে। নিজ যোগ্যতা বলে যা পেয়েছি তা আঁকড়েই অগ্রসর হবো সম্মুখে। আর সেই লক্ষ্যে সব ভাবনা বাদ দিয়ে ২০০৬-২০০৭ শিক্ষাবর্ষে ইতিহাসেই ভর্তি কার্যক্রম সম্পন্ন করলাম।

ভর্তি-পরবর্তী বেশ কিছুদিন পর ইতিহাস থেকে ডাক এলো আমার। সূচি অনুযায়ী যথাসময়ে উপস্থিত আমি। লাল কার্নিশে সাদা রঙে আবৃত দেয়ালের প্রবেশমুখে সবুজ রঙের কপাট আর জানালার ফাঁকে কাঁচা রোদের ঝলকানি, নতুন আশ্রয়, নতুন মুখ সব মিলিয়ে একটা মিশ্রিত অনুভূতি নিয়ে অপেক্ষার প্রহর গুনছিলাম প্রথম ক্লাসের। এরই মধ্যে শ্যামবর্ণের হালকাণ্ডপাতলা মোটামুটি লম্বা একজন মানুষ অনেকগুলো রজনীগন্ধা নিয়ে সম্মুখের একটি টেবিলে রেখে বললেন, আপনারা সবাই নির্দিষ্ট আসনে বসেন, স্যাররা এক্ষুণি চলে আসবেন। আর আমার নাম মোঃ শরীফ, আমি বিভাগ সহকারী হিসেবে কর্মরত আছি। তাঁর বলার মাঝেই স্যাররা সবাই এসে হাজির হলেন। প্রথমে বিভাগীয় প্রধান আবু হানিফ স্যার উনার নিজ পরিচয় দিয়ে উপস্থিত অন্যান্য স্যারের পরিচয় তুলে ধরেন এবং আমাদেরও পরিচয় নিলেন। পরবর্তীতে বিভাগীয় প্রধান আবু হানিফ স্যারসহ উপস্থিত শ্রদ্ধেয় শিক্ষকবৃন্দের সবাই সংক্ষেপে আমাদের উদ্দেশ্যে দামী কিছু কথা উপস্থাপন করেন, যা এখনো আমার কানে ভাসে।

স্যারদের কথা শেষে উপস্থিত নবীন ছাত্র-ছাত্রীদের অনুভূতি জানতে চেয়ে হানিফ স্যার স্বেচ্ছায় কিছু বলার আহ্বান করলেন। মনে আছে, ঐ সময় সাহস করে নিজে থেকে কেউ দাঁড়াতে পারিনি আমরা। স্যার বিষয়টি বুঝতে পেরে বললেন, আচ্ছা আমিই ছেলেদের মধ্য থেকে একজন আর মেয়েদের মধ্য থেকে একজনকে ডেকে নিচ্ছি। কী কপাল আমার! মাথা নিচু করে পেছনের বেঞ্চে বসা আমার ওপরই স্যারের চোখ পড়লো। রক্ষা নেই! সামনে এগিয়ে গেলাম। স্যার বললেন, ভয় পেয়ো না বাবা। তোমার পরিচয় দিয়ে শুরু করো, তুমি পারবে। স্যারের কথায় একটু সাহস এলো মনে। বলার শুরুতেই মায়ের কথা মনে পড়ছিলো খুব। তাই মায়ের কথা দিয়ে শুরু করলাম, ‘আমার মা গ্রামের মানুষ, সহজ সরল। মা চান আমি বড় ক্লাসে পড়ে যেন ভালো কিছু করি। আজ একটা ধাপে পৌঁছেছি। আপনারা সবাই আশীর্বাদ করবেন, মায়ের চাওয়াটা যেন পূর্ণ করতে পারি।’ অনেক কষ্টে কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে এইটুকু বলেই আমি তড়িঘড়ি করে স্থান ত্যাগ করি। নতুন শিক্ষক, নতুন বন্ধু সবাই হাততালি দিয়ে অভিবাদন জানান এবং হানিফ স্যার বললেন, খুব ভালো বলেছ ছেলে, খুব ভালো। পরে মেয়েদের পক্ষ থেকে একজনকে ডেকে নেন স্যার। (দুঃখিত তার নামটি মনে নেই আমার) সে খুব গোছালো অনুভূতি ব্যক্ত করেছিলো সেদিন। এরপর টেবিলে রাখা রজনীগন্ধা এবং বিভাগের নাম সম্বলিত ব্যাগ ও ক্লাস রুটিন সবার হাতে একটি করে তুলে দেন স্যাররা। অবশেষে প্রথম ক্লাস নিয়ে মনের বিক্ষিপ্ত ভাবনাগুলোর অবসান হলো। জীবন অধ্যায়ে চমৎকার একটি দিন কাটলো সেদিন। যা শুধু অনুভূতির তুলিতে আঁকা যায়, প্রকাশ করা কষ্টসাধ্য। প্রথম দিন আলাপ হয় কচুয়ার ছেলে বন্ধু রাজীব, সিপন ও মতলবের আশ্রাফের সাথে। পরিচয় বা আলাপের ধারাবাহিকতায় যুক্ত হলো আনোয়ার, জাহিদ, সঞ্জয়, পুতুল, মুন্নি, আল-আমিন, আরাফাত, চিত্রা, মানসী, সুজন, রবিউল, কামাল, সালমা, নাজনিন, রুবি, সোহেল, জ্যোতিসহ ক্লাসে অনিয়মিত আরো অনেকে, যাদের নাম এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না। যত বেশি ক্লাস করছি, ততই কলেজের প্রতি, নিজের ডিপার্টমেন্টের প্রতি, স্যারদের প্রতি এবং বন্ধুদের প্রতি একটা ভালো লাগার মায়ায় জড়িয়ে পড়ি দ্রুত।

একদিন ক্লাস শেষে বাড়ি ফিরছিলাম। নুরে আলম পাটওয়ারী আমার ঘনিষ্ঠজনদের একজন। যিনি আমার সাথে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে বাংলা সাহিত্যে সুযোগ পেয়েছিলেন। সে ফোন করে বললো, দত্ত! সুখবর আছে! আপনিতো বাংলা চেয়েছিলেন। সিট খালি আছে, চাইলে মাইগ্রেশন করে চলে আসতে পারবেন। এটা শোনার পরে বিন্দুমাত্র না ভেবে তাকে বুঝিয়ে না বলে দিই। কারণ ইতিহাসের প্রেমে পড়া ছেলেটা প্রেম ছেড়ে চলে যাওয়ার কোনো ইচ্ছাশক্তিই খুঁজে পাচ্ছিল না সেদিন।

সময় গড়াতে গড়াতে পরম করুণাময়ের কৃপাদানে, বাবা মায়ের আশীর্বাদে এবং আমার সম্মানিত শিক্ষাগুরুদের সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও ভালোবাসায় ইতিহাসের নিয়মিত ছাত্র হিসেবে কৃতকার্যের তালিকায় নিজের নাম বসিয়ে মায়ের চাওয়াটা কিছুটা পূর্ণ করে চাঁসক মাকে ছেড়ে আসার নোটিস নিই হাতে।

ছেচল্লিশের গণ্ডি মাড়িয়ে চাঁসক মা এখন ঐতিহ্যের উৎকর্ষে উল্লাসের পঁচাত্তরে। সে আনন্দ আর উচ্ছ্বাসে পূর্তি হলো জেলার বৃহৎ মিলনমেলার মঞ্চ। ফেব্রুয়ারির ২৪/২৫-এ মায়ের কাছে যাই। সে প্রহর গুণে একটা অন্যরকম অনুভূতিতে ফেলে আসা স্মৃতি বার বার উঁকি মারছে মনের দুয়ারে। প্রিয় ক্যাম্পাস, বিশাল মাঠ, মাঠের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে ছুটে চলা, বন্ধুদের নিয়ে অন্য ডিপার্টমেন্টগুলোতে আড্ডা মারা, এ.বি.এম. জাহিদ স্যারের ভারতের ইতিহাস, খলিল স্যারের বাংলার ইতিহাসের উপস্থাপনা, আর অসিত বরণ স্যারের রাষ্ট্রবিজ্ঞান ক্লাসে রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্ব ও নীতি কথা খুব মনে পড়ে আজ। মনে পড়ে আবু হানিফ স্যার, নমিতা দাস ম্যাডাম, এনামুল স্যার, মহিবুল্লা স্যারসহ সিদ্দিক স্যারের কথা। কত সুন্দর প্রাণবন্ত উপস্থাপনা ছিল তাঁদের ক্লাসে। বিভাগ সহায়ক শরিফ ভাইকেও মনে পড়ে খুব। আন্তরিকতা দিয়ে সবসময় সহযোগিতা করেছেন আমাদের। এটা সেটা করে তাকে জ্বালিয়েছি অনেক। যা এখন সবই স্মৃতি। জানি না আজ কে কোথায়। বন্ধুদের অনেকের সাথেই যোগাযোগ নেই তেমন। যারা আমরা কাছাকাছি অবস্থান করছি বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিয়মিত, তাদের সাথে যোগাযোগ বাড়িয়ে প্রাণের টানে আবার এক হওয়ার তাগিদে নিবন্ধনে উৎসাহ দিই। এর মধ্যে খুবই অল্প সংখ্যক বন্ধু নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়েছেন। বাকিরা হয়তো চেয়েছিলেন, কিন্তু বিভিন্ন পারিপার্শ্বিকতার কারণে সময়মতো আর করতে পারেননি। যারা নিবন্ধনে অংশ নিতে পারেননি, এই পরিসরে তাদের খুব অনুভব করেছি। হয়তো তারাও আমাদের খুব মনে করেছে।

সুমন কুমার দত্ত : প্রাক্তন শিক্ষার্থী, ইতিহাস বিভাগ, শিক্ষাবর্ষ : ২০০৬-০৭।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়