প্রকাশ : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০০:০০
স্মৃতিময় শিক্ষাগুরুদের সান্নিধ্য

সুশিক্ষার সুশৃঙ্খলে যে জাতি অগ্রগামী, তারাই আজ নন্দিত। চাঁদপুর সরকারি কলেজ জেলার নন্দিত বিদ্যাপীঠ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচয় দেওয়ার এক গর্বিত নাম। আমি এই সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের ছাত্র হিসেবে গর্বিত, আনন্দিত ও সম্মানিত।
১৯৯৩ সালের পর থেকে দখিনা নির্মল বাতাসে চোখ জুড়ানো দৃষ্টিনন্দন ত্রি-তলা ভবন, বিশাল খেলার মাঠে সবুজের গালিচা, পূর্বপ্রান্তের পুকুরে শাপলার মিতালি, কচুরি ফুলের সমারোহে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমিতে আমার পদচারণা। তখন ইন্টারমিডিয়েটে পড়তাম। বিজ্ঞান বিভাগের ইসমাইল হোসেন কাঞ্চন স্যার (অবসরপ্রাপ্ত উপাধ্যক্ষ), তাজুল ইসলাম স্যার, আনোয়ার স্যার, বদিউর রহমান স্যার, জয়সেন বড়ুয়া, খলিলুর রহমান স্যার, সহিদুল্লাহ স্যার, নিরঞ্জন (প্রদর্শক, রসায়ন বিভাগ) স্যারদের শব্দমেলায় তারুণ্যের জোয়ারে ভেসেছে আগামীর স্বপ্ন। সেই স্বপ্নের পালতোলা নৌকায় আজ আমরা আরোহীবেশে জীবনের জয়গান গাই।
১৯৯৫ সালে এইচএসসি উত্তীর্ণ হওয়ার পর ঢাকায় পড়ার ইচ্ছে ছিল প্রবল। কিন্তু ঐ সময়ে জাতীয় রাজনীতি ছিল ভীষণ উত্তপ্ত। আমার আব্বা মরহুম উমেদ আলী ভ্ূঁইয়া রাজনীতির প্রেক্ষাপটে আমাকে ঢাকায় রেখে পড়াতে অপারগ ছিলেন। অতঃপর রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হলাম ১৯৯৫-৯৬ শিক্ষাবর্ষে। পূর্বমুখী রৌদ্রোজ্জ্বল বিল্ডিংয়ে বরণ করে নেয়া হলো আমাদের। অনার্সের পাঠ-পরিক্রমায় আমাদের জীবন রাঙিয়ে তোলেন শ্রদ্ধেয় শিক্ষকগণ। গুরুগম্ভীর ভাবগাম্ভীর্যময় মোহাম্মদ হোসেন স্যার, সরলমনা রুহুল আমিন স্যার, প্রাণচঞ্চল অসিত বরণ দাশ স্যার (বর্তমানে অধ্যক্ষ, চাঁদপুর সরকারি কলেজ), সময়-অনুরাগী মাসুদ স্যার (বর্তমানে অধ্যক্ষ, চাঁদপুর সরকারি মহিলা কলেজ), কবি জাকির হোসেন মজুমদার স্যারসহ শ্রদ্ধেয় স্যারদের মুখ স্মৃতির অ্যালবামে ধরা দেয়। ভুলোমনা আমি অনেক স্যারের নাম স্মরণ করতে না পারায় দুঃখিত, অনুশোচনায় মাথা নত। স্যাররা ছিলেন অগাধ জ্ঞানের অধিকারী। তাঁদের উপস্থাপনা ছিলো পাণ্ডিত্যপূর্ণ। স্যারদের পড়ানোকালীন মনে হতো ছাত্রদের চেয়ে স্যাররা বেশি পড়তেন! একজন ছাত্র সব শিক্ষকের দৃষ্টিতে আসতে পারে না। তবে একজন না একজন স্যারের দৃষ্টিতে পড়বেই। এটা হয়ত প্রাকৃতিক নিয়মে সঞ্চালিত। পড়ার গণ্ডিতে অথবা বাইরে কোন কাজ, কথা, ব্যবহার, উপমায় একজন শিক্ষক হয়ে ওঠেন এক একজন শিক্ষার্থীর প্রিয়, পরম শ্রদ্ধেয়।
ইসমাইল হোসেন কাঞ্চন স্যার আমার প্রিয় শিক্ষক। তিনি অনন্য হয়ে আছেন আজও। স্যারের সান্নিধ্যে নিজেকে শাণিত করেছি। স্যারের সাথে আজও আমার হৃদয়ের নিবিড় সংযোগ। স্যার এখনো বাবুরহাটে এলে আমার সাথে দেখা করে যাবেনই। এটা সূচি। স্যারের মিষ্টি হাসিতে ‘মোখলেস কী খবর তোমার’ প্রশ্নে আমি আন্দোলিত হয়ে পড়ি। স্যার উপাধ্যক্ষ হয়েছিলেন। কিন্তু আমি দেখা করতে যেতে পারিনি। সেজন্যে আমি লজ্জিত ও অনুতপ্ত। একজন শিক্ষকের হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসার প্রকাশ। ছাত্র অবস্থায় স্যার খোশগল্পে মাতিয়ে রাখতেন। বুদ্ধি-প্রতিবন্ধীদের নিয়ে একটি প্রতিষ্ঠানের সাথে স্যার যুক্ত ছিলেন। বিদেশি মেহমান এলে স্যার বিশ্বস্ততার সাথে আমাকে পাঠাতেন। কাজ শেষ করে এলে থ্যাংক ইউ, থ্যাংক ইউ বলে প্রশংসামালায় আবিষ্ট করতেন।
সে দিনগুলো ছিল মধুর। জীবন ধারাবাহিকতার সঞ্চিত পুঁজি। সেই পুঁজি এখন অবলীলায় ব্যয় করছি ঘাটতিবিহীন। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের রুহুল আমিন স্যার প্রথম ক্লাসেই আমাকে মুগ্ধ করেন। পর্যায়ক্রমে স্যারের সাথে কথা বলা, মেশা, স্যারের বাসায় যাতায়াতে স্যারের দর্শন, ছাত্রদের প্রিয় করা, সন্তান-ভাই, আপনজনদের ন্যায় ব্যবহার, শাসন, দিক-নির্দেশনা সবকিছুই আমাকে মুগ্ধ করে। স্যারের সাথে আমার সখ্য এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে; স্যার অন্য ক্লাসেও প্রসঙ্গক্রমে বা কথামালার ফাঁকে আমার নাম উচ্চারণ করতেন। আমি এতে লজ্জাবোধ করলেও মনে মনে বিশ্বাস করতাম আমি স্যারের স্নেহের পরশে জড়িয়ে আছি। প্রথম ক্লাস হতে আজ পর্যন্ত স্যার আমার হৃদয় সিংহাসনে মহাশয় হয়ে আছেন। অনেক স্যার বদলিজনিত বাধ্যবাধকতায় স্বল্প সময় ছিলেন। মোহাম্মদ হোসেন স্যার, রুহুল আমিন স্যার, অসিত স্যার, মাসুদ স্যার- এঁরাই রাষ্ট্রবিজ্ঞান ডিপার্টমেন্টের চাবিকাঠি ছিলেন আমাদের সময়ে। সহপাঠীর ভাই হওয়ায় মাসুদ স্যার ‘আপন’ আসনে আসীন। ক্লাসে স্যার খুব মনোযোগ দিয়ে পাঠদান করতেন। অসিত স্যার প্রাণচাঞ্চল্যে ভরিয়ে রাখতেন ক্লাসরুম। ব্যবস্থাপনায় স্যারের ভূমিকা চোখে পড়তো বেশি। যে কোন অনুষ্ঠানের প্রাণশক্তি ছিলেন অসিত বরণ দাশ স্যার।
কর্মোদ্দীপনায় স্যার আজ চাঁদপর সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ। এই গৌরবে আমরা অংশীদার। আজ উচ্চস্বরে বলি অসিত বরণ স্যার আমার শিক্ষক। আমাদের শিক্ষক। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক। আজ আমরা ছাত্র নই। সৌভাগ্যক্রমে আমার শিক্ষক প্রফেসর অধ্যক্ষ অসিত বরণ দাশ স্যারের সুদীর্ঘ বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবনে ঐতিহ্যবাহী চাঁদপুর সরকারি কলেজের ৭৫তম উৎসব উদযাপন নিঃসন্দেহে এক মাহেন্দ্রক্ষণ। সেই মাহেন্দ্রক্ষণের সারথি হতে পেরে আমরাও সত্যি গর্বিত, আনন্দিত ও উচ্ছ্বাসিত। একরাশ শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা আমার প্রিয় সহপাঠীদের। এই শুভলগ্নে শ্রদ্ধেয় সকল শিক্ষকের সম্মানে একটি কবিতা নিবেদন করলাম :
কবিতা পদক
শিক্ষা-শিক্ষক-শিক্ষার্থী
তিনটি শব্দ মহামূল্যবান
আমার শিক্ষকগণ
হাসিখুশি প্রাণবন্ত
জীবনের প্রেরণা, আদর্শের প্রতীক।
সুশিক্ষিত নাগরিক গড়ে তোলা
শিক্ষকতা জীবনের সাধনা
তাঁরা যদি শিল্প-সংস্কৃতি নিয়ে
করতেন পেশাগত সাধনা
ঘোষণা হতো অনেক অনেক পদক ও সম্মাননা।
চাঁদপুর সরকারি কলেজের ৭৫ বছর পূর্তিতে
প্রিয় শিক্ষকদের জন্যে আমার এই কবিতা পদক।
মোখলেছুর রহমান ভূঁইয়া : প্রাক্তন শিক্ষার্থী, অনার্স, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, শিক্ষাবর্ষ ১৯৯৫-৯৬; সভাপতি, উমেদ আলী স্মৃতি সংসদ, চাঁদপুর।