প্রকাশ : ১০ মে ২০২৩, ০০:০০

কিছু কিছু মানুষ নিজের সৃষ্টিশীলতা, কর্মদক্ষতা এবং সার্বিক মানবিক গুণাবলির কারণে অনেকের মধ্যে অনন্য হয়ে উঠেন। তাঁরা শিক্ষকতার মতো মহান পেশায় যুক্ত হয়ে যেমন আলোকিত করেন শিক্ষার্থী তথা সমাজকে, তেমনি চেষ্টায় থাকেন ঘুণে ধরা সমাজের মধ্যে আলোকবর্তিকা হাতে এগিয়ে যেতে। এমন মানুষ স্বল্প হলেও তাদের নিজেদের আলোয় আলোকিত হয় সমাজ এবং রাষ্ট্র। এমন একজন মানুষ ছিলেন চাঁদপুর সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ প্রয়াত অধ্যাপক ‘আবদুল ওয়াহাব মোহাম্মদ তোয়াহা মিয়া’, যিনি ‘এ ডব্লিউ এম তোয়াহা মিয়া’ নামে বহুল পরিচিত। নিজের খুব কাছের বন্ধুর নাম ছিল ‘আবদুল ওয়াহাব’। দুই বন্ধু ছিলেন আত্মার আত্মা। তাই ঠিক করলেন, দুই বন্ধু নিজের নামের আগে অপর বন্ধুর নাম যোগ করবেন! যেই চিন্তা সেই কাজ। শুধু ‘মোহাম্মদ তোয়াহা মিয়া’ বন্ধুর নাম নিজের নামের আগে যুক্ত করে হয়ে গেলেন ‘আবদুল ওয়াহাব মোহাম্মদ তোয়াহা মিয়া’। পরে যে নাম পরিচিত হয়ে উঠলো ‘এ ডব্লিউ এম তোয়াহা মিয়া’ হিসেবে।
চাঁদপুর সরকারি কলেজ ও তোয়াহা মিয়া
১৯৪৬ সালের ১ জুন শুরু হওয়ার পর থেকে বেসরকারি থাকাকালীন চাঁদপুর কলেজের বেসরকারি পর্যায়ে অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেছেন ৫ জন। যাত্রা শুরুর পর থেকে সরকারি কলেজে রূপান্তরিত হওয়ার জন্য সময় লেগেছে ৩৩ বছর ৯ মাস। পরে ১৯৮০ সালের ১ মার্চ যখন চাঁদপুর কলেজ সরকারি হয়ে ‘চাঁদপুর সরকারি কলেজ’ হিসেবে যাত্রা শুরু করলো, তার ৯ মাস ১০ দিন পর ১৯৮০ সালের ১১ ডিসেম্বর কলেজের অধ্যক্ষের গুরু দায়িত্বভার নেন এ ডব্লিউ এম তোয়াহা মিয়া। এর আগে তিনি কুমিল্লার ঐতিহ্যবাহী ভিক্টোরিয়া কলেজে অধ্যাপকের দায়িত্বে ছিলেন। চাঁদপুর কলেজের প্রাক্তন শিক্ষার্থী হিসেবে তিনিই প্রথম কলেজের সর্বোচ্চ পদে দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদানের পর ১৯৮৯ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত টানা ৮ বছর ২ মাস ১৫ দিন দায়িত্ব পালন করেন তিনি। বলতে গেলে সরকারি কলেজ হওয়ার পরে তিনিই প্রথম দীর্ঘ সময় ধরে অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করতে পেরেছিলেন। সে সময়ে কলেজের নানা কার্যক্রমে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়া এবং বাস্তবায়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করায় আজও জেলার অন্যতম সেরা কলেজ হিসেবে মাথা উঁচু করে ৭৫ বছর পূর্ণ করতে যাচ্ছে চাঁদপুর সরকারি কলেজ। এ একটি দিক ছাড়াও বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে আছে অধ্যাপক এ ডব্লিউ এম তোয়াহা মিয়া। ১৯৮৮ সালের ২৫ ডিসেম্বর এ কলেজের ৪২ বছর পূর্তিতে প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে প্রথম পুনর্মিলনী করার ক্ষেত্রে শুধু সহযোগিতাই নয়, নানাভাবে সফল করতে ছিলেন যথেষ্ট আন্তরিক।
অধ্যাপক তোয়াহা মিয়া শিক্ষার্থী হিসেবে ছিলেন মেধাবী। পড়াশোনার প্রতি ছিল প্রবল আগ্রহ। যা পরবর্তীতে নিজের কর্মজীবনেও নানাভাবে ফুটে উঠেছে। ১৯৫০ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় মেধা তালিকায় ১৭তম হয়ে আই-কম পাস করেছিলেন তিনি। জগন্নাথ কলেজ- কুমিল্লা পলিটেকনিক কলেজ, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে চাঁদপুর সরকারি কলেজ, নিজের কর্মের ছাপ তিনি রেখেছেন প্রতিটি জায়গায়। যখনই খবর পেতেন বা জানতেন কোনো শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে বা আগ্রহী তাদের দিকেই হাত বাড়িয়ে দিতেন। চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জ উপজেলার সরখাল গ্রামের চৌধুরী বাড়িতে জন্ম এ মেধাবী মানুষটির। সে গ্রামেরই অনেক শিক্ষার্থীকে নিজের বাসায় রেখে পড়াশোনা করার সুযোগ করে দিয়েছিলেন বরেণ্য এ শিক্ষাবিদ, যারা এখন নিজ নিজ জায়গায় প্রতিষ্ঠিত। শুধু সুযোগ করে দেয়াই নয়, প্রয়োজনে থাকাণ্ডখাওয়া এবং আর্থিক সহায়তার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অগ্রণী। শিক্ষার্থীদের ক্লাসের বাইরেও বিনামূল্যেই টিউশনি করতেন। এ কাজটি তিনি কুমিল্লায় যেমন করেছেন, তেমনি চাঁদপুরেও চলমান রেখেছিলেন। তারই অনেক শিক্ষার্থী আজও অপকটে স্বীকার করেন তাদের প্রিয় স্যারের এমন আন্তরিক প্রচেষ্টার কথা। একাধিক শিক্ষার্থী যারা আজ বিভিন্ন কাজে সফল, বিভিন্ন সাক্ষাৎকার বা আলোচনায় স্মরণ করেছেন তোয়াহা স্যারের কথা। বলেছেন ক্লাসের বাইরেও তিনি যে অনেকটা জোর করেই বিনামূল্যেই শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ক্ষেত্রে নানা ধরনের সহায়তা করতেন সেসব বিষয়ে। শিক্ষাবিষয়ক যে কোনো সহায়তায় অধ্যাপক তোয়াহা মিয়াকে সবসময় সমর্থন দেয়া মানুষটি ছিলেন তার স্ত্রী জাহানারা বেগম। শিক্ষার প্রতি স্বামীর এমন আন্তরিক আগ্রহ থেকেই তিনি সবসময় ছিলেন সকলের প্রিয় একজন। নিজের সন্তান ডা. আনিসা জাহান, ডা. খালেদ মাহমুদ, প্রকৌশলী ওয়ালিদ মাহমুদ, মুনিরা জাহানকেও মানুষের মতোই মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছেন। যারা আজ নিজ নিজ পেশার পাশাপাশি শিক্ষাক্ষেত্রে সহায়তার হাত প্রসারিত করে দেন।
স্মরণে ও শ্রদ্ধায় তোয়াহা মিয়া
চাঁদপুর কলেজের প্রাক্তন শিক্ষার্থী, সরকারি হিসেবে যাত্রা শুরুর পরে প্রথম অধ্যক্ষ, প্রাক্তন শিক্ষার্থী হিসেবে নানাভাবেই এগিয়ে আছেন তোয়াহা মিয়া। সারাজীবন নিজেকে শিক্ষার নানা মাধ্যমে বিলিয়ে দেয়া এ মানুষটি ১৯৯৭ সালে প্রয়াত হন। কিন্তু তাঁর স্মৃতি ধরে রাখা বা স্মরণে আমরা যেন অনেক পিছিয়ে। নানাভাবে উন্নয়নের ছোঁয়া শহর থেকে গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে। ছোট ভবনের কলেজ আজ বহুতল ভবনে যেমন সমৃদ্ধ, তেমনি শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখর। তোয়াহা মিয়ার জন্মস্থান ফরিদগঞ্জের ২নং বালিথুবা (পূর্ব) ইউনিয়নের সরখাল গ্রামের চৌধুরী বাড়ির সামনে ১৯৯৪ সালের ডিসেম্বর মাসে তারই নামে একটি ‘এ ডব্লিউ এম তোয়াহা মিয়া সেতু’ চালু করা হয়। যার মাধ্যমে গ্রামের মানুষজনের চলাচলের যেমন একটি জায়গা তৈরি হয়, তেমনি কিছুটা হলেও স্মরণ করা হয় তাঁকে। নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধিরা সেতুর নাম দেখে জানতে চান তাঁর সম্পর্কে। একইভাবে নিজের বাড়িতেই ২০০৫ সালে ‘এ ডব্লিউ এম তোয়াহা মিয়া স্মৃতি পাঠাগার’ করা হয়, যার মাধ্যমে প্রতি বছরই ছোট ছোট বেশ কিছু কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু জেলার শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠে গুরুদায়িত্ব পালন করাসহ বেশ কিছু জায়গায় প্রথম থেকেই সত্যিকার অর্থেই নেই তাঁর কোনো চিহ্ন। শুধু এ কলেজের শিক্ষার্থীই নন, ১৯৮১ সালের ২৬ অক্টোবর প্রতিষ্ঠিত জেলার অন্যতম আরেক বিদ্যাপীঠ পুরানবাজার ডিগ্রি কলেজের উদ্বোধনের আয়োজনেও যে প্রথম সুধীসমাবেশ হয়েছিল, সেখানেও সরব উপস্থিতি ছিলো তোয়াহা মিয়ার। পুরানবাজার কলেজের বর্তমান অধ্যক্ষ এবং চাঁদপুর সরকারি কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী রতন কুমার মজুমদার এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তিনি তোয়াহা স্যারের মাধ্যমেই চাঁদপুর কলেজে নিজের কর্মজীবনের শুরুটা করেছিলেন। প্রিয় তোয়াহা স্যারের কথা বিশেষভাবেই স্মরণ করেছেন তিনি। এমনই অনেক শিক্ষার্থী নানাভাবেই তোয়াহা মিয়াকে স্মরণ করেন। তবে সেটি কলেজ থেকেই যদি হয়, তবে পুরানো শিক্ষার্থী ছাড়াও নতুন শিক্ষার্থীরাও জানতে পারবে এ কলেজেরই প্রাক্তন কৃতী শিক্ষার্থীর কথা, যিনি কলেজ সরকারি হওয়ার পরের প্রথম অধ্যক্ষ এবং প্রাক্তনদের মধ্যেও প্রথম শীর্ষ পদে কাজ করা ব্যক্তি।
৭৫ বছর পূর্তি ও পুনর্মিলনী আয়োজনের বিশেষ এ সংখ্যায় অধ্যাপক এ ডব্লিউ এম তোয়াহা মিয়াকে স্মরণ করার উদ্দেশ্যেই এ লেখার প্রচেষ্টা। পাশাপাশি বহু প্রাক্তন শিক্ষার্থীর মিলনমেলায় পরিপূর্ণ কলেজ ক্যাম্পাসে যখন প্রাক্তনদের হাতে যাবে এ স্মারকগ্রন্থ, তারাও যাতে খুঁজে পান তাদেরই এক সতীর্থ এবং একজন অধ্যক্ষকে। যিনি কলেজটি সরকারি হবার পর দীর্ঘ সময় প্রথম অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করা একজন সফল ব্যক্তি এবং কলেজের এগিয়ে যাওয়া পথের এক সারথি ছিলেন। তোয়াহা মিয়ার নামে কলেজে একটি শিক্ষাবৃত্তি চালু আছে। সেটি চলমান। তাঁকে আরো একটু প্রাতিষ্ঠানিকভাবে স্মরণ রাখা যায় কিনা সেটিই এখন বড় চাওয়া। এ মানুষটিকে নিয়ে একটি বইয়ের কাজও চলমান। সেখানেও হয়তো আরো বিস্তারিত নানা তথ্যাদির সংকলন থাকবে। যারা তোয়াহা মিয়ার শিক্ষার্থী তারা ছাড়াও নতুন প্রজন্মও হয়তো সেই বইয়ের মাধ্যমে কিছুটা হলে জানতে পারবেন তার কথা। প্রাক্তন শিক্ষার্থী যারা আছেন, তারাও চাইলে সে বইয়ের জন্য তোয়াহা স্যারের সঙ্গে নিজের স্মৃতি, ছবি বা অন্য কোনো তথ্য দিতে পারেন। পরিশেষে বলা, মানুষ বাঁচে তার কর্মের মাঝেই। তবে নতুন প্রজন্ম এবং প্রজন্মের পর প্রজন্মের কাছে সেই সব মানুষদের কথা, কাজ তুলে ধরাটাও দায়িত্ব। সেটিও হোক ভাবনার জগতে কিছুটা হাতড়ে বেড়ানো। চাঁদপুর সরকারি কলেজের ৭৫ বছর পূর্তি স্মরণীয় হোক।
লেখক : সাংবাদিক ও লেখক। অধ্যক্ষ এ ডব্লিউ এম তোয়াহা মিয়ার ভ্রাতুষ্পুত্র।
* শিক্ষাঙ্গনে লেখা পাঠানোর ই-মেইল : [email protected]