প্রকাশ : ১৮ জুলাই ২০২৬, ০৯:০৩
বন্দিশালা ভেঙে আলোয়

দীর্ঘ প্রতীক্ষা, বাধা আর হতাশার অন্ধকার পেরিয়ে অবশেষে আমার জীবনে এলো আলো। মনে হচ্ছিল যেন আমি এক বন্দিশালায় আটকে ছিলাম যেখানে স্বপ্ন ছিল, কিন্তু পূরণের পথ ছিল না। সেই বন্ধ দরজা একদিন খুলে গেলো ভালোবাসার শক্তিতে। সব বাধা পেরিয়ে আমি পেলাম আমার জীবন সঙ্গীকে। তার হাত ধরেই শুরু হলো নতুন পথচলা। এখন আর একা নই আছে বিশ্বাস, আছে ভালোবাসা, আছে একসাথে বাঁচার স্বপ্ন। জীবনের সব কষ্ট আজ সার্থক মনে হয়, কারণ শেষ পর্যন্ত আলোয় এসে দাঁড়াতে পেরেছি আমরা দুজন।
হতাশা কখনো কখনো মানুষকে এমন এক মোড়ে দাঁড় করায়, যেখানে চারপাশে পথ থাকলেও কোনো পথই নিজের মনে হয় না। সেদিন আমিও তেমনই এক রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম নিঃশব্দ, নিরুপায়, আর ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়া। মনে হচ্ছিল, জীবনের সব রঙ যেন মুছে গেছে। চারপাশে মানুষের চলাফেরা, দোকানের কোলাহল সবকিছুই যেন আমার থেকে আলাদা এক পৃথিবী। আমি শুধু দাঁড়িয়ে আছি, নিজের ভেতরের শূন্যতা নিয়ে। ঠিক তখনই পেছন থেকে একটি পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এলো ভাই, আপনাকে এমন দেখাচ্ছে কেনো?
পেছনে তাকিয়ে দেখি ওর এক দূর সম্পর্কের বোন, যাকে আমি আপু বলে ডাকি। সে তার ছোট মেয়েকে স্কুল থেকে নিয়ে ফিরছিল। আমি হালকা হাসার চেষ্টা করে বললাম, কিছু না আপু, এমনি। কিন্তু সে বুঝে ফেলেছিল আমার “এমনি”র ভেতরে কতটা অস্থিরতা লুকিয়ে আছে। সে একটু থেমে বললো, একদিন আমার বাসায় আসতে পারবেন?
আমি কিছুটা অবাক হলাম, কিন্তু মনে একটা আলো জ্বলে উঠলো। হয়তো সে কিছু বলতে চায়, হয়তো আমাদের ব্যাপারেই। আমি বললাম, জি আপু, কাল দুপুরে আসবো।
সে মৃদু হাসলো, ঠিক আছে, আসবেন।
সেদিন বাসায় ফিরে আমার আর কিছুতেই মন বসলো না। মনে হচ্ছিল কালকের সেই সাক্ষাৎ যেন আমার জীবনের একটা বড় সিদ্ধান্ত বয়ে আনবে। কখনো ভাবছি আপু হয়তো ভালো কিছু বলবেন, হয়তো কোনো সমাধান দেবেন। আবার কখনো মনে হচ্ছিল না, হয়তো সব শেষ হয়ে গেছে, তিনি শুধু সেটা জানাবেন।
এই দ্বিধা, এই অস্থিরতা নিয়ে রাতটা কেটে গেল। পরের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে সবকিছু স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করলাম। বন্ধুদের সাথে হোটেলে নাস্তা করলাম, হাসলাম, গল্প করলাম কিন্তু ভেতরে ভেতরে আমি অন্য এক জগতে।
তারপর ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের অফিসে গিয়ে বসে থাকলাম। কিন্তু কাজের প্রতি কোনো মনোযোগ নেই। শুধু একটা প্রশ্ন “আপু কি বলবেন?” সময় যেন সেদিন খুব ধীরে চলছিল। অবশেষে দুপুর হলো।
আমি বাজার থেকে কিছু ফল কিনলাম। আর আপুর ছোট দুই মেয়ের জন্য চিপস আর চকলেট নিলাম। মনে হচ্ছিল এই ছোট ছোট উপহারগুলো দিয়ে আমি যেন নিজের ভদ্রতা নয়, নিজের আশা নিয়ে যাচ্ছি।
আপুর বাসায় গিয়ে কুশলাদি বিনিময় হলো। তিনি হাসিমুখে আমাকে বসালেন। বললেন, দুপুরের খাবার খাওয়ার জন্য ফ্রেশ হয়ে আসেন। আমি মাথা নাড়িয়ে বললাম, না আপু, আগে বলুন আমাকে কেনো ডাকলেন।
তিনি একটু গম্ভীর হলেন। তারপর ধীরে ধীরে আমাদের সম্পর্কের প্রসঙ্গ তুললেন।
তিনি বললেন, তোমাদের ব্যাপারটা আমি জানি কিন্তু তোমার এই অবস্থা কেনো?
আমি আর নিজেকে আটকে রাখতে পারলাম না। সব খুলে বললাম, আমার ভালোবাসা, আমার চেষ্টা, আমার ব্যর্থতা, আমার ভয়। কথা বলতে বলতে কখন যে আমার চোখ ভিজে গেলো, বুঝতেই পারিনি।
আপু চুপ করে শুনছিলেন। তারপর বললেন, তোমার মনে ওর জন্য এত ভালোবাসা আছে, সেটা আমরা বুঝতেই পারিনি। আমি কিছু বললাম না।
তিনি আবার বললেন, খালাম্মা হয়তো রাজি, কিন্তু খালুজান উনি মানবেন কি না বুঝতে পারছি না। আমি গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে বললাম, আপু, আমি তাকে না পেলে আমার জীবন রেখে কি লাভ? হয়তো একদিন শুনবেন, আমি আর নেই। আমার কথাটা শুনে তিনি হতবাক হয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
তারপর বললেন, এভাবে বলো না আমি চেষ্টা করবো কিছু একটা করার। তার সেই কথাটুকুই যেন আমার ভেতরে আবার একটু আশা জাগিয়ে দিলো। আমি বিদায় নিলাম।
বাসা থেকে বের হয়ে মনে হচ্ছিল সবকিছু এখনো অনিশ্চিত, কিন্তু কোথাও একটা আলো জ্বলছে। আমি আপুকে বলে এলাম, আপনি আমাকে জানাবেন তাদের অবস্থানটা। বিকেলে হঠাৎ একটা অপরিচিত নাম্বার থেকে ফোন এলো। আমি “হ্যালো” বললাম। ওপাশে প্রথমে কোনো শব্দ নেই। কিছুক্ষণ পর একটা মৃদু, পরিচিত, আর মধুর কণ্ঠ, “হ্যালো” আমার বুকটা কেঁপে উঠলো। আমি বুঝে গেলাম সে। আমার ভালোবাসা। আমরা কিছুক্ষণ চুপ করে ছিলাম। তারপর সে বললো, আপনি জয়ী। আমি প্রথমে কিছুই বুঝতে পারলাম না। বললাম, মানে?
সে হাসলো, আমাদের ব্যাপারে বাবা-মা রাজি হয়েছে। এই কথাটা শুনে আমি যেন বাস্তবতা ভুলে গেলাম। মনে হচ্ছিল আমি আকাশে ভাসছি। আমার চোখ ভিজে গেলো, কিন্তু মুখে হাসি। ওপাশ থেকে মনে হচ্ছিল সে যেন আমাকে জড়িয়ে আছে। সেই মুহূর্তে আমরা দুজনই শুধু অনুভব করছিলাম। অবশেষে আমাদের ভালোবাসা জয়ী হয়েছে। আমি দৌড়ে বাসায় গেলাম। বাবা-মাকে বললাম, একটা মেয়ে আছে আপনারা গিয়ে দেখে আসতে পারেন। তারা রাজি হলেন। পরের দিনই তারা গেলেন। সবকিছু যেন খুব দ্রুত এগোতে লাগলো। বিয়ের কথা পাকা হলো, দিনক্ষণ ঠিক হলো। এই কয়েকটা দিন যেন বন্দিশালা থেকে মুক্তির মতো লাগছিল।
বন্ধুদের আড্ডা এখন শুধু একটাই বিষয়, কবে বিয়ে?
আমি শুধু হাসতাম।
অবশেষে সেই দিন এলো।
দুপুরের দিকে আপু ফোন করলেন, ভাই, আজকে তোমাদের পরিবার এসেছে, ওদেরও লোকজন আছে আজই কি বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা করবে? আমি এক মুহূর্তও দেরি করলাম না।
বললাম, জি আপু, করবো। তাঁদের পরিবারের মত থাকলে আমি কোনো অমত করবো না। আমি কিছু না ভেবেই রাজি হয়ে গেলাম। বাবা-মাকেও বললাম। তারা সম্মতি দিলেন। সবকিছু যেন স্বপ্নের মতো দ্রুত ঘটতে লাগলো।
প্রস্তুতি, আয়োজন সবকিছু একসাথে। আমি তাকে ফোন করলাম। বললাম, আমি আসছি তোমাকে আপন করে নিতে। ওপাশে নীরবতা। তারপর মৃদু একটা কণ্ঠ, আমি অপেক্ষা করছি।
সেদিন বিকেলে আমি যখন তার বাড়ির দিকে যাচ্ছিলাম, মনে হচ্ছিল আমি শুধু একটা বাড়ির দিকে যাচ্ছি না, আমি আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর গন্তব্যের দিকে যাচ্ছি। সেই বাড়ি, সেই জানালা যেখানে সে লুকিয়ে আমাকে দেখতো। আজ আর লুকিয়ে নয় আজ সে আমার সামনে, আমার জন্য। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হলো।
সবাই উপস্থিত, চারপাশে আলো, স্বজনের মুখে হাসি। কিন্তু আমার চোখে শুধু একজন মানুষ সে। যখন তাকে পাশে পেলাম, মনে হলো সবকিছু থেমে গেছে। এতদিনের অপেক্ষা, কষ্ট, অশ্রু সবকিছু যেন এক মুহূর্তে সার্থক হয়ে গেলো।
আমি মনে মনে বললাম, শেষ পর্যন্ত তুমি আমার হলে। সে মৃদু হাসলো। সেই হাসির ভেতর ছিল ভালোবাসা, ছিল স্বস্তি, ছিল এক নতুন জীবনের প্রতিশ্রুতি। আমাদের বন্দিশালা ভেঙে গেছে। আমরা আজ মুক্ত। আর এই মুক্তির নাম ভালোবাসা।







