প্রকাশ : ১৮ জুলাই ২০২৬, ০৯:০২
চাঁদপুরের লেখকদের সিলেট-শ্রীমঙ্গল আনন্দভ্রমণ

(পূর্ব প্রকাশিতের পর ॥ শেষ পর্ব)
এমন আনন্দ উপভোগের সময়ে আমার একমাত্র ছেলে উমেদ আজহার ইয়ানুর ভূঁইয়া মোবাইলে একঝুড়ি বায়নার সাথে সাদা পাথরের আর্জি শুনিয়ে দেয়। বিধি না থাকিলেও ছেলের বায়নায় একটি ছোট সাদা পাথর করি হস্তগত। সময়ের স্বল্পতায় পাহাড়ের ঝরনার জলে স্নান এবং খাসিয়া পল্লী পরিভ্রমণ না করায় অবশিষ্ট প্রকৃতি-রূপকন্যার মায়াজালের আকর্ষণে আবারও দেখা হবে জাফলং।
তপ্ত তাপের তীব্রতা তাড়া করছে আমাদের। আমরাও ছুটছি চাঁদের গাড়িতে। চলন্ত পথেই দুপুরের খাবার, অতঃপর পৌঁছে যাই হোটেলে। শীতল জুস খাওয়ার জন্য আমরা একটি স্টলে। সংবাদ আসলো আমাদের অন্য ভ্রমণসঙ্গীদের সাথে সুরুচি রেস্তোরাঁ কর্তৃপক্ষ বাকবিতণ্ডায় জড়ায়। তথ্য নিয়ে জানা যায় যে, জিম্মি করে মালিক ইচ্ছানুযায়ী অস্বাস্থ্যকর খাবার পরিবেশন করে। এককথায়, অধিক মুনাফার স্বেচ্ছাচারিতা। দুঃখ পেলাম আমরা। কারণ, হাঁসের মাংস খাওয়ার জন্য সিলেটের একজন গুণীজন এই হোটেল সম্পর্কে বলেন। এহেন অনাকাক্সিক্ষত আচরণের কারণ জানলে আমাদের চেয়ে অধিক বিব্রত হতেন ওই গুণী ব্যক্তিত্ব।
দর্শনীয় স্থানের সাথে স্থানীয়দের আতিথ্যতার পরিষেবা পর্যটকদের আকর্ষণ হয় পর্যটন এলাকায়। পর্যটকদের সাথে বিরূপ আচরণে পর্যটন শিল্প ধসের সাথে স্থানীয় ব্যবসায় মন্দার উপক্রম হবে। অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা ষড়ঋতুর বাংলাদেশে বিদেশি পর্যটক আকৃষ্ট না হওয়ার বহুবিধ কারণের একটিÑস্থানীয়দের অহেতুক আচরণ ও পকেটকাটা ব্যবসা। ভালো আচরণে ত্রুটি মার্জনা করা যায়; ঔদ্ধত্য আচরণে ক্ষুদ্র ত্রুটিও বিষফোড়া হয়ে ওঠে। চলার পথে পথে অনাকাঙ্ক্ষিত সমস্যা হবেই। তবুও অগ্রসর হতে হবে সামনের পরিক্রমায়।
আমরাও স্থির না থেকে হোটেল চেকআউট হয়ে শ্রীমঙ্গলের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। রাত প্রায় ৯:৩০টায় শ্রীমঙ্গল হোটেলে। হোটেলের পরিবেশ মনপুত না হলেও এখন আর কিছু করার নেই। অনলাইন বুকিং বিড়ম্বনা সহ্য করে হোটেল চেক-ইনে আনমনা ফ্রেশনেস। সিলেট শহরের নামকরা হোটেলের ন্যায় শ্রীমঙ্গলের ‘ফানসি’ হোটেলেও গরুর মাংসের অর্ডারে বসিয়ে অন্য খাবারের মেন্যু আসায় বিরক্ত হয়ে চলে আসি। অবগত্যা আরেকটি হোটেলে আমি ও আরিফুল ইসলাম শান্ত রাতের খাবারে মোটামুটি তৃপ্ত। বলা যায়, খাবার বিড়ম্বনা আমাদের পিছু লেগেছে। রুচিসম্মত খাবার ভ্রমণের আনন্দ-উদ্দীপনা বাড়িয়ে দেয়। একটু ঘোরাঘুরির ইচ্ছে জাগলেও এখনকার আবাসিক হোটেল+রেস্তোরাঁয় মেন্যুর হঠকারিতায় শ্রীমঙ্গলের রাত হয়ে যায় শ্রীহীন। অপ্রতুল ঘুমে পোহাতে হলো রাত।
আজ শনিবার। ভ্রমণের শেষ দিন হওয়ায় হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে রাত থেকেই সকালের তাড়া মাইনুল ইসলাম মানিকের। নাস্তা খেয়ে চাঁদের গাড়ি চলছে আমরা। শুভ্র আবহাওয়ার নির্মল বাতাসের দোলায় সড়কের দু’পাশের শ্যামল সবুজায়নের দৃশ্য চোখে প্রশান্তি, মন-মননে পুলকিত। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি চা-বাগানের ইটসুরকির রাস্তায় নেই ঝক্কি-ঝামেলা।
একসময় এই জনপথ কাদা-মাটি মাড়িয়ে অতিরিক্ত সময়-শক্তি ক্ষয়ে পার হতে হতো। বিগত দশকে সমতলের ন্যায় পাহাড়ের অববাহিকায় জীবনযাপন আমূল পরিবর্তন হয়েছে। দুই হাজার আট/নয় সালে চা বাগানের কোলজোড়ে আমার নিজ দেখা দীর্ঘ পরিক্রমা ছিল। সখ্যতা ছিল পাহাড়ের লোকালয়ে। ঐ সময়ে সাগরনাল চা-বাগানে বাঘের তিন দিনের বাচ্চা দেখা ছিল শ্বাসরুদ্ধকর-রোমাঞ্চকর অ্যাডভেঞ্চার। দারুণ স্মৃতি। চায়ের রাজ্যে পাহাড়ের আঁকা-বাঁকা পথ হাঁকিয়ে মোগল সাম্রাজ্যের স্মৃতি-নাম বহনে নুরজাহান চা-বাগানে এখন। অক্টোবরে চা গাছে পাতায় পাতায় থাকে ভরপুর। চোখের দৃষ্টি মাতিয়ে রাখে ভ্রমণের তৃষ্ণা। ছবি তোলার হিড়িক।
আবদুল্লাহ হিল কাফির ভাইয়ের সহধর্মিণী সুলতানা আক্তার, তাশফিয়া কাফী, কাশফিয়া কাফী আদুরে সন্তানদ্বয়, ভায়রা ও তাঁর সহধর্মিণী হেলানা আক্তার হেনার ইচ্ছেমতো একক-ফ্যামিলি গ্রুপ স্মৃতি-ছবি তোলার সময় দারুণ উপভোগ্য। চা-শ্রমিকের সাইকেল চালিয়ে দারুণ মজা পাই আমি। জাহিদ নয়ন ও মুনিয়া আলমের চা-বাগান পরিদর্শন, দেওয়ান মাসুদুর রহমান ও সাব্বির আহমেদের ফটোসেশন-অভিনয় স্টাইলে হাঁটার দৃশ্যায়নÑসবাই চায়ের ভুবনে সুখের উল্লাসে। সুখানুভূতির খুনসুটিতে আবারও চলছি চাঁদের গাড়িতে।
পাহাড়-প্রকৃতির নিস্তব্ধতা সৌন্দর্যে ভরপুর আকাশ, রৌদ্রস্নাত সবুজায়ন দেখতে দেখতে আনন্দ-প্রফুল্লতায় স্বল্প সময়ে পৌঁছে যাই মাধবপুর। দৃষ্টিনন্দন পরিবেশ, লেক পরিভ্রমণ করে উঠে যাই পাহাড়ের চূড়ায়। নির্মল বাতাসে পাহাড়ি পেঁপে খেয়ে আমি, মাইনুল ইসলাম মানিক, ফরিদ হাসান তৃপ্তি ও এনার্জিতে স্বস্তির নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসে পাহাড়ের পাদদেশে। সাদমান শরীফের দুষ্টমিতে আমার গলায় জড়ানো মায়াকান্না দেখে চা-শ্রমিক খুব আনন্দ পায়। এবং মাইনুল ইসলাম মানিক আমাদের কান্নাকে মোবাইলে অপর প্রান্তে থাকা কাউকে অভয়ের সান্ত্বনার ধ্বনি শোনান।
গেস্ট ভ্রমণসঙ্গী বয়স্ক মকবুল হোসেন ভাইকে পাহাড়ের চূড়ায় দেখে ফরিদ হাসানের দুষ্টুমি-কথাবার্তায় জড়তা কেটে আমাদের সাথে রসাত্মক কথনে। চায়ের পাতা বোটলে অনেকের সাথে মজে আছে কাদের পলাশ। সামিয়া আলম-মুনিয়া আলম নারী চা-শ্রমিকের জীবিকার সাথে সহমর্মিতা প্রকাশ করে চা-পাতা উত্তোলনÑআমাদের চা-বাগান ভ্রমণের যথার্থতা ফুটে ওঠে। মাধবপুর চা-বাগান একটি পর্যটন-আকর্ষণীয় চা-বাগান।
ভ্রমণ আকর্ষণে এবার আমরা জাতীয় উদ্যান লাউয়াছড়া। প্রবেশমুখে দর্শনার্থীদের সাথে বানরের খুনসুটি, বনায়ন উদ্যানের ভেতর দূর থেকে রেললাইনের সরু গলি দেখার ন্যায় ছবি দেখে তুষ্ট থেকে গ্রুপ-ছবিতে প্রস্থান। হোটেল চেকআউট হয়ে ঈমোহনার টানে ট্রেনে শ্রীমঙ্গল থেকে কুমিল্লার লাকসামে যাত্রা-বিরতি। দিনের খাবার লাকসাম রেস্তোরাঁয়। সালা-দুলাভাই এবং আবদুল্লাহ হিল কাফী ভাইয়ের পরিবার এখানে বিদায় নেন।
আমরা ট্রেনের অপেক্ষায়। সর্বকনিষ্ঠ ভ্রমণসঙ্গী জাহিন সুলতান (কাদের পলাশ) অপেক্ষমান সময়ে জড়তা কাটিয়ে মিশে যায়। আমরাও খুনসুটি-ছেলে-মানসী কথাবার্তায় মজে আছি। হুইসেলের আওয়াজ। টিকিট-সিট নম্বর অনুযায়ী দুই কামরায় আমরা। ট্রেন চলছে ইলিশের বাড়ি। সময় যত ঘনিয়ে আসছে, আনন্দ উৎরিয়ে মাখামাখি করছে। ট্রেনের ভিতরÑবিশেষ করে হাজীগঞ্জ পর থেকে কাজী রাসেল ও আরিফুল ইসলাম শান্তর প্রধান সুরে সমবেত গলায় লোকসংগীতে অন্যসব যাত্রীরাও আমাদের আনন্দে একাকার হয়ে যায়। ছবি তোলা বিধিনিষেধ থাকলেও অনেকে লুকিয়ে-লুকিয়ে ছবি তোলে।
হোটেলে প্রথম আনন্দ এবং ট্রেনে শেষ সঙ্গীতায়ন সত্যি রোমাঞ্চকর ট্রাভেল। নিরাপদে ফেরা জন্ম-শহর। ট্রিপের প্রোগ্রাম রোমাঞ্চ শেষ হয়েও যেন হয় না শেষ। আলোচনায় চলে আসে ২০২৩ সালের ভ্রমণ। সেই ভ্রমণের সঙ্গী ছিলেনÑম. নূরে আলম পাটোয়ারী, কাদের পলাশ, কিমিয়া (কাদের পলাশের কন্যা), মাইনুল ইসলাম মানিক, নার্গিস তন্বী (মানিকের সহধর্মিণী), এইচএম জাকির, নেহলিন সাবা অহনা (জাকিরের সহধর্মিণী), নাজমা নূর (জাকিরের শাশুড়ি), আয়াজ (জাকিরের সন্তান), কাজী সাইফ, নূরুল ইসলাম ফরহাদ, রাকিবুল হাসান, জাহিদ নয়ন, আরিফ রাসেল, নাজমুন নাহার মমি (আরিফের সহধর্মিণী), শাদমান শরীফ, আনিস ফারদিন, উজ্জ্বল হোসাইন, নাসরিন উজ্জ্বল (উজ্জ্বলের সহধর্মিণী), নওশাদ হোসাইন নিহাল, নওশাবা মেহেরিন নাফিসা, আবদুল্লাহিল কাফী, সুলতানা আক্তার (কাফীর সহধর্মিণী), হেলেনা আক্তার, তাশফিয়া কাফী, আব্দুল বাচেত খিলজী, দেওয়ান মাসুদ রহমান, সালমা রহমান (মাসুদের সহধর্মিণী), আব্দুল মুসা, দিহান, আরিফুল ইসলাম, পূর্ণতা হাসান শিউলি, সাবিহা, আসিফ, নীরা, মনিরুজ্জামান বাবুল, ইভা বাবুল (বাবুলের সহধর্মিণী), ফাইয়াজ আহমেদ, ফাইজা আক্তার, মুহাম্মদ ফরিদ হাসান এবং আমি মোখলেছুর রহমান ভূঁইয়া। দারুণ এনজয় করি ভ্রমণ।কক্সবাজার থেকে চাঁদপুরে আগমনের মুহূর্তে কাজী সাইফ বাসে বলেনÑতাঁর মোবাইল পাচ্ছে না। অনেক খোঁজার পর সবার ভগ্নহৃদয়। ২০২৫ ভ্রমণে আরিফুল ইসলাম শান্ত একেবারে তীরে এসে তরী ডোবার অবস্থায়। ট্রেন থেকে চাঁদপুর কোর্ট স্টেশনে নেমেই বলেনÑতাঁর মোবাইল হারিয়ে গেছে। আনন্দের মাঝে নিরানন্দের অশুভ সংবাদে ভ্রমণসাথীরা ব্যথিত। তবে এবার প্রযুক্তির কল্যাণে থানা-পুলিশের সহায়তায় আরিফুল ইসলাম শান্তর মোবাইল পাওয়াÑ‘শেষ ভালো যার, সব ভালো তার’ প্রবাদে হাসি ফুটে।
যাঁর যাঁর অবস্থান ও কর্মে মনোনিবেশ সবার। কিছুদিন বিরতির পর হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে মেসেজ আসেÑসাহিত্য একাডেমি, চাঁদপুর; সওগাত সম্পাদক নাসির উদ্দীন হল রুমে ‘চাঁদপুর-সিলেট-শ্রীমঙ্গল আনন্দ ভ্রমণ-২০২৫’-এর আনন্দ-অনুভূতি প্রকাশ, ক্যামেরাবন্দী স্মৃতি প্রজেক্টরে উপস্থাপন, ক্লোজিং রিপোর্ট এবং সর্বশেষ চাঁদপুরের আলোচিত ‘কাচ্চি ডাইনিং’-এ রাতের ডিনার। অনুভূতি প্রকাশে ২০২৩ সালে মাইনুল ইসলাম মানিকের সাথে কাফী ভাইয়ের ভুলের অবসানে করতালিতে ভ্রমণের স্বার্থকতা ও ২০২৫-এ নুরুন্নাহার মুন্নীর ভ্রমণে অংশ নিতে না পারার আফসোস সাহিত্য সমাজের আগামী প্রীতি-ভ্রমণ আকর্ষণীয় হয়ে আছে। মোখলেছুর রহমান ভূঁইয়া : নির্বাহী সদস্য, সাহিত্য একাডেমি, চাঁদপুর।








