প্রকাশ : ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৯:৩৭
খণ্ডে খণ্ডে অখণ্ড জীবন

(পঞ্চান্নতম পর্ব)
আমার দেখা বিশ্বকাপ ফুটবল
উৎসাহ আর আবেগের দৌড়ে বাঙালি কারও চেয়ে পিছিয়ে নেই কোনোমতে। বরং ক্ষেত্র বিশেষে এগিয়েই থাকে। হুজুগ আর আবেগের বিষয় নির্বাচন করতে গেলে নির্দ্বিধায় বিশ্বকাপ ফুটবলের উন্মাদনা শীর্ষেই থাকবে। ইংরেজরা এ খেলার জনক হলেও (মতান্তরে চীন) তৃতীয় বিশ্বের দারিদ্র্য পীড়িত অনাহারক্লিষ্ট দেশগুলোতে এর প্রভাব গগনচুম্বী। দলকে সমর্থন করা নিয়ে এখানে প্রাণহানি ঘটে। প্রিয় দলের পতাকা বানাতে না খেয়ে থাকা মানুষগুলোই জমি বিক্রি করে টাকার যোগান দেয়। ঊনিশশো তিরিশের সূচনার পর প্রতি চার বছর অন্তর অন্তর বিশ্বকাপ ফুটবলের শুরু হতে শেষ পর্যন্ত বাঙালিকে এক বিশেষ জ্বরে পেয়ে বসে। এ জ্বরের নাম ফুটবল জ্বর দিলে মোটেই বাড়িয়ে বলা হয় না। এ জ্বরের কোনো ঔষধ নেই এবং যতোদিন খেলা চলে ততোদিন এ জ্বরে আক্রান্ত থাকে বাঙালি। আমি নিজেও এ জ্বরের বাইরে নই।
জন্মের পরে ঊনিশশো চুয়াত্তরে বিশ্বকাপ এলেও আমি ছিলাম দুগ্ধপোষ্য শিশুমাত্র। ফলে তা কী ওই সময় বুঝিনি। আবার ঊনিশশো আটাত্তরে বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হলেও টেলিভিশন না থাকায় তার আঁচ টের পাইনি তেমন করে। পাঁচ-ছয় বছরের শিশুর পক্ষে গভীর রাত জেগে প্রতিবেশীর ঘরে টেলিভিশন দেখার যেমন সুযোগ ছিলো না, তেমনি ঘর হতে অনুমতিও ছিলো না। আমার নিজের চোখে টেলিভিশনে দেখা প্রথম বিশ্বকাপ ছিলো ঊনিশশো বিরাশি সালে। এটা ছিলো স্পেন বিশ্বকাপ। মাস্কটের নাম ছিলো ‘নারানজিটো’। এর মানে ছোট কমলা। ঊনিশশো বিরাশির বিশ্বকাপে ব্রাজিলের দলটা ছিলো হট ফেভারিট এবং সবাইকে বলতে শুনতাম, ঊনিশশো সত্তরের বিশ্বকাপজয়ী পেলের দলের পরেই এ দলটার শক্তিমত্তা ও সৌন্দর্য। এ দলে ছিলো সক্রেটিস, জিকো, ফ্যালকাও এবং জুনিয়রের মতো বিশ্বকাঁপানো তারকারা। বহুদিন পরে জেনেছিলাম, সক্রেটিস ছিলেন আমার মতোই একজন ডাক্তার। তা জানার পরে তার প্রতি ভালোবাসা আরও বেড়ে যায়। তিনি মূলত মিডফিল্ডার এবং প্লে-মেকার। পায়ে খুব বেশিক্ষণ বল রাখতেন না। তার পায়ে বল গেলেই তিনি ওয়ানটাচে পাস দিয়ে দিতেন সতীর্থকে। জীবকোষের পাওয়ার হাউজ যেমন মাইটোকন্ড্রিয়া, ঠিন তেমনই ব্রাজিলের খেলার মাঠের শক্তি ছিলেন সক্রেটিস। তার সাথে স্ট্রাইকার হিসেবে ছিলেন জিকো, যাকে বলা হতো সাদা পেলে। নিয়তির কেমন বিধান! ব্রাজিলের ইতিহাসে দ্বিতীয় সেরা দল সেবার দ্বিতীয় পর্ব থেকেই বিদায় নেয়। গ্রুপ পর্বের সব ম্যাচে দুর্দান্ত ও নান্দনিক ফুটবল খেলে ব্রাজিল সবক’টা প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করে। দ্বিতীয় পর্বে চির প্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনাকে তিন-এক গোলের ব্যবধানে সহজে হারিয়ে ইতালির মুখোমুখি হয়। এ খেলায় একটা মজার ঘটনা ঘটে। খেলোয়াড়ি মেজাজ হারিয়ে অপেক্ষাকৃত তরুণ ম্যারাডোনা তিন গোলে পিছিয়ে থাকা অবস্থায় খেলার পঁচাশি মিনিটে ব্রাজিলের জোয়াও বাতিস্তাকে সরাসরি লাথি মারে। এতে বিধি মোতাবেক রেফারি তাকে লাল কার্ড দেখিয়ে মাঠের বের করে দেন। তখনও ম্যারাডোনা এতো জনপ্রিয়তা অর্জন করেনি।
ইউরোপের পাওয়ার ফুটবলের অন্যতম বড়ো বিজ্ঞাপন হলো ইতালি, যারা টোটাল ডিফেন্সের চেয়ে লোকাল ডিফেন্সকে অগ্রাধিকার দেয়। বল যখন যেখানে যার কাছে থাকে তাকে ঘিরেই তাদের লোকাল ডিফেন্স তৈরি হয়। ইতালির সাথে ব্রাজিলের খেলার আগে কেউ পাওলো রসি নামের খেলোয়াড়টিকে চিনতোই না। অথচ তার হ্যাট্রিকের কাছে হেরে যায় ব্রাজিল। তেমন কোনো আহামরি স্ট্রাইকার সে ছিলো না। সে ছিলো সুযোগ সন্ধানী।
তার পজিশন সেন্স ভালো ছিলো। ফলে তিনটা গোলে তার পা ছোঁয়ানো সহজ হয়ে যায়। সক্রেটিস এবং ফ্যালকাও গোল দিলেও এক গোলের ব্যবধানে হেরে গিয়ে কোটি কোটি ভক্তকে কাঁদিয়ে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা কোচ টেলে সান্টানার ব্রাজিল বিদায় নিতে বাধ্য হয়। এ খেলা যখন চলছিলো তখন বাংলাদেশের মানুষ পবিত্র রমজানের সিয়াম পালন করছিলো। ফলে সেহরি খাওয়া এবং খেলা দেখার সময় কাছাকাছি হওয়ায় প্রায় সবাই রাত্রি জাগরণে আগ্রহী হয়ে ওঠে। পরদিন সকালবেলা দশটায় আমি ডিসি হিলের সামনে ফুলকিতে যাই এবং খেলাঘরের আয়োজনে দাবা খেলায় অংশগ্রহণ করি। তখন সবাই পত্রিকা হাতে ব্রাজিলের হেরে যাওয়া নিয়ে আফসোসের আলোচনায় বেদনার্ত হয়ে উঠেছিলো। ইতালি-ব্রাজিলের এ খেলাটি বিশ্বের ফুটবল ইতিহাসে অন্যতম ধ্রুপদী খেলা হিসেবেই বিবেচিত হয়ে আসছে। ইতালির এ দলকে দেখে আমি অনেক খেলোয়াড়কে মনের মধ্যে গেঁথে রেখেছিলাম। পাওলো মালদিনি, গিওসেপ্পে ডোনাডুনি, গোলরক্ষক দিনো জফ, ডিফেন্ডার ফ্রাঙ্কো বারেসি প্রমুখ তখন আমার ঠোঁটেই ঘোরাঘুরি করতো। সেবার ইতালির বিশ্বকাপজয়ী কোচ ছিলেন এনজো বেয়ারজট। তাঁর সম্মানে এরপর ইতালিতেই বর্ষাসেরা কোচের পুরস্কারের নামকরণ করা হয়।
ঊনিশশো ছিয়াশি সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপেও ম্যারাডোনা, সক্রেটিস, জিকো, প্লাতিনিরা মাঠ মাতিয়েছিলেন। ব্রাজিল যথারীতি হট ফেভারিট। আর্জেন্টিনার ম্যারাডোনা তখন প্রচারণার পাদপ্রীপের আলোয়। গ্রুপ পর্বে ব্রাজিল চ্যাম্পিয়ান হয়ে নক আউট পর্বে যায়। বিগনিউ বনিয়েকের পোল্যান্ডকে চার-শূন্য গোলে হারিয়ে সবশেষে কোয়ার্টার ফাইনালে শিল্পের দেশ, ছবির দেশ ফ্রান্সকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে পায়। এখানে বিগনিউ বনিয়েকের কথা এজন্যে বিশেষভাবে উল্লেখ করলাম, কারণ আমার দেখা বাইসাইকেল কিকের ব্যাকভলিতে তার একটা গোল এখনও জীবন্ত হয়ে আছে। বিরাশির বিশ্বকাপে বিগনিউ বনিয়েকের একটা দুর্দান্ত হ্যাট্রিক আর সেই বাইসাইকেল কিক সারাবিশ্বের ফুটবলামোদী মানুষের জন্যে পরম পাওয়া। ফ্রান্সের যে দলটি কোয়ার্টার ফাইনালে ব্রাজিলের মুখোমুখি হয় তাতে দুজন খেলোয়াড় ছিলেন অসাধারণ। একজন হলেন অধিনায়ক মিশেল প্লাতিনি আর অন্যজন হলেন জাঁ টিগানা। তারা তখন ইউরোপ মাতিয়ে বিশ্বসেরা। অপরপক্ষে ব্রাজিল দলের নক্ষত্রমণ্ডলীতে ছিলেন সক্রেটিস, জিকো, জুনিয়র, ফ্যালকাও, ব্রাঙ্কো, কারেকা প্রমুখ। কোচ ছিলেন সেই টেলে সান্টানা। বিশ্ব বিমোহিত এ খেলায় নির্ধারিত সময় এবং অতিরিক্ত সময়ে খেলা এক-এক গোলে অমীমাংসিত থাকে। ব্রাজিলের কারেকা খেলার সতের মিনিটে গোল দিয়ে ব্রাজিলকে এগিয়ে নেন এবং চল্লিশ মিনিটে মিশেল প্লাতিনি তা শোধ করে সমতা আনেন। টাইব্রেকারে ব্রাজিলের সক্রেটিস এবং জুলিও সিজারের শট গোলকিপার বাঁচিয়ে দেয় আর অন্যদিকে মিশেল প্লাতিনির শটকে ব্রাজিলের গোলকিপার ঠেকিয়ে দেয়। ফলে জিকো গোল করতে সমর্থ হলেও ব্রাজিল হেরে যায় তিন-চার গোলের ব্যবধানে। এ খেলাটিকেও ফুটবল বোদ্ধারা বিশ্বসেরা ম্যাচের তালিকায় অগ্রভাগে রেখেছেন।
ছিয়াশির বিশ্বকাপের সবচেয়ে বিখ্যাত ম্যাচ হলো কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ড বনাম আর্জেন্টিনা ম্যাচ। তখন এমনিতেই রাজনৈতিক কারণে ফকল্যান্ড আইল্যান্ড নিয়ে যুদ্ধে মাতায় দেশদুটি বিশ্ব গণমাধ্যমে বেশ সরব ছিলো। যুক্তরাজ্য ফকল্যান্ড আইল্যান্ড কব্জা করতে গিয়ে আর্জেন্টিনার সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। এরই আঁচ লাগে ছিয়াশির মেক্সিকোতে অ্যাজটেক খেলার মাঠে। এই যুদ্ধে দুদিকে দু মহান সারথি ছিলেন গ্যারি লিনেকার ও দিয়েগো আর্মান্ডো ম্যারাডোনা। ম্যারাডোনা অবশ্য পাশে পেয়েছিলেন সোনালি চুলের ক্লউডিয়া ক্যানিজিয়াকে। এখানে গ্যারি লিনেকার সম্পর্কে কিছু কথা না বললেই নয়। ইংল্যান্ডের ইতিহাসে জর্জ বেস্টের পরে গ্যারি লিনেকারই হলেন সবচেয়ে সফল খেলোয়াড়, বিশেষত বিশ্বকাপে। ছিয়াশির বিশ্বকাপে লিনেকার ছয়টা গোল করে বহু আরাধ্য গোল্ডেন বল লাভ করেন, যখন গোল্ডেন বুট যায় ম্যারাডোনার হাতে। কোয়ার্টার ফাইনালে লিনেকার যেমন এক গোল দেয় তেমনি ম্যারাডোনাও এর জবাবে দুগোল দিয়ে আর্জেন্টিনাকে সেমিফাইনালে তোলে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এ খেলায় বহুচর্চিত ‘হ্যান্ড অব গড’ নিয়ে। ম্যারাডোনা প্রথম গোলটিতে হেড দেওয়ার জন্যে লাফিয়ে উঠে নাগাল না পেয়ে হাত দিয়ে অতি সূক্ষ্মভাবে ঠেলে গোল দেন। তখন ভিডিও রেফারিংয়ের সুযোগ না থাকায় কেউ জানতেই পারেনি আদতে গোলটায় হাতের ছোঁয়া ছিলো। পরে ম্যারাডোনা নিজেই তা স্বীকার করেন এবং ঘটনাটাকে নাম দেন হ্যান্ড অন গড। যে যেভাবেই ব্যাখ্যা করুক না কেন, এ ঘটনা সভ্য সমাজে ম্যারাডোনাকে খলনায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। আবার একই খেলায় হ্যান্ড অব গডের ঘটনার চার মিনিট পরে ম্যারাডোনা দিয়ে দেন শতাব্দীর অন্যতম সেরা গোল। এ গোল নিয়ে কয়েক পাতা শেষ করলেও তার সৌন্দর্যের বয়ান শেষ হওয়ার নয়। একই খেলায় মহানায়ক ও খলনায়ক হওয়ার যে বিশ্বরেকর্ড তা কেবল ম্যারাডোনার পক্ষেই সম্ভব হয়েছে। যাই হোক, নানা ঘটন-অঘটন পার হয়ে ছিয়াশির বিশ্বকাপ যায় জার্মানিকে বঞ্চিত করে আর্জেন্টিনার ঘরে। কিন্তু মানুষের কাছে ছিয়াশির বিশ্বকাপ শুধুই ম্যারাডোনার। এখানে আর কারও ভাগ নেই।
ছিয়াশির বিশ্বকাপে মূল চরিত্র ম্যারাডোনা হলেও মুখ্য মুখ ছিলেন তাদের কোচ কার্লোস বিলার্দো। গণমাধ্যমে এবং ফুটবল ভক্তদের ডাকে তিনি ‘এল নারিগন’ বা বড় নাকওয়ালা নামে পরিচিত। সক্রেটিসের মতো তিনিও একজন চিকিৎসক ছিলেন। তাকে খেলার সময় কখনও চুপ থাকতে দেখা যায়নি। সব সময় তার মুখটা নড়তো। এজন্যে মাঝে মাঝে রেফারি তাকে সতর্কও করে দিয়েছেন। কিন্তু কে শোনে কার কথা। তিনি ডাগ আউট থেকে উঠে এসে মাঠের সাইড লাইনে দাঁড়িয়ে অনবরত শিষ্যদের উদ্দেশ্যে করণীয় বর্ষণ করতেন। আর্জেন্টিনার খেলায় এ রকম বকবকানো মানুষটাকে না দেখলে অনেকের মন খারাপ হতো। যেই ক্যামেরায় তাকে দেখা যেতো অমনি ভক্তকূলে স্বস্তি ফিরে আসতো। কার্লোস বিলার্দো অবশ্য এরপরে ঊনিশশো নব্বই সালের দল নিয়েও বিশ্বকাপের রঙ্গমঞ্চে উপস্থিত হয়েছিলেন। (চলবে)







