প্রকাশ : ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৯:৩৫
আল মাহমুদের শৈশব কৈশোর এবং লেখার অনুপ্রেরণা

কবি আল মাহমুদের পুরো নাম মীর আব্দুস শুকুর আল মাহমুদ। সাহিত্য জগতে আল মাহমুদ নামে পরিচিত। আল মাহমুদের ডাক নাম ছিলো পিয়ারু। তাঁর পূর্ব পুরুষগণ ইসলাম প্রচারক দলের সাথে বাংলাদেশে আসেন ফিরোজ শাহের সিলেট ও উত্তর কুমিল্লা দখলেরেও দুশো বছর পর। কাইতলার মীরদের একটি শাখায় জন্ম কবি আল মাহমুদের। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মৌড়াইল মোল্লা বাড়িতে কবির জন্ম। বাবার নাম মীর আব্দুর রব এবং মায়ের নাম রওশন আরা মীর। আল মাহমুদের দাদা মীর আব্দুল ওহাব ছিলেন কবি, যিনি আরবি, ফারসি ভাষায় ছিলেন পণ্ডিত। লিখতেন জারি গান। আল মাহমুদের মা ছিলেন সিলেট শায়েস্তাগঞ্জ এলাকার এক জোরদারের মেয়ে। দাদীর পান খাওয়া লাল ঠোঁট আর তাঁর মুখনিঃসৃত অনন্য সব রূপকথা শুনে শুনে বড়ো হয়েছেন কবি আল মাহমুদ। ছোটবেলায় তাঁকে কোন্ বাড়ির ছেলে বললেই, তিনি মোল্লা বাড়ির সুন্দর উঁচু ঘর দেখিয়ে বলতেন, ওটাইতো আমাদের বাড়ি। কবির যাযাবরী ভগ্নি এবং শিক্ষয়িত্রী ছিলেন আলকি। আলকির কাছে কবি এক মানবীয় প্রতিচ্ছবি দেখতে পেয়েছিলেন। ছোটবেলায় মহরমের মাস কবির মনে দাগ কাটতো। বাড়ির মেয়েরা আশুরার সময় মর্সিয়া গাইয়েদের এনে শোকগাথা শুনতো সবাই। নাগারচির বাজনা আর আর হ্যাজাকের আলোয় রাতে লাঠিখেলা হতো কবির বাড়িতে মহরমের মাসে। বাড়ি থেকে কোয়ার্টার মাইল দূরে তিতাস নদীতে স্নান আর সাঁতার কেটে বড়ো হয়েছেন কবি আল মাহমুদ। জন্ম ১১/০৭/ ১৯৩৬ খ্রি. এবং মৃত্যু ১৫/০২/২০১৯ খ্রি.। মোল্লা বাড়ির পিয়ারু যখন সকালে ঘুম থেকে উঠতেন, সঙ্গীতের শহর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ঘরে ঘরে ছোট ছেলেমেয়েদের সুর সাধার শব্দ শুনে মুগ্ধ হতেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে জন্ম নিলেও ঢাকাকেই নিজ শহর হিসেবে বেশি ভাবতেন পিয়ারু। কবির ভাষায়, ‘যে শহর জন্ম দেয়, জীবিকা দিতে পারে না, সে শহর থেকে জীবিকাদাত্রী শহরকেই মাতৃতুল্য আপন নগরী মনে করি আমি। আমি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জন্মে শুধু কৈশোরকাল কাটিয়েছি। কিন্তু ঢাকা আমাকে দিয়েছে যৌবনের বিস্ময়, প্রেম, খ্যাতি ও কবিতা। দিয়েছে সাহিত্যিক ঈর্ষা এবং কথা বলার অধিকার।’ গদ্যপাঠে শফি স্যারের স্পষ্ট ও সুন্দর উপমা পরবর্তীতে কবির সাহিত্যজীবনে কাজে লেগেছিলো বেশ। কবির প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এম. ই. স্কুলে। অংকের প্রতি ছিলো তার অবহেলা। এর জন্যে কবির আফসোস ছিলো। স্কুলে ভর্তি হওয়ার প্রথম দিন থেকেই কবি বুঝতে পেরেছিলেন তিনি মুসলমান হওয়ার কারণে সংখ্যাগুরু সহপাঠীদের অবহেলার পাত্র। ফলে প্রায়ই মাথা ফাটাফটির মতো ঘটনা ঘটতো। কবি তাঁর আত্মজীবনী ‘যেভাবে বেড়ে উঠি’ গ্রন্থে আরো লিখেছেন, এম ই স্কুলে মুসলমানদের নেতা ছিলেন বাহাদুর হোসেন খাঁ, যিনি এ উপমহাদেশের বিখ্যাত সরোদ বাদক হয়েছিলেন । আল মাহমুদের ভাষায়, ‘হিন্দু ছেলেরা বাহাদুর হোসেন খাঁর নাম বিকৃত করে বাদুইরা বলে ডাকতো। স্কুলে ঠিকমত গেলেও গুলতি দিয়ে পাখি শিকারের নেশা ছিলো আল মাহমুদের। রোমাঞ্চকর বই পড়ার অভ্যাস ছিলো তাঁর নেশার মতো। কিশোর বয়সে তিনি শুনেছিলেন ভাষাই মানব সন্তানের ব্যক্ত হওয়ার একমাত্র উপায়। সে সময় কবি বইয়ের দোকান আর সাধারণ গ্রন্থাগারে যাতায়াত করতে লাগলেন। একসময় কবি বাজে বই ছেড়ে গল্পের বই পড়তে শুরু করলেন।
আল মাহমুদ তাঁর ‘যেভাবে বেড়ে উঠি’ গ্রন্থে লিখেছেন, আমার অসম্ভব বই পড়ার অভ্যাস দেখে আব্বা আম্মা চিন্তিত হতে লাগলেন বয়ঃসন্ধিকালে । কবি যখন একা থাকতেন তখন সহানুভূতি জানাতে তাঁর পাশে দাঁড়াতেন কবির যুবতী ফুফাতো বোন সাদেকা, কবি যাকে সাদু বুবু বলে ডাকতেন । আদরে আর ভালবাসার আবেগ-আতিশয্যে সাদেকার বিয়ে ঠিক হলে একদিন কবি তাঁকে বলেছিলেন, ‘সাদু বুবু আমিই তোমাকে বিয়ে করবো’ । সাদু বুবুও সেদিন তাকে বলেছিলেন, ‘আমাকে এতো ভালবাসিস যদি তবে আমার ছোট হয়ে জন্মালি কেন?’
বই খুঁজতে খুঁজতে কবির সাথে যেসব মানুষের পরিচয় ও বন্ধুত্ব হয়েছিলো তারা ছিলো তার অসমবয়সী । এ তালিকায় ছিলো স্কুলের মাস্টার, কেরানী, বড়ো ব্যবসায়ী, সরকারি কর্মচারীর মেদবহুল স্বাস্থ্যবান স্ত্রী, বিধবা নারী যার স্বামী ছিলো স্বরাজ আন্দোলনের নেতা। ঐ বিধবা মহিলা ও তার বোন শোভার সাথে রেলস্টেশনে দেখা ও তাদের বাড়িতে নিয়ে আসা। ভদ্র মহিলা ছিলেন হিন্দু বৈদ্য যিনি আল মাহমুদের বিস্ময়কর বইয়ের পুলকিত দরজা খুলে দিয়েছিলেন। দেশী-বিদেশী অগণিত বইয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন এই নারী। ঐ নারীর বাড়িতে ছিলো অনন্য সব বইয়ের সমাহার। ঐ নারী পিয়ারুর মায়ের কাছে তার প্রশংসা করে বলেছিলেন, ‘জ্ঞানে যারা তৃপ্তি পায়, তাদের নাকি ক্ষুধা-তৃষ্ণা থাকে না, আমার স্বামী বলতেন।’ কবিও বিধবা নারী ও তার বোন শোভাকে তাদের বাড়ি পৌঁছে দিতে গিয়ে তাদের বাড়িতে থেকেছিলেন। শোভার সাথে কবির একসময় ভাব হয়ে যায় । তারপর কবি কতো চাঁদনী রাতে শোভার সাথে কুরু মিয়া ব্রিজে দাঁড়িয়ে থেকেছিলেন তা দেখে লোকে নানা ভাবনা ভাবতো । কবি নিজেই বলেছেন, শোভার কাছ থেকে পালিয়েও থাকতে পারিনি । তা আমার পক্ষে সম্ভব ছিলো না। এর কারণ প্রেম কি না জানি না। শোভাদের বাড়ি থেকে লালমোহন পাঠাগারের ঠিকানা পেয়েছিলেন কবি। শোভা তাঁকে ‘ইতিহাসের ধারা’ ও শোভার দিদি ‘রাইকমল’ বই উপহার দিয়েছিলো। এরপর থেকে কবি নিয়মিত লালমোহন পাঠাগারে যাতায়াত করতেন। সেখানে পরিচয় হয় কানুদার সাথে। এন্ডারসন ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে কবি ভাবতেন শোভার চেয়ে সুন্দরী মেয়ে পৃথিবীতে নেই। লালমোহন পাঠাগারে যাতায়াতের সুবাদে কবি মার্কসীয় চিন্তাধারায় আকৃষ্ট হন। তখন কবির আচরণ বদলে যেতে থাকে। আল্লাহর ভয় বুক থেকে পালাতে লাগলো । কবি তাঁর আসল প্রচারক পূর্বপুরুষের কথা ভুলে যেতে লাগলেন। একবার কবির খ্রিস্টান বন্ধু শিশির সিংহ তাঁর কবিতা শুনে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে জীবনানন্দ দাশের ‘মহাপৃথিবী’ বইটি উপহার দিয়েছিলো। মহাজীবন গ্রন্থের কবিতা পড়ে বিশাল উত্তেজনায় কেঁপেছিলো কবির শরীর। শুরু করলেন কবিতা লেখা। শুরু করলেন নতুন জীবন। শব্দের গন্ধ টের পেলেন তখন আল মাহমুদ।
কবির প্রথম কবিতার শ্রোতা ছিলেন কবির চাচাত বোন হানু। হানুরও পড়ার অভ্যাস ছিলো ভীষণ । সেই সময় কবির লেখার পর প্রথম হানুকে পড়তে দিতো কবি। সে তাঁর লেখার প্রশংসা করতো। বিখ্যাত কবি ও লেখক মাহফুজ উল্লাহর কাছ থেকে ছন্দ ও তাল সম্পর্কে প্রথম ধারণা পেয়েছিলেন । তিনি আল মাহমুদকে ছন্দের সাধারণ নিয়মগুলো ধরিয়ে দিয়েছিলেন। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের উত্তাল দিনের ঢেউ লেগেছিলো ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। তখন আল মাহমুদ তাজুল ও মুসার সাথে যোগ দিয়েছিল ভাষা আন্দোলনে। সেই সময়ে ভাষা আন্দোলনের লিফলেটে কবির অজান্তেই কবির কবিতার চার লাইন ছেপে দেয়া হয়েছিলো। তখন আল মাহমুদ রাস্তায় ও ট্রেনে ভাষা কমিটির জন্যে চাঁদা তুলতে বক্তৃতা ও যুক্তি দিতেন। একবার কবি তেলিয়াপাড়ায় ফুফুর বাসায় বেড়াতে গিয়ে এক চা শ্রমিকের দুঃখগাথা শুনে বলেছিলেন, ‘কবিদের কাজও কুলিদের মতো । উভয়েই চায় খারাপ জিনিস থেকে বেছে যা কিছু কচি ও কোমল তা আলাদা করে ফেলতে। কুলিরা কচি পাতা বাছে, আমরা কোমল শব্দ বাছি।’
এস ডি সুব্রত : কবি ও প্রাবন্ধিক, সুনামগঞ্জ। নিলয় ১৭৪/৩ পূর্ব নতুন পাড়া, সুনামগঞ্জ।







