প্রকাশ : ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৯:৩৪
সাহিত্যে প্রবীণ জীবন-করুণার নয়, সম্মানের পুনর্দাবি

সাহিত্য কেবল কল্পনার বিনোদন নয়, এটি সমাজের বিবেক ও সময়ের দলিল। যে সমাজ সাহিত্যে যাদের স্থান দেয়, বাস্তবেও তাদের গুরুত্ব স্বীকার করে। কিন্তু দুঃখজনক সত্য হলো—আমাদের সাহিত্যে প্রবীণ জীবন এখনো সম্মান ও মর্যাদার পূর্ণ স্বীকৃতি পায়নি। প্রবীণ চরিত্র যেন সাহিত্যের মূল মঞ্চে নয়, বরাবরই প্রান্তিক এক উপস্থিতি। এই অনুপস্থিতি কেবল সাহিত্যিক সীমাবদ্ধতা নয়, বরং আমাদের সামগ্রিক সামাজিক মানসিকতার প্রতিফলন।
সাহিত্যের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, অধিকাংশ কবি ও সাহিত্যিক যৌবনের জয়গানেই মগ্ন থেকেছেন। প্রেম, বিপ্লব, শরীরী আকাঙ্ক্ষা, বেদনা, বিদ্রোহ—এসব বিষয় সাহিত্যের প্রধান উপজীব্য হয়েছে। যৌবনের উচ্ছ্বাস ও ভাঙনের নাটকীয়তা পাঠককে সহজে আকর্ষণ করে, এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ ও গভীর অধ্যায়—বার্ধক্য—কেন সাহিত্যে এতো অবহেলিত?
কিছু সাহিত্যিক অবশ্য প্রবীণদের দুঃখ-কষ্ট ও দুর্দশার চিত্র এঁকেছেন। নিঃসঙ্গতা, অবহেলা, অসুস্থতা, দারিদ্র্য—এই বাস্তবতাগুলো সাহিত্যে উঠে এসেছে। কিন্তু সমস্যা হলো, প্রবীণ চরিত্রকে প্রায়শই কেবল করুণার বস্তু হিসেবেই উপস্থাপন করা হয়েছে। তাঁদের শক্তি, আত্মমর্যাদা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, জীবনদর্শন—এসব দিক অনেক সময় উপেক্ষিত থেকে গেছে। ফলে সাহিত্যে প্রবীণ মানেই দুর্বল, নির্ভরশীল ও পরাজিত এক চরিত্র।
এই প্রবণতা আমাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিরই সম্প্রসারণ। আমরা এমন এক সমাজে বাস করি, যেখানে বয়স বাড়াকে অকার্যকর হয়ে যাওয়ার সমার্থক ভাবা হয়। কর্মক্ষমতা, সৌন্দর্য ও গতিশীলতাকে জীবনের একমাত্র মানদণ্ড বানানো হয়েছে। সাহিত্যও এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পুরোপুরি মুক্ত হতে পারেনি। তাই প্রবীণ চরিত্র সাহিত্যে খুব কম ক্ষেত্রেই মর্যাদার আসনে বসতে পেরেছে।
অথচ প্রবীণ জীবন মানেই শেষ হয়ে যাওয়া নয়। বরং এটি জীবনের সবচেয়ে সংবেদনশীল ও প্রজ্ঞাপূর্ণ সময়।
প্রবীণরা জানেন হারানোর অর্থ, অপেক্ষার মূল্য, সময়ের নিষ্ঠুরতা ও ক্ষমতার ক্ষণস্থায়িত্ব। তাঁদের স্মৃতিতে থাকে ইতিহাস, অভিজ্ঞতায় থাকে উপলব্ধি, নীরবতায় থাকে গভীর দর্শন। এই উপাদানগুলো সাহিত্যকে আরও গভীর, আরও মানবিক করে তুলতে পারে—যদি লেখকরা সেই চোখে দেখতে শেখেন।
সাহিত্যে প্রবীণ চরিত্রকে সম্মানের সঙ্গে তুলে ধরার অর্থ এই নয় যে তাঁদের কষ্ট লুকিয়ে রাখতে হবে। বরং কষ্টের মধ্যেও তাঁদের দৃঢ়তা, আত্মসম্মান, নৈতিক অবস্থান ও মানবিক সৌন্দর্যকে তুলে ধরতে হবে। প্রবীণ চরিত্র হতে পারেন গল্পের কেন্দ্রীয় নায়ক, নীরব প্রতিবাদী, নৈতিক বাতিঘর কিংবা জীবনের সাক্ষী—কেবল করুণার প্রতীক নয়।
আজকের সমাজে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। পরিবার কাঠামো বদলাচ্ছে, যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবার গড়ে উঠছে। এই বাস্তবতায় প্রবীণ জীবন আরও দৃশ্যমান, আরও সংকটময়। সাহিত্য যদি এই বাস্তবতাকে সম্মানের সঙ্গে ধারণ না করে, তবে তা সময়ের সঙ্গে তাল হারাবে। একই সঙ্গে তরুণ পাঠকদের কাছেও প্রবীণ চরিত্র গুরুত্বপূর্ণ—কারণ এখান থেকেই তারা নিজেদের ভবিষ্যৎকে বুঝতে শেখে।
এই অধ্যায়ের মাধ্যমে সাহিত্যিকদের কাছে একটি স্পষ্ট আহ্বান জানানো জরুরি—প্রবীণ জীবনকে সাহিত্যের প্রান্ত থেকে মূল মঞ্চে ফিরিয়ে আনুন। বয়সকে দুর্বলতা নয়, অভিজ্ঞতার শক্তি হিসেবে দেখান। প্রবীণ চরিত্রের কণ্ঠকে দৃঢ় করুন, তাঁদের উপস্থিতিকে অর্থবহ করে তুলুন। এতে সাহিত্য শুধু মানবিক হবে না, আরও সত্যনিষ্ঠ ও পরিপক্ব হয়ে উঠবে।
একটি সভ্য সমাজ সেই সমাজই, যে সমাজ তার প্রবীণদের সম্মান দিতে জানে। আর সেই সম্মান যদি সাহিত্যে প্রতিফলিত না হয়, তবে সাহিত্য তার নৈতিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়। প্রবীণ জীবনকে মর্যাদার সঙ্গে তুলে ধরা মানে জীবনের পূর্ণ বৃত্তকে স্বীকার করা।
শেষ পর্যন্ত বলা যায়, যৌবনের আলো যেমন প্রয়োজন, তেমনি বার্ধক্যের নীরব দীপ্তিও অপরিহার্য। এই দুয়ের সমন্বয়েই সাহিত্য পূর্ণতা পায়। এখন সময় এসেছে—করুণার নয়, সম্মানের আসনে প্রবীণ জীবনকে সাহিত্যে প্রতিষ্ঠা করার। এই অধ্যায় সেই দাবি ও দায়িত্বেরই একটি বিনীত অথচ দৃঢ় উচ্চারণ।







