প্রকাশ : ২০ জুন ২০২৬, ০৮:০২
শিশুর নিরাপত্তায় গুড টাচ্ এবং বেড টাচ্ সম্পর্কে সচেতনতা ও করণীয়

শিশুদের সাথে কথা বলতে হবে সহজ সাবলীল ভাষায়।কঠিন কথাকে সহজভাবে উপস্থাপন করার ক্ষমতা কেবল পাণ্ডিত্য নয়, এটি একটি অনন্য শিল্প। মার্জিত শব্দচয়নই একজন মানুষের ব্যক্তিত্বের আসল দর্পণ।শব্দ দিয়ে মানুষকে জয় করা যায়, আবার শব্দ দিয়েই দূরত্বের সৃষ্টি হয়। সুন্দর করে কথা বলা এবং সঠিক শব্দের প্রয়োগই মানুষকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।
প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই শিশুদের ‘গুড টাচ’ (নিরাপদ স্পর্শ)এবং ‘ব্যাড টাচ’ (অনিরাপদ স্পর্শ)সম্পর্কে স্পষ্ট ও সহজ ভাষায় ধারণা দেওয়া অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং জরুরি একটি বিষয়। শিশুরা সরল ও অবুঝ হওয়ায় অনেক সময় নিজেদের সাথে ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা বুঝতে বা কাউকে বলতে পারে না।
প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে এই বিষয়ে সচেতনতা তৈরির মূল কারণগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
১.। আত্মরক্ষা ও সচেতনতা তৈরি
শিশুরা সাধারণত পরিচিত বা অপরিচিত সবার আচরণকেই স্বাভাবিক মনে করে। গুড টাচ এবং ব্যাড টাচের সুস্পষ্ট পার্থক্য বুঝতে পারলে তারা বুঝতে পারে কোন স্পর্শটি ভালোবাসার আর কোনটি ভয়ের বা অস্বস্তির। এই জ্ঞান তাদের নিজেদের শরীর সম্পর্কে সচেতন করে এবং যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি থেকে নিজেদের রক্ষা করতে সাহায্য করে।
২ । গোপনীয়তা এবং নিজের শরীরের ওপর অধিকার
শিশুদের খুব ছোট থেকেই শেখানো উচিত যে, তাদের শরীর সম্পূর্ণ তাদের নিজস্ব।
৩ । সুইমস্যুট রুল
শিশুদের সহজে বোঝানোর জন্য বলা যায়Ñশরীরের যেসব অংশ আমরা পোশাক বা সাঁতার কাটার পোশাক দিয়ে ঢেকে রাখি, সেগুলো অত্যন্ত ব্যক্তিগত।
* চিকিৎসক (বাবা-মায়ের উপস্থিতিতে) ছাড়া অন্য কারো এই অংশগুলোতে স্পর্শ করার বা দেখার কোনো অধিকার নেইÑএই বিষয়টি স্পষ্ট করা জরুরি।
৪ । ভয় ও নীরবতা ভাঙা
অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিশুরা কোনো খারাপ অভিজ্ঞতার শিকার হলে ভয়ে বা অপরাধবোধে চুপ হয়ে যায়। কারণ তারা বুঝতে পারে না দোষটি আসলে কার। স্কুল থেকে যখন শিক্ষকরা এই বিষয়ে খোলামেলা কথা বলেন, তখন শিশুরা অভয় পায়। তারা বুঝতে শেখে যে এমন কিছু ঘটলে দোষ তাদের নয় এবং এটি লুকিয়ে না রেখে বড়দের জানানো উচিত।
৪। নিরাপদ মানুষ চিহ্নিত করা
শ্রেণীকক্ষে এই বিষয়ে আলোচনার সময় শিশুদের শেখানো হয় যে, যদি কখনো তারা কোনো অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়, তবে তারা যেন তাৎক্ষণিকভাবে ৩টি কাজ করে:
১. না বলা
জোরালো গলায় “না” বলা বা চিৎকার করা।
২. পালিয়ে যাওয়া
সেই স্থান থেকে দ্রুত সরে যাওয়া।
৩ . কাউকে বলা
বিশ্বাসযোগ্য কোনো বড় মানুষকে জানানো।
বিদ্যালয় থেকেই তাদের শিখিয়ে দেওয়া দরকার যে তাদের বাবা-মা, শিক্ষক বা নির্ভরযোগ্য কোনো ব্যক্তিই হলেন তাদের ‘নিরাপদ মানুষ’/ সেফ জোন যাদের কাছে তারা যেকোনো গোপন কথা নির্দ্বিধায় বলতে পারে।
৫। শিক্ষক ও বিদ্যালয়ের দায়িত্ব
যেহেতু শিশুরা দিনের একটি বড় সময় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কাটায়, তাই শিক্ষকদের প্রতি তাদের গভীর বিশ্বাস থাকে। অনেক সময় যে কথাটি তারা বাবা-মার কাছে বলতে দ্বিধা বোধ করে, তা একজন স্নেহশীল শিক্ষকের কাছে সহজে বলে ফেলে। তাই প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে এই সচেতনতা তৈরি করা প্রতিটি বিদ্যালয়ের অন্যতম সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ব।
শিক্ষকদের জন্য পরামর্শ (শিক্ষার্থীদের যেভাবে বলবেন):
১। বিষয়টি শিশুদের শেখানোর সময় কোনো প্রকার ভীতি বা জটিল বৈজ্ঞানিক শব্দ ব্যবহার না করে
২। গল্প, ছড়া, পুতুল বা ছবির মাধ্যমে
অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে উপস্থাপন করা উচিত। যেমনÑমা যখন মাথায় হাত বুলিয়ে দেন বা শিক্ষক যখন পিঠ চাপড়ে সাবাশ বলেন, সেটা গুড টাচ। কিন্তু কেউ যদি এমনভাবে স্পর্শ করে যা তোমার ভালো লাগে না বা তোমাকে ভয় দেখায়, সেটাই ব্যাড টাচ।
প্রাথমিক স্তর থেকেই এই বুনিয়াদি শিক্ষা দেওয়া গেলে শিশুদের শৈশব যেমন নিরাপদ হবে, তেমনই একটি সচেতন ও সুরক্ষিত প্রজন্ম গড়ে তোলা সম্ভব হবে। এক্ষেত্রে শ্রেণী কক্ষে শিশুদের শুধু লেকচার দেওয়াই শেষ কথা নয়, শিক্ষককে ক্লাসরুমের পরিবেশ এমন রাখতে হবে যেন শিশুরা আশ্বস্ত বোধ করে।
নিরাপদ সার্কেল তৈরি
বোর্ডে একটি বৃত্ত এঁকে সেখানে মা, বাবা, শিক্ষক ও নির্ভরযোগ্য আত্মীয়দের নাম লিখুন। শিশুদের জানান, এরা তাদের নিরাপদ মানুষ। যেকোনো সমস্যায় এদের কাছে নির্দ্বিধায় বলা যাবে।
বন্ধুসুলভ আচরণ ও ধৈর্য ধরে শোনা
কোনো শিশু যদি কখনো একা এসে শিক্ষককে কোনো অস্বস্তিকর ঘটনার কথা বলতে চায়, তবে শিক্ষককে অত্যন্ত ধৈর্য ধরে, স্নেহের সাথে তার কথা শুনতে হবে। শিশুকে কোনোভাবেই ধমক দেওয়া বা থামিয়ে দেওয়া যাবে না।
শিশুর আচরণ পর্যবেক্ষণ করা: কোনো শিশু হঠাৎ ক্লাসে খুব চুপচাপ হয়ে গেলে, একা একা থাকলে, পড়াশোনায় মনোযোগ হারিয়ে ফেললে বা স্কুল আসতে ভয় পেলে শ্রেণী শিক্ষক হিসেবে তার সাথে আলাদাভাবে পরম স্নেহে কথা বলতে হবে। কারণ এগুলো ট্রমা বা কোনো খারাপ অভিজ্ঞতার লক্ষণ হতে পারে।
অভিভাবক সমাবেশ
মা-বাবার সাথে মিটিংয়ের সময় তাদেরও অনুরোধ করা যেন তারা ঘরে শিশুদের সাথে প্রতিদিন খোলামেলা কথা বলেন এবং শিশুদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন।
এই বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে কোনো দ্বিধা বা লজ্জা কাজ করতে দেওয়া যাবে না। একজন শিক্ষকের একটু সচেতনতা ও সঠিক দিকনির্দেশনা একটি কোমলমতি শিশুকে বড় কোনো বিপদ থেকে আজীবন সুরক্ষিত রাখতে পারে।
রোকেয়া সুলতানা : প্রধান শিক্ষক, হাজীগঞ্জ মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং চাঁদপুর জেলার শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক ২০২৬।






