রবিবার, ০৭ জুন, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ০৬ জুন ২০২৬, ০৯:৫৮

ধারাবাহিক উপন্যাস-৪৪

নিকুঞ্জ নিকেতন

রাজীব কুমার দাস
নিকুঞ্জ নিকেতন

(পূর্ব প্রকাশের পর)

২৫.

আজ বহুদিন পর পার্কে আসা হলো সারোয়ার-পিটার সহকারে। পার্কের বেঞ্চিটার কাছে এসে আমরা কেহই বসছি না দাঁড়িয়ে আছি। চিরচেনা সেই বাদামগাছ, পার্কের রাস্তা, রাস্তায় থাকা ডাবওয়ালা, চায়ের দোকানি, আমরা সকলেই আছি শুধু নেই আমাদের নতুনভাবে বাঁচিয়ে তোলা সেই মানুষটা। সারোয়ার বেঞ্চিটা ছুঁয়ে দেখছে তারপর হঠাৎ কেঁদে ফেলে। আমাদেরও মনের অবস্থা তার মতো, কান্নাও আসছে অথচ কাঁদছি না কিন্তু চোখ ছলছল ঠিকই করছে।

‘সারোয়ারÑদাদার বেঁচে থাকার মূল মন্ত্রটা কী ভুলে গেলে?’

‘না অনিমেষ ভুলিনি তবে হারানোর ব্যথাটাকেও যে সইতে পারছি না। এই সেই বেঞ্চি যেখানে আমি খুঁজে পেয়েছিলাম তাকে। আজ সবই আছে শুধু সে নেই।’

‘সারোয়ার খেয়াল আছে সেন্টমার্টিনের সেই রাতের কথা যখন পিটার কেঁদেছিল।’

‘হ্যাঁ।’

‘আমরা দুজনে কটেজে আসার পর অনেক রাত অবদি জেগে ছিলাম। তখন দাদা বলেছিলÑ“অনিমেষ এই জীবনের গণিতটা বড়ই জটিল। এখানে আমরা যেমন ভাবি সেটা হয় না আর যা হয় সেটা ঐ নটমঞ্চের রূপকারের ইচ্ছা। তিনি যেভাবে চালান আমরা সেভাবেই চলি। একটা কথা মনে রেখ জীবন কখনো কারো জন্য থেমে থাকে না। আমরা কখনো না কখনো এক এক করে হারিয়ে যাব। কারো বিহনে অন্যদের জীবন যেন থেমে না থাকে, তবেই জীবনের সার্থকতা। সৃষ্টির নিয়মে এই পৃথিবী থেকে প্রতিনিয়ত কত মানুষ হারিয়ে যাচ্ছে শুধু থেকে যায় মায়ার বাঁধন। সময় যতই গড়িয়ে যায় বাঁধনটা ছিন্ন হতে হতে তারপর স্মৃতির রূপ নেয়”। সেদিন বুঝতে পারিনি কথাগুলো তার জীবনের সাথেই সম্পর্ক গড়ে তুলবে। দাদার বেঁচে থাকার মূল মন্ত্র মনে গেঁথে নাও তারপর এসো আরেকবার বাঁচার চেষ্টাটা করি।’

আজ বহুদিন পর বাসার বাইরে রাজীবকে নিয়ে আসা হলো। কাকাবাবুর শ্রাদ্ধ-শান্তির পর রাজীবের এবার যাওয়ার পালা। মা তাকে বলেছিল আর কিছুদিন থেকে যেতে অথচ রাজীব তাতে রাজি না। আমি জানি তার জীবনে এটা একটা বিপর্যয় যা তাকে সামলে নিতে হবে। এখানে থাকলে না হয় আপনজনদের সহানুভূতি ও ভালোবাসায় সেটা রিকোভারি করতে পারত কিন্তু দূর দেশে কে আছে তাকে ভরসা দেবার। হাঁটতে হাঁটতে আমরা মাঠের সেই বটতলায় এসে বসি।

‘মা বলেছিল তোমায় আরও কয়েকটা দিন থেকে যেতে। ইচ্ছে করলেই তো পার।’

‘ইচ্ছেটাই তো নেই। কেন থাকব আর কার জন্য থাকব।’

‘কবে যাচ্ছ?’

‘আগামী কালকে রাত এগারোটায় ফ্লাইট।’

‘আবার কবে ফিরবে?’

‘জানা নেই।’

‘কাকাবাবুর কিছু আমানত আমার কাছে রেখেছিলেন আর বলেছিলেন তোমায় দিয়ে দিতে।’

‘কী সেটা?’

‘উনার ডায়েরিগুলো।’

‘হ্যাঁ সেগুলো আমায় দিয়ে দিতে পারিস। কোথায় আছে?’

‘আমার কাছে। কাকাবাবু হাসপাতালে থাকাকালীন আমায় বলে গেছেন সেগুলো যেন তোমায় দিয়ে দেই।’

‘ঠিক আছে, আমায় দিয়ে দিস আমি নিয়ে যাব।’

কত সহজে বলে ফেলেছে কার জন্য আসব। আমি বাক্যটার উত্তর দেওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলাম অথচ উত্তরগুলো যথার্থ কী না সেটাই জানি না। তাকে আটকে রাখার জন্য আমাদের মাঝে সেরকম দৃঢ় বন্ধনও তো নেই যে চাইলেই চটজলদি আঁটকে রাখতে পারি। অনুভূতিগুলো আজও সেরকম আছে তবে অধিকারের জায়গাটা তৈরি হয়নি।

‘জানিস বিশাখা আমি এ পৃথিবীর সবচেয়ে অভাগা কারণ বাপির একটা ভালো ছেলে আমি হতে পারিনি।’

‘হঠাৎ এমনটা কেন মনে হচ্ছে তোমার?’

‘বাবার ইচ্ছে-আগ্রহকে কখনো বুঝতে চেষ্টা করিনি। আমি সবসময় উনার কাছে অপরাধী থাকব আর সেজন্যই শেষ বেলায় বিধাতা আমার হাতে জলটুকু গ্রহণ করতে দিলেন না।’

‘এ কী তুমি এসব কবে থেকে বিশ্বাস করা শুরু করলে! শোন তুমি কতটুকু ভালো বা মন্দ তোমার চেয়ে ভালো কেহ জানে না তবে এটা বলতে পারি তুমি সবসময়ই যোগ্য সন্তান হয়ে থাকতে চেষ্টা করেছ।’

‘আমাকে মিথ্যে আশ্বাস দিস না প্লিজ। আচ্ছা একটাবার বল তো দেখি আমার ভুলটা কোথায় ছিল?’

‘ভুল শুদ্ধ আমি বলতে পারব না তবে তোমার অবর্তমানে কাকাবাবু আমার সাথে অনেক বিষয়েই আলাপ করতেন। একদিন যখন আমি বাবার উপর রাগ করে বসেছিলাম তখন তিনি আমাকে বললেনÑসন্তানেরা যেভাবে ভাবে সেটা বাবা মায়েরা ভাবতে পারে না আর পারে না বলেই দুটো প্রজন্মের মাঝে একটা গ্যাপ তৈরি হয়।’

‘ঠিক তাই? আমার কাছে মনে হয় কী জানিস বাবা-মা যখন বৃদ্ধ হয়ে যায় তখন ধীরে ধীরে তাদের বিশ্বাসের জায়গাটুকু ক্ষয় হতে থাকে তারপর মনে বাসা বাঁধে শংকা আর সেজন্যই হয়তো ছেলে-মেয়েদের ভরসা করতে পারেন না। তারপর তারা দৃঢ় অবস্থান নিয়ে নিজেকে আলাদাভাবে ভেবে নেন।’

‘হতেও পারে।’

‘চল ফিরে যাই আর ভালো লাগছে না এখানে।’

রাজীবের মনের ভিতর কিছু প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে যার উত্তরগুলো সে মিলানোর চেষ্টায় আছে কিন্তু সমাধান কিছুতেই মিলছে না। কাকাবাবুকে একপ্রকার জোর করেই সে রাজি করায় বিদেশ পড়তে যাওয়ার জন্য তারপর সেখানে নাগরিকত্ব নেয়। সে নিজেও জানে এটাতে তার বাপির কতটা অনিহা আর অভিমান আছে তারপরও সেটাকে খন্ডানোর প্রচেষ্ঠায় ছিল এতকাল। কাকাবাবু অবশেষে অন্তীম যাত্রায় পড়ি দিলেন তাই আর সেগুলো খণ্ডানো হয়নি। তারওপর শেষ যাত্রায় বাবার মুখে ছেলের জলটুকু দিতে না পারায় তার যন্ত্রণা আরও কয়েকগুন বেড়ে যায়। মানুষ পৃথিবীতে অপরাধী হয়ে থাকতে পারে কিন্তু নিজের কাছে নিজেই যখন অপরাধী তখন পালানোর কোনো পথ থাকে না কারণ নিজের সত্যিটা পুরোপুরি সে নিজেই জানে। সময় অনেক বড় বড় ব্যথাকে সারিয়ে দেয় ঠিকই আবার কিছু বেদনাকে করে তোলে অমর। বাসায় এসে কাকাবাবুর ডায়েরিগুলো দিয়ে দেই সে ভালোভাবে প্যাক করে নেয় এগুলো। আমার বলার ছিল অনেক কিন্তু কিছুই বলা হচ্ছে না। কাকাবাবু যে স্বপ্ন তার-আমার বন্ধনকে ঘিরে গড়ে তুলেছিলেন সে বিষয়েও কিছু বলা হয়নি। মন বলছে এখন না কারণ ওর মনের অবস্থা করুণায় ডুবে আছে। এখন এসবকিছু বললে বিষয়টা আবেগী না হয়ে হয়ে যেতে পারে অভিমানের তখন সারাজীবন স্বার্থপরও ভাবতে পারে। অতঃপর তার ফিরে যাওয়ার পালা। এবারও আমরা সকলে গিয়েছিলাম এয়ারপোর্টে। রাজীব আগের মতো আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছে না। আমাদের সাথে এবার আছে অনিমেষ আংকেলের গ্রুপ। হাতজোর করে প্রণাম জানিয়ে তাদের কাছ থেকে বিদায় নেয় তারপর আসে আমার কাছে।

‘জানিস প্রতিবার যখন গিয়েছি মনটা পড়ে থাকত প্যাভিলিয়নের এই জায়গাটায় বাপির কাছে। আজ সেটা মনে হচ্ছে না। সবকিছুই হচ্ছে, আমি বিদায় নিচ্ছি আর তোরাও আমাকে বিদায় জানাচ্ছিস শুধু বাপি নেই।’

‘যাওয়ার সময় হাসিমুখে যেতে হয় এটা কী তোমার জানা নেই?’

‘তাহলে তুই কাঁদছিস কেন?”

‘সেটা আমার জানা নেই।’

হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে সে চলে যাচ্ছে। যাওয়ার সময় এবার কেন যে পিছু ফিরে তাকাল বুঝতে পারছি না। খানিকটা সময় দাঁড়িয়ে থেকে চোখটা মুছে চলে গেল। প্রতিবার যে রাজীব চলে যেত সে ছিল একজন পিতার ছেলে কিন্তু এবার তা মনে হয়নি।

[পরের পর্ব আগামী সংখ্যায় ছাপা হবে]

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়