রবিবার, ০৭ জুন, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ০৬ জুন ২০২৬, ০৯:৫৭

সৌন্দর্যের রাণী শ্রীমঙ্গলে একদিন...

মো. মাসুদ হোসেন
সৌন্দর্যের রাণী শ্রীমঙ্গলে একদিন...

বহুদিন হলো দূরে কোথাও ঘুরতে যাওয়া হয় না তেমন। তাই এবার সাংগঠনিক সহকর্মীদের নিয়ে সিদ্ধান্ত হলো দূরের কোন এক জায়গায় ঘুরতে যাওয়া। তবে কোথায় যাবো এবং কবে যাবো তা নিয়ে খুবই সিদ্ধান্তহীনতায় ছিলাম আমরা। হঠাৎ একদিন সন্ধ্যায় কয়েকজন বসে সিদ্ধান্ত হলো প্রকৃতি কন্যা চায়ের রাজধানী শ্রীমঙ্গলের কথা। কারন, চায়ের রাজধানী হিসেবে শ্রীমঙ্গল সারাবিশ্বে পরিচিত। মূলত চা-শিল্পকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে এই পর্যটন কেন্দ্র। সারা বছর দেশি-বিদেশি পর্যটকদের ভিড়ে মুখরিত থাকে শ্রীমঙ্গল। তাই আমাদের গন্তব্যও ছিল এই জায়গাটি জুড়ে। এক সপ্তাহ হাতে নিয়ে তারিখ সিদ্ধান্তের মধ্যে চলতে থাকে আমাদের সাংগঠনিক সদস্যদের যাওয়ার প্রস্তুতি। কে যাবে, কে যাবেনা এ নিয়ে বোঝাপড়া। সবশেষে এলাকার কয়েকজন সম্মানিত ব্যক্তিদের সহযোগিতায় চলতি বছরের ২১ অক্টোবর রাতে চাঁদপুর থেকে সড়ক পথে রওনা দিয়ে চলে যাই লাকসাম জংশনে। এক সপ্তাহ আগে থেকেই অনলাইনে ট্রেনের সিট খালি না থাকায় স্ট্যান্ড টিকিট নিয়ে আমরা সাত সহকর্মী অপেক্ষায় আছি ট্রেন এর।

রাত তখন ১২ টা পেরিয়ে, স্টেশনে উঁকি দিচ্ছে চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা আন্তঃনগর উদয়ন এক্সপ্রেস ট্রেন। সহকর্মী হাবিব, নোবেল, মাসুদ, সাজিদ, শাহালম ও আকাশ যে যার মতো উঠে পড়লো ট্রেনের বিভিন্ন বগিতে। ট্রেন ছাড়ার কিছুক্ষণ পরে আবার সবাই একত্রে হয়ে খালি সিট খুঁজতে লাগলাম। কিন্তু কোন উপায় হলো না আমাদের। প্রায় ২০০ কিলোমিটারের পথ সাড়ে ৩ ঘন্টায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পাড়ি দিয়ে রাত সাড়ে ৩টায় পৌঁছালাম আমাদের সেই কাক্সিক্ষত অচেনা শহরে। নোবেলের বন্ধু র‌্যাব সদস্য আবিরও থাকে শ্রীমঙ্গলে। তাই ওনার দেয়া স্টেশনের পাশে এক ক্যান্টিনে গিয়ে সবাই ফ্রেশ হয়ে নাস্তা করে চলে গেলাম পার্শ্ববর্তী রেলওয়ে জামে মসজিদে। সেখানে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে ফজরের আজানের পর নামাজ আদায় করে আবারও মসজিদের বারান্দায় শুয়ে থাকলাম কতক্ষণ। আমাদের সাথে আরো কয়েকজন পর্যটকও শুয়ে ছিল সেখানটিতে। অপেক্ষা শুধু দিনের আলোর জন্যে। দিনের আলো বাড়ার সাথে সাথে চলে এলো আবিরও। এবার যেতে হবে আমাদের সেই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের উদ্দেশ্যে। আমরা সবাই যখন মসজিদের সামনে একত্রিত হলাম তখন একেক করে আমাদের কাছে আসতে শুরু করলো চান্দের গাড়ির চালকরা। কয়েকজন চালকের সাথে কথা বলে একজনকে সারাদিনের জন্য ২৮০০ টাকায় ভাড়া করে নিলাম।

বয়সে সবার বড় হওয়ায় চালকের সাথে সামনে বসতে হলো আমাকে। বিসমিল্লাহ করে রওনা হয়ে সোজা চলে গেলাম আধাকিলোমিটার দূরে শহরের রিজিক হোটেলে। সেখান থেকে সকালের নাস্তা পারসেল নিয়ে আমরা চলে যাচ্ছি নূরজাহান টি এস্টেট এর দিকে। যেতে যেতেই শ্রীমঙ্গলের চারিদিক ঘেরা সবুজে সমারোহে সজ্জিত সারি সারি চা বাগানের নয়নাভিরাম দৃশ্য যেন অবলীলায় মুগ্ধ করে আমাদের। সকালের মিষ্টি রোদের আলো আর আমার ফ্রেশ মনে জায়গা করে নেয় এক আনন্দের জোয়ার। নূরজাহান চা বাগানের সামনে আমাদের গাড়িটি দাঁড় করিয়ে আমরা চা বাগানের একদম ভিতরে গিয়ে যে যার মতো করে ছবি তুলে আবার চলে এলাম চান্দের গাড়িতে। এবারের যাত্রা মৌলভীবাজারের আরেকটি উপজেলা কমলগঞ্জের মাধবপুর লেকের উদ্দেশ্যে। সময়ের কথা চিন্তা করে দ্রুত স্থান ত্যাগ করে রওনা দিলাম মাধবপুর লেকে। এগিয়ে চলছি আঁকাবাঁকা পথ ধরে। প্রকৃতির অসাধারণ রূপ আমাদের মোহিত করছে। গাড়িতে বসে যত দূর চোখ যায় দেখেছি কেবল সবুজের হাতছানি। চা বাগানের সারি সারি টিলা, আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ

আর ঘন সবুজ অরণ্যের অপরূপ সৌন্দর্য আমাদের সবাইকে আকৃষ্ট করে। যদিও এর আগে সিলেট ও পঞ্চগড়ে সারি সারি চা বাগান দেখেছি কিন্তু শ্রীমঙ্গল আর কমলগঞ্জের চা বাগানের মত নয়। এর মধ্যে আমরা চলে এলাম সবুজ চা বাগানের মাঝে কৃত্রিম জলধারার স্বচ্ছ পানি ও নিরব পরিবেশ বেষ্টিত মাধবপুর লেকে। ন্যাশনাল টি কোম্পানির মালিকানাধীন মাধবপুর চা বাগানের ১১ নম্বর সেকশনে অবস্থিত এই লেকের সাদা, লাল ও নীল পদ্ম ফুলগুলো চোখে পড়ার মতো। এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ আর ফটোসেশান করে বেরিয়ে বাহিরে একটি খোলা জায়গায় সকালের নাস্তা সেরে নিলাম সবাই।

সময় তখন সকাল ১০ টা। পথ চলতে শুরু করল প্রকৃতি গহীনে লুকিয়ে থাকা এক জলপ্রপাতের দিকে। ছোট-বড় টিলাগুলো সবুজে মোড়ানো। সড়কের পাশ দিয়ে আদিবাসী চা শ্রমীকদের ছুটে চলা। চা–বাগান শেষ হতেই শুরু হলো বিজিবি পরিচালিত বিশেষায়িত এলাকা। রাস্তার দুই পাশে মানুষের সাধারণ জীবনমান দেখতে দেখতে আমরা এগিয়ে চলেছি। কয়েক ঘণ্টার পথ পাড়ি দেয়ার পরে আমরা পৌঁছাই কলাবনপাড়া নামক এলাকায়। মূলত এখান থেকেই হাইকিং শুরু হবে। চান্দের গাড়ি পার্ক করার সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা দৌড়ে এল। তাদের হাতে ছোট ছোট বাঁশ। ১০ টাকা করে আমরা কয়েকটি বাঁশ নিয়ে নিলাম। এখান কয়েক বোতল পানি নিয়ে শুরু হলো হাঁটা। আমরা গহীন বনের মধ্য দিয়ে হাঁটছি। সবাই বেশ উৎফুল্ল। পথিমধ্য অন্যদের সঙ্গে দেখা হচ্ছে, কথা হচ্ছে। হাসি-ঠাট্টা আর আনন্দ নিয়েই এগোচ্ছি। চারপাশে ঘন বন, মাঝখানে হাঁটার সরু পথ। সামনে একটু উঁচু পাহাড় পার হতে হবে। ঘন জঙ্গলের কারণে বাতাস নেই বললেই চলে। ছোট-বড় কয়েকটি পাহাড় পার হতেই আমরা মোটামুটি ক্লান্ত। এবার হাঁটার গতি সবার কমে এসেছে। তবুও হাল ছাড়িনি আমরা। ১৪ টি পাহাড় বেয়ে দেখা মিলল আঁকাবাঁকা বেশ রোমাঞ্চকরের ঝিরিপথ। কখনো অন্ধকার, আবার কখনো মৃদু আলোয় আমরা এগোনের পর চোখে পড়ল অনিন্দ্যসুন্দর হাম হাম জলপ্রপাত। কাছে গিয়ে সবাই নেমে পড়লাম ঝরনায়। প্রায় ১৪০ ফুট উঁচু থেকে পানি পড়ছে। বর্ষার মৌসুম না হলেও পানিতে ভরপুর। দারুণ সুন্দর। ততক্ষণে ঝরনার পানির ভেসে আসা কণায় আমরা শীতল হয়ে গেছি। ভুলে গেছি সব কষ্ট। তাকিয়ে আছি অপলক দৃষ্টিতে। প্রায় আড়াই ঘণ্টা হাঁটতে হয়েছে এখানে আসতে। কিছুক্ষণ ঝরনার জলে গা ভিজিয়ে ছবি তুলে এবার ফেরার পালা। সেখানে বেশ ভালোই কেটেছে সময়।

আবারও সেই পথ পাড়ি দিয়ে চান্দের গাড়ির কাছে গিয়ে সবাই ফ্রেশ হয়ে ক্লান্ত শরীরে রওনা দিলাম দুপুরের খাবার খেতে হবে। ততক্ষণে দুপুর প্রায় ২টা। চলে গেলাম সরাসরি শ্রীমঙ্গলের বিখ্যাত হোটেল পানসীতে। দুপুরের খাবার খেয়ে আবার উঠে পড়লাম চান্দের গাড়িতে। গন্তব্য এবার শ্রীমঙ্গলের ভাইরাল সেই সড়কে। সেখানে পৌঁছে ছবি তুলে চলে গেলাম সাত রং এর চায়ের জন্য বিখ্যাত নীলকণ্ঠ টি কেবিন-এ। সেখানেই শুনতে পাই মসজিদের মাইকে মাগরিবের আজান। বেরিয়ে পড়লাম নতুন গন্তব্যের পানে। কোথায় যাওয়া যেতে পারে তাই ভাবছিলাম। বললাম, নতুন কোথায় যাওয়া যায় বলুন তো? চালক বললেন, ভাই, বধ্যভূমি ’৭১-এ চলেন। এটি এখন শ্রীমঙ্গল শহরের অন্যতম বিনোদনকেন্দ্র। বললাম, ঠিক আছে, চলেন তাহলে। দেখতে দেখতে আমরা এসে পৌঁছালাম বধ্যভূমি ’৭১-এ। ধীর পদক্ষেপে আমরা এগিয়ে গেলাম বধ্যভূমি ’৭১-এর দিকে। সিঁড়ি বেয়ে এগিয়ে গেলাম আমরা ভিতরে। দৃষ্টিনন্দন এই পুণ্যভূমে ঘুমিয়ে আছে শত-সহস্র তাজা প্রাণ। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী মৌলভীবাজার জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের ধরে এনে এখানে হত্যা করেছে। দেখা পেলাম ছড়ার পাশে শহীদদের নামফলক। সেখানে কিছু সময় দাঁড়িয়ে আমরা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানালাম এবং ছবিও তুলে নিলাম।

এবার বিদায়ের পালা। রাত তখন সাড়ে ৭টার মতো। আমাদের ভাড়া করা গাড়িতে উঠে সোজা চলে গেলাম শ্রীমঙ্গল বাসস্ট্যান্ডে। উদ্দেশ্য ছিল, ক্লান্ত শরীর নিয়ে ঘুমহীন এতদূর পথ ট্রেনে দাঁড়িয়ে যাওয়া দুষ্কর। তাই চাঁদপুরের যাত্রীবাহী বাস একতা-সততা কাউন্টারে গেলাম। দূর জার্নির এই সড়কপথ খারাপ হওয়ার খবরে সবার সিদ্ধান্ত মোতাবেক চলে গেলাম রেলস্টেশনে। আবার সেই মসজিদে এশার নামাজ আদায় করে কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে রাত ১২টায় স্ট্যান্ড টিকিট কেটে উঠে পড়লাম ট্রেনে। টিটিই এর সাথে সমন্বয় করে দুইটি সিট পেয়ে কিছুক্ষণ পর পর আমার বসে চলে এলাম লাকসাম জংশনে। রাত তখন সাড়ে ৩টা। সেখান অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে সিএনজি নিয়ে পৌঁছালাম নিজ ভূমিতে।

ঘুরে দেখার মতো এখানে রয়েছে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, বাংলাদেশ চা গবেষণা ইন্সটিটিউট, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউট, টি মিউজিয়াম, বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন, বিস্তীর্ণ হাইল হাওর, মৎস্য অভয়া-শ্রম বাইক্কা বিল, মিনি চিড়িয়াখানা, বার্ড পার্ক, নীলকন্ঠ সাত রঙের চা কেবিন, চা কন্যা ভাস্কর্য, বধ্যভূমি-৭১ সহ নানা পর্যটন স্পট। এখানে আরো রয়েছে লেবু আনারসের বাগান আর মনিপুরী পাড়ায় রয়েছে মনিপুরী হস্তশিল্পের বিশাল মেলা। শ্রীমঙ্গলের চা-পাতা, লেবু, আনারস, মনিপুরী হস্তশিল্প আর বাঁশ বেতের তৈরি কুটির শিল্পসমূহ অনায়াসে নজর কারে সকল পর্যটকদের।

কীভাবে যাবেনÑদেশের যেকোন স্থান থেকেই রেল কিংবা সড়ক পথে শ্রীমঙ্গল যাওয়া যায়। সেখান থেকে সময় অনুযায়ী চান্দের গাড়ি বা সিএনজি ভাড়া করে নিতে পারেন। থাকার জন্য, পাঁচ তারকা হোটেল গ্র্যান্ড সুলতান সহ আন্তর্জাতিক মানের রিসোর্ট দুসাই, হারমিটেজ রিসোর্ট, নভেম রিসোর্ট, টি হ্যাভেন, শ্রীমঙ্গল ইন, গ্রীণ লিফ, লেমন গার্ডেনসহ ছোট বড় প্রায় অর্ধ শতাধিক রেস্টহাউজ। কোথায় খাবেন- গ্র্যান্ড তাজ, সুলতান, আগ্রা চাইনিজ, কুটুমবাড়ি, সাতকরা, পানসী, পাঁচভাই সহ বেশ কয়েকটি অত্যাধুনিক হোটেল। মনে রাখবেন, ভ্রমণকালে সময়ের প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। এবং স্থানীয়দের সাথে সন্তোষজনক ব্যবহার করতে হবে। ব্যবহৃত ময়লা আবর্জনা এদিক সেদিক ফেলা থেকেও বিরত থাকতে হবে। যেকোন প্রয়োজনে স্থানীয় প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ করে নিতে পারেন।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়