রবিবার, ০৭ জুন, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ০৬ জুন ২০২৬, ০৯:৫৫

কাব্য পাঠ পর্যালোচনা

‘জলতিতির’ ইলিয়াস ফারুকীর হৃদয়রঞ্জিত উপলব্ধির জয়গীতি

গাজী গিয়াস উদ্দিন
‘জলতিতির’ ইলিয়াস ফারুকীর হৃদয়রঞ্জিত উপলব্ধির জয়গীতি

কবিতা হচ্ছে ‘বাসর উদ্যাপিত নারীর সাথে প্রথম পরিচয়’। অবগুণ্ঠিত সলজ্জের সকল পরিচয় উন্মোচন দুঃসাধ্য ও দুঃস্বপ্ন। এতেই বোঝা যায়, কবিতার পাঠক হতে পারা ভাগ্যের ব্যাপার। কবিতা বোঝা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠকলার বিশদ ব্যাখ্যা জানার মহাবিদ্যা। কবিতা শব্দে সংগীতে উপমায় চিত্রে ও অনুভূতির নিবিড়তায় নিজেকে নারীর মতো প্রকাশিত করে। কোলরিজ-এর ভাষায় : ইবংঃ ড়িৎফং রহ ঃযব নবংঃ ড়ৎফবৎ.’ অপরিহার্য শব্দের অবশ্যম্ভাবী বাণী বিন্যাস হচ্ছে কবিতা।

জীবনের রূপ রস গন্ধ বর্ণ ও আনন্দ বেদনায় অবগাহন করে কবি ইলিয়াস ফারুকী তাঁর হৃদয়রঞ্জিত উপলব্ধির জয়গীতি গেয়েছেন ‘জলতিতির’ (২০২৪) কাব্যে। জলচর পাখিটি জলের উপরে হেঁটে যেতে পারে। নদীবেষ্টিত চাঁদপুরের পাখি। আশিটি কবিতা বুকে ধারণ করে পাখিকাব্য। কবি গল্পকার, প্রাবন্ধিকও। বিগত দুটো কাব্য মঞ্জরিত যতিপাত ২০১৮ এবং শিমুলের যত রঙ ২০২০।

উদ্বোধনী কবিতা ‘তথাকথিত আপনজন’।

“হৃদপিণ্ডে উচ্চারিত শব্দরা

নিগূঢ় মিথ্যার কাছে হেরে গিয়ে হয়েছে চাঁড়াল,

বৃত্তহীন জীবনের ষোলোকলায়

এক অট্টালিকা সময় বিরহে

একা হয়ে যাই, নরম কথার আড়ে

ঘুঙুর বাজাই।”

কবির বিরহ বিরুদ্ধ সময়ের সাথে। কবি জীবন দ্রোহদূর ঘৃণ্য অহমিকার ছদ্মবেশে।

নদীমাতৃক জীবনের অভিজ্ঞতায় কবি বিভিন্ন কবিতায় সুবিধাবঞ্চিত যাযাবর বেদে গোষ্ঠীর কাব্যচিত্র এঁকেছেন:

“এইভাবে ছই- নাওয়ে বংশ বাড়ে

বংশের হিসাব বুঝে নাও বাড়ে।

কোনো জমি লাগে না, লাগে না ইমারত

প্রেমের হিসাবে বেড়ে চলে স্বপ্ন ও সুখের আড়ত। “

(বেদে ও বাহারি নাও)

উপমার আহরণও নদীমাতৃক অঞ্চল থেকে

“ফ্যাকাশে সময়ে হারতে হয়েছে বহুবার

অদৃশ্য জাদুর বল

তবুও ফিরিয়ে আনে-যেন জবুথবু

ঝড়ের হারানো বক।

(ভাবনার নগর অধিপতি)

সাহিত্যও কৃত্রিমতা আক্রান্ত

কবির ঘোষণা

“কবিতা এখন সচিবালয়ের বেলকনিতে

বড়োই আদরে সাহিত্য উর্বশীর গালের প্রলেপন!

আমিও অহেতুক রোদন করি ডাকাতিয়া পাড়ে

আমাকে বাঁচাও... আমাকে বাঁচাও

কে বাঁচাবে এবং কীভাবে!

সম্ভবত আবারও রাখালের গল্পের পুনরাবৃত্তি ঘটবে।”

চমৎকার স্বরবৃত্ত ছন্দে ‘আষাঢ়ের কবিতা’; সুপাঠ্য কবিতা ‘প্রেম, প্রথম দেখার ক্ষণে’; ‘কাঠবেড়ালি, গাঙচিল এবং মানুষ’; ‘প্রেম’; ‘কুটিলতা’; প্রভৃতি কবিতা যথার্থ মানসম্পন্ন।

‘কোথায় আছি আমরা’ কবিতায় বন্ধুত্বের আকালের চিত্র তুলে ধরতে অভিণব উপমার ব্যবহার

“সুহৃদ নেই যে সখ্য গড়ে তুলি।

পেটিকোটের মতন নেওড়ে আটকে আছে সম্পর্ক

একটানে খুলে পড়ে যেতে পারে

উলঙ্গ বিকৃত দৃশ্যে।”

‘আষাঢ়ের টক ঝাল’ কবিতায় সুন্দর চিত্রকল্প :

“বৃষ্টির কণায় সুরের রেণু গড়ে দেয় রংধনু সাঁকো”

এ কবিতা বলে দেয়, বুদ্ধদেব বসু কেন বলেছেন “কবিতা বোঝা যায় না, অনুভব করা যায়।”

“প্রেম, স্বপ্ন এবং ইচ্ছেগুলো” জীবনবাদী, উত্তরাধুনিক কাহিনি কবিতা। ভাব-শিল্পসম্পদ ও আঙ্গিক সৌষ্ঠব সুশোভিত এ কবিতায় কবির মুন্সিয়ানা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ‘দ্বিধাগ্রস্ত’ কবিতা গদ্যছন্দের সার্থক কবিতা।

‘শরৎ আবেগ’ ঋতুধর্মের ভেতর দিয়ে মানবিক প্রেমবিরহের চিত্রাত্মক কবিতা। শব্দ বাছাই ও প্রয়োগে, উপমা প্রতীকে মায়াময় এক কাব্য-সৌন্দর্যের কবিতা।

“একসাথে হেঁটে এসেছি ক্রোশ ক্রোশ পথ

নক্ষত্রের আলোয়ে ছোঁয়াবো বলে চাঁদের পরশ।”

এটি কাব্য আভিজাত্যের প্রতীক পঙ্ক্তি।

কাব্যের সর্বশেষ কবিতা “অনুভব মৃত্যুর দু- পারে” । এ কবিতায় মৃতব্যক্তিকে মনোযোগ সহকারে সাজানোর আকাক্সক্ষা বা ওসিয়ত ব্যক্ত হয়েছে। কবির সখীর প্রতি আহবান এসময় কপোল (গাল) রাঙাবার জন্যে। “তারপর শোক ভুলে যাবো/হবো তার মুখোমুখি”। কবি কি শোকের মুখোমুখি হবেন? একজন কবির পক্ষেই বলা সম্ভব খাঁটি প্রেমবচন

“মৃত্যুর পরও জানবো ভাগ্যের লেখা

অদৃশ্যে থেকেও অনুভবে হবে দেখা।”

জলতিতির ১ ও ২ দুটো কাব্যনাম কবিতা আছে। সেখানে কবি পাখির রূপকে বলতে চেয়েছেন, পাখির জীবনের মতো মানুষও আজ জীবনের স্বাভাবিকতা, সহজ প্রকৃতি হারিয়ে ফেলেছে। কবি মানুষকে শিখতে বলেছেন, সে কৌশল শিখতে, যেমনি জলতিতির হাল্কা পায়ে জলের ওপর দৌড়ায়।

“প্রাচীন দেয়ালে ভাঙা ভাঙা চিকা মারা

বহুকাল পূর্বে কারা জানি লিখেছিল

‘মানুষের ওপর অতটা হয়ো না ভারী’

এতটাই হালককা হও, যেমন হালকা পায়ে

জলের ওপর দৌড়ায় জলতিতির।”

জলতিতির। ইলিয়াস ফারুকী। প্রচ্ছদ মোমিন উদ্দীন খালেদ। প্রকাশক: যুক্ত। প্রকাশকাল : ডিসেম্বর ২০২৪। মূল্য : ২৫০ টাকা।

গাজী গিয়াস উদ্দিন : কবি, প্রাবন্ধিক ও সাহিত্য সংগঠক।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়