সোমবার, ০৬ এপ্রিল, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ
  •   চাঁদপুর জেলা পরিষদের প্রশাসক অ্যাড. সলিম উল্লা সেলিম!

প্রকাশ : ০৬ এপ্রিল ২০২৬, ১০:০২

খণ্ডে খণ্ডে অখণ্ড জীবন

পীযূষ কান্তি বড়ুয়া
খণ্ডে খণ্ডে অখণ্ড জীবন

(একান্নতম পর্ব)

আমার দ্বিতীয় জীবন : যাপনের চরণ চিহ্নে

কেবল একটি দম বা নিশ্বাসের বদৌলতে জীবন এক বহতা নদী। টুটে যেতে যেতে বেশ কয়েকবার সে নিশ্বাস রয়েছে অটুট। তাই আজকের জীবন আমার দ্বিতীয় জীবনের উপহার। যাপনের চরণ চিহ্নে সে উপহার অমূল্য হয়ে রয়েছে। আমার বোকা বোকা শৈশবে সাঁতার না জানাটা আমাদের অপরাধ ছিলো না। মায়ের কড়া শাসনের কারণে আমার কখনও পুকুরে নামা হয়নি। তাই গ্রামে শৈশব কাটলেও সাঁতার শেখা হয়নি। একবার আমার খুড়তুতো ভাই শিবুদা আমাকে সাঁতার শেখানোর দায়িত্ব নিলেন। আমার বুক ও পেটে তিনি তার দুহাত পেতে দিয়েছিলেন আর আমাকে বলেছিলেন হাত-পা ছোঁড়াছুড়ি করার জন্যে। আমি তাই করছিলাম সানন্দে ও সাগ্রহে। সাঁতার আমাকে শিখতেই হবে তাই। এমন করতে করতে তিনি আমাকে প্রায় মাঝ-পুকুরের কাছাকাছি নিয়ে গেলেন। এরমধ্যে তার পায়ে হঠাৎ একটা গলদা চিংড়ি ঠোকর দিয়ে গেলো। তিনি আমাকে বললেন, তুই সাঁতরাতে থাক আমি চিংড়িটা ধরি। এই বলে তিনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে ডুব দিলেন পুকুরের গভীরে। আর আমি এদিকে পানি খেতে খেতে গেছি তলিয়ে। প্রায় দুমিনিট পর টের পেলাম, আমাকে টেনে তুলছে শিবুদা। এরপর থেকে মা আমাকে বললেন, তোর আর সাঁতার শিখে কাজ নেই। সেই প্রথম আমি আমার মায়ের দেওয়া প্রাণের দ্বিতীয় জীবন উপহার পেয়েছিলাম। জলের তলদেশের অন্ধকার আজও আমার চোখে বিভীষিকা আনে। শ্বাস না নিতে পারার কষ্ট কি অপার! আমি তা বুঝেছিলাম আমার বোকা শৈশবে।

তখন তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ি। দুপুর একটায় স্কুল শেষ। বাসায় আসতাম দুটোয়। খেলতে খেলতে বেলা গড়িয়ে দিতাম। এরপর বাসায় এসে তিনটায় খেয়ে কোনোমতে ঘড়িতে চারটে বাজতে দিতাম। চারটে বাজলেই ছুট লাগাতাম পাড়ার খেলার মাঠে। মাঠটা ছিলো মনোহরখালি বন্দর কর্তৃপক্ষের। তারা কখনও আমাদের প্রতি সদয় হয়ে খেলতে দিতেন। আর কখনও কখনও হঠাৎ খেপে গিয়ে নির্দয় হতেন। তখন আমাদের খেলাধুলা বন্ধ হয়ে যেতো। এ রকম এক আনন্দময় কৈশোরে ফুটবল খেলতে খেলতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছিলো। কাছের মসজিদে মুয়াজ্জিন আযান দিচ্ছিলেন মাগরিবের। আমাদের তখন খেলাধুলার পাট চুকিয়ে ঘরে ফেরার পালা। সময়কে বাঁচাতে সেদিন আমি একটা ঘুপচি পথ ধরেছিলাম বাড়ি ফেরার। বেশি দেরি হলে বাবার বকুনি খাওয়ার ভয় ছিলো। পথটা ছিলো নিগম হোমিও হলের পাশ দিয়ে যাওয়া গলিপথ। জ্যোস্না রানি চৌধুরীর চেম্বার ও বাড়ির উঠোনের মাঝখান দিয়ে যেতে যেতে হঠাৎ একটা মাঠ এসে পড়লো। মাঠে যেন হলদে ঘাসের কার্পেট বিছানো ছিলো। আঁধারের ম্লানিমায় আমার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এসেছিলো। আগে কখনও যাইনি এ পথ দিয়ে। তবে জানতাম এদিক দিয়ে একটা চোরা পথ গেছে আমার বাসার মুখে। মনে ঘোর লাগা বিভ্রমে আমি পা দিতে গিয়েছিলাম সেই মাঠ ভাবা ঘাসের গালিচায়। এরমধ্যে কানে বাজলো কেউ যেন বলছেন, এই! এটা মাঠ নয় এটা কচুরিপানা ভরা পুকুর। পা দিস না। গায়েবি আওয়াজ শুনে আমি আঁতকে উঠে পা না দিয়ে ভয়ে উল্টোপথে ভোঁ দৌড় লাগালাম। আমি কাউকে আশেপাশে দেখিনি যার কণ্ঠ হতে পারে তা। ঐ পথ ছিলো সেসময় নির্জন। সে আমার দ্বিতীয়বার ঈশ্বরের দেওয়া প্রাণের জীবনোপহার। কাউকে না বলে কিছু পরদিন দিনের বেলায় আমি সরেজমিনে ঐ এলাকা পরিদর্শনে গেলাম। গিয়ে যা দেখলাম তাতে আমার চক্ষু চড়কগাছ! আমি যাকে ঘাসের হলুদাভ গালিচা ভরা মাঠ ভেবেছিলাম তা ছিলো আসলে কচুরিপানাময় এক গভীর মজা পুকুর। যদি একবার পা দিতাম তবে পাঁকে আটকে সলিল সমাধি হতো আমার নিশ্চিত। কেউ জানতো না এক কিশোরের অন্তর্ধানের কাহিনি।

আমার মাধ্যমিক স্কুলের অষ্টম শ্রেণির পাঠ চুকিয়েছিলাম সেন্ট প্ল্যাসিডস্ স্কুল থেকে। এ স্কুলে একস্ট্রা কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিস ছিলো অসাধারণ। তার মধ্যে অন্যতম ছিলো কাবিং এবং স্কাউটিং। পঞ্চম শ্রেণিতে অধ্যয়নকালীন আমি ছিলাম গ্রিন সিক্সের সিক্সার বা দলনেতা। ঐ বছর আমাদের বার্ষিক তাঁবু জলসা ছিলো নদীর ওপারবর্তী দেয়াং পাহাড়ের পাদদেশ। এই দেয়াং পাহাড় ছিলো ঐতিহাসিক। এখানে একদিকে পর্তুগিজ ফিরিঙ্গিরা এসে গির্জা তৈরি করে গেছে আর তারও আগে পাল শাসনামলে এখানে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিলো নবপণ্ডিত বিহার বৌদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয়। সেই সমৃদ্ধ ইতিহাস এখন কালের উদরে তলিয়ে গেছে। আমরা একজন উডব্যাজার শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে নৌকায় চড়ে নদী পার হচ্ছিলাম কয়েকজন কাবস্। মাঝনদীতে গিয়ে নৌকার পাটাতন ও গলুইয়ে লাগলো ঢেউয়ের প্রলয় দোলা। এক একটা ঢেউ যেন জলের পাহাড় হয়ে আছড়ে পড়ছিলো আমাদের নৌকার তলদেশে। ফলে নৌকা উঠে যাচ্ছিলো জলচূড়ার শীর্ষে কখনও আবার পরক্ষণে তা নেমে আসছিলো মনে হয় পাতাল প্রান্তরে। নৌকার এই দুলুনি ও কম্পন আমাদের মনে মৃত্যুভয় ঢুকিয়ে দিয়েছিলো। একটু পরেই দেখা গেলো ইয়া বড় গালিভার মার্কা এক জাহজ পোঁওওও বাজাতে বাজাতে ধেয়ে আসছে আমাদের ডিঙি নায়ের দিকে। এই বুঝি আর রক্ষা নেই। ঢেউয়ে না তলিয়ে নিলেও জাহাজের বাড়ি লেগে আজ আমাদের ভবলীলা সাঙ্গ হবে নিশ্চিত। সবাই যে যার মতো ইস্টনাম জপ করা শুরু করে দিলো। আয়ু তখনও ছিলো বলা যায়। হঠাৎ জাহাজের নাবিকের কানে গেলো আমাদের হৈচৈ। তিনি শেষ মুহূর্তে জাহাজের দিক ঘুরিয়ে দিলেন। আর আমরা জীবন নিয়ে পাড়ে উঠলাম। এ ছিলো আমার বাবার দেওয়া প্রাণের আরেকবার দ্বিতীয় জীবনোপহার। আজও কখনও কখনও কর্ণফুলি নদীর মোহনায় গেলে চোখে ভাসে সেই দানব জাহাজ আর আমাদের বিন্দুপ্রতিম ডিঙি নৌকোর বেঁচে থাকার দ্বৈরথ। কী ভীষণ! কী মর্মন্তুদ!

লেনিনের দেশ রাশিয়ায় যাবো বলে সবকিছু ঠিকঠাক। আর ক’দিন পরেই ফ্লাইট। এ সময় নবীন পরিব্রাজকের চোখে আপন মাতৃভূমিকে চোখ ভরে দেখবার চাতক-তৃষ্ণায় আমি শহর এলাকার বাসে চড়ে ঘুরছি দিকহীন। তখন রাইডার নামধারী ছোটো বাস ছিলো শহরে। দূর থেকে দেখলে আমার মনে হতো এ যেন খেলনা বাস। সেই বাসে চড়ে যাচ্ছিলাম নিউমার্কেট থেকে কাতালগঞ্জ। জানালায় হাত রেখে চোখ ভরে দেখে নিচ্ছিলাম প্রাণের শহরটাকে শেষবার। চকবাজ অলি খাঁ মসজিদের মোড়ে আসতে না আসতেই আমার রাইডারকে তীব্র বাড়ি লাগিয়ে গেলো আরেকটা শহর এলাকার গাড়ি। বাড়িটা আমার জানালায় লেগেছিলো বেশ। আমার শার্টের হাতা ছিঁড়লো, আমার ডান বাহুতে জখম হলো আর আমার প্রাণে কম্প হলো থর্ থর্। আমাদের বাসটা কেন যে পড়ে গেলো না কাত হয়ে এতো তীব্র আঘাতে তা আমার বোধগম্য হলো না। অথচ এরচেয়ে কম বাড়ি খেয়েই অনেক শহর এলাকার বাস ডেইন্টারের কাছে গেছে ইন্সিওরেন্স অফিস হয়ে। বুঝলাম, ঈশ্বর আবারও আমার প্রাণকে দ্বিতীয় জীবন দিলেন।

দুহাজার পাঁচ-ছয় সালে আমি বসতাম পিয়ারলেস ডক্টরস্ পয়েন্টে। শুক্রবারে তখন সাপ্তাহিক চেম্বার ছিলো আমার বাবুরহাট। সেরকম এক শীতের সকালে এসিআইয়ের কিবরিয়ার মোটরসাইকেলে সওয়ার হয়ে আমি চলেছিলাম বাবুরহাট চেম্বারের উদ্দেশ্যে। চালক হিসেবে কিবরিয়া স্বস্তির ছিলো না সেদিন। তার মনে তখন প্রতিযোগিতার মনোবৃত্তি ছিলো। একটা প্লাস্টিকের ছোটো পিক আপ আমাদের জায়গা দিচ্ছিলো না কোনোমতেই। বোঝাই যাচ্ছিলো ঐ পিক আপের চালক দুষ্টু ছিলো ভীষণ। কিবরিয়া তা আঁচ করতে পেরে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারেনি। সে গতি বাড়িয়ে ছোট প্লাস্টিকের পিক আপটিকে ওভারটেক করার জন্যে চেষ্টা করলো। আর এটা করতে গিয়ে সে যে কখন রোডের ডান কিনারে চলে এসেছে বলতে পারিনি। সুযোগ পেয়ে পিক আপটি ডানে চাপিয়ে দিলো আমাদের। আর আমাদের হোন্ডা তার বাড়ি খেয়ে ছিটকে গেলো তিন হাত দূরে। কিবরিয়ার মাথায় হেলমেট ছিলো। আমার মাথায় কিছু ছিলো না। তারপরও আমি কীভাবে যেন অক্ষত থেকে গেলাম আর কিবরিয়ার কোমড়ে ফ্র্যাকচার হলো। তাকে আমি নিজে দুটো ব্যথার ইঞ্জেকশন দিলাম। খবর পেয়ে পিয়ারলেস থেকে সুজন-প্রবীরেরা এলো ঘটনাস্থলে। এটা ছিলো খলিশাডুলি-মঠখোলার রাস্তায় ‘পওর’ এর স্থাপনার নিকটবর্তী। এ ছিলো আমার বিধাতার দয়ায় পুনর্বার দ্বিতীয় জীবন পাওয়া।

ওই একই রাস্তায় দুহাজার আট-নয় সালের দিকে যাত্রীবাহী সিএনজি দুর্ঘটনা হয়। এতে গাড়ি চিৎপটাং। আমাকে টেনে তুলেছিলেন এমন একজন যাঁকে আমি আগে আর দেখিনি। এটা অবশ্য আনসার কার্যালয়ের গেইটের নিকটবর্তী ছিলো। সেদিনও জীবনের সংশয় ছিলো নির্ঘাৎ। কিন্তু দ্বিতীয় জীবনের আশীর্বাদে আমি উৎরে গিয়েছি সেই বিভীষিকা।

ফলের মধ্যে আমার প্রিয় হলো লাল রসালো তরমুজ, পাকা হলুদ পেঁপে আর সবুজ কচকচে কাঁচা পেয়ারা। এটা দুহাজার বারো সালের কথা। চেম্বার শেষে রাতে বাসায় এসে তরমুজের প্লেট নিয়ে বসেছি ড্রইং রুমে সোফায় হেলান দিয়ে। হাতে ধরা কাঁটা চামচ৷ একটা একটা করে চিবুচ্ছি আর রসের ধারায় বিগলিত হচ্ছি সুখে ও উপভোগে। কিন্তু বিধিবাম। তরমুজের একটা টুকরোয় এতো বেশি রস ছিলো যে তা দুদাঁতের মাঝখানে চেপে ধরতেই প্রচুর রসের উদগীরণ ঘটলো। এতো রস হুট করে গিলতে না পারায় তার কিছুটা চলে গেলো শ্বাসনালীতে। রসের এই নিষিদ্ধ অনুপ্রবেশে শ্বাসনালীর মাংশপেশীর তীব্র সংকোচন শুরু হলো। আমার শ্বাসনালী প্রায় বন্ধ হয়ে গেলো। আমার ভেতরের হাওয়া বাইরে আসছিলো না আর বাইরের নতুন হাওয়া ভেতরে যাওয়ার জো ছিলো না। প্রায় এক মিনিট পার হলো এভাবে। আমার বুক ফেটে যাচ্ছিলো। গোঁ গোঁ গোঙানির আওয়াজ পেয়ে আমার ঘরণী এলো পিঠ মেজে দিতে। আমার কষ্ট দেখে তার মধ্যে উদ্ভ্রান্তি তৈরি হলো। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, হাতের কাঁটা চামচ দিয়ে আঘাত করে আমার শ্বাসনালী ছিদ্র করবো। তাহলে আমি বেঁচে যাবো। এটাকে আমাদের চিকিৎসা বিজ্ঞানে বলে ট্রাকিয়োস্টোমি। যেই না হাত ওঠালাম নিজেকে নিজে ঘায়েল করবো বলে, ওমনি আমার গলার পেশী ছেড়ে দিলো। আমি শ্বাস নিয়ে বাঁচলাম। এ ছিলো আমার আরেকবার দ্বিতীয় জীবন ফিরে পাওয়া। দ্বিতীয় জীবন প্রাপ্তির আরও একটা রোমহর্ষক এপিসোড আছে আমার জীবনে। আজ বলতে বলতে ক্লান্ত। তাই তা ভবিষ্যতে সবিস্তারে বলার জন্যে তুলে রাখলাম মনের শিকেয়। (চলবে)

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়