প্রকাশ : ২৯ মার্চ ২০২৬, ০৯:২১
চাঁদপুরে জমিদারি শাসনামলের স্থাপত্যশৈলী

একটাসময় আমাদের এই ভূখণ্ডে জমিদারদের আধিপত্য অর্থাৎ জমিদারি প্রথা প্রচলিত ছিলো। যা আজ বিলুপ্ত। তবে তাঁদের রেখে যাওয়া স্থাপত্যশৈলী কালের বিবর্তনে স্মৃতি হিসেবে রয়ে গেছে আজও। হাতি, ঘোড়া, পাইক, পেয়াদা না থাকলেও ঠায় দাঁড়িয়ে আছে জমিদারদের রেখে যাওয়া স্থাপত্যশৈলী। পোড়া ইট-পাথরের দেয়ালে বাসা বেঁধেছে বিভিন্ন রকমের উদ্ভিদ আর শেওলা। তবুও ঐতিহ্যমণ্ডিত জমিদার বাড়িগুলো আজও টিকে আছে আপন গৌরবে।
হরিপুর রাজবাড়ী: চাঁদপুর জেলার সবচেয়ে প্রভাবশালী জমিদার তনু রাজা চৌধুরী। তিনি ব্রিটিশবিরোধী সিপাহী আন্দোলনের অন্যতম নেতা।
চাঁদপুর সদরের চান্দ্রা ইউনিয়নের মদনা গ্রামে অবস্থিত হরিপুর রাজবাড়ী উপনিবেশিক শাসনামলের এক ঐতিহাসিক সাক্ষী। প্রায় একশতক আগে এই জমিদার বাড়িটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এই জমিদার বাড়ির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তনু রাজা চৌধুরী। সুবিশাল এলাকাজুড়ে গড়ে তোলা জমিদার বাড়িটি স্থানীয়ভাবে চৌধুরী বাড়ি নামে পরিচিত।
ব্রিটিশ শাসনামলে ব্রিটিশদের দেশ ছাড়া করতে যে সিপাহী বিদ্রোহ আন্দোলন হয়েছে তার প্রথম সারির নেতা ছিলেন তনু রাজা চৌধুরী। যার হাত ধেরে এ বাড়িটি প্রতিষ্ঠা লাভ করে। সিপাহী বিদ্রোহের সময় ব্রিটিশদের ধরপাকড়ে তনু রাজা চৌধুরী চাঁদপুর সদরের চান্দ্রা নামক এ ইউনিয়নে আত্মগোপন করেন। এরপর এখানেই তিনি স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন এবং জমিদারী দায়িত্ব পান। জমিদার তনু রাজা চৌধুরীর একমাত্র সন্তানের নাম আলী আজগর চৌধুরী। পিতার মৃত্যুর পরে পনবর্তীতে তিনি জমিদারিত্ব পান। ১৯ শতকের মাঝামাঝি ব্রিটিশ শাসনামলে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হলে এ জমিদার বাড়ির জমিদারিত্ব ইতি ঘটে।
আলী রাজা চৌধুরী ছিলেন সাত সন্তানের জনক। এ সাত সন্তানের নামে ৯টি ভবন গড়ে তোলা হয়। প্রতিটি ভবনের গায়ের কারুকার্য খচিত নাম লেখা। তাঁরা হলেনÑমতি রাজা চৌধুরী, উমেদ রাজা চৌধুরী, কামিজ রাজা চৌধুরী, হামিদ রাজা চৌধুরী, মোহাম্মদ রাজা চৌধুরী, প্রেম রাজা চৌধুরী ও গোলাম রাজা চৌধুরী। তাদের সবাই এখন মৃত। তবে তনু রাজা এবং তার একমাত্র ছেলে ও সাত নাতির জীবদ্দশার গুণকর্মের মাধ্যমে আজও সারা দেশে সুনামের সাথে পরিচিত। জমিদার হলেও প্রজাদের সাথে সুন্দর সম্পর্ক, নিজ এলাকায় জনকল্যাণ কর্ম, শিক্ষা বিস্তার, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলায় তাদের যে ভূয়সি প্রশংসা স্থানীয়দের কাছ থেকে শুনা যায়।
দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যশৈলীর দু’টো দালান পাশাপাশি। যার একটির গায়ে লেখা শহিদ মঞ্জিল, আপরটি মতি মঞ্জিল। ইট, সুরকি আর রড দিয়ে গড়ে তোলা দ্বিতল ভবন দু’টোর শরীর নান্দনিক কারুকার্য খচিত। বাড়ি ভেতরে যতোটা প্রবেশ ঠিক ততোটাই মুগ্ধতা!
একটি বাড়ির ভেতরে ৭টি ভবন। বাড়ির পারপাশে প্রায় ১৮টি দিঘি রয়েছে। পুরো বাড়িজুড়ে নানা জাতের বৃক্ষরাজি। পাতাদের ফাঁকগলে মাটিতে লুটিয়ে পড়ছে সূর্যের হলদে আলো। নাম না জানা হরেক পাখির কিচির-মিটির শব্দে মনে এক অদ্ভুত আনন্দ খেলে যাচ্ছে।
বর্তমানে বিশালায়তনের বাড়িটিতে জমিদারদের ৭-৮টি পরিবার বসবাস করছে। চাঁদপুরের ঐতিহাসিক চৌধুরীঘাট ও চৌধুরী মসজিদ তাদের নামে নামকরণ করা হয়েছে। এছাড়াও উইথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় গাজীপুর ছোরিয়া ফাজিল মাদ্রাসা, চৌধুরী বাড়ি হাফেজিয়া মাদ্রাসা তাদের হাত ধরেই প্রতিষ্ঠিত।
রূপসা জমিদার বাড়ি: চাঁদপুর ফরিদগঞ্জ থেকে সাড়ে চার কিঃমিঃ পূর্বে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী রূপসা জমিদার বাড়ি। জমিদারের জমিদারি না থাকলেও এখনো ন্যূনতম সম্মান আর শ্রদ্ধার কোনো
ঘাটতি হয়নি প্রজা প্রিয় জমিদারদের প্রতি সাধারণ মানুষের। তাইতো এই এলাকার সাধারণ মানুষ আজো জমিদারদের পূণ্যময় কাজগুলোর প্রশংসা করতে ভুলেন না। মেঘনা পাড়ের সমৃদ্ধশালী অঞ্চল চাঁদপুরের গৌরবময় ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই জমিদারবাড়ি ও পরিবারের ইতিহাস। এ অঞ্চলে অত্যন্ত ধর্মপরায়ণ, জনহিতকর কাজের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী ছিলেন রূপসার জমিদাররা। জমিদারি প্রথা থাকাকালীন প্রজাদের খাজনার টাকায় ভোগ বিলাস না করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রাস্তাঘাট, মসজিদ-মাদ্রাসাসহ অনেক কিছুই স্থাপন করে গেছেন তারা। চাঁদপুর শহর থেকে ১৯ কিলোমিটার দূরে ফরিদগঞ্জ উপজেলা সদরের পাশে রূপসা বাজারের পশ্চিম দক্ষিণ কোনে নজর দিলেই দৃষ্টিতে পড়বে জমিদারবাড়ির সিংহদ্বার। পাশেই কারুকার্জ খচিত একটি মসজিদ। মসজিদের দক্ষিণ পাশে একটি কবরস্থান। এর প্রতিটি ফলকে লেখা রয়েছে চিরনিন্দ্রায় শায়িত ব্যক্তিদের সুকর্মের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা।পথ ধরে সামনে এগুলেই চোখে পড়বে ঘাঁট বাঁধানো দিঘি। সামনেই নজরে পড়বে জমিদারবাড়ির ঐতিহ্যমণ্ডিত কাছারি ভবন।প্রায় তিনশ’ বছর আগের কথা। আঠারো শতকের মাঝামঝি সময়ে রূপসার জমিদারদের গোড়াপত্তন। রূপসার পূর্ব দিকে খাজুরিয়াতে বাইশ সিংহ পরিবার নামে এক সম্ভ্রান্ত প্রভাবশালী হিন্দু পরিবার ছিল। কালের আবর্তে তাদের জমিদারির বিলুপ্তি ঘটলে আহম্মেদ রাজা চৌধুরীর কৃতিত্ব ও অদম্য স্পৃহায় রূপসা জমিদারবাড়িতে জমিদারির বীজ অংকুরিত হয়। তিনিই ছিলেন এই জমিদারির কর্ণধার।
তার পরেই এই এস্টেট পরিচালনার গুরুদায়িত্ব পান মোহাম্মদ গাজী চৌধুরী। তিনি ছিলেন এই বংশের সর্বাপেক্ষা দানশীল ব্যক্তি। তার মৃত্যুর পর জমিদারির দায়িত্ব হাতে নেন আহম্মদ গাজী চৌধুরী। প্রকৃত অর্থে মোহাম্মদ গাজীর ছেলে আহমেদ গাজী চৌধুরীর সময়কালেই এ জমিদার পরিবারের বিস্তৃতি ঘটে। সাধারণভাবে জমিদার বলতেই সাধারণ মানুষের মনে যে, নেতিবাচক প্রতিচ্ছবি ভেসে ওঠে, আহমেদ গাজী সে ধরনের জমিদার ছিলেন না। প্রজাহিতৈসী এ জমিদার তার কাজের মাধ্যমে নিজকে একজন বিশিষ্ট সমাজসেবক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। দয়া ও দানশীলতাই ছিল তার চারিত্রীক বৈশিষ্ট্য। জন কল্যাণমূলক কাজের জন্য তিনি অনেক জমি ওয়াকফ করে যান। তার মধ্যে লাউতলী দীঘির ওয়াকফ উল্লেখযোগ্য।
জমিদারবাড়ির মূল ফটকের পাশে কাছারি ভবন, এই ভবনেই বিভিন্ন বিচারের কাজ সম্পন্ন হতো। শিক্ষানুরাগী এ জমিদার অনেকগুলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। তারমধ্যে রূপসা আহম্মদিয়া উচ্চ বিদ্যালয়, রূপসা আহম্মদিয়া সিনিয়র মাদ্রাসা, রূপসা স্কুল উল্লেখযোগ্য। একই সঙ্গে তিনি ছিলেন অত্যন্ত ধর্মানুরাগী। ইসলাম ধর্মের প্রচার ও প্রসারে তিনি অকৃপণভাবে অনুদান দিতেন। রূপসার সু-প্রাচীন মসজিদ তিনিই প্রতিষ্ঠা করেন। এছাড়াও তার জীবদ্দশায় তিনি আরো অনেকগুলো মসজিদ প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। হবিগঞ্জের লস্করপুর সৈয়দ পরিবারের ঐতিহ্যমহিত সু-প্রাচীন সুশিক্ষিত ও সম্ভ্রান্ত এক মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন বাংলাদেশের এক সময়ের প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন। আহমেদ গাজী ঐ পরিবারে বিয়ে করেন। তাঁর কোনো পুত্র সন্তান ছিল না। পাঁচ কন্যা সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয় মেয়ে তহুরুন্নেছা চৌধুরাণী জমিদারির উত্তরাধিকার মনোনীত হন। আহমেদ গাজীর জীবদ্দশায় অন্যান্য কন্যা সন্তানদের মৃত্যু হয়।সুযোগ্য পিতার সুযোগ্য কন্যা তহুরেন্নেছা অচিরেই তার কর্মদক্ষতার স্বাক্ষর রাখেন। জীবন সঙ্গী হিসেবেও তিনি মনোনীত করেছিলেন এক সুযোগ্য ব্যক্তিত্বকে। হবিগঞ্জের দাউদ নগরের বিখ্যাত জমিদার সৈয়দ শাহ কেরামত উল্যার ছেলে সৈয়দ হাবিব উল্যার সঙ্গে তিনি পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন। তহুরুন্নেছা চৌধুরাণী রূপসাতেই ছিলেন এবং তার স্বামী মূলত জমিদারী দেখাশোনা করতেন। তহুরুন্নেছা অন্য দশজন জমিদারের মেয়ের মত অন্তঃপুরে অলস জীপনযাপন করেননি। তিনি বিভিন্ন সমাজ সেবামূলক কাজে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছিলেন। তাঁর এ কর্মদক্ষতার স্বীকৃতি হিসেবে তৎকালীন ব্রিটিশ পরিবার তাঁকে ‘কায়সারে হিন্দ’ উপাধিতে ভূষিত করেন। এ খেতাব বিখ্যাত মহিলাদের জন্য এক দূর্লভ সম্মান। তহুরুন্নেছা চৌধুরাণীর এক ছেলে ও এক মেয়ে ছিল। তার মেয়ের অকাল মৃত্যু হয়। সৈয়দ হাবিব উল্যার মৃত্যুর পর তার একমাত্র পুত্র সন্তান সৈয়দ আবদুর রশিদ চৌধুরী জমিদারির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯০৭ সালে সৈয়দ আবদুর রশিদ জন্ম গ্রহন করেন। তিনি কলকাতায় পড়াশোনা করেন।
উপমহাদেশের প্রখ্যাত মণীষা লাকসামের নবাব ফয়জুন্নেছার পরিবারের সঙ্গে তিনি বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হন। ঐ পরিবারের সৈয়দ গাজিউল হকের মেয়ে সৈয়দা আমিরুন নেছাকে বিয়ে করেন। আহমদ গাজিউল হক ছিলেন নবাব ফয়জুন্নেছার দৌহিত্র।
সৈয়দ আবদুর রশিদ চৌধুরীর জীবিতাবস্থায় জমিদারি সবচেয়ে বেশি বিস্তার লাভ করে। তিনি শুধু জমিদারী নিয়েই ছিলেন না। তিনি ছিলেন অত্যন্ত সমাজ সচেতন তৎকালীন বৃটিশবিরোধী অন্দোলনে সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা প্রদান করেন। তিনি ছিলেন বঙ্গীয় মুসলিমলীগের স্থানীয় পর্যায়ের নেতা। তিনি তদানিস্তত বেঙ্গল লেজির্সলেটিভ কাউন্সিলের সদস্য নির্বাচিত হন। পূর্ব পুরুষের ঐতিহ্যের ধারাকে তিনি সমুন্নত রাখেন। তার দয়া ও দানশীলতার কথা এলাকাবাসী আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। প্রজাসাধারণ কখনই তার ক্ষমতার রোসানলে পড়েনি। উপরন্তু তার সর্বজনীন মানবতাবাদী আচরণের মাধমের সাধারণ মানুষের প্রিয়ভাজন হন তিনি। তার ফলশ্রুতিতে পাকিস্তান আমলে জমিদারী প্রথা বিলুপ্তি হলেও সাধারণ মানুষের কাছে তিনি প্রত্যাখ্যাত হননি। জমিদারী প্রথা বিলোপের পর অনেক অত্যাচারী জমিদারকেই নিগৃহীত হতে হয়েছে। সমাজ সংস্কারক হিসেবে তার খ্যাতি এ অঞ্চলে সর্বজন স্বীকৃত। তিনি একাধিক হাট-বাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ, মক্তব নির্মাণ করেন। জনহিতকর কাজের বিরল স্বীকৃতি হিসেবে ব্রিটিশ শাসকরা তাকে ‘খান বাহাদুর’ উপাধিতে ভূষিত করেন।
কড়ইতলী জমিদার বাড়ি : চাঁদপুর শহর থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে ফরিদগঞ্জ উপজেলার কড়ৈতলী গ্রামে অবস্থিত এই জমিদার বাড়ি। ১২২০ সালে হরিশ চন্দ্র বসুর হাত ধরে জমিদারদের কড়ৈতলীতে প্রত্যাবর্তন। প্রায় তিনশ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত জমিদার বাড়িটির অস্তিত্ব এখন সামান্য জায়গাজুড়ে। জমিদার বাড়িটি ‘বাবুর বাড়ি’ নামে সবার কাছে পরিচিত। বাবুর বাড়ি বললেই একনামে চেনে উপজেলাবাসী। জমিদার বাড়িটিতে রয়েছে দুর্গা মন্দির, বিধ্বস্ত প্রাসাদ, অট্টালিকা, কাছারি ঘর এবং সুরঙ্গপথ। এছাড়া ‘বাবুর দীঘি’ নামে বিশাল এক দীঘিও রয়েছে। কড়ৈতলী বাজারে রয়েছে ‘শ্মশানকালী মন্দির’। প্রতিদিনই দূর-দূরান্ত থেকে পর্যটক এসে ভিড় জমান বাড়িটি দেখতে।বিশেষ করে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা স্থাপত্যশৈলীর ব্যাপারে জানতে ছুটে আসেন। প্রতিদিনই বাড়িটি লোকারণ্য হয়ে যায়। কালের বিবর্তনে স্মৃতি হিসেবে রয়ে গেছে জমিদারদের অস্তিত্ব। হাতি, ঘোড়া, পাইক, পেয়াদা না থাকলেও ঠায় দাঁড়িয়ে আছে জমিদারদের রেখে যাওয়া স্থাপত্যশৈলী। পোড়া ইট-পাথরের দেয়ালে বাসা বেঁধেছে বিভিন্ন রকমের উদ্ভিদ আর শেওলা। তবুও ঐতিহ্যমণ্ডিত জমিদার বাড়িটি আজও টিকে আছে আপন গৌরবে।
বড়কুল জমিদার বাড়ি: হাজীগঞ্জে আদূরেই ডাকাতিয়া নদীর দক্ষিণ পাড়ে বড়কুল গ্রাম। হাজীগঞ্জ পাইলট স্কুল লাগোয়া পাকা সড়ক। এক কিলোমিটার মতো রাস্তা পেরোলেই নদী। খেয়াঘাট আছে নদীর পাড়ে। নদী পার হলেই ঔপনিবেশিক শাসনামলে প্রতিষ্ঠিত দৃষ্টিনন্দন জমিদারবাড়ি। গাঁয়ের নাম নিয়ে নানা কথা চালু আছে। বড় বংশের (কুল) লোকজন বসতি গড়েছিল দক্ষিণ পাড়ে, তাই এমন নাম। আবার অনেকে বলেন, ডাকাতিয়া নদী খুব ডাকাবুকো ছিল, কূলও ছিল বড়। আজ ডাকাতিয়ার সেই শওকত নেই, নামের সঙ্গে কাজের মিল পাওয়া যায় না আর। তবে কয়েকটি জমিদারবাড়ি নিজের কূলে ধরে রেখেছে ঠিকই। তেমনই একটা বাড়ি ভাগিত্যা বাড়ি মানে ভাগ্যবানের বাড়ি। মালিক ছিলেন জমিদার পদ্মলোচন সাহা। তিনি ছিলেন শৌখিন। বাড়িটির ভেতর-বাইরে ঝলমলে। বাইরে চিনি টিকরির কারুকাজ, ভেতরে
ঝাড়বাতি। পুজোর ঘর, অতিথিশালা, জমিদারের থাকার ঘরÑসব আলাদা আলাদা। প্রাঙ্গণে স্মৃতি মন্দিরও আছে খানকতক। ঢোকার মুখেই চোখে পড়বে লোকনাথ মন্দির। ডান দিকে আছে বড় একটি পুকুর। জনশ্রুতি আছে, জমিদারের মায়ের পায়ে কাদা লাগবে বলে পুকুরের তলদেশ ইট-সুরকি দিয়ে পাকা করা হয়েছিল। পুকুরের পশ্চিমপাড়ে আছে দুটি পাকা ঘাটলা। পুকুর পেরিয়ে সামনে এগোলে দুর্গামন্দির তবে এখন আর পুজোর কাজে ব্যবহৃত হয় না এই মন্দির। মন্দির পেরোলে অতিথিশালা আর তার সামনেই দক্ষিণমুখী দোতলা বসতঘর। চার একর ভূমির উপর অবস্থিত ভবনগুলোর নকশায় মোগল স্থাপত্যরীতি অনুসরণ করা হয়েছে।
শাহরাস্তির নাওড়া মঠ: ১৭৯১ সালে সত্যরাম মজুমদারের হাত ধরে শাহরাস্তি উপজেলার নাওড়া গ্রামে নির্মিত হয় এই স্থাপনা। তবে এর প্রতিষ্ঠাতাকে নিয়ে দ্বিমত রয়েছে। কারো কারো মতে এই মঠটির প্রতিষ্ঠাতা জমিদার শৈলনাথ মজুমদার, যিনি তার মায়ের সমাধির উপর স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবে মঠটি নির্মাণ করেছিলেন।
১৯৭১ সালে আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এই মঠটি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে চাঁদপুরের শাহরাস্তি মুক্তির শেষ তিনদিন পশ্চিম পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী শেষ রক্ষায় এই মঠে ঢুকে পড়ে এবং যুদ্ধ চালিয়ে যায়। এসময় তাদেরকে তিনদিক থেকে মুক্তিযোদ্ধারা ঘিরে রাখে এবং বিরামহীন ভাবে গোলাবারুদ বর্ষন করতে থাকে। এক পর্যায়ে হানাদার বাহিনীর খাদ্য ও গোলাবারুদ শেষ হয়ে আসায় টিকতে না পেরে তারা আহত অবস্থায় মঠ থেকে বের হয়ে পাশের নাওড়া উচ্চ বিদ্যালয় মাঠদিয়ে পালিয়ে যাবার চেষ্টা করে। কিন্তু এসময় চারিদিকে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধের মুখে পড়ে তারা। এই যুদ্ধে মুক্তি বাহিনীর পক্ষে থাকা মিত্র বাহিনীর একজন ভারতীয় শিখ সৈনিক মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়েন এবং বহু মুক্তিযোদ্ধা আহত হন। এই যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী ১৩ পাকিস্তানী বাহিনীর সৈনিকের মরদেহ ২টি গর্তে একটিতে ৭টি এবং অপরটিতে ৬টি একত্র করে নাওড়া রেলওয়ে সেতুর পাশে মাটি চাপা দেয়া হয়েছে। যা বর্তমান প্রজন্মের অনেকের কাছে অজানা। আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে নাওড়া মঠের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়। স্থাপনাটি মহান স্বাধীনতাযুদ্ধের স্বাক্ষী হিসাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। তাছাড়াও তিন শতাধিক বছরের পুরনো এই মঠ এক ঐতিহাসিক সাক্ষ্যপ্রমাণ হিসেবে সংরক্ষিত।
বলাখাল জমিদার বাড়ি : চাঁদপুর হাজীগঞ্জের বলাখালে অবস্থিত জমিদার বাড়িটি বলাখাল চৌধুরী বাড়ি নামে পরিচিত। ধারনা করা হয়, প্রায় একশতক আগে এই জমিদার বাড়িটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই জমিদার বাড়ির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন যোগেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরী। জমিদার বাড়িটি প্রায় ১২.৫১ একর জমি নিয়ে নির্মিত। এই জমিদার বাড়ির জমিদাররা ছিলেন বেশ দানশীল। বলাখাল জেএন উচ্চ বিদ্যালয় ও রেল লাইনটি তাদের দান করা জায়গাতেই করা হয়েছে। এই এলাকায় তাদের এরকম আরো অনেক দানশীলতার চিহ্ন দেখা যায়। ইতিহাসে এই জমিদার বংশের তিনজন ব্যক্তির নাম পাওয়া যায়। তারা হলেন জমিদার বাড়ির প্রতিষ্ঠাতা এবং তার দুই সন্তান সুরেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরী ও দেবেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরী। দেশ ভাগের পর জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হলে এই জমিদার বাড়ির জমিদারিরও সমাপ্তি ঘটে। জমিদার বাড়ির একাংশ এখন ভঙ্গুর। যদিও তা খুব নগন্য অংশ। বাড়ির একপাশে জমিদারের বংশধর থাকেন, অন্যপাশ লাকড়ি রাখার কাজে। স্তব্ধ হয়ে যাবেন ফটকের গায়ের নিপুণ কারুকার্যে। এই বাড়ির ঢোকার সময় পাবেন সূপ্রাচীন ঘাট সমেত পুকুর যদিও ঘাট এখন ভেঙ্গে অনেকটাই বিলুপ্ত।
লোহাগড় মঠ: প্রায় চার থেকে সাত শতাব্দী পুরাতন প্রাচীন এই মঠ চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার লোহাগড় গ্রামে ডাকাতিয়া নদীর পাশে অবস্থিত। যা লোহাগড় জমিদার বাড়ির জমিদাররা তৈরি করেছিলেন।আজ থেকে প্রায় চারশ’ থেকে সাতশ’ বছর পূর্বে লোহাগড় জমিদার বাড়ির জমিদাররা এই এলাকাটিতে রাজত্ব করতেন। মঠের মত বিশালাকার দুটি প্রাসাদ। এই প্রাসাদেই জমিদাররা তাদের বিচারকার্য সম্পাদন করতেন। বিভিন্নত তথ্যে যানা যায় প্রতাপশালী দুই রাজা লৌহ এবং গহড় ছিলেন অত্যাচারী রাজা। তাদের ভয়ে কেউ মঠ সংলগ্ন রাস্তা দিয়ে যেতে শব্দ করতেন না। জনৈক এক ব্রিটিশ কর্তাব্যক্তি ঘোড়া নিয়ে প্রাসাদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বলেছিলেন, “কেমন রাজা রে এরা বাবু রাস্তা গুলো ঠিক নেই!” পরবর্তীতে একথা জমিদারের গোলামরা শোনে লৌহ ও গহড়কে অবহিত করে।
কথিত আছে, ওই কর্তাব্যক্তির জন্য নদীর তীর হতে জমিদার বাড়ি পর্যন্ত সিকি ও আধুলি মুদ্রা দিয়ে রাস্তা তৈরি করা হয়। যার প্রস্ত ছিল ২ হাত, উচ্চতা ১ হাত ও দৈর্ঘ্য ২০০ হাত। পরবর্তীতে ঐ রাস্তাটিতে স্বর্ণ-মুদ্রা দ্বারা ভরিয়ে দেয়া হয় এবং যখন ঐ ব্যক্তি রাস্তাটি ধরে আসছিলো তখন এ দৃশ্য দেখে চমকে উঠেন। রাজার শীর্ষরা তার প্রতি অত্যাচার করেন।
জমিদারি আমলে সাধারণ মানুষ এদের বাড়ির সামনে দিয়ে চলাফেরা করতে পারতো না। বাড়ির সামনে দিয়ে বয়ে যাওয়া ডাকাতিয়া নদীতে নৌকা চলাচল করতো নিঃশব্দে। ডাকাতিয়া নদীর কুলে তাদের বাড়ির অবস্থানের নির্দেশিকাস্বরূপ সুউচ্চ মঠটি নির্মাণ করেন। তাদের আর্থিক প্রতিপত্তির নিদর্শনস্বরূপ তারা মঠের শিখরে একটি স্বর্ণদস্থাপন করেন। জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির পর ওই স্বর্ণের লোভে মঠের শিখরে উঠার অপচেষ্টায় অনেকে গুরুতর আহত হয়। শুধু তা-ই নয় কেউ কেউ মৃত্যুবরণ করেছে বলেও শোনা যায়। কালের সাক্ষী এই প্রাচীন স্থাপনাটি আজও দাঁড়িয়ে আছে তার আপন গৌরবে।








