প্রকাশ : ০৭ মার্চ ২০২৬, ১০:৫৪
সেদিন

পাঁচ তলা নীল রংয়ের বাড়িটি বেশ পুরনো। তারই নিচতলায় শাওন সাহেব তার স্ত্রী নাহিদা এবং তাদের একমাত্র মেয়ে সাওদার চড়ুই পাখির সংসার। শাওন সাহেব শান্ত মেজাজের হলেও তার স্ত্রী বেশ রগচটা স্বভাবের। অন্যদিকে সাদা -মাটা সাওদার প্রাণ কাঁদে সবার জন্য। সেবার কি হয়েছিলো বিকেলে স্কুল থেকে ফেরার পথে মায়ের ঘরের সামনের পেয়ারা গাছটার নিচে ধবধবে সাদা বিড়ালছানার কান্না শুনে সেকি মায়া লাগলো তার! আশেপাশে ঘুরে ঘুরে বোধহয় মাকে না দেখতে পেয়ে কাঁদছে। তাইতো ছানাটাকে কোলে নিয়ে যখনই বাড়ি পৌঁছালো তখনই দরজার ওপাশ হতে মায়ের চিৎকার চেঁচামেচি শুনতে পেলো সে। পঁচা কুমড়া কেনার দায়ে শাওন সাহেবকে যেন কারাগারে পাঠানোটাই বাকি রাখলো শুধু। নাহলে তার গোষ্ঠীর পিন্ডি চটকানো শেষ ততক্ষনে। যেই না সাওদা ঘরে ঢুকলো ওমনি তার কোলে বিড়ালটাকে দেখে তার রাগ যেন সপ্তমে চড়লো। এবার নাহিদা বেগম বাবা মেয়ে দুজনেকেই বকতে লাগলেন। বিড়ালটিকে পছন্দ হয়নি মায়ের এটা বেশ বুঝলো সে। আপাতত মায়ের কথায় তার মনোযোগ নেই, তাইতো হট্টগোল শুনে জানালা দিয়ে বাইরে তাকালো সে। রাস্তায় কিছু লোক গাড়ি থেকে আসবাসপত্র নামিয়ে দীপক কাকাদের বাড়ির ভেতরে নিয়ে যাচ্ছে। মাঝারি বয়সের একজন সুদর্শন এবং বেশ গোছানো ধরণের লোক তাঁদের নির্দেশনা দিচ্ছে। এরপর গাড়ি থেকে নামলো ছাই রঙের শার্ট পড়া, এলোমেলো চুলের একজন কিশোর যার চেহারায় বেশ বিরক্তির ছাপ। সাওদা কেন যেন হাভাতের মতো তাকিয়ে রইলো ছেলেটির পানে। এদিকে মায়ের চিৎকারে হুশ ফিরলে বিড়ালটিকে বাড়িতে রাখতে সাহস পেলো না সে। অগত্যা ভেজা চোখেই বিড়ালটিকে পেয়ারা গাছটার তলায় রেখে আসলো সে।
সাদা রঙের বাড়িটির ২য় তলাটিকে ঘুরে ঘুরে দেখছিলো মিহাদ। এ শহরে তার বাবার নতুন পোস্টিং হওয়ায় বাধ্য হয়েই মিহাদকে এখানে আসতে হয়। রাতে ঘর গুছিয়ে ঘুমাতে দেরি হওয়ায় সকালে উঠে একপ্রকার দৌঁড়েই কলেজের উদ্দেশ্যে বের হয় মিহাদ। যতই অপছন্দ হোক না কেন নতুন কলেজে তো আর দেরি করে যাওয়া যায় না। পথে একটি মেয়ের জীবপ্রেম দেখে তার মন মুগ্ধতায় ছেয়ে গেলো। স্কুলে যাওয়ার সময় লুকিয়ে বিড়ালটিকে দুধ খেতে দেয় সাওদা। প্রিয় রং নীল হওয়ায় সাওদা বিড়ালটির নাম দেয় নীলা। গাছের পেছন থেকেই মিহাদ ওদের কথোপকথন শুনতে পায়। সাওদা বলে, “জানো নীলা মা আমাকে খুব বকেছে। তোমাকে দুধ দিলাম, খেয়ে নাও”। নীলাকে দুধ খেতে দেখে খিলখিলিয়ে হেসে সাওদা বললো আজ থেকে আমরা বন্ধু কেমন? মিহাদ আর দাঁড়ালো না, নাহয় যে বড্ডো দেরি হয়ে যাবে।
মিহাদের ঘরটা একদম রাস্তার কাছে। তার ঘরের পড়ার টেবিলটির সাথেই রয়েছে বড় একটি জানালা। রাতে সেই জানালা দিয়ে সামনের নীল রঙের বিল্ডিংটির নিচ তলার জানালা দিয়ে সকালের সেই মেয়েটিকে সাদা একটি বিড়ালের সাথে হেসে হেসে কথা বলতে দেখতে পায় সে। এদিকে একা একা কথা বলছে ভেবে জানালাটা বন্ধ করে দেয় নাহিদা বেগম। খাওয়া শেষে খাটে শুয়ে শুয়ে মিহাদ ভাবছিলো-বিড়ালটার নাম কি ছিল? কি যেন রং লাল নাকি হলুদ? অতিকষ্টে মিহাদ নীলা নামটি মনে করলো। আর নীলার বন্ধুর নাম কি?”ষোড়শী” নাম দিলো তার। মিহাদ ভেবেছিলো ঐটাই হয়তো তার ষোড়শীর ঘর। তাইতো প্রায়ই লুকিয়ে লুকিয়ে জানালাটার দিকে তাকিয়ে থাকতো ঠিকই তবে দেখা মিলতো না। সাওদার মা তার ঘরের জানালা বন্ধই রাখতো প্রায় যেন সাওদা বিড়ালটির সাথে কথা বলে পড়াশোনার ক্ষতি না করে। সাওদার প্রায়ই মনে পড়তো এলোমেলো চুলের সেই ছেলেটিকে। রাস্তায় দুই-একবার তার সাথে দেখা হলে সাওদা যেন শ্বাস নিতেই ভুলে যেত। মাঝে মাঝে সাওদা না আসলে নীলাকে খাবার দিতো মিহাদ। ধীরে ধীরে নীলা ও হয়ে যায় মিহাদের বন্ধু। সাওদাও দেখলো তারপর অবর্তমানে নীলার যত্ন নেয় আরো একজন। এভাবেই বছর প্রায় শেষ হতে চললো, তবে ষোড়শীর আর এলোমেলো চুলের ছেলেটির দেখাই হলো না ঠিকমতো!
কয়েকদিন ধরেই মিহাদের বাবার বদলির কথা চলছে। হয়তো মিহাদের প্রি-টেস্টের পরেই। দিনটি ছিল ডিসেম্বরের ২৩ তারিখ। সকাল থেকেই ঘোর বর্ষায় শহরটা যেন কাকভেজা হয়ে আছে। সাওদার আজ টেস্ট পরীক্ষার ফলাফল দিয়েছে। সব বিষয়ে ভালো করলেও অংকে পেয়েছে মোটে ৪৭। তাইতো বরাবরের মতো এবারে ও অংকের জন্য তাকে মায়ের কাছে বকা খেতে হলো। বকুনি খেয়ে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়েই পড়লো সাওদা। এদিকে মিহাদের বাবা আসাদ সাহেব আসবাসপত্র গাড়িতে তুলছেন।বৃষ্টির কারণে রাস্তায় কাদা জমে যাওয়ায় গাড়িটা গলির সামনে রাখা হয়েছে। অন্য শহরে যেতে হবে বিধায় মিহাদ মন খারাপ করে তার ঘরের টেবিলটাতে বসে আছে। হঠাৎ মিহাদ দেখলো নীলা বৃষ্টিতে ভিজে গুটিসুটি হয়েছে গাছটার কাছে বসে আছে। মিহাদ তার কালো ছাতাটি নিয়ে বের হয়। নীলাকে এই অবস্থায় দেখে তাকে সঙ্গে করে নিয়ে আসে। আসাদ সাহেব মিহাদকে ডাক দিলে সে গাড়ির দিকে এগিয়ে যায়। সাওদা ঘুম থেকে উঠে নীলাকে দেখতে না পেয়ে বেশ চিন্তায় পড়ে যায়। এদিকে মিহাদ শেষ বারের মতো তার ষোড়শীকে দেখার জন্য দৌঁড়ে সাওদাদের বাড়ির সামনে যায়। সাওদা পেছনে ফিরে দেখতে পায় নীলা সেই এলোমেলো চুলের ছেলেটির কোলে। অন্যদিকে সাওদার মা তাকে ঘরে দেখতে না পেয়ে বাইরে এসে সাওদা সাওদা বলে খুঁজতে থাকে। মিহাদ কিছু বলার আগেই নাহিদা বেগম সাওদাকে টেনে নিয়ে যায়। সফল সাক্ষাৎকার হয় নি তো কি হয়েছে মিহাদ সাওদার নামটি তো জানতে পারে, এতেই সে বেজায় খুশি। মিহাদ গাড়িতে গিয়ে বসলো। তার বাবা নীলার সম্পর্কে জানতে চাইলে মিহাদ কিছুই বললো না। মিহাদ যে নিজের খেয়াল খুশি মতো চলে সেটা তিনি জানেন। তাই তো তিনি প্রসঙ্গ পাল্টে বললেন, জানো মিহাদ আজকে আমার শাওন সাহেবের সাথে দেখা। এইটা শাওন সাহেবের কার্ড, এইযে নিচে তারপর ফোন নাম্বার দেওয়া। মিহাদের কোনো আগ্রহই দেখা গেলো না। আসাদ সাহেব ফের বলতে লাগলেন, জানো তিনি নাকি আমাদের সামনের বিল্ডিং এ থাকতেন অথচ কোনোদিন দেখাই হয় নি। ভদ্রলোক তার বউয়ের জ্বালায় যাকে বলে একদম অতিষ্ট। তার সাওদা নামে একটি মিষ্টি মেয়েও আছে।এতোক্ষণ যেই কার্ডটা মিহাদের কাছে মূল্যহীন ছিল সেই কার্ডটাই এখন তার কাছে যেন অমূল্য। এই ঘটনা আসাদ সাহেবকে অবাক করলেন বেশ।
ষোড়শী আর এলোমেলো চুলের ছেলেটির পথের দূরত্ব বেড়েছিল ঠিকই কিন্তু হয়তো নতুন পথচলার সূচনা হয়েছিলো সেদিন।







