প্রকাশ : ০৭ মার্চ ২০২৬, ১০:৫১
ধারাবাহিক উপন্যাস-৩৫
নিকুঞ্জ নিকেতন

(পূর্ব প্রকাশের পর)
‘আমি বিষয়গুলো আগে থেকেই বুঝতে পারি আর সেজন্যই তো রুমটা গুছিয়ে রেখেছিলাম। সবই নিয়তি বুঝলে এটার বাইরে আমরা কেহই না।’
আমাদের আলোচনার মাঝে পিটার এসে উপস্থিত। কাছে বসে মাথা নুঁইয়ে চুপচাপ বসে আছে যেন সে একটা করুণার পাত্র। তার মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু বলব সেই সাহসটুকু নেই আমার। এরই মধ্যে অনিমেষও এসে হাজির আমাদের সমাবেশে। নরেন্দ্র দা বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থেকে পিটারের সামনে প্রশ্ন তুললেন।’
‘পিটার এখন কী করবে ভেবেছ?’
‘আমি জানি না দাদা আপনিই বলে দিন কী করার আছে আমার?’
‘আমাদের বলার কিছুই নেই সিদ্ধান্তটা একান্ত তোমার।’
‘দাদা যখন পরিবারের প্রয়োজন ছিল আমি সামনে ছিলাম, সন্তানদের দাঁড়ানোর প্রয়োজন ছিল আমি হাত ধরেছিলাম, যার যখন প্রয়োজন আমি ছিলাম অথচ যখন আমার প্রয়োজন তখন আশপাশে তাকিয়ে দেখি কেউ নেই। পরিচিতদের তখন অচেনা হতে দেখি।’
‘যা ঘটে গেছে তা নিয়েই পড়ে থাকবে নাকি সেগুলো ভুলে গিয়ে সামনে এগিয়ে যাবে। আপন মানুষগুলো আপন হতে অনেক সময় লাগে কিন্তু অচেনা হতে মুহূর্তই যথেষ্ট তাই জীবনে গুরুত্ব বোঝার চেষ্টা কর। কোনো একজন একদিন একটা কথা আমায় বলেছিল যা আজ তোমায় বলি-যদি কষ্টের চেয়ে মানুষটার গুরুত্ব বেশি থাকে তাহলে কষ্টকে ভুলে যেও আর যদি মানুষের চেয়ে কষ্টের গুরুত্ব বেশি হয় তাহলে মানুষগুলোকে ভুলে যাও। দেখবে জীবনের আফসোসগুলো বয়ে বেড়াতে হবে না। আমরা তোমায় সাজেশন দিতে পারি কিন্তু সমাধান তোমাকে বের করে নিতে হবে।’
‘আমি তো কম্পিউটারের কোনো বিষয় না যে সিফট-ডিলিট করলেই সব শেষ হয়ে যাবে, মুছে যাবে মেমোরি থেকে। আমি চেষ্টা করি কিন্তু চাইলেও পারি না দাদা হয়ে উঠে না।’
‘পারতে হবে, পারা উচিত। শোন আমাদের প্রত্যেকের পারিবারিক সমস্যা আছে কম-বেশি। কেহ সন্তানদের মাঝে সমস্যা অনুভব করে আবার কেহ সমস্যা অনুভব করে পরিবারের অন্যদের মাঝে। প্রত্যেকের সমস্যাগুলো কিন্তু এক না। এই যেমন আশরাফ সাহেবের কথাই ধরÑতার সমস্যা সন্তান বা পরিবার নয়, সমস্যা তার পরিস্থিতি। এভাবে বিভিন্ন প্রকারের ঝামেলা নিয়েই আমাদের শেষ বয়েসিদের জীবনযাপন। এখন আমরাই যদি এগুলোকে আগলে রাখি তাহলে বাঁচব কীভাবে। তুমি সেই কবিতাটা শোননিÑ
কোথায় স্বর্গ কোথায় নরক
কে বলে তা বহুদূর,
মানুষের মাঝে স্বর্গ-নরক
মানুষেতেই সুরাসুর।
যদি ভুলতে না পার তাহলে নরক যন্ত্রণায় নিজেই ভুগবে। তুমি অনেক সৌভাগ্যবান যে জীবন আরেকবার সুযোগ দিয়েছে সেটাকে কাজে লাগাও। এ দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক তৃতীয়াংশ আমাদের মতো প্রবীণ যারা জীবনে সুযোগের অভাবে মানবেতর জীবনযাপন করে। তাই আমি বলব অতীতটা ভুলে গিয়ে যে কয়টা দিন আছে ভবিষ্যতের তাকে স্বর্গময় করে তোল আর দেখিয়ে দাও সমাজকে প্রবীণরা পঁচে যায়নি শুধু জীবনটা বার্ধ্যক্যে পৌঁছে গেছে, মনটা নয়।’
২০.
দিনগুলো কেটে যাচ্ছে এমনিভাবে কতগুলো মানুষ নিয়ে হাসি-আনন্দের মাঝে। একাকিত্ব এখন আর ধরা দেয় না এবং অসহায়ত্ব যেন অচেনা কিছু যাকে দেখেছিলাম কভুও এখন তার পাত্তা নেই। রওশন আরার একটা ভালো সঙ্গী বিশাখা যার কাছে সে মন খুলে কথা বলতে পারে। এদিকে অনিমেষের পরিবার নারায়ণগঞ্জে শিফট হয় আর অনিমেষ চলে গিয়ে সেই আগের অবস্থায় জড়াজীর্ণ। আমরা গিয়েছিলাম একবার বেড়াতে তার ওখানে আর আমাদের দেখে অনিমেষ যেন বাচ্চা শিশুর মতো আগলে ধরল। তাদের অনুরোধেই আমরা দুটা দিন সেখানে থেকে যাই। বয়স্ক লোকেরা চাইলেই যেখানে সেখানে হুট করে যেতে পারে না, থাকতে পারে না কারণ তাদের জীবন প্রণালি ছকে বাঁধা একটা নিয়মে চলে এবং
সেটা পরিচালনার চাবি থাকে ওষুধের বাক্সে। চলে আসার আগের দিন আমরা একটা প্রস্তাব রাখি তার পরিবারের সামনেÑঅনিমেষ আমাদের সাথে থাকবে নিকুঞ্জ নিকেতনে। ছেলেরা অনিমেষের মতামত জানতে চাইলে সে এক বাক্যে রাজি হয়ে যায়। পরিবারের অন্যরা আর বাঁধা দিতে পারেনি কারণ একটা ট্রমায় অনিমেষ ভুগেছিল কোনো একসময়। একাকিত্ব তার প্রধান শত্রু যাকে দূর করার একমাত্র উপায় তার সমবয়েসিদের সঙ্গ। এখন অনিমেষও নিকুঞ্জ নিকেতন পরিবারের একজন সদস্য। বিশাখার পরীক্ষা পরবর্তী কোনো কাজ নেই তাই তার সঙ্গী আশরাফ সাহেবের স্ত্রী রওশন আরা। বেশ ভালো জুটি বেঁধেছে দুজন তাই চক্ষুলজ্জার রেশ কাটিয়ে সে একদিন মুখ খুলে বলে ফেলেÑ
‘আমার জন্য কোনো একটা কাজ জোগাড় করে দিতে পারবে বিশাখা?’
‘কোন ধরণের কাজ জোগাড় করে দিব আন্টি তাছাড়া এই বয়সে আপনি কী কাজ করবেন? মনমোহন কাকার সাথে মাঝে মাঝে আপনিও রান্না-বান্না করেন এটা কাজ না? ’
‘জানি না, তবে একটা উপার্জন অবশ্যি প্রয়োজন। আমাদের একটা খরচ, তোমার আংকেলের ওষুধের খরচ এগুলো সবই নরেন্দ্রদা বহন করছেন। আমাদের মাথা গোজার ঠাঁই দিলেন, ভরনপোষন করছেন তারওপর যদি ব্যক্তিগত খরচের চাপও তুলে দেই নিজের কাছে অস্বাভাবিক লাগে। তার চেয়ে ছোটখাটো কোনো কাজ করে যদি উনার ওষুধের খরচটাও চালাতে পারি তাহলে নিজেকে অনেক ধন্য মনে করব। নিজের কাছেই নিজে ছোট হয়ে যাই যখন উনাদের উপর বসে খাই।’
‘আপনার কোনো প্ল্যান আছে অর্থাৎ কী করতে চান সেটা কিছু ভেবেছেন?’
‘না কিছুই ভাবিনি?’
‘আচ্ছা আপনি কী ধরনের কাজ করতে পারেন?’
‘আমি সেলাই করতে পারি আবার কুটির শিল্পের বিভিন্ন ধরনের বুননের কাজও পারি। ব্যাগ, পুতুল, কার্পেট ইত্যাদি তৈরি করা। বহু আগের কথা যখন তোমার আংকেল চাকুরি করতেন তখন বাসায় অবসর বসে কী করব এই কাজগুলো করতাম।’
‘বাহ্ তাহলে তো হয়েই গেল। আমাদের পাশের এলাকায় একটা মিশনারী রয়েছে সেখানে কুটির শিল্পের বিভিন্ন ধরনের কাজ করানো হয় এবং বিনিময়ে মাইনেও দেন উনারা। আমি কাল বের হলে সেখানে নিয়ে যাব আপনাকে। আমার কলেজের এক বন্ধুর বাবা সেখানকার পরিচালক আশা করি সমস্যা হবে না।’
[পরের পর্ব আগামী সংখ্যায় ছাপা হবে]








