শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারি, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ২৩ জানুয়ারি ২০২৬, ১৩:৪৮

রহস্যের অন্ধকারে আলো

মিজানুর রহমান রানা
রহস্যের অন্ধকারে আলো

চঁাদপুর জেলার পাশের উপজেলায় একটি ছোট্ট গ্রামে ছিলো রাহাত নামের কিশোর। বয়স বারো বা তেরো হতে পারে। তার কৌতূহল ছিলো গ্রামের অন্য সব বাচ্চাদের চেয়ে বেশি। স্কুল শেষে সে প্রায়ই নদীর ধারে বসে পুরনো বই পড়তো, কিংবা গ্রামের বয়স্কদের কাছ থেকে অদ্ভুত গল্প শুনতো। একদিন বিকেলে, রাহাত তার বন্ধু মীম আর সোহানকে নিয়ে গেলো গ্রামের পুরনো বটগাছের নিচে। কথিত আছে, সেই গাছের পাশে একসময় একটি পুরনো বাড়ি ছিলো, যেখানে নাকি অদ্ভুত শব্দ শোনা যেতো। বাড়িটি এখন ভেঙে পড়েছে, শুধু ভাঙা দেয়াল আর মাটির নিচে চাপা পড়া কিছু কাঠের টুকরো পড়ে আছে।

মীম ভয় পেয়ে বললো, ‘আমরা এখানে কেন এসেছি? সবাই বলে এই জায়গায় রাতে ভূত দেখা যায়।’

রাহাত মীমের কথা শুনে একটু হাসলো, তারপর বললো, ‘ভূত নেই। তবে রহস্য আছে। আমি শুনেছি এখানে একটা পুরনো বাক্স চাপা পড়ে আছে, যেটা কেউ খুঁজে পায়নি।’

সোহান কৌতূহলী হয়ে উঠলো। তারপর বললো, ‘বাক্সে কী আছে?’

রাহাত কঁাধ ঝঁাকালো। তারপর বললো, ‘সেটা জানার জন্যই তো এসেছি।’

তারা তিনজন মাটি খুঁড়তে শুরু করলো। কিছুক্ষণ পরেই তারা একটি মরিচা ধরা লোহার বাক্স পেলো। বাক্সটি ভারী, আর তালা দেওয়া।

মীমের চোখ বড় হয়ে গেলো, সে বললো, ‘এটা খুলবো কীভাবে?’

রাহাত বললো, ‘আমাদের গ্রামের মসজিদের পাশের হুজুরের কাছে পুরনো চাবির সংগ্রহ আছে। হয়তো ওখান থেকে কিছু পাওয়া যাবে।’

পরদিন তারা হুজুরের কাছে গেলো। হুজুর বাক্স দেখে অবাক হয়ে বললেন, ‘এই বাক্সটা আমি আগে দেখেছি। আমার দাদার সময়কার। বলা হয়, এর ভেতরে এমন কিছু আছে যা গ্রামের ইতিহাস বদলে দিতে পারে।’

চাবি খুঁজে পাওয়া গেলো না, তবে হুজুর বললেন, ‘বাক্স খোলার জন্য তোমাদের সাহস দরকার। ভেতরে যা আছে, সেটা হয়তো তোমাদের ভয় দেখাবে, আবার হয়তো আনন্দও দেবে।’

রাহাত, মীম আর সোহান বাক্সটি নিয়ে আবার বটগাছের নিচে গেলো। তারা চেষ্টা করতে করতে অবশেষে তালা ভেঙে ফেললো। বাক্স খুলতেই ভেতর থেকে বের হলো একটি পুরনো ডায়েরি আর কিছু অদ্ভুত চিত্র।

ডায়েরির প্রথম পাতায় লেখা ছিলো: “যে এই ডায়েরি পড়বে, সে গ্রামের লুকানো রহস্য জানতে পারবে। তবে সাবধান, সত্য জানার পর আর ফিরে আসার পথ থাকবে না।”

তারা পড়তে শুরু করলো। ডায়েরিতে লেখা ছিলো, বহু বছর আগে এই গ্রামে এক বৃদ্ধ শিক্ষক ছিলেন, নাম আব্দুল করিম। তিনি গ্রামের শিশুদের পড়াতেন, কিন্তু এক রাতে হঠাৎ নিখেঁাজ হয়ে যান। কেউ তাকে আর খুঁজে পায়নি।

ডায়েরির শেষ পাতায় একটি মানচিত্র অঁাকা ছিলো। মানচিত্রে ডাকাতিয়া নদীর ধারের পুরনো কবরস্থানের পাশে একটি গোপন চিহ্ন দেওয়া।

তিন বন্ধু সিদ্ধান্ত নিলো মানচিত্র অনুসরণ করবে। রাতের অন্ধকারে তারা কবরস্থানের দিকে গেলো। চারপাশে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, বাতাসে অদ্ভুত শীতলতা।

হঠাৎ তারা দেখলো, একটি পুরনো কবরের পাশে মাটির নিচে কিছু জ্বলজ্বল করছে। খুঁড়ে বের করতেই তারা পেলো একটি ছোট্ট কাঠের বাক্স। ভেতরে ছিলো কিছু পুরনো বই, গ্রামের ইতিহাস, আর একটি চিঠি।

চিঠিতে লেখা ছিলো: “আমি আব্দুল করিম। আমি জানি, গ্রামের কিছু মানুষ লোভের কারণে শিশুদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করতে চাইছে। আমি এই বইগুলো লুকিয়ে রেখেছি, যাতে ভবিষ্যতের শিশুরা সত্য জানতে পারে। যদি তোমরা এগুলো খুঁজে পাও, তবে প্রতিজ্ঞা করোÑতোমরা গ্রামের মানুষকে সত্য জানাবে।”

রাহাত, মীম আর সোহান প্রতিজ্ঞা করলো। তারা বইগুলো নিয়ে স্কুলে গেলো, শিক্ষককে দেখালো। শিক্ষক বই পড়ে বুঝলেন, গ্রামের পুরনো ইতিহাসে অনেক সত্য চাপা পড়ে ছিলো।

গ্রামের মানুষ একত্র হলো। সবাই জানলো, আব্দুল করিম আসলে গ্রামের শিশুদের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। তার নিখেঁাজ হওয়ার রহস্য এখন উন্মোচিত হলো।

রাহাত বললো, ‘আমরা ভয় পাইনি। আমরা সত্য খুঁজেছি। আর সত্য সবসময় আলো হয়ে আসে।’

গ্রামের মানুষ আনন্দে কেঁদে ফেললো। তারা আব্দুল করিমের নামে একটি নতুন পাঠাগার তৈরি করলো।

রাহাত, মীম আর সোহান বুঝলোÑরহস্য যতই অন্ধকার হোক, সাহস আর কৌতূহল থাকলে আলো খুঁজে পাওয়া যায়।

তাদেরকে পুরো গ্রামের মানুষ মিলে সাধুবাদ জানালো। তারা পড়াশোনায়ও ভালো ছিলো। একদিন একজন সাংবাদিক এ বিষয়ে জানতে পেরে তাদের সাক্ষাৎকার নিতে আসে, তাদেরকে পড়াশোনা করে ভবিষ্যতে কী হতে চায় প্রশ্ন করলে তারা জানায়, ‘আমরা তথ্যপ্রযুক্তির উপর পড়াশোনা করবো আর ভবিষ্যতে তথ্য-প্রযুক্তির জ্ঞান দ্বারাই পৃথিবী চলবে। আমরা আমাদের দেশকে উন্নত দেশে পরিণত করতে চাইলে পুরোনো চিন্তাধারা ঝেড়ে ফেলে তথ্য-প্রযুক্তির দুনিয়ায় এগিয়ে যেতে হবে।”

পরদিন সাক্ষাৎকারটি পত্রিকায় প্রকাশ হয়। আর দলে দলে লোকজন এসে তাদের জড়িয়ে ধরে এবং ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নেয়।

দীর্ঘদিন পর তারা নিজেদের আবিস্কার করে আমেরিকায়। তারা তিনজনই গুগলে কাজ করছে আর টাকা আয় করে দেশে পাঠাচ্ছে।

বহুদিন পর তারা একসাথে তিন বন্ধু দেশে আসে, আর সরকার তাদেরকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মাননা দিয়ে এই দেশে চাকুরির প্রস্তাব দেয়। তারাও আনন্দে দেশের কাজে নিজেদেরকে আত্মনিয়োগ করে। দেশ তথ্যপ্রযুক্তিতে এগিয়ে যায়।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়