শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারি, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ২৩ জানুয়ারি ২০২৬, ১৩:৪৬

শিশু শ্রেণীর ‘শিশুবরণ উৎসব’

রাশেদা আতিক রোজী
শিশু শ্রেণীর ‘শিশুবরণ উৎসব’

মায়ের কোল ছাড়ার পর বিদ্যালয় একটা শিশুর প্রথম সামাজিক প্রতিষ্ঠানÑযেখানে তার সামাজিকীকরণ ঘটে। একটি শিশুর সাথে আরেকটি নতুন শিশুর মিথস্ক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। বাড়ি এবং পরিবারের নিরাপদ গণ্ডি পেরিয়ে একটি শিশু যখন প্রথম স্কুলে পা রাখে, তখন তার মনে কৌতূহল এবং ভয়Ñউভয়ই কাজ করে। এই ভয় কাটিয়ে স্কুলকে আনন্দময় করে তুলতেই প্রাক প্রাথমিক শ্রেণীতে “শিশুবরণ উৎসব” পালন করা হয়।

প্রথমবার স্কুলে আসার সময় শিশুরা বাবা-মায়ের থেকে আলাদা হতে ভয় পায়। একটি উৎসবমুখর পরিবেশে তাকে স্বাগত জানালে স্কুলের প্রতি তার মনে ইতিবাচক ধারণা তৈরি হয় এবং অজানা পরিবেশের ভয় দ্রুত কেটে যায়।

রঙিন বেলুন, গান, ছবি এবং ছোট উপহারের মাধ্যমে যখন শিশুকে বরণ করা হয়, তখন তার কাছে স্কুল একটি ‘শাস্তির জায়গা’ না হয়ে ‘খেলার জায়গা’ হিসেবে পরিচিতি পায়। এটি শিশুর স্কুলে আসার আগ্রহ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

এই উৎসবের মাধ্যমে শিশু তার সহপাঠী এবং শিক্ষকদের সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পায়। দলগত কর্মকাণ্ড বা খেলাধুলার মাধ্যমে তাদের মধ্যে সামাজিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যা তার পরবর্তী বিকাশে সহায়ক হয়। শিক্ষকরা যখন হাসিমুখে শিশুদের বরণ করে নেন, তখন শিশুদের মনে শিক্ষকদের প্রতি বিশ্বাস ও নির্ভরতা তৈরি হয়। শিশু অনুভব করে যে স্কুলের এই নতুন মানুষগুলোও তাকে ভালোবাসে।

ঝরে পড়া রোধ

গবেষণায় দেখা গেছে, স্কুলের প্রথম দিনটি যদি আনন্দদায়ক হয়, তবে শিশুরা নিয়মিত স্কুলে আসতে চায়। প্রাক-প্রাথমিক স্তরে সুন্দর একটি শুরু শিশুর ভবিষ্যৎ শিক্ষাজীবনের ভিত্তি মজবুত করে এবং মাঝপথে পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার হার কমায়।

উৎসবটি যেভাবে আনন্দময় হতে পারে :

* মিষ্টি বা চকলেট বিতরণ: শিশুদের ছোট উপহার দিয়ে স্বাগত জানানো।

* সাংস্কৃতিক পরিবেশনা: বড় ক্লাসের শিক্ষার্থীদের দিয়ে ছড়া গান বা নাচের আয়োজন।

* সৃজনশীল কাজ: শিশুদের হাতে রং বা খেলনা দিয়ে তাদের ব্যস্ত রাখা।

শিশুবরণ উৎসব মূলত একটি সেতুর মতো, যা শিশুর শৈশবকে শিক্ষার আনুষ্ঠানিক জগতের সাথে আনন্দের মাধ্যমে যুক্ত করে।

এই শিশু বরণ উৎসবটি একটা শিশুর মনে সারা জীবন প্রভাব বিস্তার করে। জীবনের প্রথম স্কুলে আগমনের দিন সে কখনোই ভুলে না।

জ্যাক বারজুন বলেছিলেন, “শিক্ষকতায় একদিনের কাজের ফল সাথে সাথে দেখা যায় না; তা অদৃশ্য থাকে এবং হয়তো বিশ বছর পর তার প্রকাশ ঘটে।” একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মূলত একজন মালী। মালী যেমন বীজ বপন করে প্রতিদিন নিড়ানি দেন, পানি দেনÑকিন্তু পরদিন সকালেই ফুল বা ফলের আশা করেন না, শিক্ষকের কাজটাও ঠিক তেমন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একেকটি শিশু হলো একেকটি চারাগাছ।

আজ আপনি পরম মমতায় তাকে যে বর্ণমালা শেখাচ্ছেন, যে নৈতিকতার পাঠ দিচ্ছেন বা যে মূল্যবোধের বীজ তার মনে বুনে দিচ্ছেন, তার ফল হয়তো আজই দেখা যাবে না। কিন্তু আজ থেকে ২০ বছর পর, যখন সেই শিশুটি একজন সৎ আমলা, দক্ষ প্রকৌশলী, আদর্শ কৃষক বা একজন সুনাগরিক হয়ে দেশের হাল ধরবে, ঠিক তখনই আপনার আজকের এই “অদৃশ্য” পরিশ্রম দৃশ্যমান হয়ে উঠবে।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, পৃথিবীর অনেক বিখ্যাত মানুষ আজ আস্তাকুঁড়ে হারিয়ে যেতেন, যদি না একজন শিক্ষক তাদের ভেতরের সম্ভাবনাকে আগলে রাখতেন:

আলবার্ট আইনস্টাইন: যাকে শৈশবে ‘মন্দবুদ্ধি’ মনে করা হতো, তিনি আজ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী। কারণ কোনো একজন শিক্ষক তার কৌতূহলকে মরতে দেননি।

হেলেন কেলার: অন্ধ ও বধির এক শিশু আস্তাকুঁড়ে হারিয়ে যেত পারতো, কিন্তু শিক্ষক অ্যান সুলিভানের ধৈর্যের কারণে তিনি আজ বিশ্বজয়ী এক নাম।

এ পি জে আব্দুল কালাম: রামেশ্বরমের এক দরিদ্র পত্রিকা বিক্রেতা বালক আজ ‘মিসাইল ম্যান’ ও রাষ্ট্রপতি হতেন না, যদি না তার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক তাকে স্বপ্ন দেখতে শেখাতেন।

আমাদের বাংলাদেশের গ্রামেও এমন উদাহরণ আছে: কত শিশু আজ বড় ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার, যাদের বাবা-মা হয়তো নিরক্ষর ছিল। সেই শিশুটি যখন প্রথম স্কুলে এসেছিল, তার ছেঁড়া জামা আর অপরিচ্ছন্ন হাত দেখে আপনি তাকে অবহেলা করেননি। বরং তাকে বুকে টেনে নিয়েছেন, মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছেন “তুই বড় হবি”। আপনার সেই একটুখানি মমতার পরশ না থাকলে সে হয়তো আজ কোনো কলকারখানায় শিশুশ্রমিক হিসেবে হারিয়ে যেত অথবা বিপথে পা বাড়াত।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আপনার দায়বদ্ধতা: আমাদের গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে এমন অনেক শিশু আসে, যাদের ঘরে শিক্ষার আলো নেই। আপনিই তাদের প্রথম আদর্শ।

আপনিই উদ্ধারকর্তা: আপনার ক্লাসের যে ছেলেটি আজ ঠিকমতো যোগ-বিয়োগ পারছে না, তাকে ধমক না দিয়ে যদি একবার বুকে টেনে নেন, তবে হয়তো আপনি বিশ বছর পরের একজন সৎ পুলিশ অফিসার বা দক্ষ ডাক্তার তৈরি করছেন। আপনার অবহেলায় সে হয়তো বিপথে গিয়ে সমাজের বোঝা হতো।

অদৃশ্য বীজ বপন: আপনি যখন ছাত্রকে টিফিন ভাগ করে খেতে শেখান বা মিথ্যা না বলতে উদ্বুদ্ধ করেন, তখন সমাজ সংস্কারের এক অদৃশ্য বীজ বপন করেন। যার ফল হয়তো আজ দেখা যাবে না, কিন্তু ২০ বছর পর যখন সে একজন নীতিবান মানুষ হবে, তখনই আপনার সার্থকতা।

ভিত্তিপ্রস্তর: একটি দালান যত উঁচু হোক, তার শক্তি থাকে মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা ফাউন্ডেশনে। প্রাথমিক শিক্ষক হিসেবে আপনি সেই ফাউন্ডেশন তৈরি করেন। কেউ দেখুক বা না দেখুক, আপনার গড়া ভিত্তির ওপরই দঁাড়িয়ে থাকবে আগামীর বাংলাদেশ।

অদৃশ্য বিনিয়োগ: আপনি যখন কোনো শিক্ষার্থীকে সততার গল্প বলেন, তখন আপনি আসলে বিশ বছর পরের একজন ‘দুর্নীতিমুক্ত অফিসার’ তৈরি করছেন। আপনি যখন তাকে প্রশ্ন করতে শেখান, তখন আপনি আসলে একজন ‘ভবিষ্যৎ বিজ্ঞানী’ তৈরি করছেন।

মাঝে মাঝে ক্লাসের ভিড়, অভাব-অনটন বা দাপ্তরিক চাপে আমাদের মনে হতে পারেÑ”কী লাভ এত খেটে?” ঠিক তখনই জ্যাক বারজুনের কথাটি মনে করবেন। আপনার শ্রম বৃথা যাচ্ছে না। আপনার কাজ হলো বীজ বোনা, আর মহাকালের নিয়মে সেই বীজ একদিন মহীরুহ হবেই।

একজন শিক্ষক শুধু জ্ঞান দেন না, তিনি মূলত একটি প্রাণের ‘উদ্ধারকর্তা’। আস্তাকুঁড়ে পড়ে ধুঁকতে থাকা একটি জীবনকে তুলে এনে পালিশ করে উজ্জ্বল হীরায় রূপান্তর করার ক্ষমতা কেবল আপনাদেরই আছে। তাই নিজের কাজকে ছোট করে দেখবেন না; আপনি একেকটি জীবন বঁাচাচ্ছেন। তাই, আসুন, আমরা আমাদের দায়িত্বকে কেবল পেশা হিসেবে নয়, বরং একটি জাতি গঠনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করি। মনে রাখবেন, মালী যদি ধৈর্য হারায়, তবে বাগান মরুভূমি হয়ে যায়। বাংলাদেশের প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয় হয়ে উঠুক একেকটি সোনার মানুষ গড়ার কারখানা। সেই শিশুরাই হবে সত্যিকারের সোনার বাংলার নাগরিক।

আমরা আনন্দের সাথে শিশুর বিদ্যালয়ে আসার প্রথম দিনটিকে “শিশুবরণ উৎসব “হিসেবে পালন করি । তাদেরকে বিদ্যালয়ের প্রতি আকৃষ্ট করি। অভিভাবকগণকে সচেতন করিÑবিদ্যালয় হবে তার শিক্ষার সামাজিক ভিত্তি, যেখানে তার নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে উঠবে।

রাশেদা আতিক রোজী : ইন্সট্রাক্টর, উপজেলা প্রাইমারি এডুকেশন ট্রেনিং সেন্টার (ইউপিইটিসি), চঁাদপুর সদর।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়