শনিবার, ১৭ জানুয়ারি, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ১৮:১১

ধারাবাহিক উপন্যাস-২৮

নিকুঞ্জ নিকেতন

রাজীব কুমার দাস
নিকুঞ্জ নিকেতন

(পূর্ব প্রকাশের পর)

রেস্তোরঁা থেকে বের হয়ে আমরা যথারীতি হঁাটতে হঁাটতে বাজার পর্যন্ত এসেছি। রাত দশটা হতে এখনো অনেকটা সময় বাকি আছে। কটেজ বেশকিছু দূরে আর খাওয়ার পর শরীর এতটা ওজন মনে হচ্ছে যে কোনোভাবেই হেঁটে এতদূর যেতে পারব না। বাজারে এসে বসে এককাপ চা নিতেই আলস্য ভর করল। চায়ের পর্ব শেষ করে ভ্যানগাড়িতে চেপে চলে এলাম কটেজের দিকে। রুমে এখন না আরও পরে যাব তাই সকলের সিদ্ধান্তক্রমে আমরা চলে আসলাম বীচের দিকে। কক্সবাজারের মতো এখানকার বীচে তেমন আলোকসজ্জা নেই তবে একটা মিল আছে এখানেও বীচ সিটগুলো বসানো আছে। আমরা তিনটে সিট ভাড়া করে এগুলো একসাথ করে রিল্যাক্সে বসে পড়ি। পিটার তার ট্রাভলিং ব্যাগ থেকে অবশেষে বোতলটা বের করল।

‘আপনারা যদি অনুমতি দেন তাহলে আমি কয়েক প্যাগ নিতে পারি।’

‘এটা কোথায় পেলে, কখন নিয়েছ পিটার?’

‘গতকালই নিয়েছিলাম কক্সবাজার থেকে।’

‘আরে বল কী? তুমি জান না অ্যালকোহল পরিবহন নিষেধ। গাড়িতে পুলিশ চেকিং এ যদি ধরা খেতে আমাদের মান-সম্মান সবই যেত।’

‘তা ঠিক তবে এটাও ভেবেছি এই জীবনটা হয়তো আর দ্বিতীয়বার আসবে না। বঁাচবই বা কয় দিন। অভ্যেস যেহেতু আছে তাতে মন্দ কী? তা আপনাদের অনুমতি হলে প্যাগ বানাতে পারি।’

‘দু প্যাগের বেশি না। বেশি হলে অসুস্থ্য হয়ে পড়তে পার তখন ঘুরেফিরে মজা পাবে না।’

‘অনিমেষ সঙ্গ দিবে নাকি?

‘অভ্যেস নেই তবে একটা চেখে দেখা যায়।’

বীচে আমরা বসে আছি অনিমেষ আর পিটার আমাদের কাছ থেকে সরে গিয়ে বীচের বালিতে বসে পড়ল। গত পরশু চন্দ্রিমা রজনী ছিল তাই চঁাদের জোছনা এখনো মলিন হয়নি। চঁাদনী রাতে বীচের অনেকাংশে স্পষ্ট দেখা যায়। কুয়াশা তেমন নেই আর নেই ঠান্ডাও। অনিমেষ এক প্যাগ নিয়েই চুপ হয়ে গেল আর প্যাকেট থেকে সিগারেট নিয়ে জ্বালিয়ে নিল। পিটার বড় করে দু প্যাগ মেরে নেয়। অল্প সময়ের মধ্যে অনিমেষ এসে আমাদের পাশে বসে পড়ে হেলানো অবস্থায়। সারোয়ারসহ আমরা বসে আড্ডা দিচ্ছি হঠাৎ দেখি সারোয়ার আমাকে নাড়া দিয়ে বলেÑ

‘দাদা কিছু একটা হয়েছে নইলে পিটার এভাবে বসে আছে কেন?’

‘তাইতো! চল আমরা গিয়ে দেখে আসি।’

আমরা সকলে উঠে পিটারের দিকে আগাই আর কাছে যেতেই দেখি পিটার অঝোরে কঁাদছে। এটা তার মাতলামি নাকি স্বাভাবিকতা বুঝে উঠতে পারছি না। সারোয়ার অনিমেষ তাকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে কিন্তু হচ্ছে না।

‘পিটার-আসার আগে আমি সকলকে বলেছিলাম কোনো পিছুটান রাখবে না। কোনো দুঃখ নেই, অভিমান নেই যা থাকবে তা আমাদের নিজের জন্য বঁাচা, কথাগুলো কী ভুলে গেছ?’

‘আমাকে কেন নতুন করে বঁাচতে শিখাচ্ছেন দাদা যেখানে আমার আগের জীবনটাই অপেক্ষা করছে। ভাবতে পারিনি কভু জীবনের শেষটা এত বিশ্রিভাবে কাটাব। জীবন নাকি সৃষ্টিকর্তার আশীর্বাদ কিন্তু সে জীবনই আমার অভিশাপে পরিণত হয়েছে।’

‘পিটার আমাদের সকলের জীবনেই কিছু না কিছু বিচিত্র অভিজ্ঞতা আছে যার বোঝাটা না চাইতেও আমরা বহন করি।’

‘তুমি কী মনে কর পিটার জীবনে শুধু তোমারই দুঃখ কষ্ট আছে আর কারো নেই। আমাদের সকলেরই আছে তাই বলে কী বঁাচতে চাই না আমরা।’

‘আমার আর তোমার জীবনধারা এক না সারোয়ার। পরে দুঃখ দিলে মেনে নেওয়া যায় কিন্তু আপন মানুষের দেওয়া কষ্টগুলো মেনে নেওয়া যায় না। তোমার মতো জীবনটা গোছানো হলে আফসোস করতাম না। হেঁসে খেলে জীবনটা পার করতাম।’

‘তোমায় কে বলেছে আমার জীবন গোছান। বাইরের চাকচিক্য দেখে কী মনে হয় আমি সুখি? আমারও বেদনা আছে বেশ কিছু। তোমাদের কখনো জানতে দেইনি, বুঝতে দেইনি। প্রতিনিয়ত আমায় সেগুলো খুঁড়ে খুঁড়ে খায় জান। এসো আমার সাথে সিটে গিয়ে বসি। খুব অল্প বয়সে আব্বা-আম্মা একসাথে এক দুর্ঘটনায় মারা যায়। আব্বার মৃত্যুর পূর্বে তখন আব্বা ছাড়া আমরা কেহই উপার্জন করি না আর আমি পরিবারের বড় ছেলে। আমার ডিগ্রি ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হয়নি তখনো। পরীক্ষা চলাকালীন এই দুর্ঘটনায় এত জোরে হেঁাচট খেয়েছি যে উঠে দঁাড়াতে পারছি না কোনোভাবেই। আমার মাথায় পুরো সংসারের দায়িত্ব এবং দায়িত্ব ছোট ভাই-বোনদেরও। আব্বা-আম্মার মৃত্যুর দুদিন পর ম্যাথ পরীক্ষা ছিল আর পরীক্ষার হলে যখন যাই তখন মাথায় ম্যাথের ইকুয়েশন নয় ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা সামনে ভেসে আসে। আগামী দিনের বাজার টাকা ছাড়া কীভাবে করব তাই ভেবে উঠতে পারছিলাম না। আমরা দু-চারদিন শুকনো ভাত খেয়ে কাটিয়েছিলাম বুঝলে। তারপর একদিন পাড়ার এক মুরব্বির সাহায্যে পাশের ফ্যাক্টরিতে লেবারদের সর্দার হিসেবে দায়িত্ব পাই। আমার অধীনে থাকবে বেশ কিছু শ্রমিক। সেবারের পরীক্ষাটা আমার ভালো হয়নি, ফেল করি। জীবনের প্রথম ফেল মানে প্রথম ব্যর্থতা। বিষয়টা কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলাম না। আশপাশের লোকজন কিছু সহানুভূতি দেখালেও অনেকেই আমাদের তাড়িয়ে দিতে চায় সম্পত্তি দখলের লোভে। মাথা গেঁাজার ঠঁাই ছিল বলেই রক্ষে নতুবা বাসাভাড়া দিয়ে ভাই-বোনদের লেখাপড়ার খরচ চালানো দায় হয়ে পড়ত। কলেজ জীবন থেকেই আমি বেশ চটপটে আর মিশুক স্বভাবের ছিলাম। মানুষের সাথে মিশতে পারা আড্ডাবাজি এগুলো আমার দৈনন্দিন রুটিনের অংশ ছিল। হুটহাট এত অভাব, অসংগতি কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না। ভালো প্রস্তুতি নিয়েও ডিগ্রি পাশ করতে পারলাম না আর আগামীতে যে পরীক্ষা দিয়ে পাশ করব সেই সামর্থ ও সুযোগ নেই। লেবারদের মাঝে থেকে সারাদিন অশালিন কথাবার্তা ও তাদের আচরণ আমায় পাগল করে তুলছিল। ওদের সাথে না মিশে আড়াল থাকলেও সমস্যা তাদের ইগোতে লাগে আবার আমার আচরণও তাদের স্টেটাসে যায় না ওরা এটাকে কটুক্তি করে। বিষয়গুলো কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলাম না। আমার আচরণ পাগলের মতো হয়ে আছে আর একটা সাধারণ মানুষ হয়ে ভিন্ন ভিন্ন বেঁচে থাকাও হচ্ছে না। ভাবছি নিজের বা পরিবারের জন্য আমি কিছুই করতে পারছি না। জীবনের যুদ্ধটায় যেন পুরোপুরি হেরে গেছি তাহলে বেঁচে থেকে কী লাভ। তারপর একদিন রাতের বেলা ঘরের কাপড় শুকানোর দঁড়িটা ফ্যানে ঝুলিয়েছি তারপর দীর্ঘনিঃশ্বাস নিয়ে গলায় পঁ্যাচানোর চেষ্টা করলাম। ইচ্ছে করে মরতে গেলে অনেক সাহস লাগে বুঝলে। আমার সেই সাহস সঞ্চার করেছিলাম সারাদিনে কারণ প্ল্যানিংটা আগেই ছিল। গলায় দড়ি টাঙ্গিয়ে টেবিলটা পায়ের নিচ থেকে সরানোর আগেই পরিবারের সকলের মুখগুলো ভেসে আসে চোখের সামনে। পাশে থেকে কেউ যেন ইশারা দিয়ে বারণ করছে অথচ আমি তাকিয়ে দেখি কেউ নেই পুরো ঘর অন্ধকার। মনের মধ্যে একটা আওয়াজ আসছিলÑআমি কী কাপুরুষ যে জীবন যুদ্ধে পরাজয় মেনে নিব। যুদ্ধে হেরে যাওয়াও বীরত্বের কিন্তু পরাজয় মেনে নেওয়া হয় কাপুরুষত্ব। পাশের রুমে গিয়ে ভাই-বোনদের চেহারা দেখে মরা আর হয়নি। না চাইতেও লেবারদের মাঝে কাজ করতে হচ্ছে কারণ এতে আমার সংসার চলে। ভাই-বোনদের পড়াশোনা করাতে অর্থের প্রয়োজন তাই টিউশনে মেতে উঠলাম। ওদের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে থাকি টিউশনের টাকা দিয়ে। কাজ থেকে ফিরে রাত নয়টা পর্যন্ত টিউশন করতাম কিন্তু শিফট ডিউটি করার ফলে টিউশনগুলো চালিয়ে যেতে বেশ কষ্ট হতো। পরবতর্ী বছর আবার ডিগ্রি ফাইনাল দেই। সারাদিন কাজ করে লেখাপড়ায় মনযোগ দেওয়া বেশ কষ্টের ছিল তাই কোনোরকম সেকেন্ড ক্লাসে পাশ করে যাই। এভাবে লেবারদের ইনচার্জ হয়ে কাজ করাটা চলতে থাকে বেশ কিছু বছর। তারপর সৌভাগ্যক্রমে সাকুর্লার হওয়ায় এই সরকারি চাকরিটা ম্যানেজ করি। নিজের ভবিষ্যতের কথা কখনো ভাবিনি অথচ পরিবারের সিংহভাগ উপার্জন আমার পরিশ্রমে। বোনদের বিয়ে দেই ভাইটা মাস্টার্স শেষ করে বি.সি.এস সিলেকশন হয়ে ক্যাডার সার্ভিস করে এখন। তারপর একদিন পরিবারে দেখা দেয় অসংগতি। ভাই বোনদের আমাকে পরিচয় দিতে লজ্জা লাগে। আমি একজন সাধারণ কর্মচারী আর উনারা বড় পদের অফিসার। একই ছাদের নিচে থাকাটাও ওদের জন্য মুশকিল ছিল কারণ বিসিএস ক্যাডারের ভাই একজন সাধারণ ক্লার্ক। অবশেষে একদিন কথাগুলো বলে ফেলে তারপর আমি বলি এই ক্লার্কের উপার্জন দিয়েই আজ তোমরা এখানে। আমায় কী বলে জান! রিজিকের মালিক আল্লাহ তুমি আমাদের জন্য কী করেছ? আমাদের মেধা ছিল বলেই আমরা আজ এখানে তোমার সে মেধা ও যোগ্যতা নেই বলে তুমি একজন ক্লার্ক। কথাটা শোনার পর আমার হাত-পা অবস হয়ে আসে। অবশ্যই রিজিকের মালিক আল্লাহ তাই বলে কী আমার তাদের প্রতি কর্তব্যকর্ম কিছুই ছিল না! ওদের গড়ে তোলার জন্য জীবনে যা কিছু বিসর্জন দিয়েছি সবই বৃথা।

[পরের পর্ব আগামী সংখ্যায় প্রকাশিত হবে]

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়