প্রকাশ : ০৯ জানুয়ারি ২০২৬, ১৪:৫০
শিশুর হাতে রঙিন নতুন বই, নতুন স্বপ্ন বুনন

নতুন বইয়ের ঘ্রাণ আর ঝকঝকে রঙিন পাতাÑএকটি শিশুর কাছে এর চেয়ে বড় উপহার আর খুব কমই আছে। বছরের শুরুতে বা কোনো বিশেষ দিনে যখন একটি শিশুর হাতে নতুন বই ওঠে, তখন তার চোখে-মুখে যে অনাবিল আনন্দ ফুটে ওঠে, তা সত্যিই অতুলনীয়।
শিশুর হাতে নতুন বই পাওয়ার এই আনন্দকে আমরা কয়েকটি বিশেষ দিক থেকে দেখতে পারি:
১. নতুনত্বের রোমাঞ্চ
নতুন বইয়ের প্রতিটি পাতা উল্টানোর মধ্যে একটি রহস্য থাকে। বইয়ের প্রচ্ছদ, ভেতরের রঙিন ছবি এবং অক্ষরের বিন্যাস শিশুকে এক অজানা জগতের স্বপ্ন দেখায়। সেই চিরচেনা “নতুন বইয়ের ঘ্রাণ” শিশুদের মনে এক ধরণের সজীবতা ও উদ্দীপনা তৈরি করে।
২. কল্পনার ডানা মেলা
একটি নতুন বই মানেই নতুন কিছু গল্প বা তথ্য। শিশু যখন বইটি হাতে পায়, সে অবচেতনভাবেই গল্পের চরিত্রগুলোর সাথে নিজেকে মেলাতে শুরু করে। ছবিগুলো দেখে সে নিজের মনে একটি আলাদা জগত তৈরি করে নেয়, যা তার সৃজনশীলতাকে বাড়িয়ে দেয়।
৩. শেখার আগ্রহ ও প্রেরণা
নতুন বই শিশুর মধ্যে অজানাকে জানার এক প্রবল তৃষ্ণা জাগিয়ে তোলে। পড়ার প্রতি যে একঘেয়েমি মাঝে মাঝে তৈরি হয়, নতুন বই তা নিমেষেই দূর করে দেয়। এটি তাকে নতুন উদ্যমে পড়াশোনা শুরু করার অনুপ্রেরণা দেয়।
৪. মালিকানার আনন্দ
“এটি আমার বই”Ñএই অনুভূতিটি শিশুর আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়। নিজের নতুন বইগুলো গুছিয়ে রাখা, তাতে নাম লেখা বা মলাট দেওয়ার কাজগুলোর মাধ্যমে সে দায়িত্বশীল হতে শেখে।
শিশুর এই আনন্দকে দীর্ঘস্থায়ী করতে আমাদের উচিত তাদের বই পড়ার জন্য উৎসাহ দেওয়া এবং তাদের পছন্দমতো বই উপহার দেওয়া। বই হোক শিশুর শ্রেষ্ঠ সঙ্গী।
বছরের প্রথম দিন শিশুর হাতে নতুন বই মানেই হচ্ছে এক উজ্জ্বল ভবিষ্যতের শুভ সূচনা লগ্ন।
জানুয়ারির এক তারিখ মানেই বাংলাদেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আঙিনায় এক উৎসবমুখর পরিবেশ। হিমেল হাওয়ায় শিশুদের কলকাকলি আর নতুন বইয়ের ঘ্রাণে মুখরিত হয় বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ। ‘শিশুর হাতে নতুন বই দেওয়া’ কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং একটি শিশুর আগামীর স্বপ্ন বুননের শুরু। এই স্বপ্নকে সফল করতে শিক্ষক, অভিভাবক এবং শিক্ষার্থীÑএই তিন স্তম্ভের সমন্বিত ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শিক্ষার্থীদের করণীয়: আগামীর স্বপ্ন সারথি
নতুন বই হাতে পাওয়ার আনন্দকে পড়াশোনার শক্তিতে রূপান্তর করতে শিশুদের যা করতে হবে:
বইয়ের যত্ন ও সম্মান: নতুন বই পাওয়া মাত্রই তাতে নিজের নাম লিখে সুন্দর করে মলাট দেওয়া। বই ছেঁড়া বা নোংরা না করার প্রতিজ্ঞা করা, কারণ বই-ই হলো শ্রেষ্ঠ বন্ধু।
কৌতূহলী পাঠ: বই হাতে পেয়েই সব মুখস্থ করার প্রয়োজন নেই। বরং ছবিগুলো দেখা, গল্পগুলো পড়া এবং এ বছর নতুন কী কী শেখা যাবে তা নিয়ে বন্ধুদের সাথে আলোচনা করা।
নিয়মিত উপস্থিতির শপথ: বছরের প্রথম দিন থেকেই প্রতিদিন বিদ্যালয়ে আসার মানসিক প্রস্তুতি নেওয়া।
শিক্ষকদের ভূমিকা: আলোকবর্তিকা ও পথপ্রদর্শক
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ওপরই মূল দায়িত্ব থাকে একটি আনন্দময় শিখন পরিবেশ তৈরির
উষ্ণ অভ্যর্থনা: বছরের প্রথম দিনটি যেন উৎসবের মতো হয়। হাসিমুখে শিশুদের বরণ করে নেওয়া, যাতে তারা বিদ্যালয়কে ভয়ের বদলে আপন করে নেয়।আর শিশুদের ‘করণীয়’ শুধু শিশুদের নয়,অভিভাবকদেরও বলতে হবে।
বইয়ের সাথে সখ্য তৈরি: প্রতিটি বিষয়ের বই সম্পর্কে মজার কোনো গল্প বা তথ্য দিয়ে শিশুদের কৌতূহল জাগিয়ে তোলা। পড়াশোনা যে একটি আনন্দের সফরÑতা বুঝিয়ে দেওয়া।
পিছিয়ে পড়া রোধে শুরু থেকেই নজর: কোন শিশুটি গত বছর অনিয়মিত ছিল বা কার শিখন দুর্বলতা আছে, তা চিহ্নিত করে বছরের শুরু থেকেই তাদের বিশেষ যত্ন নেওয়া।
অভিভাবকদের ভূমিকা: শিক্ষার মজবুত ভিত্তি
সন্তান বিদ্যালয়ে কী শিখছে, তার চেয়ে বড় বিষয় হলো বাড়িতে সে কেমন পরিবেশ পাচ্ছে।
উৎসাহ ও সঙ্গ দান: শিশু যখন নতুন বই নিয়ে বাড়ি ফিরবে, তখন তার আনন্দকে ছোট করে না দেখে সাগ্রহে বইগুলো উল্টে দেখা। তার নতুন ক্লাসের পরিকল্পনা নিয়ে গল্প করা।
পড়ার সঠিক পরিবেশ: বাড়িতে শিশুর জন্য একটি নির্দিষ্ট পড়ার কোণ বা টেবিল গুছিয়ে দেওয়া। মনে রাখা প্রয়োজন, দামি আসবাব নয় বরং পড়ার জন্য একটি শান্ত পরিবেশই যথেষ্ট।
শিক্ষক-অভিভাবক যোগসূত্র: নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসা এবং শিক্ষকের সাথে কথা বলা। বিশেষ করে উঠান বৈঠক ও মা সমাবেশে সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
কার ভূমিকা অগ্রগণ্য?
প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে শিক্ষকের ভূমিকাই সর্বাগ্রে। কারণ:
আস্থার জায়গা: শিশুরা মা-বাবার চেয়ে অনেক সময় শিক্ষকের কথা বেশি গুরুত্ব দেয়। শিক্ষক যদি প্রথম দিন থেকেই ইতিবাচক ভূমিকা রাখেন, তবে শিক্ষার্থীর ঝরে পড়ার হার কমে যায়।
সেতুবন্ধন: শিক্ষকই পারেন একজন অসচেতন অভিভাবককে বুঝিয়ে সন্তানের পড়াশোনায় আগ্রহী করে তুলতে।
মানসিক ভিত্তি: বিদ্যালয়ের পরিবেশ যদি আনন্দদায়ক হয়, তবে প্রতিকূল পরিবেশ থেকেও আসা একটি শিশু শিক্ষার প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে।
একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে হলে আমাদের শিশুদের মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষার বিকল্প নেই। নতুন বছরের প্রথম দিনে শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীর এই সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে। বই উৎসবের আনন্দ কেবল এক দিনের না হয়ে প্রতিটি দিনের শিখন-শেখানো কার্যক্রমে ছড়িয়ে পড়ুকÑএটাই আমাদের প্রত্যাশা।
এক হাতে নতুন বই, আর চোখে আগামীর স্বপ্ন। নতুন বছরের আনন্দটা এখানেই।নতুন বছরের প্রথম দিন, আর হাতে নতুন বইয়ের ঘ্রাণÑএর চেয়ে সুন্দর শুরু আর কী হতে পারে? প্রতিটি পৃষ্ঠা যেন এক একটি নতুন সম্ভাবনার কথা বলছে।
রাশেদা আতিক রোজী : ইন্সট্রাক্টর, উপজেলা প্রাইমারি এডুকেশন ট্রেনিং সেন্টার (ইউপিইটিসি), সদর, চঁাদপুর।








