প্রকাশ : ২৪ নভেম্বর ২০২৫, ০৯:২৬
খণ্ডে খণ্ডে অখণ্ড জীবন

(পঁয়তাল্লিশতম পর্ব)
|আরো খবর
ডাকনাম সংস্কৃতি : ‘নামে কী আসে যায়’ কিংবা ‘মানুষই নামকে জাঁকাইয়া তোলে’-এ প্রবাদগুলো শৈশব হতে শুনে আসছি। আবার পাশাপাশি ‘নামে আর যমে টানাটানি’ কথাটিও নেহায়েৎ কম শ্রুত নয়। অনেক শাস্ত্র ঘেঁটে, বইপত্র ও দিনক্ষণ মেনে নাম রাখা হলেও কখনও কখনও কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন কিসিমের কিছু নামও আমাদের বিড়ম্বিত করে এবং কারও কারও হাসির খোরাক হয়। ডাক নামের সংস্কৃতি আমাদের সমাজে আবহমান কাল থেকেই প্রচলিত। শৈশবে কেউ নাম জিজ্ঞেস করলে তাই বলতে হতো, ডাক নাম বলবো না আসল নাম? আমরা স্কুল-কলেজে, রেকর্ডেপত্রে যে নাম লিখি তাকেই আসল নাম হিসেবে চিহ্নিত করি। তাই বলে ডাক নাম যে নকল নাম তা কিন্তু নয়। আমার বাবার সনদ নাম ছিলো সুরেশ আর ডাক নাম ছিলো সায়ন। আমার ঠাকুরমাকেও গ্রামের লোকেরা সায়ইন্যার মা বলে ডাকতো। সাধারণত বড়ো সন্তানের নামেই বাপ-মাকে ডাকা হয়। এ কারণেই প্রবচনে বলা হয়, ‘যখন কোনো শিশু জন্ম নেয়, তখন কেবল ঐ শিশুই জন্মগ্রহণ করে না, একজন মা এবং একজন বাবারও জন্ম হয়।’ অর্থাৎ শিশুর জন্মের সাথে সাথে জনক-জননীর মধ্যে পিতামাতার মমত্ববোধ ও দায়িত্বশীলতা তৈরি হয়ে যায়। যে মেয়েটি আগে কারও মেয়ে ছিলো, সে মেয়েটিই সন্তান জন্ম দিয়ে কারও মা হয়ে যায়। অর্থাৎ তার পরিচিতিও নতুন করে নির্মিত হয়। আমার বাবার মতো আমার মা-ও তাঁর পিতামাতার জ্যেষ্ঠ সন্তান ছিলেন। আমার মায়ের কেতাবি নাম ছিলো পাখি। তাই মায়ের মা-বাবাকে সবাই পাখির মা এবং পাখির বাপ নামেই জানতো। কিন্তু আমার দিদিমার কাছে আমার মায়ের ডাক নাম ছিলো পুচি। পুচি নামটা একটা আদুরে নাম। ছোট বাচ্চাদের কেউ কেউ পুচি বা পুচ্চি বলে ডাকে। আবার আদরের বেড়ালকেও কেউ কেউ পুচি বলে ডাকে। মা হয়তো আমার দিদিমার কাছে তেমনই নাদুস-নুদুস, তুলতুলে আদরণীয় ছিলেন। আবার মায়ের সংলগ্ন ছোট ভাই মানে আমাদের বড়ো মামা, যাঁর মূল নাম সুনীল, তাঁকে ডাক নামে ডাকা হতো কালু বলে। মেজো মামা, যিনি তীক্ষ্ণ নাকের অধিকারী, সনদের নাম তাঁর পরিমল। কিন্তু ডাক নাম হলো বোচা। বোঁচা নয় কিন্তু। বোচা নামের উৎপত্তির কারণও জানা যায়নি। ছোট মামার অবশ্য বিমল নামের পরে আর কোনো ডাক নাম বা আদুরে নাম নেই। আমার মেজ কাকা (অনিল) ও বড় পিসির (জ্যোৎস্না) কোনো ডাক নাম নেই। কিন্তু ছোট কাকার (শচীন্দ্র) ডাক নাম ছিলো গুড়া তইন্যা আর ছোট পিসির (যুথিকা) ডাক নাম ছিলো গুড়া তয়নী। এ নামগুলোর উৎস খুঁজতে গেলে আমার ঠাকুরমাকে খুঁজে বের করতে হবে। এটা এখন অসম্ভব।
আমাদের গ্রামে ডাক নামে সোনার ছড়াছড়ি। আমাদের একবাড়িতে আছেন হিমাংশু কাকা যার নাম ছিলো সোনা। তিনি মাস্টারি করতেন। একই সাথে স্কুল মাস্টার এবং পোস্ট মাস্টার। তাকে সবাই সংক্ষেপে ডাকতো সোনা মাস্টার বলে। আমাদের গ্রামের বোর্ড স্কুলেও একজন লম্বা গড়নের শিক্ষক ছিলেন যার ডাক নাম ছিলো সোনা। তাকেও সবাই সোনা মাস্টার নামেই ডাকতো। গ্রামের পূর্ব পাড়ায় অধীর বড়ুয়া নামে একজন ছিলেন। তিনি লম্বা ছিলেন বলে তাকে ডাকা হতো লম্বা সোনাইয়া। পুকুরের পশ্চিম পাড়ে আছেন আমাদের একজন জেঠতুতো দাদা। তিনি টেইলর ছিলেন। তাকে সবাই ডাকে গুড়া সোনা বলে। তার ভালো নাম সবাই এখন বিস্মৃত হয়ে গেছে। গুড়া সোনা নাম বোধ হয় এজন্যেই হলো, কারণ তিনি বয়সে অন্যান্য সোনার চেয়ে নবীন ছিলেন। কেউ কেউ তাকে তার গাত্রবর্ণের জন্যে কালা সোনা নামেও ডাকতো। গ্রামের পশ্চিম পাড়ায় তপনদার বাবা ছিলেন আরেকজন সোনা ডাকনামধারী। ইতিহাস ঠিকমতো খুঁড়লে হয়তো আরও কয়েকজনের সোনা নামের অস্তিত্ব জানা যাবে। সোনার পাশাপাশি এক কাকার ডাক নাম হলো লাইল্যা। তিনি হয়তো তার অন্যান্য ভাইদের চেয়ে একটু ফর্সা ছিলেন। গ্রামে গুড়া বা ছোটরও ছড়াছড়ি ছিলো ডাকনামে। যেমন : গুড়া বঅইন্যা, গুড়া তাতু, গুড়া বালি, গুড়া সোনা, গুড়া তইন্যা, গুড়া তঅনী ইত্যাদি। পেডাইন্যা, মাইট্যা পুতলা, গুন্ডুসী, তুফানি ডাকনামগুলো ছিলো যমের মুখে ঝাঁটা মারার মতো। কারণ তাদের আগের ভাইবোন বাঁচেনি কেউ ভূমিষ্ঠ হয়ে। সবার ধারণা, তুচ্ছ নাম দিলে যমের অরুচি হবে। হয়েছিলো মনে হয়। তাই বোধ হয় তারা বার্ধক্যেই মারা গেছেন। অকালে নয়। আমার এক কাকা ছিলেন, যার ডাকনাম ছিলো ‘প্যাঁচা’। সবাই ডাকতো প্যাঁচাইয়া বলে। ওনার বাপমা ওনাকে ‘প্যাঁচা’ বলে কেন ডাকতেন তা তারাই ভালো বলতে পারবেন। মনে হয় রাতে শিশুকালে তিনি হয়তো জেগে থাকতেন প্যাঁচার মতো নিশাচর হয়ে, বাপমাকে ঘুমুতে না দিয়ে। তারই ছোটভাইয়ের ডাকনাম পুতুল। পুতুলের মতো তিনি ছিলেন না মোটেই। ছিলেন সুঠাম ও কঠিন দেহাবয়বের মানুষ। আমাদের ছোট বয়সে একজনের ডাকনাম ছিলো কালাবদ। কালো ছিলো সে নির্ঘাৎ। কিন্তু তাই বলে ‘কালাবদ’! ডিমকে স্থানীয় ভাষায় বদা বলে। কাজেই নামের উৎস সহজেই অনুমানযোগ্য।
স্কুলে এসে এক বন্ধুর নাম শুনতে পেলাম লইট্যা। আসলে তার স্কুলে লেখা নাম হলো জুয়েল। কিন্তু বন্ধুদের দেওয়া ডাকনামে সে লইট্যা। সে ছিলো হ্যাংলা স্বাস্থ্য, লম্বাটে গড়নের। আরেক বন্ধুকে সবাই ডাকতো নুরানী নামে। তার নাম ছিলো নূরুল হুদা। তার নুরানী নামের মাহাত্ম্য এখন আর মনে নেই। বন্ধু আবেদ ইব্রাহিম ছিলো ঠাণ্ডা মাথার মানুষ। চাপা স্বরে বুকের গভীর থেকে সে কথা বের করতো। কিন্তু বনফুল তাকে ডাকতো সিমেন্টের মানুষ বলে। তার গায়ের ত্বক কি সিমেন্টের মতো ধূসর ছিলো কি না কে জানে। ক্যায়াও নিয়ান ওহন ছিলো কলেজিয়েট স্কুলে পড়ুয়া বন্ধু। তার নাম উচ্চারণে আহমেদ হোসেন স্যারের কষ্ট হতো। তাই স্যার তাকে ডাকতো ঝনঝইন্যা নামে। স্কুলে আবুল বাশার চৌধুরী ছিলো একষট্টি রোল নাম্বার। এতবড় নামে তাকে কে ডাকে? আমরা ডাকনাম দিয়েছিলাম এবিসি। ছোটবেলায় নাটক করতে গিয়ে টুম্পাদি হয়েছিলেন রাজদ্রোহী হেম। এটা ছিলো রবীন্দ্রনাথের ‘রাজা ও রাজদ্রোহী ‘ নাটক। সংলাপ বলতে গিয়ে তিনি মুখ ফস্কে বলে ফেললেন, যদুর বদলে যোদা। এরপর থেকে তার নাম যে টুম্পা তা সবাই ভুলে গেলো। যোদা নামটাই প্রচার হয়ে গেলো। মেডিকেল কলেজের বন্ধু শাকিল পারভেজ নির্ঝরকে অন্যসব বন্ধুরা সংক্ষেপে শাপা বলে ডাকতো। আমাদের বন্ধুদের মধ্যে সে-ই প্রথম পেজার কিনেছিলো। ফলে তাকে আরও সংক্ষেপে ‘পেশাপ’ নামে ডাকা শুরু করলো। আমাদের পাড়ায় এক ধোপা ছিলো যার নাম ছিলো মরণ। লোকে ডাকতো মরইন্যা বলে। এটাও তার ডাক নাম। মরণ নাম নিয়ে সে বেঁচে আছে দিব্যি। টুলুদা ছিলো ডাক নাম। কিন্তু মাঝে মাঝে তার শিশুসুলভ আচরণের জন্যে পাড়ার বিচ্ছুরা ডাকতো টুইল্যা মদাইয়া বলে। তিনি রাগ করতেন না। শিব শঙ্কর শিকদার আমাদের সাথে পড়তো। তার লম্বা নামকে ছোট করে আমরা ডাকতাম এস কিউব বলে। তেমনি আমাদের স্যার বিনয় ভূষণ বড়ুয়ার ডাক নাম ছিলো ছাত্রমহলে বি-কিউব। কলেজে তাহের স্যার ছিলেন দুজন। চেনার সুবিধার্থে আমরাই ডাকনাম দিলাম একটা। বড় তাহের স্যারের মুখে তিল বেশি ছিলো। তাই ডাকনামে বলতাম তিলা তাহের (ক্ষমা প্রার্থনীয়)। ছোট জন লম্বা তাহের। বন্ধু আহসান আর আমি একসাথে টিটি খেলতাম নবীন মেলায়, রহমতগঞ্জ কেবি আবদুস সাত্তার সড়কে। আহসানের চেহারায় মঙ্গোলীয় একটা ভাব ছিলো। তাই নবীন মেলার সভাপতি জামাল ভাই তাকে ডাকনাম দিয়েছিলেন ‘তিব্বতী’। নামটা সবার এতো পছন্দ ছিলো যে তার আসল নামই কারও আর মনে আসতো না। অবেদনবিদ ছিলেন নাজিম ভাই। কিন্তু তাঁর স্কুলের শিক্ষকের বদৌলতে নাম হয়ে গেলো নিজামউদ্দিন। আসল নামটাই তখন হয়ে গেলো ডাক নাম। আমার ছোট ভাই পুষ্প। তার কোনো ডাক নাম ছিলো না। স্কুলে হেনরিয়েটা বেলাসো টিচার তাকে ডাকতেন পুষ্পেন বলে। সে অবশ্য নিজেই নিজের ডাক নাম রাখলো পার্থ। আমার বাবা শুনে অমলিন হাসি হেসে বললেন, ‘ আমার ছেলে কখন পার্থ হয়ে গেলো আমি টেরই পেলাম না!’ তেমনি ছোটবোন সুমনারও কোনো ডাকনাম ছিলো না। ছোট বিধায় তার কোনো ডাক নামের দরকার হয়নি। কিন্তু সে নিজে নিজে নাম দিলো শ্রাবন্তী। তবে পার্থ এবং শ্রাবন্তী নাম দুটো তেমন সচল হতে পারেনি।
আমার নিজের ডাকনাম হলো বাবলা। ছোটবেলায় ‘বাবলা বনের ধারে ধারে বাঁশি বাজায় কে’ বলে আমাকে খেপানোর চেষ্টা করতো সমসাময়িক বড়ো বা সমবয়সীরা। বাবলাকে ছোট করে বাবুও ডাকতো অনেকেই। বাবলাকে স্থানীয় ভাষায় বিকৃত করে কেউ বাবলাইয়াও ডাকতো। আমার দুছেলেকে মাঝে মাঝে আমি ডাকতাম মারুতি-সুজুকি বলে। তবে তারা ডাকনাম হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়নি। একই ভিটেতে জেঠতুতো এক বৌদিকে ঠাট্টা-মস্করা করার লোকেরা ডাকতো জামগুলা সুন্দরী বলে। এ ডাকে অবশ্য বর্ণবাদ চলে আসলেও আসলে তাতে ছিলো আন্তরিকতা, বিভেদ বা বাঁকাদৃষ্টিভঙ্গি ছিলো না। তাঁর সবকাজে সংশ্লিষ্ট থাকার অদম্য প্রেরণা থেকেই তাকে আড়ালে-আবডালে চেয়ারম্যান বলে ডাকা হতো। সোনার মতো তাতু ডাকনামটাও আমাদের গ্রামে বেশ প্রচলিত ছিলো। আমার মেজদাকে তাতু ডাকনামে ডাকতো অনেকেই। আবার তার সবচেয়ে ছোট শালীর ডাক নামও তাতু। আমাদের গ্রামে তাতুর বাপ যেমন ছিলো তেমনি তাতুনিদিও ছিলো। তাতুনিদি অবশ্য সাম্প্রতিককালে মারা গেছেন। তিনি বড়ো তাতু বলেই আরেকজন গুড়া তাতু ছিলো। তাতুর বাপ যার নাম, তাদের ছিলো ফলবতী লিচুগাছ। এ গাছ হতে লিচু চুরি খেতে গিয়েছিলো আমার মেজদার সমবয়সীরা। মেজদা দর্শনার্থী সদস্য হলেও লিচুচোরদের দলে তারও নাম উঠে গেলো ধরা খেয়ে। তাতুনি যেমন ছিলো তেমনি ছিলো তাতুইন্যা। বালি ডাক নামে ছিলো তিনজন। একজন বালি পিসি তথা দূর সম্পর্কের পিসি। আরেকজন গুড়া বালি যিনি শৈশবে আমাকে হাতের লেখা শেখাতেন। নন্তুবালি নামে একজন ছিলেন পশ্চিম পাড়ায়। আমাদের গ্রামের এক মেয়ে যার বিয়ে হয়েছিলো গোমদন্ডী, তার নামও ছিলো বালি। তার বাচ্চা ছেলেকে ডাকা হতো বালির তাতু নামে। তাতু মানে হলো স্থানীয় ভাষায় আদুরে শিশু। পুতুল পুতুল। আমার কাকার ছেলে টুকুন। কী কারণে তাকে কিনারাম নামে ডাকা হতো তা পরিষ্কার ছিলো না আমার কাছে। বাবুন ছিলো তিনজন। একজন টুকুনের বড়ো ভাই যার আসল নাম মণীষ। কিন্তু ডাকনাম বাবুন। আমার এক কাকার নামও বাবুন। তিনি বড়ো বলে তাকে ডাকা হতো বড়ো বাবুন আর তার ছোট ভাইকে ডাকা হতো ছোট বাবুন বলে। বাবুনকে চট্টগ্রামের ভাষায় বলে বঅইন্যা। এদের দুভাইকে তাই বড় বঅইন্যা আর ছোট বঅইন্যা বলে ডাকা হয়। অথচ তাদের ভালো নাম হলো দীপংকর আর কালীশংকর।
পুব পাড়ায় একজন ছেলে ছিলো যার মাথার চুল জন্ম থেকেই সাদা। সে থেকে তার ডাকনাম হয়ে গেলো চীনাইয়া। তার নাম ছিলো ফোরকান। কিন্তু সেই নামের অংশবিশেষ নিয়ে ডাকনাম বানাতে গিয়ে নাম হয়ে গেলো ফোরাইয়া। সাম্পান মাঝি মোখতেলকে সবাই সংক্ষেপে ডাকতো মুত্তুইল্যা বলে। খোরশেদ ভাই পড়তেন আমার বড়দার সাথে। কিন্তু আসল নাম থেকে ডাকনাম বানাতে গিয়ে খোরশেদ ভাই হয়ে গেলেন খুইশ্যা। শহরে এসে আমাদের কম্পাউন্ডে পেলাম ইকবালদের। তার ছোটভাই রাশেদ তাকে ভাইজান না ডেকে ডাকতো ভাইধন বলে। সে থেকে ইকবালও সবার ভাইধন। ইকবালের বড়ো জেঠতুতো ভাই ছিলো যার ভালো নাম বাবুল। তাকে ডাকতো তারা বড়ধন বলে। সেই বড়ধন হয়ে গেলো বদ্ধইন্যা। ওনার বোন ছিলো শিরিন আপা। ইকবালের মায়ের ভাসুরঝি। তিনি শিরিন আপাকে ডাকতেন শিরিয়া বলে। আমাদের দক্ষিণে আরেকটা কম্পাউন্ড ছিলো। তাতে থাকতেন কমরু পিসিরা। কমরু পিসিকে তার মা ডাকতেন সংক্ষেপে কমুনি বলে। তাদের এক ছোট ভাই ছিলো মনির। মনিরকে তার আপন মেজো ভাই ডাকতেন চেউয়া বলে। কারণ সে চেউয়া মাছের মতো পিছলা ও লিকলিকে ছিলো। চেউয়াও কম যেত না। সে তার মেজো ভাইকে প্রত্যুত্তরে খেপাতো : ‘শুক্কুর শনি আন্ডা গণি’ বলে। কারণ তার মেজো ভাইয়ের নাম ছিলো ওসমান গণি। বাসার সামনের দিকে কম্পাউন্ডে থাকতেন গোলাল ভাইয়েরা। তার বড় ছেলে ছিলো মোজাহার। নিজের ছেলেকে আদর করে ডাকনামে ডাকতে গিয়ে তিনি বলতেন, মোজাইজ্যা। স্কুলে মাইকেল ছিলো একজন। লাল টকটকে। দুষ্টু বনফুল তাকে ডাকতো লাল বাঁদর বলে। এন্ড্রু পেরেইরা ছিলো একজন। একটু সিনিয়র। তাকে আড়ালে কেউ ‘এলে পঁ’ বলে ডাকলেই খেপে যেতো। আমাদের পাড়ায় একজন ছিলো তার নাম ছিলো মনে হয় বার্নার্ড। কিন্তু কেউ তাকে ব্ল্যাক স্প্যারো বলে ডাক পাড়লেই খবর ছিলো। লালন ছিলো আমার খেলার সাথী। এখন অবশ্য নাট্য নির্দেশক ও নাট্য নির্মাতা। সেই লালন দাসের ডাকনাম বন্ধুদেরই দেওয়া। মহাপ্রভু। মহাপ্রভুর মধ্যে শ্রীচৈতন্যের কোনো গুণ ছিলো বলে মনে পড়ে না। বরং দুষ্টুমির লেজটা ছিলো লম্বা।
আমার জেঠতুতো বোনের বড়ো মেয়ে, আমার অনেক বড়ো। তার আসল নাম ছিলো মমতা। কিন্তু তাকে ডাকনাম দেওয়া হয়েছিলো কালামণি বলে। তার মাকেও সবাই কালামণির মা বলে ডাকতো। কানা ছেলের নাম পদ্মলোচনের মতোই আমার মামাবাড়িতে একজনের নাম ছিলো চাণক্য। পড়াশুনা তার খুব বেশি একটা হয়নি। চাণক্যের নামকে উজ্জ্বল করে তার আর অর্থশাস্ত্রবিদ হওয়া হয়নি।
ডাকনামে যেমন আদর আছে তেমনি আছে ব্যঙ্গ। কোনো কোনো ডাকনাম নস্টালজিয়ায় ভোগায় আবার কিছু কিছু ডাকনাম শরীর জ্বালিয়ে দেয়। কিন্তু দিনশেষে সেই নামগুলোতেই জড়িয়ে থাকে শৈশব, জড়িয়ে থাকে মায়া। (চলবে)








