বৃহস্পতিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৪, ৫ বৈশাখ ১৪৩১, ৮ শাওয়াল ১৪৪৫  |   ২৭ °সে
আজকের পত্রিকা জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্য সারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয়
ব্রেকিং নিউজ
  •   হাজীগঞ্জে আগুনে পুড়ে ছাই ১০ পরিবারের ঈদ আনন্দ

প্রকাশ : ১৮ জানুয়ারি ২০২৪, ০০:০০

‘সংস্কৃতি অঙ্গনে’র সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে সপ্তসুর সংগীত একাডেমীর অধ্যক্ষ রূপালী চম্পক

যখন আমার কণ্ঠ স্তব্ধ হয়ে যাবে, তখন আমার শিক্ষার্থীদের সংগীতের মধ্যেই বেঁচে থাকবো

অনলাইন ডেস্ক
যখন আমার কণ্ঠ  স্তব্ধ হয়ে যাবে, তখন আমার শিক্ষার্থীদের সংগীতের মধ্যেই বেঁচে থাকবো

রূপালী চম্পক। চাঁদপুর জেলায় এই নামে সকল মহলে পরিচিত অন্য কোনো নারী নেই। তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেতারের তালিকাভুক্ত কণ্ঠশিল্পী। চাঁদপুরের সর্বস্তরের সংগীত-শ্রোতা ও সংগীত-বোদ্ধাদের কাছে রয়েছে তাঁর সুখ্যাতি। সাধারণ্যে রয়েছে তাঁর ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও পরিচিতি। তিনি শুধু গান গান না, গান শেখানও। সেজন্যে প্রতিষ্ঠা করেছেন সপ্তসুর সংগীত একাডেমী, যেটির তিনি অধ্যক্ষ এবং তাঁর স্বামী সভাপতি।

রূপালী চম্পকের পুরো পরিবার সংগীতের সাথে সংশ্লিষ্ট ও ভীষণভাবে নিবেদিত। তাঁর স্বামী চাঁদপুরের প্রখ্যাত সংগীত শিল্পী চম্পক সাহা, যিনি পেশায় একজন ব্যবসায়ী (‘হেভেন’ রেস্তোরাঁর মালিক)। রূপালী চম্পকের স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী জ্যেষ্ঠ সন্তান (কন্যা) স্বর্ণালী সাহা (স্বর্ণা) নামকরা কণ্ঠশিল্পীই শুধু নয়, সংগীতের ওপর দেশে-বিদেশে একের পর এক উচ্চতর ডিগ্রি নিচ্ছেন। বর্তমানে পড়াশোনা করছেন ভারতে। কনিষ্ঠ সন্তান (পুত্র) পৃথ্বীজিৎ সাহা (জিৎ) সংগীত বিষয়ে দেশে পড়াশোনা শেষ করে এখন পড়ছেন সুদূর কানাডায়।

রূপালী চম্পক চাঁদপুরসহ দেশের সংগীতাঙ্গনে শুধু তাঁর শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে নয়, নিজের সন্তানদের মাধ্যমেও বেঁচে থাকবেন, অমর হবেন--এটাই ভক্তদের প্রত্যাশা। মঙ্গলবার দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠের 'সংস্কৃতি অঙ্গন' পাতার পক্ষ থেকে তাঁর একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেন কাজী শাহাদাত। নিচে পাঠকদের জন্যে তা হুবহু পত্রস্থ করা হলো :--

চাঁদপুর কণ্ঠ : সপ্তসুর সংগীত একাডেমি প্রতিষ্ঠার কথা মাথায় আসলো কীভাবে? বিজয় মেলায় এটির আত্মপ্রকাশের বিষয়টি ভাবলেন কেন?

রূপালী চম্পক : নিজের সংগীত চর্চাটিকে ধরে রাখার জন্যে এবং যখন আমার কণ্ঠ স্তব্ধ হয়ে যাবে তখন আমার শিক্ষার্থীদের সংগীতের মধ্যেই আমি বেঁচে থাকবো--এই প্রত্যাশায় সপ্তসুর সংগীত একাডেমী প্রতিষ্ঠা করেছি। আর আমাকে এই স্বপ্নটা দেখিয়েছিলেন অধ্যক্ষ প্রফেসর বিলকিস আজিজ। তিনি আমার গানের একজন গুণমুগ্ধ শ্রোতা। চাঁদপুরের রবীন্দ্র সংগীত সম্মেলন পরিষদের অনুষ্ঠানে নজরুল সংগীত পরিবেশন করে মঞ্চ থেকে নামার পর তিনি আমাকে বলেছিলেন, রূপালী তোমার একটা গানের স্কুল করা উচিত। আমি বললাম, কেন ভাবী? তিনি আমাকে বললেন, সারাজীবন তো আর এমনি করে গাইতে পারবে না। কিন্তু তোমার এই অর্জিত জ্ঞান যদি অন্যদের মাঝে বিলিয়ে দাও, তাহলে ওদের মাধ্যমেই তোমার গান বেঁচে থাকবে। সেই ভাবনা থেকেই বিজয়ের মাসে চাঁদপুরের মিলন মেলা খ্যাত বিজয় মেলায় সপ্তসুরের আত্মপ্রকাশ ঘটে ২০০৩ সালের ১৭ ডিসেম্বর।

ডিসেম্বর মাসটি বিজয়ের মাস। আর এটি আমার এবং সভাপতি দুজনেরই জন্মমাস। তাই এই বিজয়ের মাসে বিজয় মেলাতেই সপ্তসুরের আত্মপ্রকাশের বিষয়টি মাথায় এসেছিলো।

চাঁদপুর কণ্ঠ : আপনি সপ্তসুরের যে কোনো অনুষ্ঠান-পরিকল্পনায় গতানুগতিকতা পরিহারের বিষয়টিকে প্রধান্য দেন। এটি কেন?

রূপালী চম্পক : নিজেদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার জন্যে। এতে করে দর্শকও একঘেঁয়েমি থেকে মুক্তি পায় এবং যারা উপস্থাপন করে তারাও নতুন নতুন পরিবেশনার সুযোগ পায়।

চাঁদপুর কণ্ঠ : কোরিওগ্রাফি আপনার অনুষ্ঠানের একটা আকর্ষণীয় দিক। এটা কি শরীফ চৌধুরীর মতো খ্যাতিমান অভিনেতাকে আপনার প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা হিসেবে পেয়ে?

রূপালী চম্পক : এটা ঠিক যে শরীফ চৌধুরীর মতো খ্যাতিমান অভিনেতাকে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে পাওয়াতে, তা কিন্তু নয়। আমার পরিকল্পিত কোরিওগ্রাফিগুলোর অধিকাংশই তার সুন্দর ও সফল অভিনয়-গুণে মূর্ত হয়ে উঠে। তবে কোরিওগ্রাফির নেশাটা আমার নিজস্ব সংগঠন হওয়ার পূর্ব থেকেই আমার মাথায় ঘুরপাক খেতো। যার প্রথম আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল আমারই এক বাল্য সখীর মাধ্যমে, যাকে বর্তমানে সবাই কবি-সাহিত্যিক হিসেবেই বেশি চিনে। আমরা বন্যার ওপরে একটি কোরিওগ্রাফি করেছিলাম, যাতে নেপথ্য কণ্ঠে ছিলাম আমি, আর মঞ্চে ছিলো আমার বান্ধবী মোর্শেদা খানম বেবী (প্রখ্যাত গীতিকার কবির বকুলের বড়ো বোন)। কোরিওগ্রাফিটি ঐ সময় অনেক আলোচিত ও সমাদৃত হয়েছিল।

চাঁদপুর কণ্ঠ : এবার বিজয় মেলার অনুষ্ঠানে একজন শিশুশিল্পীকে দিয়ে ব্যতিক্রম পারফরমেন্স করালেন। তাকে খুঁজে পেলেন কোথায়? সে কি অতিথি শিল্পী, না সপ্তসুরের নিজস্ব শিল্পী? তার সম্পর্কে একটু বলুন।

রূপালী চম্পক : অবশ্যই সে আমাদের সপ্তসুরের নিজস্ব শিল্পী। আমরা (সপ্তসুর) সাধারণত অতিথি শিল্পী দিয়ে অনুষ্ঠান করাই না। এ পযর্ন্ত আমরা সপ্তসুরের যতো অনুষ্ঠান করেছি, তা আমাদের নিজেদের সংগঠনের শিল্পীদের দিয়েই করেছি। যদিও এবার বিজয় মেলার মঞ্চে একজন পুলিশ সদস্য আমাদের অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করেছেন। তবে সেটা আমাদের প্রয়োজনে নয়। আমাদের অনুষ্ঠান দেখে তিনি এতোই আপ্লুত হয়েছেন যে, একটি সংগীত পরিবেশন করার জন্যে তিনি আপনার কাছে ইচ্ছা পোষণ করেছেন। যদিও অনুমতির বলটি আপনি আমার দিকেই ঠেলে দিয়েছেন। তাই একজন শিল্পীকে সম্মান দেখানোর জন্যেই আপনি তাকে মঞ্চে ডেকেছেন।

এবার আসি আমাদের সেই শিশুশিল্পীর প্রসঙ্গে :--

আমাদের সেই খুদে সংগীত কন্যাকে ওর বাবা মা-ই আমাদের স্কুলে গান শেখার জন্যে ভর্তি করেছেন। যেহেতু ওর বাবা-মা দুজনই অল্প স্বল্প গান জানেন, তাই গানটা ওর রক্তেই ছিল। মঞ্চে ওঠানোর জন্যে যতোটুকু তৈরির প্রয়োজন ছিল, সে দায়িত্বটাই আমি পালন করেছি।

চাঁদপুর কণ্ঠ : আপনি কি স্বীকার করবেন, চাঁদপুরে পুরুষ কণ্ঠশিল্পীর খুব অভাব। কারণ কী? আপনার লিটন মজুমদারকে নিয়ে আপনি কতোটুকু আশাবাদী?

রূপালী চম্পক : এ কথা সত্যি যে, নারীদের তুলনায় চাঁদপুরে পুরুষ কন্ঠশিল্পীর সংখ্যা বর্তমানে অনেকাংশেই কম। আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে যা মনে হয়, ছেলেদের জন্মগত বহির্মুখী মনোভাবের ফলে স্কুলের পড়াশোনার পাশাপাশি প্রাইভেট, কোচিং বদ্ধ ঘরে করতে করতে আবারো সেই ঘরে বসে গান বাজনা করার চাইতে খোলা জায়গায় খেলাধুলা করাটাতেই ওরা আকর্ষণ বোধ করে বেশি। যেহেতু যে কোনো শিক্ষার সূচনা শিশুকাল থেকেই হয়, তাই ওদের এই অনীহার ফলে শুধু চাঁদপুরেই নয়, সর্বত্রই ছেলে কণ্ঠশিল্পীর সংখ্যা অনেকাংশে কমে গেছে। তবে এর ব্যতিক্রম যে নেই তা নয়, না হলে তো সংগীত জগৎ পুরুষ সংগীত শিল্পী শূন্য হয়ে যেতো।

আমার লিটন অত্যন্ত প্রতিশ্রুতিশীল, সুমিষ্ট কণ্ঠের অধিকারী, ভালো সুরে গায়। যতোটুকু করে মন দিয়ে করে। তবে তার মা অসুস্থ থাকার কারণে সে অতোটা সময় দিতে পারে না। সে যদি আর একটু সময় দিতে পারতো, তাহলে চাঁদপুরের সংস্কৃতি অঙ্গনে তার অবস্থান আরো সুদৃঢ় হতো।

চাঁদপুর কণ্ঠ : দর্শকরা কোনো অনুষ্ঠানের আয়োজকদের উদ্দেশ্য, উপলক্ষ ইত্যাদি বিবেচনা না করেই ফাটাফাটি গান/নাচ চেয়ে দেয় চিৎকার। এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য কি?

রূপালী চম্পক : এটা কিছুটা এলাকানির্ভর। আবার কিছু উশৃঙ্খল দর্শক তো আছেই, যারা মাতৃভাষা দিবসেও ফাটাফাটি নাচ/গান শুনতে চায়। তবে এদেরকেও যে রুচিশীল নাচ/গান শোনানো যায় তার প্রমাণ তো এবার বিজয় মেলায় সপ্তসুরের অনুষ্ঠান আপনি (কাজী শাহাদাত) নিজে সঞ্চালনা করে পেয়েছেন।

চাঁদপুর কণ্ঠ : আপনি কি সপ্তসুরের অনুষ্ঠানগুলোর পরিকল্পনা করে আশানুরূপ বাস্তবায়নে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতে পারেন?

রূপালী চম্পক : পুরোপুরি নয়।

চাঁদপুর কণ্ঠ : সপ্তসুরের অতীত ও বর্তমান নিয়ে তুলনামূলক বিশ্লেষণ করুন। সঙ্কটকে বড়ো করে দেখেন, না সম্ভাবনাকে?

রূপালী চম্পক : সপ্তসুরের অতীত গৌরবোজ্জ্বল, বর্তমান অতীব সম্ভাবনাময়। অবশ্যই সম্ভাবনাকে বড়ো করে দেখি। চলার পথে সঙ্কট তো থাকবেই। সে জীবন-সাম্রাজ্যই হোক আর সংগীত-সমুদ্রই হোক। প্রতিকূলতাকে কাটিয়ে তীরে আসাটাই তো একজন যোগ্য নাবিকের ধর্ম।

চাঁদপুর কণ্ঠ : সপ্তসুরের প্রতিষ্ঠা ও পৃষ্ঠপোষকতায় আপনার জীবনসঙ্গী চম্পক সাহার মূল্যায়ন কীভাবে করবেন? তিনি এখন গান গাইতে চান না কোনো সমস্যায়, না মনের কষ্টে?

রূপালী চম্পক : চম্পক সাহা পাশে না থাকলে সপ্তসুর সৃষ্টি করার সাহসই হয়তো আমার হতো না। সৃষ্টিলগ্ন থেকে অদ্যাবধি তার সহযোগিতায় এতোটুকু কার্পণ্য এখনো পযর্ন্ত পাইনি। তবে গান গাওয়ার সময় এখন আর তাকে পাশে পাই না বলে ডুয়েট গান আর আমি এখন গাই না। এটাকে অসহযোগিতা বলতে চাই না। এটা আমার মনঃকষ্ট।

আমার যতোটুকু মনে হয় চম্পক সাহার মঞ্চে গান না গাওয়ার পিছনের রহস্য হচ্ছে তার সময়ের অভাব। তার ভাষ্যমতে, ব্যবসায়িক ব্যস্ততা না থাকলে সে সারাদিন গানই করতো। এটা অভিমান নাকি সমস্যা আমারও বোধগম্য নয়। তবে মঞ্চ থেকে স্বেচ্ছা নির্বাসন নিলেও আপনার মতো কিছু শুভানুধ্যায়ী যখন আমাদের ঘরে এসে চেপে ধরে, তখন কিন্তু সে গান না শুনিয়ে থাকতে পারে না।

চাঁদপুর কণ্ঠ : আপনার প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের অবদান নিয়ে কিছু বলুন।

রূপালী চম্পক : সপ্তসুরের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে এ পর্যন্ত যে সমস্ত শিক্ষক ছিলেন এবং আছেন, তারাই মূলত এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান চালিকা শক্তি। প্রতিষ্ঠানের অগ্রযাত্রায় তাদের অবদান অনস্বীকার্য।

চাঁদপুর কণ্ঠ : সংগীতে কতোদিন থাকতে চান? আপনার প্রথম ও শেষ প্রেম কি সংগীত নাকি অন্য কিছু?

রূপালী চম্পক : সংগীতে আমৃত্যু থাকতে চাই। প্রথম প্রেম স্পোর্টস্, শেষ প্রেম সংগীত।

চাঁদপুর কণ্ঠ : ধরুন, আপনার ও চম্পক সাহার দ্বৈত কণ্ঠে বহু গান শোনার জন্যে উপর্যুপরি কেউ অনুরোধ করতে থাকলো, আপনি তখন কী করবেন?

রূপালী চম্পক : সাধ্যমত অনুরোধ রক্ষা করার চেষ্টা করবো।

চাঁদপুর কণ্ঠ : আপনার দুসন্তান ( স্বর্ণা ও জিৎ, যারা যথাক্রমে ভারত ও কানাডা প্রবাসী) কি আপনার স্বপ্নের সমান্তরালে বেড়ে উঠেছে?

রূপালী চম্পক : হ্যাঁ। দিনশেষে দুজনেই সংগীত বিষয়ক পড়াশোনা করছে।

চাঁদপুর কণ্ঠ : ব্যক্তিজীবনে আপনার তৃপ্তি ও অতৃপ্তি কী?

রূপালী চম্পক : সংগীতকে কেন্দ্র করেই আমি মানুষের সবচেয়ে বেশি কাছে আসার সুযোগ পেয়েছি। পেয়েছি ভালোবাসা, সম্মান--এটাই আমার সবচেয়ে তৃপ্তি।

শিক্ষকতা করতে চেয়েছিলাম। যখন বয়স ছিলো তখন সময় ছিলো না। এখন অফুরন্ত সময়, কিন্তু সার্টিফিকেট-এইজ নেই। এই অতৃপ্তিটা হয়তো কোনোদিন যাবে না।

চাঁদপুর কণ্ঠ : অনেক প্রশ্ন করলাম, তার বাইরে কিছু বলবেন কি?

রূপালী চম্পক : আজ তবে এইটুকুই থাক, বাকি কথা পরে হবে।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়