প্রকাশ : ০৯ জুন ২০২৬, ১২:৫৯
শিশুকে পরিবেশ শিক্ষা দেওয়া কেন জরুরি

বিজ্ঞানী র্যাচেল কারসন ১৯৬২ সালে তার যুগান্তকারী গ্রন্থ ‘সাইলেন্ট স্প্রিং’-এ সতর্ক করে লিখেছিলেন, ‘প্রকৃতির প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি যদি না বদলায়, তবে একদিন বসন্ত আসবে, কিন্তু পাখির গান শোনা যাবে না।’ আজ ছয় দশক পর অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও শিল্পায়নের প্রভাবে সেই সতর্কবার্তা কেবল রূপক নয়Ñএটি আমাদের প্রতিদিনের রূঢ় বাস্তবতা। ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা, ঘন ঘন বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষয় মানবসভ্যতার অস্তিত্বকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। এ সংকট মোকাবিলায় প্রযুক্তি, নীতি ও আন্তর্জাতিক চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ হলেও কেবল প্রযুক্তি বা সরকারি নীতি যথেষ্ট নয়। দীর্ঘমেয়াদে এর সবচেয়ে কার্যকর সমাধান হলো সচেতন ও দায়িত্বশীল নাগরিক গড়ে তোলা। এ বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলা করে পৃথিবীকে বাসযোগ্য রাখতে প্রয়োজন দৈনন্দিন জীবনাচরণের টেকসই পরিবর্তন। আর এ পরিবর্তনের সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার হলো আজকের শিশুদের সঠিক পরিবেশ শিক্ষা।
বৈশ্বিক জলবায়ু সংকটের ভয়াবহতা ও শিশুদের ঝুঁকি
বর্তমান বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তন মানবসভ্যতার সবচেয়ে বড় অস্তিত্বসংকট। বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড় ও অস্বাভাবিক দাবদাহের তীব্রতা বিগত কয়েক দশকে আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। ওয়ার্ল্ড মেটিওরোলজিক্যাল অরগানাইজেশনের তথ্যমতে, ২০২৩ সাল ছিল ইতিহাসের উষ্ণতম বছর; আর ২০১৫-২০২৪ সময়টি ছিল মানব ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ দশক। এ বাস্তবতায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে আজকের শিশুরা।
ইউনিসেফের ২০২১ সালের ‘চিলড্রেনস ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স’ অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ১০০ কোটি শিশু (মোট শিশুসংখ্যার প্রায় অর্ধেক) জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ‘অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকিতে’ রয়েছে, যেখানে বাংলাদেশের অবস্থান প্রথম সারিতে। আইপিসিসির ষষ্ঠ মূল্যায়ন প্রতিবেদন আরও স্পষ্ট করে জানিয়েছে, ২০২০ সালে ১০ বছরের কম বয়সি শিশুরা ২১০০ সাল নাগাদ ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস উষ্ণায়নের প্রভাবে তাদের পূর্ববর্তী প্রজন্মের তুলনায় চারগুণ বেশি চরম আবহাওয়াজনিত পরিস্থিতির সম্মুখীন হবে। বাংলাদেশের মতো দেশে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও দাবদাহ শিশুদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও ভবিষ্যৎকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলছে। অর্থাৎ, আজকের শিশুরাই এ সংকটের দীর্ঘমেয়াদি পরিণতির প্রধান ভুক্তভোগী, আবার তারাই হতে পারে এর সবচেয়ে কার্যকর সমাধানদাতা।
শিশুদের জন্য পরিবেশ শিক্ষার অপরিহার্যতা
আইপিসিসি স্পষ্ট জানিয়েছে, প্রযুক্তি বা নীতিমালাই যথেষ্ট নয়-মানুষের দৈনন্দিন জীবনাচরণের পরিবর্তন অপরিহার্য। আর এ পরিবর্তন সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ীভাবে আসে শৈশব থেকে। ১৬৯টি গবেষণা ও ১,৭৬,০০৭ জন অংশগ্রহণকারীর তথ্যের মেটা-অ্যানালাইসিস প্রমাণ করেছে, পরিবেশ শিক্ষা জ্ঞান, মনোভাব ও আচরণে উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক পরিবর্তন আনে। স্নায়ুবিজ্ঞানও বলছে, শৈশবে গঠিত অভ্যাস মস্তিষ্কের বেসাল গ্যাংলিয়ায় স্থায়ীভাবে প্রোথিত হয়। অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও পরিবেশ শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। কৃষি, মৎস্য, বনসম্পদ ও পর্যটনসহ বহু খাত সরাসরি প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীল। পরিবেশের অবক্ষয় খাদ্য উৎপাদন কমায়, জীবিকা সংকুচিত করে এবং অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হয়। তাই পরিবেশ সংরক্ষণ কেবল নৈতিক দায়িত্ব নয়, বরং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও টেকসই উন্নয়নের পূর্বশর্ত।
বহুমাত্রিক মনস্তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক প্রভাব
পরিবেশ শিক্ষা কেবল গাছপালা, প্রাণী বা বাস্তুতন্ত্র সম্পর্কে তথ্য জানার বিষয় নয়; এটি এমন একটি শিক্ষাপ্রক্রিয়া, যা মানুষকে প্রকৃতির সঙ্গে নিজের সম্পর্ক বুঝতে শেখায়। এর মাধ্যমে শিশুরা উপলব্ধি করে, মানুষ প্রকৃতির বাইরে কোনো সত্তা নয়, বরং এ বিশাল বাস্তুসংস্থানেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাদের প্রতিটি আচরণ-পানি ব্যবহার, শক্তি খরচ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কিংবা ভোগের অভ্যাস-পরিবেশের ওপর প্রত্যক্ষ প্রভাব ফেলে। ইউনেস্কোর ১৯৭৭ সালের তিবিলিসি ঘোষণায় পরিবেশ শিক্ষার যে রূপরেখা দেওয়া হয়, তাতে জ্ঞানার্জনের পাশাপাশি সচেতনতা, দৃষ্টিভঙ্গি, দক্ষতা ও অংশগ্রহণ-এ পাঁচটি স্তম্ভের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা ও সচেতনতা
পরিবেশ শিক্ষা শিশুদের চারপাশের সমস্যাগুলোর পেছনের কারণ বুঝতে সাহায্য করে। যখন একটি শিশু বিজ্ঞানের আলোকে জানতে পারে, একটি সাধারণ প্লাস্টিকের বোতল মাটিতে পচতে ৪০০ থেকে ৪৫০ বছর সময় নেয় এবং এটি খাদ্যচক্রে প্রবেশ করে, তখন পরিবেশ রক্ষা তার কাছে ব্যক্তিগত দায়িত্বে পরিণত হয়। তখন সে স্বপ্রণোদিতভাবেই যত্রতত্র প্লাস্টিক ফেলা থেকে বিরত থাকে। যখন সে জানতে পারে, বায়ুদূষণ ও বন উজাড় কীভাবে জলবায়ু পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করে, তখন সে পরিবেশবান্ধব আচরণে উৎসাহিত হয়। জ্ঞান থেকেই দায়িত্ববোধের জন্ম হয়। নর্থ অ্যামেরিকান অ্যাসোসিয়েশন ফর এনভায়রনমেন্টাল এডুকেশনের পর্যালোচনা দেখিয়েছে, পরিবেশ শিক্ষা কেবল পরিবেশগত জ্ঞানই বাড়ায় না, বরং একাডেমিক পারফরমেন্স, সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা এবং নেতৃত্বের দক্ষতাও উন্নত করে। সুইডেন ও ফিনল্যান্ডের গবেষণা নিশ্চিত করেছে, শক্তিশালী পরিবেশ কারিকুলামে শিক্ষিতরা পরবর্তী জীবনে অনেক বেশি সক্রিয় নাগরিকত্ব পালন করে।
টেকসই অভ্যাসের বিকাশ
পানি অপচয় না করা, বিদ্যুৎ সাশ্রয় বা বর্জ্য পৃথকীকরণের মতো কাজগুলো শৈশবে রুটিনে পরিণত হলে তা সারাজীবন স্থায়ী হয়। এক সমীক্ষা অনুযায়ী, প্রতিটি বাংলাদেশি শিশু দৈনিক এক লিটার করে পানি অপচয় বন্ধ করলে বছরে প্রায় ৬,২০০ কোটি লিটার পানির সাশ্রয় সম্ভব।
অর্থনৈতিক ও নাগরিক দায়িত্ববোধ
পরিবেশের সঙ্গে অর্থনীতির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, পরিবেশ অবক্ষয়ের কারণে প্রতিবছর বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রায় ৬.৩ ট্রিলিয়ন ডলার ক্ষতি হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পরিবেশগত ক্ষতির কারণে জিডিপির প্রায় ৬ শতাংশ মূল্যের সম্পদ প্রতিবছর হারিয়ে যাচ্ছে। কারণ, বাংলাদেশের কৃষি, মৎস্য ও পর্যটনÑতিনটি অর্থনৈতিক স্তম্ভই নির্ভর করে সুস্থ প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর। পরিবেশ শিক্ষা শিশুদের এ বাস্তবতা শেখায়, পরিবেশ ধ্বংস হলে কৃষি, মৎস্য ও পর্যটনের মতো অর্থনীতির মূল স্তম্ভগুলোও ভেঙে পড়বে।
কার্যকর শিক্ষণ পদ্ধতি
শ্রেণিকক্ষ থেকে প্রকৃতিতে শিশুদের পরিবেশ শিক্ষা কখনোই ভীতিভিত্তিক বা ‘ইকো-অ্যাংজাইটি’ সৃষ্টিকারী হওয়া উচিত নয়। কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মনস্তাত্ত্বিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, প্রকৃতির সঙ্গে ছোটবেলার ইতিবাচক অভিজ্ঞতাই পরবর্তী জীবনে পরিবেশবাদী আচরণের প্রধান নিয়ামক। তাই শিক্ষা হতে হবে আনন্দদায়ক ও অংশগ্রহণমূলক : স্কুলের বাগানে কাজ করা, পাখি পর্যবেক্ষণ, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, বর্জ্য থেকে কম্পোস্ট তৈরি-এসব হাতে-কলমে কাজ শিশুদের প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম করে। ইউনেস্কোর ২০২১ সালের প্রতিবেদন বলছে, যেসব বিদ্যালয় বর্জ্য পৃথকীকরণ ও পানি সংরক্ষণের ব্যবহারিক কার্যক্রম পরিচালনা করে, সেখানকার শিক্ষার্থীরা নিজেদের পরিবারেও সম্পদ ব্যবহারে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়।
প্রকৃতিভিত্তিক শিক্ষা
চারপাশের পরিবেশের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ শিশুদের কৌতূহল বাড়ায়। স্কুলের বাগানে কাজ করা, পুনর্ব্যবহার প্রকল্প, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, স্থানীয় পরিবেশবিষয়ক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ এবং স্থানীয় পাখি পর্যবেক্ষণ বা গাছপালা পরীক্ষার মতো কাজগুলো শিশুদের প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম করে তোলে।
সক্রিয় অংশগ্রহণ
তাত্ত্বিক জ্ঞানের পাশাপাশি হাতে-কলমে কাজ করা অত্যন্ত জরুরি। শ্রেণিকক্ষে কম্পোস্ট বিন স্থাপন, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ বা স্থানীয় পরিচ্ছন্নতা অভিযানে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে শিশুরা বুঝতে পারে, তাদের ছোট উদ্যোগও সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।
সবুজ ক্যাম্পাস
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার এবং জিরো-ওয়েস্ট পলিসির আওতায় এনে পরিবেশ ক্লাব প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশে গ্রিনিং এডুকেশন পার্টনারশিপের মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে ৫০ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সবুজায়নের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিদ্যালয় এবং পরিবার একসঙ্গে কাজ করলে পরিবেশগত মূল্যবোধ খুব সহজেই শিশুর সামাজিক সংস্কৃতির অংশে পরিণত হয়। কাজেই পরিবেশ শিক্ষা কার্যকর করতে হলে তা কেবল পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না-গল্প, খেলা, নাটক ও শিল্পকলার মাধ্যমে পরিবেশগত ধারণা উপস্থাপন করলে শিশুরা তা আরও সহজে গ্রহণ করতে পারে।
পরিবেশ শিক্ষা কেবল একটি বিষয় নয়, এটি একটি জীবনদর্শন। এটি শিশুদের সচেতন ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসাবে গড়ে তোলে এবং ভবিষ্যতের যে কোনো প্রাকৃতিক ও অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় তাদের প্রস্তুত করে। এ কারণেই ইউনেস্কো টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি ৪.৭) অংশ হিসাবে পরিবেশ শিক্ষাকে বিশ্বব্যাপী গুরুত্ব দিচ্ছে। কারণ, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি কিংবা স্থানীয় পরিবেশ সংরক্ষণ কার্যক্রমে অংশগ্রহণের মাধ্যমে তারা বুঝতে পারে, ছোট ছোট উদ্যোগও বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে। এভাবেই তারা ভবিষ্যতের দায়িত্বশীল নাগরিক ও নেতৃত্বে পরিণত হওয়ার ভিত্তি অর্জন করে। আজকের পৃথিবীর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে শিশুদের হাতে পরিবেশ শিক্ষার শক্তিশালী হাতিয়ার তুলে দেওয়া এখন আর কোনো বিলাসিতা নয়, বরং সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।








