মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ১২ মে ২০২৬, ০৮:৪৭

বোর্ডের খাতা পরীক্ষণে শিক্ষকদের অনীহা কেন?

মাছুম বিল্লাহ
বোর্ডের খাতা পরীক্ষণে শিক্ষকদের অনীহা কেন?

দেশের শিক্ষা বিষয়ক একমাত্র প্রিন্ট জাতীয় পত্রিকা দৈনিক আমাদের বার্তা এবং অনলাইন পত্রিকা ‘দৈনিক শিক্ষা ডটকম’ একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করেছে। তথ্যটি তাদের নিজেদের অনুসন্ধানের ফল যা শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খবরটি হচেছ চলমান এসএসসি পরীক্ষার বাংলা খাতা নেননি ২৩৫ জন শিক্ষক। ইংরেজি, গণিত ও বিজ্ঞান বিষয়ের শিক্ষকরা বোর্ডের খাতা পরীক্ষণ করতে চাননা।

প্রথমত, তারা প্রাইভেট পড়ান, প্রাইভেট পড়াতে যাতে সমস্যা না হয় সেজন্য তারা বোর্ডের খাতা আনতে চাননা। এটিকে তারা বিরাট এক ঝামেলা মনে করেন যা অত্যন্ত আনপ্রফেশনাল কাজ। আপনি একজন শিক্ষক অথচ পাবলিক পরীক্ষার খাতা পরীক্ষণ করবেন না, এটিতো হতে পারে না। তাহলে আপনি শিখবেন কি করে? পাবলিক পরীক্ষার খাতা পরীক্ষণ করা মানে একজন শিক্ষক হিসেবে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করা, একজন শিক্ষক সেখানে বহু ক্লু পেয়ে যান যেগুলো তার নিজের শিক্ষার্থীদের শেখাতে পারেন, নিজের পেশাগত জীবনে বিভিন্নভাবে সেগুলো ব্যবহৃত হবে। আমাদের অনেক শিক্ষার্থী উত্তরপ্রত্রে উত্তর সঠিকভাবে লিখতে পারেন না, কিভাবে লিখতে হবে অনেকেই জানেন না। তাদের শ্রেণিকক্ষে সেগুলো শেখাতে হয়। বোর্ডের খাতা থেকে অভিজ্ঞতা ও বাস্তব প্রমাণ নিয়ে একজন শিক্ষক তার নিজের শিক্ষার্থীদের সেগুলো শেখাতে পারেন। বোর্ডের খাতা পরীক্ষণ করা মানে এক ধরনের গবেষণা, প্রকৃত গবেষণা করা। যেসব শিক্ষক এগুলোর ধার ধারেন না, তারা প্রকৃত শিক্ষক নন।

দ্বিতীয়ত, তারা ভাবেন বোর্ডের খাতা দেখা অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক নয়। এটি আরেক ধরনের হীন মানসিকতা। সরকার এখানে কি করতে পারে? সরকার শাস্তির কথা বলতে পারে, এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে শাস্তি দিতেও পারে। এবার এ পর্যন্ত যারা খাতা নেননি তাদের সময় দেয়া হয়েছে, ঐ সময়ের মধ্যে তারা খাতা না নিলে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে সরকার হুঁশিয়ারি উচ্চারও করেছে। শিক্ষকদের নিজেদেরই তো উচিত শিক্ষাদানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বোর্ডের খাতা পরীক্ষণ করা! আমি নিজে দেখেছি আমার বহু সহকর্মী বোর্ডের খাতা নিতেন না, কারণ তাদের প্রাইভেট পড়াতে সমস্যা হবে। তাদেরকে আমি প্রকৃত শিক্ষক বলিনা। তারা প্রাইভেট পড়াবেন না, সেটিও বলছি না। কিন্তু খাতা তো দেখতে হবে। বহু লার্নিং সেখানে, এটি তাদের বুঝতে হবে। প্রথমত, শিক্ষকের নিজেদের এ ব্যাপরটিতে মোটিভেটেড হতে হবে, দ্বিতীয়ত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকেও একটা তাগিদ থাকতে হয় যে, কোনো প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক উপযুক্ত হলে তারা যাতে বোর্ডের খাতা পরীক্ষণ করেন, এটি তাদের শিক্ষকতা পেশার অবিচেছদ্য একটি অংশ।

বোর্ড কর্তৃপক্ষ তথা সরকারকেও এ পরিস্থিতে বিকল্প উপায় চিন্তা করতে হবে, ট্রাডিশনাল উপায়ে খাতা পরীক্ষণ করার বিষয়টি পরিবর্তন করতে হবে। আমরা ইতোমধ্যে দেখলাম, বহু শিক্ষক খাতা পরীক্ষণ করতে চাননা। তারপরেও যখন তাদের বাধ্য করা হবে তখন তারা ইচেছ করেই এমনকিছু করবেন যাতে তারা আর বোর্ডের পরীক্ষক হতে না পারেন। আবার যারা পরীক্ষক তারা খাতা নিয়ে বাসায় যান, মাসখানেক বা মাসাধিককাল বাসার, প্রতিষ্ঠানের সব কাজের ফাঁকে ফাঁকে খাতা পরীক্ষণ করেন, যেটি অনেক সময়ই সঠিক হয়না। কারণ নিয়ম-কানুন তারা দেশের বিভিন্নপ্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থেকে সেভাবে পালন করেন না। ফলে এই পরীক্ষণে সঠিক মূল্যায়ণ হয় না। বোর্ডে একটি সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয় কিভাবে খাতা দেখা হবে, কোন প্রশ্নে কিভাবে নম্বর দেওয়া হবে ইত্যাদি। কিন্তু সেই সভায় আমি নিজে দেখেছি অনেক শিক্ষক উপস্থিত থাকেন না, তারা শুধু বস্তাভরে খাতা নিতে আসেন যা ওই সভার পরে। অনেকে নিজ শিক্ষার্থী, আত্মীয়-স্বজনদের দিয়ে খাতা পরীক্ষণ করিয়ে থাকেন। আর নিজেরা বহু ঝামেলার মধ্যে খাতা দেখেন বলে সেগুলোও অনেক সময় সঠিক হয়না। তাই বোর্ডগুলোকে বিকল্প বিষয় ভাবতে হবে।

কোনো বিষয়ের খাতা ৩-৫ দিনের মধ্যে দেখা সম্ভব। বোর্ডে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, উচ্চলেভেলে পাঠরত কিংবা উচচতর ডিগ্রি নেয়ার পর চাকরিপ্রার্থী শিক্ষার্থী যাদেরকে বোর্ডে এনে পুরো একদিনের প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। সেই অনুযায়ী তারা বোর্ডের হলরুমে বসে সবাই একত্রে খাতা পরীক্ষণ করবেন। ৩-৫ দিন তারা বোর্ডে থাকবেন, খাবেন এবং উত্তরপত্র অভিজ্ঞ শিক্ষক, বিশেষজ্ঞ শিক্ষক ও পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকদের তত্ত্বাবধানে তারা কয়েকদিনের মধ্যে উত্তরপত্র সঠিকভাবে মূল্যায়ণ করতে পারেন। ওই সময়ে তাদের কাছে মোবাইল বা কোনো ধরনের ডিভাইস থাকবে না। অনেকে মনে করতে পারেন যে, শিক্ষক ছাড়া খাতা দেখা ঠিক হবেনা। এই গ্রুপটি হবে অত্যন্ত প্রফেশনাল, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এবং তাদের কাজ প্রয়োজন আছে। প্রাইভেট পড়ানো শিক্ষকদের চেয়ে এবং অনভিজ্ঞ শিক্ষকদের চেয়ে এই গ্রুপটি অনেক ভালোভাবে খাতা পরীক্ষণ করতে পারবেন।

প্রধান পরীক্ষক, বিষয়ভিত্তিক সিনিয়র শিক্ষক, এক্সপার্ট, বোর্ড পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক তারা সবাই ঘুরে ঘুরে দেখবেন। তাতে, খাতা দেখা ও নম্বর দেয়ার মধ্যে সামজ্ঞস্য থাকবে, বেশি হের ফের হবেনা, যা বর্তমানে হয়। কারণ শিক্ষকরা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বসে নিজে ইচেছ অনুযায়ী খাতে দেখেন। দ্রুত সময়ের মধ্যে খাতা দেখাসহ অন্যসব কাজও তারা করেন, ফলে সঠিক মূল্যায়ন খুব কম ক্ষেত্রেই হয়।

রেজাল্ট তৈরি করা সংক্রান্ত অন্যান্য কাজগুলো বোর্ডের কর্মকর্তা কর্মচারী করবেন কিংবা আগে থেকে কম্পিউটারে করা থাকবে, শিক্ষকরা শুধু মূল্যায়ন করবেন। প্রচলিত নিয়মে শিক্ষককে সব করতে হয়, ফলে বড় একটি সময় এইসব কাজ করতে চলে যায়। মূল্যায়ন করা হলে খাতাগুলো চেক রি-চেক করবে আরেকটি গ্রুপ, তারাও বোর্ডে অবস্থান করবেন। একজন শিক্ষক তার মুডের উপর, অভিজ্ঞতা ও অনভিজ্ঞতার উপর নির্ভর করে খাতা দেখেন যা বহু ধরনের অসামঞ্জস্য সৃষ্টি করে। এগুলো থেকে মুক্ত হবে যদি আমরা বিকল্প বিষয় চালু করতে পারি। তাতে, ফলও তাড়াতাড়ি দেয়া সম্ভব হবে।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়