শুক্রবার, ২৪ জুলাই, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ২৪ জুলাই ২০২৬, ১০:১৮

‘টাকা কম থাকলে ওষুধ কম নিন’—একটি পোস্টার, বদলে যাওয়া সমাজ আর হারিয়ে যাওয়া বাকির সংস্কৃতির গল্প

‘টাকা কম থাকলে ওষুধ কম নিন’—একটি পোস্টার, বদলে যাওয়া সমাজ আর হারিয়ে যাওয়া বাকির সংস্কৃতির গল্প
আব্দুল্লাহ আল মামুন

এক সময় গ্রামের মুদি দোকান থেকে শুরু করে ওষুধের দোকান—সবখানেই ছিলো একটি পরিচিত দৃশ্য ‘বাকির খাতা’। মাসজুড়ে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে মাস শেষে বেতন বা আয় হাতে পেলে দোকানির কাছে সেই হিসাব পরিশোধ করতেন ক্রেতারা। দোকানি ও ক্রেতার মধ্যে ছিলো পারস্পরিক বিশ্বাস, আন্তরিকতা ও দীর্ঘদিনের সম্পর্ক।

কিন্তু সময় বদলেছে। সেই বিশ্বাসের জায়গায় এখন এসেছে অনিশ্চয়তা, আর বাকির খাতার জায়গা নিয়েছে কঠোর বার্তা সম্বলিত পোস্টার।

হাজীগঞ্জ উপজেলার বলাখাল পূর্ব বাজারের ঝর্ণা মেডিকেল পয়েন্টে টাঙানো একটি ছোট্ট পোস্টার এখন পথচারীদেরও দৃষ্টি কেড়েছে। সেখানে লেখা রয়েছে— 'টাকা কম থাকলে ওষুধ কম নিন। তবুও বাকি চাইবেন না। ওষুধের দাম ও মান নিয়ে সমস্যা থাকলে নিঃসংকোচে বলুন। (টাকা এবং ওষুধ দুটোই ফেরতযোগ্য)'।

পোস্টারের ভাষা যেমন ব্যতিক্রমী, তেমনি এর পেছনের বাস্তবতাও বেশ বেদনাদায়ক।

দোকানের মালিক দ্বীপ কুমার দাস বলেন, বাকি দিলে মূলত সম্পর্কটাই নষ্ট হয়। একবার বাকি নিলে অনেকেই আর টাকা পরিশোধ করতে চান না। আমরা নিজের পুঁজি বিনিয়োগ করে ওষুধ কিনে আনি। অথচ বাকির টাকা আদায় করতে গিয়ে এমন অবস্থা হয় যে, ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে পড়ে। তাই বাধ্য হয়েই লিখেছি—'টাকা কম থাকলে ওষুধ কম নিন, কিন্তু বাকি নয়। যতোটুকু টাকা আছে, ততোটুকুর ওষুধ আমি দেবো।'

তিনি আরও জানান, বাকি টাকার জন্যে বহুবার বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। টাকা চাইতে গিয়ে সম্পর্ক নষ্ট হয়েছে, ঝগড়া-বিবাদ হয়েছে। তাই এখন তিনি নগদ বিক্রির নীতিতেই অটল।

হারিয়ে যাচ্ছে বিশ্বাসের সেই দিনগুলো :

২০ থেকে ৩০ বছর আগেও বাংলাদেশের গ্রামগঞ্জে ‘বাকির খাতা’ ছিলো এক পরিচিত সংস্কৃতি। কৃষক, দিনমজুর, চাকরিজীবী—অনেকেই মাসজুড়ে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বাকিতে নিতেন। মাস শেষে নির্ধারিত দিনে দোকানির খাতা দেখে পুরো হিসাব পরিশোধ করতেন। তখন দোকানে প্রায়ই রসিকতা করে লেখা থাকতো—

“আজ নগদ, কাল বাকি”

“বাকি দিলে সম্পর্ক নষ্ট”

“এখানে বাকি বিক্রি হয় না”।

তবে এসব লেখা অনেকটাই ছিলো হাস্যরসের অংশ। বাস্তবে পরিচিত গ্রাহকদের প্রয়োজনে দোকানিরা বাকিই দিতেন। কারণ তখন মানুষের কথার মূল্য ছিলো, প্রতিশ্রুতির গুরুত্ব ছিলো এবং সামাজিক বিশ্বাস ছিলো অনেক বেশি।

কেন বদলে গেলো পরিস্থিতি?

ব্যবসায়ীদের মতে, বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রেই একবার বাকি নিলে সেই টাকা আর ফেরত আসে না। ফলে ছোট ব্যবসায়ীরা মূলধনের সংকটে পড়েন। অনেকেই বাধ্য হয়ে ধার করে ব্যবসা চালান, আবার কেউ কেউ ব্যবসা গুটিয়ে ফেলতেও বাধ্য হন।

সামাজিক বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনৈতিক চাপ, পারস্পরিক বিশ্বাসের অবক্ষয় এবং দায়বদ্ধতার ঘাটতির কারণে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে ‘বাকির সংস্কৃতি’। এর প্রভাব পড়ছে ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের ওপর।

একটি পোস্টার, একটি বার্তা

ঝর্ণা মেডিকেল পয়েন্টের এই পোস্টার শুধু বাকি না দেয়ার ঘোষণা নয়; এটি বর্তমান সমাজের একটি বাস্তব চিত্রও তুলে ধরছে। যেখানে ব্যবসায়ী বলছেন—'প্রয়োজন অনুযায়ী কম ওষুধ নিন, কিন্তু বাকি চাইবেন না।'

একসময়ের বিশ্বাসভিত্তিক লেনদেনের জায়গায় আজ এসেছে সতর্কতা ও আত্মরক্ষার প্রয়োজন। ছোট্ট একটি পোস্টার তাই যেন নীরবে বলে দিচ্ছে—সময়ের সঙ্গে শুধু ব্যবসার নিয়মই নয়, মানুষের পারস্পরিক বিশ্বাসের সম্পর্কও অনেকটাই বদলে গেছে।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়