শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:১৯

আর কতোদিন চলবে এই পরিবহন-নৈরাজ্য?

অনলাইন ডেস্ক
আর কতোদিন চলবে এই পরিবহন-নৈরাজ্য?

বাবুরহাট-মতলব-ঢাকা রুটে জৈনপুর এক্সপ্রেস, জৈনপুর পরিবহন ও মতলব এক্সপ্রেস নামের বাসগুলোর বেপরোয়া চলাচল জননিরাপত্তার জন্য ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। এ রুটে ফিটনেসবিহীন বাস, অদক্ষ চালক, বেপরোয়া গতি এবং সড়ক আইন অমান্যের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। প্রায়শই দুর্ঘটনা ঘটা, দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হওয়া, যাত্রী ও পথচারীদের ক্ষোভ, প্রতিবাদ এবং সড়ক অবরোধের মতো ঘটনাও ঘটছে। অথচ এসবের স্থায়ী প্রতিকার নেই। প্রশ্ন হলো, সাধারণ মানুষের জীবন বিপন্ন করে আর কতোদিন চলবে এই পরিবহন-নৈরাজ্য?

সর্বশেষ জৈনপুর এক্সপ্রেসের ধাক্কায় এনসিপি নেত্রী ইসরাত জাহান বিন্দুর বাবা-মা আহত হওয়ার ঘটনা আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, মতলবের সড়কে নিরাপত্তাব্যবস্থা কতটা নাজুক। সৌভাগ্যক্রমে বড় ধরনের প্রাণহানি ঘটেনি। কিন্তু প্রতিবারই কি সৌভাগ্যের ওপর ভরসা করে থাকতে হবে? আজ একটি পরিবার দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে, কাল যে আরও বহু পরিবারকে এমন বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হবে না, তার নিশ্চয়তা কোথায়?

অভিযোগ রয়েছে, শুধু জৈনপুর এক্সপ্রেস নয়, জৈনপুর পরিবহন ও মতলব এক্সপ্রেসের ক্ষেত্রেও ফিটনেস, চালকের দক্ষতা এবং বেপরোয়া চলাচল নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এসব অভিযোগের যথাযথ তদন্ত করে সত্যতা যাচাই এবং প্রমাণিত অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু পরিবহন মালিকদের রাজনৈতিক প্রভাব, তদবির এবং সংশ্লিষ্ট মহলে যোগাযোগের কারণে নিয়মকানুন কার্যকর করার ক্ষেত্রে শিথিলতা রয়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। কারও কারও ধারণা, বিভিন্ন পর্যায়ে প্রভাব খাটিয়ে কিংবা সুবিধা দিয়ে এসব বাসের চলাচল নির্বিঘ্ন রাখা হচ্ছে। অভিযোগগুলো সত্য হলে তা কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, জনস্বার্থের সঙ্গে গুরুতর বিশ্বাসঘাতকতাও।

দুঃখজনক হলো, সড়ক নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা মালিকদের প্রভাব কোনোভাবেই বিবেচ্য হতে পারে না। আইন সবার জন্য সমান—এই নীতির বাস্তব প্রয়োগ না থাকলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অসম্ভব। যাত্রীদের ক্ষোভ, প্রতিবাদ কিংবা অবরোধের পরও যদি পরিস্থিতির পরিবর্তন না ঘটে, তবে জনমনে এমন ধারণা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক যে, প্রভাবশালীদের জন্য এক নিয়ম, আর সাধারণ মানুষের জন্য আরেক নিয়ম। এক্ষেত্রে স্থানীয় সংসদ সদস্য ড. জালাল উদ্দিনের দায়িত্বও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। নির্বাচিত হওয়ার পর এলাকার বিভিন্ন সমস্যা সরেজমিনে দেখার সুযোগ তিনি তুলনামূলকভাবে কম পান—এমন ধারণা স্থানীয়দের মধ্যে থাকলে তা দূর করার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নাগরিকদের অভিযোগ এবং দুর্ঘটনার খবরও জনপ্রতিনিধির দৃষ্টি আকর্ষণের যথেষ্ট কারণ। তাঁর দলের কেউ বা কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি এসব পরিবহনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থেকে সুবিধা নিয়ে থাকলেও তাদের প্রতি আনুকূল্য দেখানোর অবকাশ নেই। অবশ্য এমন কোনো সংশ্লিষ্টতা থাকলে তা অনুমানের ভিত্তিতে নয়, তথ্য-প্রমাণের মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি। জনপ্রতিনিধির প্রধান দায় জনগণের কাছে; কোনো গোষ্ঠী বা স্বার্থান্বেষী মহলের কাছে নয়।

স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। জানা-অজানা কী কারণে সময়োপযোগী ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যাচ্ছে না, তা স্পষ্ট হওয়া দরকার। ফিটনেসবিহীন বাস শনাক্ত করা, চালকের বৈধ লাইসেন্স ও পেশাগত যোগ্যতা যাচাই, অতিরিক্ত গতি নিয়ন্ত্রণ এবং সড়ক আইন লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। শুধু দুর্ঘটনার পর সাময়িক তৎপরতা নয়, নিয়মিত তদারকি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। কোনো বাসের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তা তদন্ত করে প্রয়োজন অনুযায়ী রুট পারমিট, ফিটনেস সনদ ও লাইসেন্সসংক্রান্ত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

এ অবস্থায় জেলা প্রশাসন, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), পুলিশ, ট্রাফিক বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট পরিবহন কর্তৃপক্ষকে সমন্বিতভাবে মাঠে নামতে হবে। জৈনপুর এক্সপ্রেস, জৈনপুর পরিবহন ও মতলব এক্সপ্রেসসহ সংশ্লিষ্ট সব বাসের কাগজপত্র, ফিটনেস, চালকের যোগ্যতা ও চলাচলের ধরন নিরপেক্ষভাবে পরীক্ষা করতে হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রভাব বা তদবিরের তোয়াক্কা না করে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি যাত্রীদের অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা এবং অভিযান ও তার ফলাফল সম্পর্কে জনসাধারণকে অবহিত করার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

মতলবের মানুষ নিরাপদে চলাচল করতে চান, কোনো পরিবহনমালিকের দয়া কিংবা রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ের ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকতে চান না। সড়ক কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়; এটি জনসাধারণের চলাচলের অধিকার ও নিরাপত্তার জায়গা। তাই আর কোনো দুর্ঘটনা, আর কোনো আহত পরিবার কিংবা আর কোনো প্রাণহানির জন্য অপেক্ষা করা চলে না। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত বড় দুর্ঘটনার পর দায় এড়ানোর চেষ্টা মানুষের ক্ষোভ আরও বাড়াবে। বাবুরহাট-মতলব-ঢাকা রুটের সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং মানুষের জীবন রক্ষা করা এখন সময়ের দাবি।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়