মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:২৮

সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর সরকারি কার্যক্রম অব্যাহত থাকুক

অনলাইন ডেস্ক
সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর সরকারি কার্যক্রম অব্যাহত থাকুক

সড়ক দুর্ঘটনা বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান জনদুর্ভোগের কারণ। প্রতিদিনই সড়কে ঝরছে প্রাণ, অসংখ্য মানুষ বরণ করছেন পঙ্গুত্ব, আর অনেক পরিবার হারাচ্ছে তাদের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে। একটি দুর্ঘটনা কেবল একজন মানুষের জীবন কেড়ে নেয় না; মুহূর্তেই বিপর্যস্ত করে দেয় একটি পরিবারের অর্থনৈতিক ভিত্তি, সন্তানের ভবিষ্যৎ ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তির শূন্যতা কোনো অর্থেই পূরণ করা সম্ভব নয়। তবে অসহায় হয়ে পড়া পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়াতে রাষ্ট্রের মানবিক ও দায়িত্বশীল ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ বিবেচনায় সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পুনর্বাসনে সরকার ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) ট্রাস্টি বোর্ডের আর্থিক সহায়তা কার্যক্রম নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় ও সময়োপযোগী উদ্যোগ।

রোববার (১১ অক্টোবর ২০২৬) চাঁদপুরে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ও গুরুতর আহত ব্যক্তিদের ৩২টি পরিবারকে মোট ১ কোটি ১৬ লাখ টাকার আর্থিক সহায়তার চেক প্রদান এই উদ্যোগের একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত। জেলা প্রশাসন ও বিআরটিএ ট্রাস্টি বোর্ডের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এ কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর আর্থিক সংকট মোকাবিলা এবং নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক আহমেদ জিয়াউর রহমান যথার্থই বলেছেন, স্বজন হারানোর বেদনা কিংবা চিরতরে পঙ্গুত্বের ক্ষতি কোনো অর্থ দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়। তবু রাষ্ট্রের এ সহায়তা বিপর্যস্ত পরিবারগুলোকে কিছুটা হলেও আর্থিক ও মানসিক শক্তি জোগাতে পারে। এটাই এ উদ্যোগের মূল মানবিক তাৎপর্য।

তবে এ প্রসঙ্গে সড়ক পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলা প্রয়োজন। সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে সহায়তার নামে বিভিন্ন সময়ে পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের পক্ষ থেকে অর্থ সংগ্রহের কার্যক্রম দেখা যায়। শ্রমিকদের কল্যাণ, দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা কিংবা নিহতদের পরিবারের সহায়তার কথা বলে সংগৃহীত অর্থের স্বচ্ছতা, যথাযথ ব্যবহার এবং প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে তার সুফল পৌঁছানো নিয়ে জনমনে প্রশ্ন ও সংশয় রয়েছে। কোথাও কোথাও এ ধরনের অর্থ সংগ্রহ চাঁদাবাজির অভিযোগে বিতর্কিত হয়; আবার কোথাও মানবিক সহায়তার কার্যক্রমকে ব্যক্তিগত বা সাংগঠনিক প্রচার-প্রদর্শনীর উপলক্ষ করে তোলার প্রবণতাও লক্ষ করা যায়।

অবশ্য পরিবহন খাতের সব সংগঠনকে একইভাবে মূল্যায়ন করা সমীচীন নয়। প্রকৃত অর্থেই অনেক সংগঠন শ্রমিকদের বিপদে পাশে দাঁড়াতে পারে এবং তাদের কল্যাণে কাজ করতে পারে। কিন্তু মানবিক সহায়তার নামে জোরপূর্বক অর্থ আদায়, অর্থ সংগ্রহের অনিয়ম কিংবা সহায়তাকে আত্মপ্রচারের হাতিয়ার বানানোর প্রবণতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বিশেষ করে দুর্ঘটনায় সর্বস্ব হারানো একটি পরিবার যখন তাৎক্ষণিক চিকিৎসা, জীবিকা ও সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দিশেহারা, তখন তাদের দুর্দশাকে কেন্দ্র করে অর্থ সংগ্রহ বা সাংগঠনিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা অত্যন্ত অনভিপ্রেত। সহায়তা হতে হবে নিঃস্বার্থ, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক; এর সঙ্গে চাঁদাবাজি কিংবা প্রদর্শনেচ্ছার কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে না।

এ বাস্তবতায় সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। বিদ্যমান সড়ক পরিবহন আইন অনুযায়ী দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তির পরিবারকে পাঁচ লাখ টাকা এবং গুরুতর আহত বা পঙ্গুত্ব বরণকারীদের নির্ধারিত নিয়মে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। এ ধরনের সহায়তা কোনো অনুকম্পা নয়; বরং দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অধিকার ও পুনর্বাসনের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় নির্ধারিত নীতিমালা অনুযায়ী আবেদন যাচাই, সহায়তা অনুমোদন ও অর্থ বিতরণ করা হলে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সহজ হয়। পাশাপাশি সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে মধ্যস্বত্বভোগী, অনিয়ম ও অযাচিত প্রভাব বিস্তারের সুযোগও কমে আসে।

তবে শুধু আর্থিক সহায়তার চেক বিতরণ করেই দায়িত্ব শেষ করা যাবে না। দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তির পরিবারের অনেকেই উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়ে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সংকটে পড়েন। তাদের সন্তানদের শিক্ষা, পরিবারের চিকিৎসা, বাসস্থান ও জীবিকা নির্বাহের প্রশ্ন সামনে আসে। অন্যদিকে গুরুতর আহত বা পঙ্গুত্ব বরণকারী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা, পুনর্বাসন, কর্মসংস্থান এবং প্রয়োজনীয় সহায়ক উপকরণের ব্যবস্থা জরুরি হয়ে পড়ে। এককালীন অর্থ সহায়তা তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটাতে ভূমিকা রাখলেও দীর্ঘমেয়াদি সংকট সমাধানে সব সময় যথেষ্ট হয় না। তাই আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি প্রয়োজনভিত্তিক পুনর্বাসন, চিকিৎসা সহযোগিতা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির বিষয়গুলোও সরকারের বিবেচনায় আনা প্রয়োজন।

এ কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করার সুযোগ রয়েছে। প্রথমত, দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তার জন্য আবেদনপ্রক্রিয়া সহজ ও হয়রানিমুক্ত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, জেলা পর্যায়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর তথ্য সংরক্ষণ এবং আবেদন নিষ্পত্তির অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা যাতে দ্রুত সহায়তা পান, সে জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে আবেদন যাচাই ও অর্থ বিতরণের ব্যবস্থা থাকা উচিত। চতুর্থত, সহায়তার অর্থ কোথা থেকে আসছে, কীভাবে তা বরাদ্দ হচ্ছে এবং কারা পাচ্ছেন—এসব বিষয়ে নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশের মাধ্যমে জবাবদিহি নিশ্চিত করা যেতে পারে। একই সঙ্গে দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের চাহিদা অনুযায়ী সহায়তার পরিমাণ ও ধরন পর্যালোচনা করাও জরুরি।

এ ক্ষেত্রে পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে সরকারের সমন্বয় থাকতে পারে, তবে তা হতে হবে সুস্পষ্ট নীতিমালা, স্বেচ্ছামূলক অনুদান, আর্থিক স্বচ্ছতা ও কার্যকর তদারকির ভিত্তিতে। কোনো সংগঠন ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়াতে চাইলে সেটি অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু সে উদ্যোগের নামে জোরপূর্বক অর্থ আদায় কিংবা অস্বচ্ছ তহবিল পরিচালনার সুযোগ থাকা উচিত নয়। সংগঠনগুলোর নিজস্ব কল্যাণ তহবিল থাকলে তার আয়-ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ, নিয়মিত নিরীক্ষা এবং প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে সহায়তা পৌঁছানোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। মানবিক কার্যক্রমের সাফল্য প্রচারের পরিমাণ দিয়ে নয়, বরং কতজন বিপর্যস্ত মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনা গেল, তার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা উচিত।

সর্বোপরি, সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশে দাঁড়ানো রাষ্ট্রের মানবিক দায়িত্বের পাশাপাশি সামাজিক ন্যায়বিচারেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। চাঁদপুরে ৩২টি পরিবারের মধ্যে ১ কোটি ১৬ লাখ টাকার সহায়তা বিতরণ সেই দায়িত্ব পালনের একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত। এ ধরনের কার্যক্রম যেন বিচ্ছিন্ন কোনো আয়োজন হয়ে না থাকে; বরং সারা দেশে নিয়মিত, বিস্তৃত ও কার্যকর কর্মসূচি হিসেবে পরিচালিত হয়। সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে জেলা, অঞ্চল কিংবা সামাজিক পরিচয়ের কারণে কোনো পরিবার যেন বঞ্চিত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কঠোর আইন প্রয়োগ, চালকদের প্রশিক্ষণ, ফিটনেসবিহীন যানবাহন নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপদ সড়কব্যবস্থা গড়ে তোলার কার্যক্রমও সমান গুরুত্ব পেতে হবে।

আমরা মনে করি, সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য সরকারের এ উদ্যোগ সময়োপযোগী, মানবিক ও প্রশংসার দাবিদার। এর পরিধি আরও বাড়ানো, সহায়তার প্রক্রিয়া সহজ করা এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে অসংখ্য বিপর্যস্ত পরিবার নতুন করে বাঁচার অবলম্বন খুঁজে পাবে। একই সঙ্গে পরিবহন খাতের নামে পরিচালিত অর্থ সংগ্রহের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করে চাঁদাবাজি এবং প্রদর্শনেচ্ছার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রকৃত অর্থ হলো তাঁদের দুর্দশা লাঘব করা, তাঁদের অধিকার নিশ্চিত করা এবং মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার পথ তৈরি করে দেওয়া। এই মানবিক দায়িত্ব পালনে সরকারের উদ্যোগ অব্যাহত থাকুক, আরও বিস্তৃত হোক—এটাই প্রত্যাশা।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়