প্রকাশ : ১২ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৪০
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা বাস্তবায়নে হারিয়ে যাওয়া মাঠ পুনরুদ্ধার ও প্রতিষ্ঠায় দ্রুত ব্যবস্থা গৃহীত হোক

একটি খেলার মাঠ কেবল শিশু-কিশোরদের বিনোদনের স্থান নয়; এটি সুস্থ প্রজন্ম গঠন, সামাজিক সম্প্রীতি বিকাশ, নেতৃত্ব ও শৃঙ্খলাবোধ তৈরির অন্যতম প্রাকৃতিক শিক্ষাঙ্গন। অথচ অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অবৈধ দখল, অপরিণামদর্শী স্থাপনা নির্মাণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় দেশের অসংখ্য খেলার মাঠ আজ বিলুপ্তির পথে। এ বাস্তবতায় দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে খেলার মাঠ নিশ্চিত করার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনা সময়োপযোগী ও আশাব্যঞ্জক। তবে এ উদ্যোগের সার্থকতা নির্ভর করবে কেবল নতুন মাঠ প্রতিষ্ঠার ওপর নয়, হারিয়ে যাওয়া মাঠগুলো পুনরুদ্ধার এবং বিদ্যমান মাঠগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করার ওপরও।
চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ পৌর এলাকার কেরোয়া গ্রামের একটি বিদ্যালয়ের পুরোনো ভবন অপসারণ করে খেলার মাঠ পুনরুদ্ধারের দাবিতে স্থানীয়দের মানববন্ধন এ সংকটের একটি তাৎপর্যপূর্ণ উদাহরণ। এলাকাবাসীর দাবি, নতুন ভবনে শিক্ষা কার্যক্রম চালু হওয়ায় পুরোনো ভবনের জায়গাটি পুনর্বিন্যাস করে মাঠ ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব। বিষয়টি যথাযথ কারিগরি মূল্যায়ন, ভূমির মালিকানা যাচাই, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন এবং জনস্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত নিষ্পত্তি করা উচিত। যেখানে বাস্তবসম্মত বিকল্প রয়েছে, সেখানে শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার অধিকার রক্ষায় প্রশাসনিক উদ্যোগ বিলম্বিত হওয়ার কোনো যুক্তি নেই। তবে ভবন অপসারণের সিদ্ধান্ত অবশ্যই নিরাপত্তা ও শিক্ষা কার্যক্রমের প্রয়োজন যাচাই করে নিতে হবে। অন্যদিকে, চাঁদপুর শহরের রেলওয়ে চৌদ্দ কোয়ার্টার মাঠের বিলুপ্তপ্রায় অবস্থা আমাদের আরও গভীরভাবে ভাবিয়ে তোলে। একসময় যে মাঠ শিশু-কিশোরদের খেলাধুলা, প্যারেড ও শৃঙ্খলাবোধ চর্চার প্রাণকেন্দ্র ছিল, দখলদারিত্ব, ময়লা-আবর্জনা এবং অপরিকল্পিত মাটি কাটার কারণে সেটি আজ তার অস্তিত্ব হারানোর মুখে। এটি কেবল একটি মাঠের করুণ পরিণতি নয়; বরং দেশের বিভিন্ন স্থানে সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক জমিতে থাকা খেলার মাঠ কীভাবে ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়, তারও একটি প্রতীকী চিত্র। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় প্রশাসন ও পৌর কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগে মাঠটির ভূমির রেকর্ড যাচাই, সীমানা নির্ধারণ, দখলমুক্তকরণ, পরিবেশগত অবস্থা মূল্যায়ন এবং পুনরুদ্ধারের সম্ভাব্যতা যাচাই করা প্রয়োজন। উদ্ধারযোগ্য হলে সেখানে শিশু-কিশোরদের জন্য নিরাপদ ও উন্মুক্ত খেলার পরিবেশ ফিরিয়ে দিতে হবে।
এ ক্ষেত্রে সরকারের প্রথম কাজ হওয়া উচিত দেশব্যাপী খেলার মাঠের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা ও মানচিত্র তৈরি করা। ইউনিয়ন, পৌরসভা, উপজেলা ও সিটি করপোরেশনভিত্তিক জরিপের মাধ্যমে বিদ্যমান মাঠ, হারিয়ে যাওয়া মাঠ, দখল হয়ে যাওয়া সরকারি জমি এবং মাঠের সংকটে থাকা এলাকাগুলো চিহ্নিত করতে হবে। এরপর অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে পুনরুদ্ধার ও নতুন মাঠ প্রতিষ্ঠার পৃথক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। ডিসেম্বরের মধ্যে মাঠ নিশ্চিত করার লক্ষ্য বাস্তবায়নে জমি শনাক্তকরণ, মালিকানা যাচাই, অর্থায়ন, নকশা প্রণয়ন এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থার কাজের সময়সীমা নির্দিষ্ট করতে হবে। তবে তাড়াহুড়ো করে কাগজে-কলমে মাঠ দেখানো কিংবা অনুপযুক্ত জমিকে মাঠ হিসেবে ঘোষণা করা যাবে না; মাঠ হতে হবে বাস্তবে ব্যবহারযোগ্য, নিরাপদ ও সর্বসাধারণের জন্য সহজলভ্য।
মাঠ রক্ষায় আইনের কার্যকর প্রয়োগও অপরিহার্য। সরকারি জমি বা প্রতিষ্ঠানের মাঠ অবৈধভাবে দখল, ভরাট কিংবা বর্জ্য ফেলে নষ্ট করার বিরুদ্ধে নিয়মিত নজরদারি ও আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। কোনো উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে মাঠের জায়গা সংকুচিত হলে বিকল্প খেলার জায়গা নিশ্চিত করার নীতি গ্রহণ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি উদ্ধার করা মাঠের রক্ষণাবেক্ষণ, পরিচ্ছন্নতা, পানি নিষ্কাশন, সীমানা সুরক্ষা ও খেলাধুলার সরঞ্জাম সরবরাহের জন্য স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট ভূমির মালিক কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। শুধু মাঠ নির্মাণ করলেই দায়িত্ব শেষ হবে না; সেটি যেন আবার দখল বা অবহেলার শিকার না হয়, তা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এ উদ্যোগে স্থানীয় জনগণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ক্রীড়া সংগঠন, অভিভাবক, সাবেক খেলোয়াড় এবং তরুণদের সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। প্রতিটি এলাকায় মাঠ ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করে ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণের নিয়ম নির্ধারণ করা যেতে পারে। মেয়েশিশু, প্রতিবন্ধী শিশু এবং সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্যও মাঠে নিরাপদ ও সমান অংশগ্রহণের সুযোগ রাখতে হবে। যেসব এলাকায় বড় মাঠের জন্য জমি পাওয়া কঠিন, সেখানে পরিকল্পিত ক্ষুদ্র খেলার জায়গা, উন্মুক্ত পার্ক ও বহুমুখী ক্রীড়া-সুবিধা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। তবে এসব বিকল্প যেন বিদ্যমান পূর্ণাঙ্গ মাঠ সংরক্ষণের অজুহাত না হয়।
খেলাধুলার সুযোগ কমে গেলে শিশু-কিশোরদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়; বাড়ে নিঃসঙ্গতা, নিষ্ক্রিয়তা এবং ক্ষতিকর অভ্যাসে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি। মাঠের সঙ্গে তাই জনস্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা, শিক্ষার পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ ক্রীড়াবিদ তৈরির প্রশ্নও গভীরভাবে যুক্ত। একটি মাঠ থেকে উঠে আসতে পারে জাতীয় পর্যায়ের খেলোয়াড়, আবার সেই মাঠই হতে পারে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মিলনস্থল। ফলে মাঠ রক্ষাকে নিছক স্থানীয় দাবি কিংবা ক্রীড়াবিষয়ক কর্মসূচি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি জাতীয় উন্নয়ন ও মানবসম্পদ বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ভূমির মালিক কর্তৃপক্ষকে এখনই সমন্বিতভাবে কাজ শুরু করতে হবে। প্রতিটি এলাকার অগ্রগতি প্রকাশ, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ সম্পন্ন করা এবং অনিয়মের ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। চাঁদপুরের কেরোয়া কিংবা রেলওয়ে চৌদ্দ কোয়ার্টার মাঠের মতো স্থানগুলোতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া গেলে তা সারা দেশের জন্য দৃষ্টান্ত হতে পারে।
আমরা চাই, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা শুধু নতুন মাঠ তৈরির ঘোষণায় সীমাবদ্ধ না থেকে হারিয়ে যাওয়া মাঠ ফিরিয়ে আনা এবং ভবিষ্যতে কোনো মাঠ যেন হারিয়ে না যায়, সেই জাতীয় অঙ্গীকারে পরিণত হোক। কারণ, একটি মাঠ হারানো মানে শুধু একখণ্ড জমি হারানো নয়; হারিয়ে যায় শৈশবের আনন্দ, সুস্থ বিনোদনের সুযোগ এবং সম্ভাবনাময় প্রজন্মের বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেলে দেশের মাঠগুলো আবারও শিশু-কিশোরদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠবে—এটাই প্রত্যাশা।







