প্রকাশ : ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:২৭
দলীয় পরিচয় ও বৈধ ব্যবসার আড়ালে অবৈধ মাদক ব্যবসা, অতঃপর-

মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব নয়; এটি সমাজ, রাজনীতি ও রাষ্ট্রÑসবার সম্মিলিত দায়িত্ব। আর যখন কোনো মাদক কারবারি সামাজিক, ব্যবসায়িক কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে নিজের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়, তখন বিষয়টি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। চঁাদপুরের বড় স্টেশন এলাকার আব্দুর রহিম গাজীকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনা সেই কঠিন বাস্তবতারই একটি দৃষ্টান্ত। ৭ অক্টোবর ২০২৬ (বুধবার) চঁাদপুর শহরের বড় স্টেশন ডকলাইন এলাকার লোকো কলোনিতে যৌথ অভিযান চালিয়ে তার বসতঘর থেকে ২ হাজার ৫০০ পিস ইয়াবা, মাদক বিক্রির নগদ ৭০ হাজার টাকা ও দুটি মোবাইল ফোন উদ্ধারের কথা জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। একই দিন তাকে দল থেকে বহিষ্কার করেছে চঁাদপুর পৌর বিএনপি। দলীয় ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন ও দলীয় গঠনতন্ত্রবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের অভিযোগে এর আগেও তাকে শোকজ করা হয়েছিলো বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। চঁাদপুর পৌর বিএনপির এই সিদ্ধান্তকে তাই ধন্যবাদ জানাতেই হয়। রাজনৈতিক দলের পরিচয় কোনো অপরাধীর ঢাল হতে পারে নাÑএই বার্তাটি স্পষ্টভাবে দেওয়া জরুরি। তবে প্রশ্নও থেকে যায় : ব্যবস্থা নিতে এতো সময় লাগলো কেন? কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে গুরুতর অভিযোগ থাকলে রাজনৈতিক পরিচয়ের বিষয়টি সামনে রেখে দলীয় পর্যায়ে আরও আগে কঠোর অবস্থান নেওয়া উচিত ছিলো।
স্থানীয়ভাবে দীর্ঘদিন ধরে আব্দুর রহিমের বিরুদ্ধে মাদক কারবারের অভিযোগের কথা বলা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রকাশ্যে গ্যাস সিলিন্ডারের ব্যবসা ও মাছ চাষের মতো বৈধ ব্যবসার আড়ালে তিনি মাদক কারবার চালিয়ে আসছিলেন। আরও অভিযোগ রয়েছে, অতীতে তার বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশের পর পত্রিকা কর্তৃপক্ষকে হুমকি-প্রতিবাদ জানানো এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাকে বদলি করানোর মতো প্রভাব বিস্তারের চেষ্টাও তিনি করেছেন। এসব অভিযোগ অবশ্যই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তে যাচাই হওয়া প্রয়োজন। অভিযোগগুলো যদি সত্য হয়ে থাকে, তাহলে তা কেবল একজন মাদক কারবারির দাপটের গল্প নয়Ñবরং তাকে ঘিরে থাকা আশ্রয়-প্রশ্রয়ের একটি উদ্বেগজনক চিত্রও তুলে ধরে। আর এখানেই বড় প্রশ্নটিÑএকজন মাদক কারবারি কি একা এতোটা শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে? তাকে যদি কোনো পর্যায়ে কেউ আশ্রয়, প্রশ্রয়, রাজনৈতিক ছত্রছায়া কিংবা প্রশাসনিক সুবিধা দিয়ে থাকে, তাহলে সেই সহযোগীদেরও খুঁজে বের করা জরুরি। শুধু মাদকসহ একজনকে আটক করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; মাদকের উৎস, সরবরাহকারী, সহযোগী এবং পেছনের পৃষ্ঠপোষকদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে।
প্রবাদ আছে, ‘দশদিন চোরের, একদিন গৃহস্থের।’ দীর্ঘদিনের দাপট, পরিচয়ের আড়াল কিংবা প্রভাবÑকোনোটিই শেষ পর্যন্ত আইনের হাত থেকে রক্ষা করার নিশ্চয়তা দেয় না। অভিযোগের সত্যতা আদালত ও তদন্তেই নির্ধারিত হবে; তবে ২ হাজার ৫০০ পিস ইয়াবাসহ আটকের ঘটনা নিঃসন্দেহে গুরুতর। কথিত মুখোশের আড়ালের সেই দাপট অবশেষে আইনের অভিযানের মুখে থেমেছেÑএটিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। তবে এই অভিযান যেন একজন আব্দুর রহিমকে ঘিরেই থেমে না যায়। তার সঙ্গে আরও কারা জড়িত, কোথা থেকে মাদক আসে, কারা সরবরাহ করে এবং কারা দীর্ঘদিন ধরে এই চক্রকে সহযোগিতা করেছেÑসবকিছু খতিয়ে দেখা দরকার। অভিযানে ফারহান রানা ও জয় নামে আরও দুজনের সম্পৃক্ততার প্রাথমিক তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর; তাদেরও আইনের আওতায় আনার কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
আমরা আশা করি, চঁাদপুরে মাদকের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, কোস্টগার্ড ও সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বিত সঁাড়াশি অভিযান অব্যাহত থাকবে। রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যবসায়িক মুখোশ কিংবা প্রভাবশালী যোগাযোগÑকোনো কিছুই যেন মাদক কারবারিদের নিরাপদ আশ্রয় না হয়। একই সঙ্গে অতীতে যারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এমন কর্মকাণ্ডকে প্রশ্রয় দিয়ে থাকলে, তদন্তের মাধ্যমে তাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনা হোক। মাদকমুক্ত চঁাদপুরের স্বার্থে এটাই এখন সময়ের দাবি।








