বুধবার, ০৭ অক্টোবর, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:২১

ফরিদগঞ্জের অদম্য হাফছা এক অশেষ অনুপ্রেরণার নাম

অনলাইন ডেস্ক
ফরিদগঞ্জের অদম্য হাফছা এক অশেষ অনুপ্রেরণার নাম

মানুষের জীবনে প্রতিকূলতা আসবেই। কিন্তু প্রতিকূলতা কারও জীবনকে থামিয়ে দেবে, নাকি তাকে আরও দুর্বার করে তুলবে—তা নির্ভর করে মানুষের ইচ্ছাশক্তি, সাহস ও স্বপ্নের ওপর। ফরিদগঞ্জের হাফছা আক্তার তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তাঁর চলার পথকে কঠিন করেছে, কিন্তু তাঁর স্বপ্নকে পরাজিত করতে পারেনি। বরং প্রতিটি বাধাকে অতিক্রম করেই তিনি প্রমাণ করেছেন—শরীরের সীমাবদ্ধতা মানুষের সম্ভাবনার সীমা নয়।

শিশুকালে অসুস্থতার কারণে কোমরের নিচের অংশ অকার্যকর হয়ে যাওয়ার পর হাফছার সামনে জীবন যেন হঠাৎ করেই বদলে যায়। স্বাভাবিক জীবনের পথ হয়ে ওঠে দুরূহ। কিন্তু হাফছা থেমে থাকেননি। বিদ্যালয়ে যাতায়াতের পথে বারবার পড়ে গিয়েও তিনি পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন। দূরের স্কুল-কলেজে যেতে হয়েছে নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে। কখনো হেঁটে, কখনো ভাঙাচুরা যানবাহনে, কখনো অন্যের সহায়তায় তাঁকে পৌঁছাতে হয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। অথচ সেই দীর্ঘ ও কষ্টকর পথই একদিন তাঁকে নিয়ে গেছে উচ্চশিক্ষা, শিক্ষকতা ও জাতীয় সম্মানের মঞ্চে।

হাফছার গল্প তাই কেবল একজন প্রতিবন্ধী নারীর সাফল্যের গল্প নয়; এটি আমাদের প্রচলিত সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিও একটি শক্তিশালী প্রশ্ন। আমরা প্রতিবন্ধী মানুষকে কতোটা সক্ষম মানুষ হিসেবে দেখি? কতোটা সুযোগ দিই? কতোটা সহজ করে দিই তাঁদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক অংশগ্রহণের পথ? হাফছার জীবন এসব প্রশ্নের উত্তরও দিয়েছে। সুযোগ পেলে প্রতিবন্ধী মানুষ করুণার পাত্র নয়—তাঁরা হয়ে উঠতে পারেন দক্ষ শিক্ষক, সফল উদ্যোক্তা, ক্রীড়াবিদ, সংগঠক এবং রাষ্ট্রের সম্পদ।

২০০৫ সালে জাপানে অনুষ্ঠিত বিশ্ব হ্যান্ডি ম্যারাথনে বিশ্বের ২৫১ জন প্রতিযোগীকে পেছনে ফেলে চ্যাম্পিয়ন হওয়া হাফছার জীবনের এক অসাধারণ অধ্যায়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের পতাকা উড্ডীন করার পর ২০০৬ সালে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি। দূরবর্তী কর্মস্থলে প্রতিদিনের যাতায়াতও তাঁর কাছে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। সংসার, সন্তান, শিক্ষকতা ও উদ্যোক্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি নিজের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। বিভাগীয় পর্যায়ে জয়িতা পুরস্কার অর্জনও তাঁর বহুমাত্রিক সাফল্যের স্বীকৃতি। আর বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে বিশেষ গুণী শিক্ষক হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে সম্মাননা অর্জন তাঁর দীর্ঘ সংগ্রামের আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ স্বীকৃতি। জাতীয় পর্যায়ের এই সম্মান নিঃসন্দেহে হাফছার ব্যক্তিগত অর্জন; তবে এর তাৎপর্য ব্যক্তির গণ্ডি ছাড়িয়ে আরও বিস্তৃত। এটি প্রমাণ করে, প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে যে মানুষ অন্যদের আলোকিত করেন, রাষ্ট্র ও সমাজের উচিত তাঁদের যথাযথ মর্যাদা দেওয়া।

হাফছার জীবনে বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী কল্যাণ সমিতি (বিপিকেএস) এবং স্থানীয় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংগঠন চাঁদপুর-ডিপিওডির সহযোগিতার কথাও বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য। একজন মানুষের সাফল্যের পেছনে তাঁর নিজের অধ্যবসায় যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সহায়ক প্রতিষ্ঠান, পরিবার ও সমাজের ইতিবাচক ভূমিকা অত্যন্ত জরুরি। হাফছার ক্ষেত্রে সেই সহযোগিতা দেখিয়েছে—সঠিক সহায়তা ও সুযোগ পেলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা নিজেদের জীবন বদলানোর পাশাপাশি সমাজকেও বদলে দিতে পারেন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, হাফছা তাঁর সাফল্যকে নিজের মধ্যে আটকে রাখতে চান না। তিনি চান তাঁর মতো অবহেলিত ও ভাগ্যবঞ্চিত প্রতিবন্ধী মানুষ শিক্ষার মাধ্যমে সমাজের মূল স্রোতে ফিরে আসুক। তাঁর এই প্রত্যয় আমাদের নীতিনির্ধারকদের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। প্রতিবন্ধিতা কোনো দয়া বা অনুকম্পার বিষয় নয়; এটি অধিকার, মর্যাদা ও সমান সুযোগের প্রশ্ন। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, চলাচল, প্রযুক্তি, সামাজিক নিরাপত্তা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

হাফছার কণ্ঠে উচ্চারিত একটি কথাই আমাদের বিশেষভাবে ভাবায়—“প্রতিবন্ধীদের কেউ দয়ার চোখে না দেখে তাদের সমাজের মূল স্রোতধারায় আসার সুযোগ দিন।” এই আহ্বান শুধু প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য নয়, সমগ্র সমাজের জন্য। কারণ একটি রাষ্ট্র তখনই সত্যিকার অর্থে এগিয়ে যায়, যখন তার কোনো নাগরিককে অক্ষমতার তকমা দিয়ে পিছনে ফেলে রাখা হয় না।

ফরিদগঞ্জের হাফছা আক্তার তাই নিছক একজন সম্মাননাপ্রাপ্ত শিক্ষক নন। তিনি প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে মানুষের জয়যাত্রার প্রতীক। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়—সুযোগের দরজা খুলে দিলে প্রতিবন্ধকতা প্রতিভাকে পরাজিত করতে পারে না। বরং যাঁরা সবচেয়ে বেশি বাধা পেরিয়ে সামনে আসেন, তাঁরাই অনেক সময় অন্যদের পথ দেখান সবচেয়ে উজ্জ্বলভাবে।

হাফছার এই অর্জন আমাদের অনুপ্রাণিত করুক; একই সঙ্গে আমাদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধকে আরও জাগ্রত করুক। দেশের প্রতিটি হাফছা যেন নিজের সম্ভাবনা বিকশিত করার সুযোগ পায়—এটাই হোক তাঁর জাতীয় সম্মাননার সবচেয়ে বড় সার্থকতা। হাফছা একা নন; তাঁর সাফল্যের মধ্য দিয়ে জয়ী হয়েছে অদম্য ইচ্ছাশক্তি, শিক্ষা ও মানবিক মর্যাদার বাংলাদেশ।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়