প্রকাশ : ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:০৬
বিত্তবানদের মধ্যে চিত্তবানই কেবল এমন কাজ করতে পারেন

একজন মানুষের প্রকৃত সচ্ছলতার পরিচয় কেবল তাঁর অর্থ-সম্পদে নয়; বরং সেই সম্পদ সমাজ ও মানুষের কল্যাণে কতোটা কাজে লাগছে, তার মধ্যেই নিহিত। অর্থবিত্ত অনেকেরই থাকে, কিন্তু সেই বিত্তকে শিক্ষার আলো ছড়ানোর কাজে ব্যয় করার মানসিকতা সবার থাকে না। শাহরাস্তির ওয়ারুক রহমানিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের আধুনিক পাঠাগার নির্মাণে বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও সমাজসেবক আবু ইউসুফ রুপনের উদ্যোগ তাই নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় এবং অনুকরণীয়।
১২৭ বছরের পুরোনো এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বর্তমানে পড়াশোনা করছে ১ হাজার ৪১৩ জন শিক্ষার্থী। এমন একটি বৃহৎ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একটি আধুনিক পাঠাগারের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। সভাপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর আবু ইউসুফ রুপন নিজের অর্থে পাঠাগারটি আধুনিকায়নের উদ্যোগ নিয়েছেন। ইতোমধ্যে ব্যয় হয়েছে পাঁচ লাখের বেশি টাকা; কাজ সম্পন্ন করতে মোট ব্যয় হবে প্রায় ছয় লাখ টাকা। চার হাজার বইয়ের সংগ্রহ নিয়ে পাঠাগারটি শিক্ষার্থীদের জ্ঞানচর্চার নতুন দুয়ার খুলে দেবে—এ প্রত্যাশা করাই যায়।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, রুপন নিজেই এই বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী। তাঁর ভাষায়, ‘এই বিদ্যালয় থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেছি, এবার দেওয়ার পালা।’ এই উপলব্ধির মধ্যেই একজন শিক্ষিত ও বিত্তবান মানুষের সামাজিক দায়বদ্ধতার সুন্দর প্রকাশ ঘটেছে। যে প্রতিষ্ঠান একজন মানুষকে গড়ে তুলতে ভূমিকা রেখেছে, সেই প্রতিষ্ঠানের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের এমন বাস্তব উদ্যোগ সত্যিই দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে।
পাঠাগার কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিছক একটি কক্ষ নয়। এটি শিক্ষার্থীর কল্পনাশক্তি, মনন ও সৃজনশীলতা বিকাশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থান। পাঠ্যবইয়ের সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা শাখার বইয়ের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি করে পাঠাগার। তাই আধুনিক পাঠাগারে বিনিয়োগ আসলে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের ওপর বিনিয়োগ।
আমাদের সমাজে বিত্তবান মানুষের সংখ্যা কম নয়। ব্যবসা-বাণিজ্য, পেশা কিংবা উত্তরাধিকারসূত্রে অনেকে বিপুল সম্পদের মালিক হন। কিন্তু সেই সম্পদের একটি অংশ যদি বিদ্যালয়, পাঠাগার, চিকিৎসা, দরিদ্র শিক্ষার্থী কিংবা জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় হয়, তবে ব্যক্তিগত সাফল্য সামাজিক সাফল্যে রূপ নিতে পারে। আবু ইউসুফ রুপনের উদ্যোগ সেই দৃষ্টান্তই সামনে এনেছে।
তবে একটি পাঠাগার নির্মাণের মধ্যেই উদ্যোগটির সার্থকতা শেষ নয়। পাঠাগারটি নিয়মিত খোলা রাখা, বইয়ের সংগ্রহ সময়ের সঙ্গে সমৃদ্ধ করা, শিক্ষার্থীদের পাঠাভ্যাস গড়ে তুলতে পাঠচক্র ও বইপাঠ কর্মসূচি চালু করা এবং এর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাও জরুরি। তাহলেই ছয় লাখ টাকার অবকাঠামোগত বিনিয়োগ দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার্থীদের জীবনে কার্যকর প্রভাব ফেলবে।
আবু ইউসুফ রুপনের এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—বিত্তের সঙ্গে যদি চিত্তের সংযোগ ঘটে, তবে ব্যক্তিগত অর্জন বৃহত্তর সমাজের সম্পদে পরিণত হয়। একজন সাবেক শিক্ষার্থী তাঁর শৈশবের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরে এসে নতুন প্রজন্মের জন্য জ্ঞানের দরজা আরও প্রশস্ত করছেন—এটি নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। সমাজের অন্যান্য বিত্তবান মানুষও যদি নিজেদের শিকড়, শিক্ষা ও সমাজের প্রতি এমন দায়বদ্ধতা অনুভব করেন, তবে আমাদের বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চেহারা বদলে যেতে পারে।
অর্থ মানুষকে বিত্তবান করে, কিন্তু মানুষের জন্য সেই অর্থ ব্যয় করার মানসিকতাই মানুষকে চিত্তবান করে। আর তাই যথার্থই বলা যায়—বিত্তবানদের মধ্যে চিত্তবানই কেবল এমন কাজ করতে পারেন।






