প্রকাশ : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:২৩
ইলিশ তো কমেছেই, দেশীয় মাছও হারিয়ে যাবে?

বাংলাদেশের নদী-খাল, বিল-হাওর ও জলাভূমি শুধু আমাদের ভূপ্রকৃতির অংশ নয়—এগুলো দেশের খাদ্যনিরাপত্তা, জীববৈচিত্র্য ও কোটি মানুষের জীবিকার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’ কথাটি তাই নিছক প্রবাদ নয়; এর পেছনে রয়েছে একটি দীর্ঘস্থায়ী জলজ সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা। কিন্তু সেই বাস্তবতাই আজ নানা কারণে ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে। ইলিশের উৎপাদন ও প্রাপ্যতা নিয়ে যখন উদ্বেগ রয়েছে, তখন দেশীয় ছোট-বড় মাছের অস্তিত্বও যদি অনিয়ন্ত্রিত ও ধ্বংসাত্মক মাছ শিকারের কারণে হুমকির মুখে পড়ে, তা নিঃসন্দেহে গভীর উদ্বেগের বিষয়।
চাঁদপুরের ডাকাতিয়া নদীকে ঘিরে চাঁদপুর কণ্ঠে প্রকাশিত সোমবারের প্রতিবেদনে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা বিশেষভাবে ভাবিয়ে তোলে। একসময় রুই, কাতল, মৃগেল, কই, শিং, পুঁটি, মাগুর, চিংড়ি, মলা, ঢেলাসহ বিভিন্ন দেশীয় মাছের প্রাচুর্য ছিলো এই নদীতে। নদীটির ওপর নির্ভরশীল ছিলো বহু জেলে পরিবার। অথচ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অবৈধ কারেন্ট জাল ও চায়না দুয়ারি বা রিং জালের ব্যবহার এবং গভীর রাতে ইলেকট্রিক শক দিয়ে মাছ শিকারের মতো ধ্বংসাত্মক পদ্ধতির কারণে নদীর মাছের প্রাচুর্য দ্রুত কমে যাচ্ছে।
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয়টি হলো, এসব পদ্ধতিতে শুধু বড় মাছ ধরা পড়ে না; রেণু, পোনা এবং নানা ধরনের জলজ প্রাণীও নির্বিচারে ধ্বংস হয়। অর্থাৎ আজকের একটি অবৈধ শিকার কেবল আজকের মাছটিই কেড়ে নিচ্ছে না, আগামী দিনের মাছের সম্ভাবনাও নষ্ট করছে। প্রজননক্ষম মাছের পাশাপাশি পোনা ধ্বংস হলে একটি নদীর স্বাভাবিক মৎস্যসম্পদ পুনরুদ্ধারের সক্ষমতাই একসময় বিপন্ন হয়ে পড়তে পারে।
ইলেকট্রিক শক দিয়ে মাছ শিকার আরও উদ্বেগজনক। এটি শুধু বেআইনি মাছ ধরার একটি কৌশল নয়; জলজ পরিবেশের ওপর এর সম্ভাব্য ক্ষতির বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুতর। রাতের আঁধারে নদীতে এ ধরনের কর্মকাণ্ড চলতে থাকলে তা শনাক্ত ও বন্ধ করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। কিন্তু প্রতিবেদনে স্থানীয়দের অভিযোগ, নিয়মিত নজরদারি ও অভিযান না থাকায় অসাধু শিকারিরা সুযোগ পাচ্ছেন।
এখানে প্রশাসনের বক্তব্যটিও গুরুত্বপূর্ণ। উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় বরাদ্দের অভাবে তাৎক্ষণিক অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হয়নি; তবে শিগগিরই অবৈধ মাছ শিকার বন্ধে কঠোর অভিযান শুরু করার কথা তিনি জানিয়েছেন। এই বক্তব্যের পর এখন মূল প্রশ্ন—অভিযান কবে শুরু হবে এবং তা কতটা নিয়মিত ও কার্যকর হবে? কারণ মৎস্যসম্পদ রক্ষার ক্ষেত্রে ‘অভিযান হবে’—এমন আশ্বাস যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন ধারাবাহিক নজরদারি, আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং স্থানীয় পর্যায়ে জবাবদিহি। একটি নদীর মৎস্যসম্পদ রক্ষা কোনো নির্দিষ্ট সপ্তাহের কর্মসূচি হতে পারে না। জাতীয় মৎস্য সপ্তাহে ঝটিকা অভিযান চালিয়ে বছরের বাকি সময়ে নদীকে অনিয়মের হাতে ছেড়ে দিলে কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে না।
অবৈধ জাল ও ধ্বংসাত্মক মাছ শিকারের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি নদীর স্বাস্থ্যও বিবেচনায় নিতে হবে। নদীর নাব্যতা, দূষণ, দখল, পানির স্বাভাবিক প্রবাহ এবং মাছের প্রজননক্ষেত্র—সবকিছুর সঙ্গে মৎস্যসম্পদের ভবিষ্যৎ জড়িত। শুধু জেলেদের ওপর দায় চাপিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। একই সঙ্গে নদী ব্যবস্থাপনা ও মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। তবে এর অর্থ এই নয় যে, প্রকৃত জেলেদের জীবিকার বিষয়টি উপেক্ষা করা যাবে। মাছ কমে গেলে সবচেয়ে আগে ক্ষতিগ্রস্ত হন বৈধভাবে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহকারী মানুষগুলোই। তাই অবৈধ শিকারিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি প্রকৃত জেলেদের জন্য বিকল্প জীবিকা, প্রজনন মৌসুমে সহায়তা এবং প্রয়োজনীয় সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা জরুরি। এতে সংরক্ষণ কার্যক্রমের প্রতি স্থানীয় মানুষের আস্থাও বাড়বে।
ডাকাতিয়া নদীর সংকট তাই কেবল একটি নদীর সংকট নয়। দেশের অসংখ্য নদী-খাল ও জলাভূমিতে একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হলে এর প্রভাব পড়বে খাদ্যনিরাপত্তা, জীববৈচিত্র্য ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে। আজ যে পুঁটি, মলা, ঢেলা, শিং কিংবা মাগুরকে তুচ্ছ মনে হচ্ছে, আগামী দিনে সেগুলোই হয়তো আমাদের নদী-জলাশয়ের হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি হয়ে উঠতে পারে। ইলিশ রক্ষায় আমরা যতটা সচেতন, দেশীয় অন্যান্য মাছ সংরক্ষণেও ততটাই গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। কারণ নদী যখন রেণু-পোনা হারায়, তখন শুধু মাছ কমে না—একটি জলজ প্রতিবেশের ভবিষ্যৎও সংকুচিত হয়।
ডাকাতিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য একটি সতর্কবার্তা। অবৈধ জাল, ইলেকট্রিক শক ও অন্যান্য ধ্বংসাত্মক পদ্ধতিতে মাছ শিকার বন্ধে দ্রুত, দৃশ্যমান ও ধারাবাহিক ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে নদীর সার্বিক পরিবেশ রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। নদী বাঁচলে মাছ বাঁচবে, মাছ বাঁচলে জেলে বাঁচবে। আর নদী ও মাছ হারিয়ে গেলে হারাবে আমাদের খাদ্য, জীববৈচিত্র্য ও ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রশ্নটি তাই শুধু—ডাকাতিয়ায় মাছ কমছে কি না—তা নয়; প্রশ্ন হলো, আমরা কি সময় থাকতে আমাদের দেশীয় মাছ ও নদীর ভবিষ্যৎ রক্ষা করতে পারবো?







