প্রকাশ : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৪৪
‘পাউবো’র জায়গা দখল কি এতোটাই সহজ?

সরকারি জমিতে রাতারাতি অবৈধ নির্মাণ নতুন কিছু নয়, কিন্তু গভীর বিস্ময়ের বিষয় হলো—রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এবং একটি বিশেষ সরকারি সংস্থার সুরক্ষাধীন জমিতে একজন ব্যক্তি পাকা ভবনের ছাদ ঢালাইয়ের পর্যায় পর্যন্ত কাজ কীভাবে এগিয়ে নেন? ফরিদগঞ্জের আলোনিয়া গ্রামের গুদারাঘাট বাজারসংলগ্ন এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) জায়গা দখল করে নূর হোসেন নামে এক ব্যক্তির মার্কেট নির্মাণের অভিযোগটি তাই নিছক একটি অবৈধ স্থাপনার ঘটনা নয়; এটি সরকারি সম্পত্তি রক্ষার সক্ষমতা ও প্রশাসনিক জবাবদিহির বড় প্রশ্ন। স্থানীয়দের বাধাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কাজ চলায় পাউবো পুলিশে অভিযোগ করেছে। অন্যদিকে অভিযুক্ত পক্ষ পাউবোর সঙ্গে ‘সমঝোতা’র দাবি করলেও তা অস্বীকার করেছে কর্তৃপক্ষ।
প্রশ্ন হলো—একটি স্থায়ী ভবন নির্মাণ এক দিনে হয় না। ভিত্তিপ্রস্তর থেকে দেয়াল উঠে ছাদ ঢালাইয়ের পর্যায়ে যাওয়ার আগে দায়িত্বপ্রাপ্ত মাঠপর্যায়ের নজরদারি কোথায় ছিল? চাঁদপুরের সামগ্রিক চিত্র আরও হতাশাজনক। অনুসন্ধানী তথ্য অনুযায়ী, চাঁদপুর সেচ প্রকল্পের খালের বড় একটি অংশ দখল-ভরাটে হারিয়ে গেছে এবং জেলায় সেচ প্রকল্পের প্রায় ২৭ হাজার হেক্টর জমি কমেছে। এটি স্পষ্ট যে, ফরিদগঞ্জের ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন নয়; বরং দীর্ঘদিনের ব্যবস্থাপনা-সংকটেরই প্রতিফলন।
মাঠপর্যায়ে প্রায়ই অসাধু যোগসাজশের কথা উঠলেও প্রমাণ ছাড়া কাউকে দায়ী করা যেমন অনুচিত, তেমনি বারবার উঠে আসা এসব দাবির নিরপেক্ষ অনুসন্ধান না করাও প্রশাসনিক গাফিলতি। কথা না বাড়িয়ে এখন প্রয়োজন নথির পরীক্ষা। জমি কার, কখন নোটিশ দেওয়া হয়েছিল এবং দায়িত্বপ্রাপ্তদের প্রতিবেদন কী ছিলো—এসবের জবাব স্পষ্ট হওয়া দরকার। পাউবো নিজেই নোটিশ জারি করে উচ্ছেদ ও সীমানা নির্ধারণের কথা বলে। কিন্তু উচ্ছেদের পর জমি কেন আবার হাতছাড়া হয়? উচ্ছেদ যদি নিয়মিত তদারকি ও পাহারার আওতায় না আসে, তবে তা সাময়িক প্রদর্শনীতেই সীমাবদ্ধ থাকে।
‘ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩’ অনুযায়ী সরকারি ভূমি অবৈধ দখল দণ্ডনীয় অপরাধ, যাতে দু বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং অপরাধে সহায়তাকারীদের শাস্তির বিধান রয়েছে। সুতরাং তদন্ত হতে হবে দুই স্তরে—দখলকারী কে এবং দখলের পথ সহজ হলো কীভাবে? পাউবোর জমি কেবল সরকারি ভূখণ্ড নয়; এটি সেচ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও কৃষির সাথে সরাসরি যুক্ত। খাল দখল বা বাঁধের জায়গায় ভবন নির্মাণ সাধারণ মানুষের নিরাপত্তায় টান ফেলে।
অবৈধ নির্মাণ গড়ে ওঠার পর তা ভাঙা কঠিন। তাই প্রথম ইট গাঁথার আগেই বাধা দেওয়া এবং ডিজিটাল ম্যাপিং ও নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা জরুরি। পাউবোর অভিযোগ দায়ের ইতিবাচক, কিন্তু জমি উদ্ধার ও ভবিষ্যতে দখল রোধে জবাবদিহি দৃশ্যমান হতে হবে। সরকারি সম্পত্তি কোনো ব্যক্তিগত সম্পদ নয়, এটি জনগণের আমানত। ফরিদগঞ্জের ঘটনাটি রাষ্ট্রীয় জমি ও প্রতিষ্ঠান রক্ষার একটি বড় পরীক্ষা। জনগণ এখন আর শুধু ‘অভিযোগ পেয়েছি’ কথাটি শুনতে চায় না; তারা দেখতে চায় দখলমুক্ত জমি ও আইনের দৃশ্যমান প্রয়োগ।







