সোমবার, ২৫ মে, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ২৪ মে ২০২৬, ০৯:১৬

পশুর হাটে হারবাল ওষুধের নামে ‘ভয়ংকর’ বাণিজ্য

অনলাইন ডেস্ক
পশুর হাটে হারবাল ওষুধের নামে ‘ভয়ংকর’ বাণিজ্য

‘কোর্ট অনুমোদিত’, ‘এক ফোঁটা তেলেই মিলবে পুরুষ শক্তির ম্যাজিক!’, ‘মাত্র সাত দিনে গোপন দুর্বলতা দূর!’, ‘কাজ না হলে টাকা ফেরত!’ এমন সব চটকদার কথায় এখন সরগরম মেহেরপুরের বিভিন্ন গবাদি পশুর হাট। মাইকে উচ্চস্বরে প্রচার, ভিড় জমিয়ে কৌশলী বক্তব্য আর লোক দেখানো ‘সফলতার গল্প’ শুনিয়ে বিক্রি হচ্ছে কথিত জোঁকের তেল, হারবাল যৌন শক্তিবর্ধক ও অনুমোদনহীন নানা ওষুধ। হাটে হাটে ‘গোপন শক্তি’ বাড়ানোর নামে গড়ে উঠেছে এক ভয়ংকর প্রতারণার বাজার। সাধারণ মানুষের লজ্জা, শারীরিক দুর্বলতা ও অজ্ঞতাকে পুঁজি করে চলছে প্রকাশ্য বাণিজ্য। অথচ চিকিৎসকদের সতর্কবার্তা এসব অজানা উপাদানের তেল ও ওষুধ দীর্ঘমেয়াদে ডেকে আনতে পারে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি, এমনকি মৃত্যু।

সরজমিনে মেহেরপুর জেলার বিভিন্ন পশু হাট ঘুরে দেখা যায়, অনেকেই ভ্রাম্যমাণ ক্যানভাসে আকৃষ্ট হয়ে জোঁকের তেল ও হারবাল বিভিন্ন ঔষধ কিনছেন। অনেকে হাটে পশু বিক্রি করে তেল ও ওষুধ কিনে বাড়ি ফিরছেন। বিক্রেতাদের অধিকাংশের নেই কোনো চিকিৎসা সংক্রান্ত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বা বৈধ অনুমোদন। অথচ নিজেদের হাকিম বা যৌন বিশেষজ্ঞ বলে পরিচয় দিয়ে মানুষকে আকৃষ্ট করছেন তারা।

মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার বামন্দী হাটে দেখা যায়, জোঁকের তেল বিক্রেতা আব্দুস সালামের ক্যানভাস ঘিরে শত শত মানুষের জটলা। প্রতিবেদকের উপস্থিতি টের পেয়ে অনেক ক্রেতাই দ্রুত সরে যান। এ সময় ওই বিক্রেতা বলেন, ‘আপনি এভাবে এখানে দাঁড়িয়ে থাকলে আজ আমার আর ব্যবসা হবে না।’

কয়েকজন তেল ক্রেতাকে জিজ্ঞাসা করলে তারা বলেন, উপকার পেয়ে আবার কিনছি, কেউ বলেন লোকমুখে শুনে এখন কিনছি। অনেকে বলেন, শখের বসে কিনেছি দেখা যাক কাজ হয় কিনা।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীন ইউনানী শাস্ত্রে জোঁক দিয়ে চিকিৎসা প্রায় ৫ হাজার বছরের পুরনো। তবে ইউনানী শাস্ত্রে জীবন্ত জোঁক দিয়ে চিকিৎসার কথা থাকলেও, তেল দিয়ে চিকিৎসার বিষয়টি প্রশ্নসাপেক্ষ।

জোঁকের তেল বিক্রেতা আব্দুস সালাম বলেন, ‘আমার পরিবারে বংশপরম্পরায় এই তেল বিক্রির প্রচলন রয়েছে। আমার দাদা ও বাবাও জোঁকের তেল বিক্রি করতেন। আমি নিজেও গত ১৮ বছর ধরে কোরবানির মৌসুমে বামন্দিহাটে এসে সপ্তাহে দুদিন জোঁকের তেল বিক্রি করি।’

তিনি দাবি করেন, বিশেষ প্রক্রিয়ায় এই তেল প্রস্তুত করা হয়। প্রথমে নারিকেলের খোলের ভেতরে নারিকেলের শাঁসের সঙ্গে জোঁকের চর্বি পঁচিয়ে নেওয়া হয়। পরে সেই উপাদানের সঙ্গে এলাচ, দারুচিনি, লবঙ্গ, কর্পূর, ঘি, তিলের তেল, ভেন্নার তেল, কালিজিরার তেল, জয়তুনের তেল ও সরিষার তেল মিশিয়ে পিতলের পাতিলে ৮ থেকে ৯ ঘণ্টা অল্প আঁচে জ্বাল দেওয়া হয়। ঠান্ডা হওয়ার পর সংরক্ষণ করা হয়। তার ভাষ্য, এই তেল ব্যথা, চর্মরোগ, এলার্জি, অর্শ, রক্তের কণিকা বৃদ্ধি এবং যৌন শক্তি বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন সমস্যায় ব্যবহৃত হয়

এ বিষয়ে ২৫০ শয্যা মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালের আয়ুর্বেদিক বিভাগের মেডিকেল অফিসার ডা. শাহিন আলী বলেন, ‘জোঁকের তেল ব্যথা নিরাময়ে কিছু ক্ষেত্রে উপকার দিতে পারে। তবে কোন ধরনের ব্যথায় কী পরিমাণে এবং কীভাবে এটি ব্যবহার করতে হবে, তা একজন প্রশিক্ষিত ইউনানী বিশেষজ্ঞই নির্ধারণ করতে পারেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘বংশপরম্পরায় অনেকেই এ ধরনের তেল বিক্রি করলেও উৎপাদন প্রক্রিয়া সঠিক না হলে উপকারের চেয়ে ক্ষতির আশঙ্কাই বেশি থাকে। এতে বিভিন্ন ধরনের চর্মরোগসহ অন্যান্য জটিলতা দেখা দিতে পারে। রাস্তাঘাটে হারবাল যৌন শক্তিবর্ধক ওষুধ বিক্রির প্রবণতাও উদ্বেগজনক। এসব পণ্যে আদৌ কার্যকর ভেষজ উপাদান রয়েছে কি না, সেটিও প্রশ্নসাপেক্ষ। বিষয়টি নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও ওষুধ প্রশাসনের আরও গুরুত্বসহকারে নজরদারি করা প্রয়োজন।’

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়