বৃহস্পতিবার, ১৪ মে, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ১৪ মে ২০২৬, ১০:০২

জাহাঙ্গীরনগর: জ্ঞানের প্রাঙ্গণ, নাকি শিকারিদের অন্ধকার সাম্রাজ্য?

অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন
জাহাঙ্গীরনগর: জ্ঞানের প্রাঙ্গণ, নাকি শিকারিদের অন্ধকার সাম্রাজ্য?
ছবি : প্রতীকী

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়—যে নাম একসময় প্রকৃতির সৌন্দর্য, মুক্তচিন্তাজ্ঞানচর্চার প্রতীক ছিল, আজ সেই ক্যাম্পাসই যেন আতঙ্ক, অনিরাপত্তা আর নীরব প্রশাসনিক ব্যর্থতার প্রতিধ্বনি হয়ে উঠছে। মঙ্গলবার গভীর রাতে ৫১তম আবর্তনের এক ছাত্রীর ওপর সংঘটিত পাশবিক হামলার চেষ্টা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এটি আমাদের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভঙ্গুরতা, প্রশাসনিক উদাসীনতা এবং সামাজিক অবক্ষয়ের নগ্ন প্রতিচ্ছবি।

একজন ছাত্রী নিজের ক্যাম্পাসে হাঁটছিলেন—সেটিই কি তাঁর অপরাধ? অথচ সেই পথেই এক নরপিশাচ তাঁর গলায় জাল পেঁচিয়ে হত্যার হুমকি দিয়ে অন্ধকার ঝোপে টেনে নেওয়ার দুঃসাহস দেখায়। এই দৃশ্য শুধু একজন শিক্ষার্থীর নয়, পুরো জাতির বিবেককে অপমান করেছে। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় মানে শুধু ক্লাসরুম নয়; এটি নিরাপত্তা, স্বাধীনতামানবিক মর্যাদার জায়গা। আর সেই জায়গাতেই যদি একজন নারী নিরাপদ না থাকেন, তবে সব অর্জনই মিথ্যা অহংকার ছাড়া আর কিছু নয়।

অন্ধকার কি শুধু বিদ্যুতের, নাকি প্রশাসনেরও?

ঘটনার পর সিসিটিভি ফুটেজ উদ্ধার হয়েছে, প্রশাসন বিবৃতি দিয়েছে, পুলিশ তদন্তে নেমেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রশাসন কোথায় ছিল? ক্যাম্পাসের পরিত্যক্ত ভবন, ঝোপঝাড়, অন্ধকার সড়ক আর নির্জন অঞ্চলগুলো যে বহুদিন ধরেই অপরাধের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা, তা কি কারও অজানা ছিল? নাকি সবাই জেনেও নীরব থেকেছে?

প্রযুক্তি কখনোই দায়মুক্তির ঢাল হতে পারে না। সিসিটিভি ক্যামেরা অপরাধীর মুখ দেখাতে পারে, কিন্তু তা একজন শিক্ষার্থীর আর্তচিৎকার থামাতে পারে না। নিরাপত্তা যদি কেবল ফুটেজ সংরক্ষণে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে সেটি নিরাপত্তা নয়—এটি প্রশাসনিক অভিনয়

বহিরাগতদের অবাধ বিচরণ: কার ছত্রছায়ায়?

সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, অভিযুক্ত ব্যক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নন। অর্থাৎ বহিরাগত কেউ রাতের অন্ধকারে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেছে, একজন ছাত্রীকে অনুসরণ করেছে এবং হামলার সাহস পেয়েছে। এটি শুধু একজন বিকৃত মানসিকতার মানুষের দুঃসাহস নয়; এটি পুরো নিরাপত্তা ব্যবস্থার পতনের ঘোষণা

প্রশ্ন জাগে—বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশপথগুলো কি আদৌ নিয়ন্ত্রিত? রাত গভীর হলে ক্যাম্পাস কি শিক্ষার্থীদের থাকে, নাকি বহিরাগত বখাটে ও অপরাধীদের দখলে চলে যায়? বহিরাগত মোটরসাইকেলের বেপরোয়া বিচরণ, নির্জন এলাকায় সন্দেহজনক আনাগোনা এবং নিরাপত্তাকর্মীদের নিষ্ক্রিয়তা বহুদিন ধরেই শিক্ষার্থীদের অভিযোগের বিষয়। কিন্তু প্রশাসন যেন প্রতিবারই কোনো বড় ঘটনার অপেক্ষায় থাকে।

আশ্বাসের রাজনীতি আর কত?

প্রতিবারের মতো এবারও বলা হবে—“দোষীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে।” কিন্তু শিক্ষার্থীরা এখন আর এই গতানুগতিক বাক্যে আস্থা খুঁজে পায় না। কারণ প্রতিটি ঘটনার পর একই প্রতিশ্রুতি শোনা যায়, অথচ বাস্তবতা বদলায় না। অন্ধকার একই থাকে, ভয় একই থাকে, অনিরাপত্তা একই থাকে।

এবার হয়তো সহপাঠীদের সাহসিকতায় বড় বিপর্যয় এড়ানো গেছে। কিন্তু প্রতিবার কি কেউ ছুটে এসে জীবন বাঁচাবে? প্রতিবার কি ভাগ্য সহায় হবে? কোনো একদিন যদি সেই সৌভাগ্য না আসে, তখন কি প্রশাসন দায় স্বীকার করবে?

এখনই কঠোর সিদ্ধান্ত প্রয়োজন

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে বুঝতে হবে, এটি আর কেবল ভাবমূর্তি রক্ষার বিষয় নয়; এটি শিক্ষার্থীদের অস্তিত্ব ও জীবনের প্রশ্ন

ক্যাম্পাসের প্রতিটি অন্ধকার অঞ্চল, ঝোপসংলগ্ন সড়কপরিত্যক্ত ভবনে জরুরি ভিত্তিতে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন আলোকসজ্জা নিশ্চিত করতে হবে। বহিরাগত প্রবেশে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে হবে এবং রাতের বেলায় মোটরসাইকেলের অবাধ বিচরণ বন্ধ করতে হবে। দৃশ্যমান ও জবাবদিহিমূলক নিরাপত্তা টহল চালু করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা অন্তত বুঝতে পারে—কেউ তাদের নিরাপত্তার দায়িত্বে আছে। প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে জরুরি হেল্পলাইন, সিকিউরিটি অ্যালার্মদ্রুত প্রতিক্রিয়া ইউনিট চালু করতে হবে।

জাহাঙ্গীরনগরের এই ঘটনা কোনো একক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংকট নয়; এটি পুরো দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার জন্য এক ভয়াবহ সতর্কবার্তা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রথম শর্ত জ্ঞান নয়—নিরাপত্তা। যে ক্যাম্পাসে একজন ছাত্রী নিশ্চিন্তে হাঁটতে পারেন না, সেই ক্যাম্পাসের আন্তর্জাতিক র‍্যাঙ্কিং, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য কিংবা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কোনো মূল্য নেই।

প্রশাসনের মনে রাখা উচিত—শিক্ষার্থীরা আর ফাঁকা আশ্বাসে বিশ্বাস করে না। তারা নিরাপত্তার দৃশ্যমান নিশ্চয়তা চায়। আর অপরাধীদের জন্য বার্তা স্পষ্ট: বিশ্ববিদ্যালয় কোনো নরপিশাচের শিকারভূমি নয়। যদি এখনই কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে আগামী প্রতিটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার দায় প্রশাসন কোনোভাবেই এড়াতে পারবে না।

আশার আলো: অন্ধকারের ভেতরেই জাগরণের সূচনা

এই ঘটনার মধ্যেও কিছু দিক আমাদের সামনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়—যেখানে ভয় নয়, বরং সচেতনতামানবিকতা নতুন দিশা দেখায়।

শিক্ষার্থীদের জাগ্রত চেতনা

ঘটনার পর শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ, সহায়তা এবং নিরাপত্তা দাবির ঐক্যবদ্ধ অবস্থান কেবল প্রতিক্রিয়া নয়—এটি একটি নতুন নাগরিক চেতনার উত্থান

এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতা: সাহসই নতুন সংস্কৃতি

এই ঘটনার সবচেয়ে অনুপ্রেরণাদায়ক দিক হলো—চিৎকার শুনে দ্বিধা না করে এগিয়ে আসা সেই দুই শিক্ষার্থীর তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত। মুহূর্তে মোটরসাইকেল থামিয়ে বিপদের দিকে এগিয়ে যাওয়া কোনো সাধারণ প্রতিক্রিয়া নয়; এটি একটি সচেতন, মানবিকদায়িত্বশীল নাগরিক মানসিকতার প্রকাশ।

এই সাহসিকতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—নিরাপত্তা কেবল প্রশাসনের দায়িত্ব নয়; এটি সমষ্টিগত চেতনার অংশ। যখন একজন শিক্ষার্থী ভয়কে উপেক্ষা করে অন্যের পাশে দাঁড়ায়, তখন তা শুধু একটি ঘটনা নয়—এটি হয়ে ওঠে মূল্যবোধের বাস্তব উদাহরণ। এই এগিয়ে আসার মানসিকতাই ভবিষ্যতের ক্যাম্পাসকে গড়ে তুলতে পারে আরও সংহত, মানবিক এবং নিরাপদ হিসেবে।

সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—নিজের নিরাপত্তার পাশাপাশি অন্যের নিরাপত্তার দায়িত্বও আমাদের সবার।

ডিসিকে /এমজেডএইচ

অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন

প্রতিবেদক: অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন

বিশেষ প্রতিনিধি,সিনিয়র সাব-এডিটর, ও কলামিস্ট, দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠ।

তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, চাঁদপুর জেলা বিএনপি।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়